ফিরে দেখা জগন্নাথ হল ট্রাজেডি

প্রকাশঃ অক্টোবর ১৫, ২০১৭

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ-

সিকি শতাব্দী ধরে এই বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছি। ঘটনাটা নিয়ে অনেকেই লিখতে বলেছে, কিন্তু কখনোই কলম ওঠেনি লিখতে। আজ নিজেকে ধাতস্ত করে লিখছি। ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর কবি জসীম উদ্দিন হলের ৫৩১ নম্বর রুমে রাত নটার দিকে কেবল খাবার খেয়ে শেষ করেছি। ঠিক তখুনি গুঁমম করে প্রবল এক ভোঁতা শব্দ আমাদের রুমটাকে কাঁপিয়ে দিল। রুমমেটরা ছিটকে বারান্দায় এলাম। উত্তরের দিকে তাকাই। শব্দ উৎপত্তি বুঝতে চাইছি। প্রত্যেক রুম থেকে ছাত্ররা বেরিয়ে বারান্দায়।

আমাদের বিল্ডিং ব্লক থেকে দক্ষিণে সোজা আন্তর্জাতিক হোস্টেল, তারপর কলা ভবন পেরিয়ে ভিসির বাড়ি পেরিয়ে বুয়েট। ভ্রু কুঁচকে উঠেছে সবার। বুয়েটে কী কিছু ঘটেছে! মিনিট কয়েক পরেই রুমে ফিরে নিশ্চুপ সকলে। একটু সময় যেতেই শাহবাগের রাস্তায় অসংখ্য এ্যম্বুল্যন্সের একটানা ছুটে চলা তীব্র সাইরেণ জসীম উদ্দিন হলের প্রতিটা কড়িডোর কাঁপিয়ে দিচ্ছে। সবকটা ছুটছে টিএসসির দিকে। সে সময়ে জসিমুদ্দিন হলের উত্তরে কোনো হল না থাকায় সহজেই যাদুঘরের ওপার থেকে শাহবাগ রাস্তার শব্দ ভেসে আসতো।

মাথায় হিসেব কষতে কষতে লাফ মেরে পোষাক বদলে আমি, আমার রুমমেট জুয়েল, সাহিন, আবু আর হুমায়ুন ঝড়ের বেগে সিঁড়ি ভেঙ্গে কলাভবন ছাড়িয়ে, ভিসির বাড়ি পেরিয়ে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সামনে হাজির। কান খাড়া। সাইরেণ কোন দিক থেকে আসছে! সাইরেণের প্রবল শব্দ আসছে জগন্নাথ হলের ভেতর থেকে। সর্বনাশ! এবার এক ছুটে উদয়ন স্কুলের পেছন দিয়ে জগন্নাথের মাঠে। শত শত ছুটে আসা ছাত্রের ধাক্কায় আমরা রুমমেটরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন। চোখের সামনের দৃশ্য দেখে ধড়াস করে উঠলো বুক। একী! ভয়াবহ দৃশ্য চোখের সামনে। বৃষ্টির পানিতে ৬৪ বছরের পুরনো জগন্নাথ হলে টিভিরুমের চুন-সুড়কির ছাদ ভেঙ্গে ইট, লোহা ও কাঠের গরাদসহ চুন-সুড়কির স্তূপে চাপা পড়ে আছে শত মেধাবী ছাত্র।

এরিই মধ্যে ফায়ার ব্রিগেড তার ওপর সার্চ লাইট ফেলে উদ্ধার কাজ শুরু করেছে। শরীরের সবকটা ঈন্দ্রীয় একসাথে কঁকিয়ে উঠলো। সামনে এগুতে পা বাড়ালাম। হড়কে গেলো পা। পাশে ছুটন্ত একজন আমাকে শক্ত করে ধরে ফেললো। অবোধ কান্না গলা টিপে মারছে।

ধুলোর ভেতর এগিয়ে গেলাম। মনকে প্রবোধ দিতে আপন মনে মাথা ঝাঁকাচ্ছি- না এ হতে পারে না। কেউ মরেনি! মনের কোনে অসংখ্য বন্ধুন মুখ। তপন! আমাদের সাথে বন্ধু তপন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের পড়ে। থাকে জগন্নাথ হলের টিভিরুমের উল্টো বিল্ডিয়ে। ওর কী খবর? ও তো বিটিভির ধারাবাহিক শুকতারা দেখবেই। ইশ্, বেঁচে আছে তো। আচ্ছা, হোসেন আলী? ওর কী খবর? এফ রহমান হলের টিভির রঙ ঠিক আসে না বলে শুকতারা দেখতে হোসেন জগন্নাথ হলে যায়। বিরুপাক্ষের কি খবর?
বিরুপাক্ষ পাল অর্থনীতিতে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্কের কেন্দ্রীয় টিমে বিরুপাক্ষ আমার সাথে যুক্ত। আমি তখন বিতর্ক সংঘের সভাপতি। ও কোথায়, কিংবা অন্য আরো জনা সাতেক বিতার্কিকরা কোথায়!

উত্তর দেবার জন্যে কেউ নেই। আমার এই ভাবনা গিলে ফেলছে চারদিকের আর্তনাদ। কেউ ডাকছে মা বলে। কেউ ভগবান বলে মাঠে আছড়ে পড়ছে। কেউ উন্মাদের মতো ধ্বংসস্তুপের দিক থেকে উল্টোপথে ছুটে আসছে, কেউ নেই দাদা, কেই নেই”। কেউ সেদিকেই ছুটছে। পুলিশের কঠোর বেষ্ঠনি সকলকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। কেউ পুলিশ বৃত্তের ভেতর যেতে পারছে না।

আমরা শত শত ছাত্র ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছি। কাঁদতে কাঁদতে মনে হচ্ছে পুরো ধ্বংশস্তুটা জড়িয়ে ধরবো। জানি না কখন, ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছে গেছি। অসংখ্য আহত ছাত্র কাতরাচ্ছে। এরিই মাঝে হাজার মানুষের লাইন। সকলে রক্ত দিতে চাইছে। চোখের পানি মুছছে লাইনে দাঁড়িয়ে। এখানে কেউ কাউকে চেনে না। তবুও ভালোবাসায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে। হাউমাউ করে কেঁদে উঠছে।

কত সময় গেছে মনে নেই আমি এক সময়ে ধীর পায়ে তখনকার পিজি হাসপাতালের সি ব্লকের পূর্বে। পিকআপ এর পেছনে স্তুপ করে বারোজনের মৃত দেহ। টপটপ করে রক্ত ঝড়ছে। প্রত্যেকের পাগুলো পিকআপের মেঝে ছেড়ে বাইরে। আমি দুহাতে ওদের পাগুলো নেড়ে দিলাম। অনুভব করলাম একজন আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। দেখি, তপন। বোবা হয়ে আছে।

আমি ওর চোখের দিকে স্তব্ধ তাকিয়ে। হাসপাতালের লোকেরা বারোটা ছাত্রের লাশ ধীরে পিকআপ থেকে নামাচ্ছে। মনে হচ্ছে প্রত্যেক ছাত্রই আহ্ণাদ করে প্রতিটা লোকের দু’হাতের ওপর নেতিয়ে আছে। কারো চোখ খোলা। কারো। বন্ধ। কিন্তু প্রতিটা মুখ বেদনাহীন। আমি এক প্রবল ঘোরে আবর্তিত।

ভোর রাতের কোনো এক সময়ে নিজেকে আবিষ্কার করলাম ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সির সামনে। দু হাতে মুখ রেখে বোবার মতো বসা। বেশ ফর্সা হয়ে এলো চারদিক। আমার রুমমেট হুমায়ুন এসে আমাকে ধাক্কা মেরে আমার সম্বিত ফেরালো।
ওই, তুই এইহানে। তরে আমি খুঁইজা মরি। কিছু খাইছস?
না। মাথা ঝাঁকালাম।

ওই, এতো ভাইঙ্গা পড়লে চলবো? একটু পরে হুমায়ুন আমার জন্যে জেলি মাখা পাউরুটি নিয়ে এলো। কিছু খা। খাইয়া চল জগন্নাথ হলের দক্ষিন বাড়ি। ওখানে অনেক লাশ আছে। দেখ গিয়া কেউ তর বন্ধু কী না। বিদায় দিবি না। ওই, উঠ।

খাবার মুখে ওঠেনি। দুজনে জগন্নাথ হলের দক্ষিণ বাড়ি গিয়ে দেখি নিচের এক বিশাল ঘরে শাদা কাপড়ে ঢাকা ৩৯ জনের মৃতদেহ দু সারিতে সাজানো। এদের ভেতর ২৫ জন ছাত্র, ১৫ জন কর্মচারি এবং অতিথি। এতো লাশ। এতো লাশ! প্রতিটা লাশের শাদা কাপড়ে নাম, পড়াশোনার বিভাগ আর বাড়ির ঠিকানা লেখা। তবুও দু সারি লাশের মাঝে কড়িডোর দিয়ে বন্ধু. স্বজনেরা নাকে রুমাল চেপে হেঁটে হেঁটে মৃত ছাত্রদের মুখ থেকে শাদা কাপড় সরিয়ে চেনার চেষ্টা করছে। এদের কেউ কি নিজের বাড়ির ছেলে?

আমিও সেখানে কোনো হারিয়ে ফেলা বন্ধুর খোঁজে। বুক খাঁমচে ধরা বেদনা। প্রতিটা লাশের ওপর থেকে শাদা কাপড় সরিয়ে মুখ দেখছি। কেউ কারো মুখের কাপড় সরালে সাথে সাথে সেদিকে তাকিয়ে দেখছি। কে সে? নাহ! আমার কেউ চেনা নয়। কিন্তু এরা সবাই যে আমার আপন। সেই আপন মানুষগুলের নিথর দেহের মাঝ থেকে বাইরে এলাম। জগন্নাথ হলের মাঠে হাজারো অশ্রুসজল মানুষ। মাঠের কোথাও জটলার ভেতর ডুকরে ওঠা কান্না। সেই কান্নার ধাক্কা আছড়ে পড়ছে সার করে রাখা ট্রাকে। ট্রাকে ওঠানো হবে কফিন। ওরা একে একে চলে যাবে আমাদের কাছ থেকে চির দিনের জন্যে।

হঠাৎ উদ্ভ্রান্তের মতো, বিরুপাক্ষ পালের ছোটো ভাই আমার কাছে এলো, দাদা, ওই ইয়েরে চিনেন নাই, আমাদের যতিন দা। ওই যে টিএসসিতে আপনাদের বিতর্কের পর আপনার কাছে গিয়ে অভিনন্দন জানাইছিলো। তার এক অতিথি মারা গেসে। যান্ত্রিক শব্দের মতো কথাগুলো আমার কানে আছড়ে পড়লো। চোখে শুধু ভাসছে শাদা কাপড়ে ঢাকা দু’সারিতে সাজানো ৩৯ জন তরুণের নিথর দেহে পাণ্ডুর মুখ।

লেখক: কবি, সাংবাদিক, প্রবন্ধিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক

কমেন্টস