অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে চাই বৈষম্যহীন সরকারি ছুটি

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৭

গোপাল অধিকারী-

আমরা গর্বিত, আমরা বাঙালি জাতি। আমরা গর্বিত আমরা বাংলাদেশী। বাঙালির ইতিহাস সমৃদ্ধ ইতিহাস, বাঙালির ইতিহাস সম্প্রীতির ইতিহাস। এজন্য আমরা অসাম্প্রদায়িক। এজন্য আমরা সংকীর্ণতার উর্ধ্বে।

বাঙালিই একমাত্র জাতি যারা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে, বাঙালি একটি জাতি যারা সকল জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। দূরীভূত হয় ত্যাগ-তীতিক্ষা। বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগের ২৮(১) নং অনুচ্ছেদে স্পষ্ট লেখা আছে কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও একটি সমীকরণে মিল হয়নি। আর তা হলো উৎসবে ছুটি। পূর্বে এই দাবিতে সম্মতি কম  থাকলেও বর্তমানে অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবে তিনদিন ছুটির দাবিতে মানববন্ধন, স্মারকলিপিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করছে বিভিন্ন সংগঠন।

আমরা বলি “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”। আর সেই কথাটি মানতেই সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ঈদের দাওয়াতে উপস্থিত হচ্ছে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিচ্ছে। ঠিক তেমনি মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ দূর্গোৎসবে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিচ্ছে। একই হিসাবে বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্যদের ক্ষেত্রে। আমি অংকে তেমন পাঁকা নই, আর প্রাইভেট পড়তে ভালো লাগে না তাই কখনও বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে অধ্যয়ন করি নাই। কিন্তু দুই আর দুইয়ে চার হয় এটা সহজে পারি। কথাগুলো এজন্যই বলছি যে,আমি যে যেটাই বলুক সেই যুক্তিকে নিজের জ্ঞান, বিবেক আর বুদ্ধি দিয়ে বিবেচনা করে তারপর বাস্তবজীবনে কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। আর এই বাস্তব জীবনে এটা স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করেছি যে, কিছু সাম্প্রদায়িক জ্ঞানপাপী ছাড়া বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই এখন অসাম্প্রদায়িক।

আমাদের আচার-আচরণ, রীতি-নীতি একটু ভিন্ন হলেও সকলে মিলেমিশে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। কিন্তু কষ্ট হলেও সত্য যে ঈদে যেখানে ৩দিন পর্যন্ত ছুটির বিধান আছে সেখানে অন্যান্য ধর্মের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠানে একদিন ছুটির বিধান রাখা হয়েছে। এটা ধর্মের দোষ নয়, আসলে এই দোষটা কিসের? এটা জানতেই এই কলামটা লেখা। একটি ঈদে একটি সন্তান যেমন তাঁর মায়ের কাছে যায় ঠিক তেমনি পূঁজোতেও একটি ছেলে তাঁর মায়ের কোলে ফিরে যায়। একটি ঈদে যেমন একটি বাবা তাঁর মেয়ের কাছে যায় ঠিক তেমনি পূঁজোতেও একটি বাবা তাঁর মেয়ের কাছে ফিরে যায়। ঠিক তেমনি বৌদ্ধদের উৎসবে বৌদ্ধরা এবং খ্রিস্টানদের উৎসবে খ্রিস্টানরা পালন করে। কিন্তু একদিনের ছুটি তাঁরা কতটা আনন্দ-কষ্ট ভাগাভাগি করতে পারে? এমন অনেক সন্তানই আছে যার পৃথিবীতে মা ছাড়া কেউ নেই । অভাবের সংসারে অর্থের সংস্থান যোগানে তাঁকে যোগ দিতে হয়েছে রাজধানী ঢাকাতে কর্মস্থলে। তাঁর পক্ষে কী সম্ভব পৃথিবীতে বেঁচে থাকা একমাত্র মায়ের সাথে উৎসব পালন করা? একজন নাগরিকের কী সম্ভব বাড়িতে আসা অতিথিদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় বা আদর-আপ্যায়ন করা? বর্তমান সরকার বিভিন্ন গোষ্ঠীর ব্যাপারে খুবই সচেতন বা  সদয়শীল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিনিও অন্য ধর্মের অনুষ্ঠানে গিয়ে বলেন ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। কিন্তু উৎসবে ছুটিটা কম থাকলে আমার মনে হয় সবাই উৎসব উপভোগ বা উদযাপন করতে পারি না। তাই আমি মনে করি সরকারের অবশ্যই এ বিষয় নিয়ে বিবেচনা করা উচিত। তবেই ধর্ম যার যার উৎসব সবার কথাটি বেশি প্রযোজ্য হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামলেখক ও মানবাধিকারকর্মী।

Advertisement

কমেন্টস