Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৯ বুধবার, সেপ্টেম্বার ২০১৮ | ৪ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

শিক্ষকদের বিপদে শিক্ষার্থীরা উদ্ধাকর্তা কেন নয়

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩০ নভেম্বর ২০১৭, ০৬:০৫ AM আপডেট: ৩০ নভেম্বর ২০১৭, ০২:১১ PM

bdmorning Image Preview


ফারুক আহমাদ আরিফ-

আজ ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসের শেষ দিন। ১৬ অক্টোবর থেকে শুরু করে এই নভেম্বর মাসটি আমার জীবনে একটি বেদনাবিধুর অবস্থা সৃষ্টি করে চলে যাচ্ছে। অনেক বিষয় যুক্ত হয়েছে। আবার কিছু বিষয় মুক্তও হয়েছে। দেশের শিক্ষাকাশে যুক্ত হয়েছে কতগুলো কালিমা, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তৈরি হয়েছে বেদনা।

প্রথমেই আসি নভেম্বর মাসের একটি সংবাদ নিয়ে। ২ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের প্যানেল নীল দলের সাধারণ সভায় প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানীর ওপর সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিন হামলা চালান। এটি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যে কোন মঙ্গলবার্তা নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশসহ তিনটি দেশ সৃষ্টিতে এর রয়েছে অসাধারণ অবদান। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ই তিনটি দেশ সৃষ্টি করে এটি সম্ভবত পৃথিবীর অন্যকোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে নেই। অবশ্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হয়ে চলেছেন অহরহ।

কিন্তু সেই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানে নিজেদের সামান্য স্বার্থের জন্যে শিক্ষকদের মধ্যে হাতাহাতি একটি ঘৃন্য কাজ। বাংলাদেশ সৃষ্টিতে যে দলটি নেতৃত্ব দিয়েছে সেটি আওয়ামী লীগ। অথচ আওয়ামী লীগের ব্যানার ব্যবহার করা শিক্ষকমণ্ডলী কাজটি করেছে মুসলিম লীগের মতো। এটির একটি সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের ইতিহাস-ঐতিহ্যে কালিমা এটে দেওয়ার কারণে এদেরকে নিয়ে দলটির চিন্তা করার প্রয়োজন রয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস।

এর আগে একি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীহ, দলহীন শিক্ষক ড. ফাহমিদুল হকের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা করেছিলেন তার সহকর্মী অধ্যাপক আবুল মনসুর আহাম্মদ। বিজ্ঞমহলে ড. ফাহমিদুল হক একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবেই সমাদিত। অথচ নিরীহ এই শিক্ষকের কপালে একে দেয়া হলো ৫৭ ধারার মামলা। এই মামলা নিয়ে আমরা অনেকেই লেখার মাধ্যমে টুকটাক প্রতিবাদ করলেও ঢাবির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষার্থী প্রতিবাদ জানালেন না। মুখে কুলুপ এটে বসে থাকলেন।

সমাজজীবনে এমন যদি বিভাজন বা নির্লিপ্ততা শুরু হয় তবে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কি হবে তা ভাবতেও গা ছম ছম করে উঠে।

২০১১ সালের ২৮ মে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বসুন্ধরা শাখার শিক্ষক পরিমল জয়ধরের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করে এক ছাত্রী। পরবর্তীতে সে মামলা করলে পুলিশ গ্রেফতার করে পরিমলকে। যেখানে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের বাবা-মার মতো সম্মান করে সেখানে শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানী করে থাকে শিক্ষকদের একটি অংশ। কোথাও কোথাও এমনও অভিযোগ আছে যে, শিক্ষিকারাও ছাত্রদের দ্বারা এমন অনৈতিক কাজ করিয়ে থাকে।

কথা হলো সমাজে এমন কেন হচ্ছে? যে যা খুশি তাই করছে। কারো কোন ন্যায়-নীতিবোধ নেই। বিবেকের কোন তাড়া বা নাড়া নেই। নৈতিকতার কোন বালাই নেই। মানবসমাজে কোন জবাবদিহিতা নেই। অন্যায় করে বুক ফুলিয়ে হেঁটে বেড়ায়। ৫০টি কথা বললে ৪৫টিই মিথ্যা বলে।

এখন আবার যুক্ত হয়েছে অন্যের স্বপ্ন চুরি। কাজ চুরি। লেখা চুরি। শ্রম চুরি। আইডিয়া চুরি। গল্প চুরি। চুরির রাজ্যে সবাই রাজা-মহারাজা। শিক্ষার্থীদের একটি দল অনেক কষ্ট, শ্রম-সাধনা করে একটি প্রকল্প, অনুষ্ঠান, সেমিনার, মেলা বা সৃষ্টিশীল কাজের কাঠামো দাঁড় করান আর সেখানে শিক্ষকরা এসে হামলে পড়ে নিজের ঝুড়িতে নিতে সামান্যতম লজ্জাবোধও করেন না। কখনো জাতিকে উদ্ধারের নামে, কখনো ওরা কিছুই জানে না-পারে না ইত্যাদি অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীদের রোপন করা বৃক্ষটি ফল দেওয়ার সময় নিজের মালিকানায় নিয়ে নেন।

আবার শিক্ষকমণ্ডলী বিপদে পড়ে কাতরাতে থাকলেও শিক্ষার্থীরা পাশে দাঁড়ান না। পিতৃব্যতুল্য শিক্ষকরা অনেক সময় কাতরাতে কাতরে মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছেন কিন্তু শিক্ষার্থীরা চড়কগাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকে কোন কথা বলছে না। তাকে জ্ঞানের সাথে পরিচিতকারী ব্যক্তিটিকে সাহায্য করা কোন ধরনের দায়-দায়িত্বও মনে করে না।

এই নির্লিপ্ততা শিক্ষক-শিক্ষার্থী দুই দিক থেকেই হচ্ছে। এটি থেকে উত্তরণের কোন পথও কেউ যেমন দেখাচ্ছে না তেমনি অন্ধকারে জোনাকীর আলো নিয়ে যারা সামনে আসতে চাচ্ছে তাদের পাখাও ভেঙে আলো কেড়ে নিয়ে যন্ত্রণার মহাসাগরে নিক্ষেপ করা হচ্ছে।

কয়েকদিন আগে দেখলাম একজন শিক্ষক ক্লাসে কফি খেয়ে মগটি নিজ হাতে নিয়ে আবার ডিপার্টমেন্টে যাচ্ছেন অথচ কোন শিক্ষার্থী হাত বাড়িয়ে তাকে সহযোগিতার জন্যে এগিয়ে আসছে না। যখন বললাম এটি আমার হাতে দেন অথবা অন্য শিক্ষার্থীদের বললাম আপনারা হাতে নেন, তখন তিনিও দিলেন না। বিষয়টা যেন 'নিজ হাতে করি কাজ হারিজিতি নাহি লাজ' এর মতো হয়ে গেল। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কাজ দেওয়া নিরাপদ মনে করেন না। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকদের কাজকে সম্মান করছে না।

চলতি বছরের ৩০ জুলাই ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষক ফারহান উদ্দিনকে বিশ্ববিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রার সহুল আফজাল লাঞ্ছিত ও চাকরিচ্যুত করলে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তার জন্যে আন্দোলন করতে গিয়ে ১৫ জন শিক্ষার্থী লাঞ্ছিত হয়েছে। সপ্তাহব্যাপী আন্দোলন করে শিক্ষককে ডিপার্টমেন্টে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে অথচ বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের প্রেসিডেন্ট স্যার আবেদ খানের কোন কূটকৌশল কোন কাজে আসেনি।

১ অক্টোবর সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির বনানী শাখায় ১২ জন শিক্ষককে বিনা কারণে কর্তৃপক্ষ বহিষ্কার করলে শিক্ষার্থীরা ৫ দিনব্যাপী চরম আন্দোলন করে তাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে নিজ নিজ কর্মস্থলে। অর্থাৎ শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের দায়বদ্ধতা, সম্মানবোধ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এখানে সফল হয়েছে। শিক্ষকদের দুর্দিনে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এসেছে।

১৬ অক্টোবর থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত একটি সমস্যায় যখন আমাকে ঘুরপাক খাওয়ানো হচ্ছিল দেখলাম আমার শিক্ষকমণ্ডলী ও শিক্ষার্থী বন্ধুরা তাদের জানপ্রাণ দিয়ে সেখান থেকে উদ্ধারে শ্রম, ঘাম, প্রেম ঢেলে দিয়েছেন। সাহসিকতার সাথে  লড়াই করেছেন। এটি এই মুহুর্তে যে কতটা আলোকবর্তিকা তা ভবিষ্যৎই বিচার-বিশ্লষণ করবে।

অন্যায় দেখে বুদ্ধিজীবীসমাজ নীরব থাকলে প্রশাসন ভেঙে যায় আর শিক্ষার্থীসমাজ নীরব থাকলে রাষ্ট্রই অস্তিত্ব হারায়। কিন্তু এই সামান্যতম উপলব্দিটি আমাদের মধ্যে আসছে না। স্ব-উদ্যোগে কেউ এগিয়েও আসছি না। শিক্ষকরাও মানুষ, ভুল-ভ্রান্তি তাদেরও হবে সেই শিক্ষকদের ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে মীমাংসা করা শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব-কর্তব্য নয় কি?

এখানে আরেকটি বিষয় অবশ্য বিবেক দিয়ে ভাবতে হবে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের বিবাদ মিটাতে আসলে শিক্ষকদের অপমান নয় বরং সম্মান এই দৃষ্টিকোণ থেকে যে, শিক্ষার্থীদের এমন গুণাবলী শিক্ষকরাই শিখিয়েছেন। অর্থাৎ এই বৃক্ষটি শিক্ষক মহোদয়ই রোপন করেছেন। অতএব নিজ হাতে রোপিত বৃক্ষের ফল ভোগ করতে কোন ধরনের ইতস্ততবোধ করা ভালো হবে না।

শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিরসনে শিক্ষাকমণ্ডলী এগিয়ে আসবে সমুদ্রস্রোতে আর শিক্ষকদের অভিমান নিরসনে শিক্ষার্থীরা আসবে বাতাসের গতিতে। আগামীর পৃথিবীটা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা, সহাবস্থান ও সুন্দর হোক সেই কামনায় পথ চেয়ে রইলাম।

লেখক: শিক্ষার্থী; জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। ৩০ নভেম্বর-২০১৭, ভোর ৫টা ৪০ মিনিট ৫/৮ লালমাটিয়া ডি ব্লক, ঢাকা-১২০৭

Bootstrap Image Preview