স্মৃতিতে, আদর্শে জসীম মন্ডল

প্রকাশঃ অক্টোবর ৬, ২০১৭

গোপাল অধিকারী।।

জসীম উদ্দীন মন্ডল। এক বিপ্লবী নাম। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র এক প্রতিবাদী নাম। বিজ্ঞানে লেখা আছে যার জীবন আছে ,তার মৃত্যু আছে। তারপরও কিছু কিছু মৃত্যু অমরণ। তেমনি এক অমর সৈনিকের নাম কমরেড জসীম মন্ডল। ৯৫ বছর বয়সে চলে গেলেন বিপ্লবী নেতা কমরেড জসিম উদ্দীন মন্ডল। ২ অক্টোবর সোমবার ভোর ৬টার দিকে  ঢাকার হেলথ এন্ড হোপ হসপিটালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় নিজ বাড়িতে শয্যাশায়ী ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা ও বর্ষিয়ান বাম রাজনীতিক কমরেড জসিম উদ্দিন মন্ডল। তিনি বেশ কিছু দিন ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল হাসপাতালে নিউরোলজি বিভাগের প্রধান ডা. একে খুরশিদ আলমের তত্বাবধায়নে চিকিৎসা নেয়।  তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।

পারিবারিক সুত্রে জানা গেছে, তিনি দীর্ঘদিন যাবত  নানা বার্ধক্যেজনিত রোগে ভুগছিলেন। গণমানুষের মুক্তির আন্দোলনে এই পুরোধা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রিয় পলিট সদস্য, বিপ্লবী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কমরেড জসিম উদ্দিন মন্ডল এখন শুধুই স্মৃতি।

মানুষ তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে অম্লান হয়ে থাকে তা বুঝিয়ে দিয়ে গেলে কমরেড জসীম উদ্দিন মন্ডল। জগতে প্রতিটি মানুষের জন্ম আছে সেই ধারাবাহিকতায় মৃত্যুও আছে। সেই প্রকৃতির নিয়মেই বিদায় নিলেন জসীম মন্ডল। কিন্তু আজ তাঁর অভাবটুকু বার বার উপলব্ধি হচ্ছে। বার বার উচ্চারিত হচ্ছে তাঁর কালজয়ী বক্তব্য, এই পঁচা গলা সমাজটাকে ভাঙ্গতেই হবে। মনে পরে তার আদর্শ কর্মকাণ্ড। জসীম মন্ডল আপাদমস্তক একজন প্রজ্ঞাবান রাজনীবিদ। সু-বক্তা। সারাজীবন খেটে খাওয়া মানুষের জন্য লড়েছেন, রাজপথে থেকেছেন জেল খেটেছেন। ১৯২২ সালে নদিয়া জেলা (বর্তমান কুষ্টিয়া) দৌলতপুর থানার খালিদাসপুর গ্রামে নানার বাড়িতে তার জন্ম। তার পিতা মরহুম হাওস উদ্দিন মন্ডল। মাতা মরহুমা জহুরা খাতুন। রাজনীতির হাতে খড়ি কলকাতায়। বৃটিশ খেদাও আন্দোলন, কৃষক  আন্দোলন, তে-ভাগা আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। মহান ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি জেলে থাকলেও রাজপথের মিছিলে থাকতো তার মন। ১৯৬৬ ছয় দফা আন্দোলন ১৯৬৯ গণ অভ্যুত্থান সহ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন নিবেদিত সংগঠক। স্বাধীনতা পরবর্তীতে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। তিনি প্রায় ২৩ বছর জেল খেটেছেন। কমরেড উপাধি পান ১৯৪০ সালে। খেটে খাওয়া মানুষের দাবি আদায়ের জন্য তার যে রাজনীতির দর্শন তিনি সেটা বুকে লালন করে যাচ্ছে যথারীতি।

জসীম মন্ডলের সময়ে জন্ম নিয়েছিলেন অনেক ব্যক্তি,অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। কিন্তু তাঁদের চেয়ে জসীম মন্ডলের বিদায় জানানোটা একটু আলাদা। কারণ তিনি কাজ করেছেন মাটি ও মানুষের জন্য। কাজ করেছেন নিরবে নিভৃতে। বাড়ি আমার ঈশ্বরদীতে তাই জসীম মন্ডলের বিভিন্ন কর্মকান্ড আমার স্বল্প বয়সে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। তখনও বুঝিনি তিনি এতটা সম্মানের। তবে অনুধাবন করতাম যেখানে বিভিন্ন দলের বিভিন্ন নেতার মধ্যে একটা অশ্রদ্ধার ভাব বিরাজ করে যেমন আওয়ামী লীগ নেতা হলে বিএনপির নেতাকে পছন্দ করে না ঠিক তেমনি বিএনপি’র নেতা আওয়ামী লীগের নেতাকে পছন্দ করে না। কিন্তু আমার দেখা জসীম মন্ডল একজন নেতা যাকে সকল শ্রেণির সকল পেশার মানুষ শ্রদ্ধার চোখে দেখেছে। করেছে সম্মান, দিয়েছে সম্মাননা। আমার মনে হয় আমরা এখন শুধু সমাজের উচ্চ শ্রেণির মানুষদের নিয়ে ভাবি তাই সমাজটা এমন। কিন্তু জসীম মন্ডল সমাজের খেটে খাওয়া মানুষদের নিয়ে ভাবতেন তাই তিনি আজ এতটা শ্রদ্ধার। তিনি চেয়েছিলেন শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে।

মঙ্গলবার ঢাকায় সিপিবির দলীয় কার্যালয়ের সামনে জানাযা, শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন ও রাষ্ট্রীয়ভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আজীবন সংগ্রামী এই নেতাকে তার নিজ গ্রামের বাড়িতে দাফন হলো, তাঁর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী গভীরভাবে শোক প্রকাশ করেছে। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানালো আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, বিভিন্নমহল। দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর মৃত্যুতে হয়েছে শোকসভা। কিন্তু নির্মম সত্য হলো যখন তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন তখন কোন বড় নেতা বা মহলকে তাঁর পাশে  পাওয়া যায় নাই। শুধু ঈশ্বরদীর সংবাদপত্রে তাঁকে নিয়ে বার বার গুরুত্বের সাথে প্রতিবেদন হয়েছে। ভাবলে মনে হয় আমরা অতীতকে ভুলে যায়। বর্তমান নিয়ে বেশি গুরুত্ব দেই। কিন্তু আমাদের অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন আছে। কারণ,অতিত ছাড়া ভবিষ্যৎ হয় না।

জসীম মন্ডল আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেলেন ভাল কর্ম করলে, দেশের জন্য দেশের জনগণের জন্য কাজ করলে তার মরণ নেই,কেই স্বীকার না করলেও তা মনের কোঠরে রেখা হয়ে থাকবে। ভালো কর্মকে  জগতে মহান হতে শিখাই। ভাল কর্মই মানুষকে যুগ যুগ স্মরনীয় করে রাখে। মানুষ তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকে। আমাদের ব্যক্তিত্বগুণে কাজ করা উচিত। কোন ক্ষমতা মোহে নয়। কারণ, ক্ষমতা আজ আছে কাল নেই। যখন ক্ষমতা থাকবে তখন স্যার আর যখন ক্ষমতা থাকবে না তখন কেই তাঁকে মূল্য দিবে না। কিন্তু ভাল কর্ম, ভাল মানুষ বার বার সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয়। ক্ষমতার সামনে যেমন, ক্ষমতার আড়ালেও তেমন। জসীম মন্ডল মরে আবারও প্রমাণ করে গেলেন “কীর্তিমানের মৃত্যু নেই”। আসুন আমরা জসীম মন্ডলের জীবনী থেকে শিক্ষা নেই। দেশ ও জাতীর কল্যাণে কাজ করি।

Advertisement

কমেন্টস