রোহিঙ্গা শরণার্থী: দায় কার, কী করণীয়?

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৭

Advertisement

সাঈদ আহসান খালিদ-

এটি ইতোমধ্যে সন্দেহাতীত যে মিয়ানমারের আরাকানে চলমান রোহিঙ্গা নিপীড়ন স্রেফ জঙ্গিবিরোধী সরকারি অভিযানের সীমা অতিক্রম করে ‘গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও জাতিগত নিধন (Ethnic Cleansing’ এর রূপ লাভ করেছে। নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে পলায়নপর রোহিঙ্গা শরণার্থীর সবচেয়ে বড় চাপটি বাংলাদেশকে সহ্য করতে হচ্ছে যদিও এই সমস্যা সৃষ্টিতে বাংলাদেশের কোন ভূমিকা ছিল না।

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে আসছে দীর্ঘদিন যাবত। আন্তর্জাতিক সমস্ত আইন, রীতিনীতি ও মানবাধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভয়ংকর নিপীড়ন, নিগ্রহ, হত্যা, গণধর্ষণ, সম্পত্তি বিনাশ, উচ্ছেদ ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে ‘রোহিঙ্গা’ নামের এই পুরো জাতিগোষ্ঠীকেই বাংলাদেশে স্থানান্তর এবং বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা করছে। চলমান নিপীড়ন ও গণহত্যা সেই অপপ্রয়াসের চূড়ান্তরূপ।

ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত সত্য হচ্ছে রোহিঙ্গা মিয়ানমারের একটি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী এবং ধর্ম ও চট্টগ্রামের কিছুটা আঞ্চলিক ভাষাগত সাযুজ্য ছাড়া বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাথে রোহিঙ্গার কোন নৃতাত্ত্বিক সম্বন্ধ নাই। এক ভাষায় কথা বললে বা একই ধর্মাবলম্বী হলেই দুটি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী এক হয়ে যায় না। যেমন: ভারতের আসাম রাজ্যে অসমীয়া জাতিগোষ্ঠীর ব্যবহৃত ‘অসমীয়া ভাষা’র সাথে বাংলা ভাষার বেশ মিল আছে, তাই বলে অসমীয়রা বাঙ্গালী হয়ে যায় নাই। তাই মায়ানমারের এই দাবি সর্বান্তকরণে নিন্দনীয়, পরিত্যাজ্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
এই জাতিগত নিধন ও নিপীড়নের দায় শুধুই মায়ানমার এবং শান্তির নোবেল বিজয়ী অং সান সু চিকে নিতে হবে। এই রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে বাঙ্গালী বা মুসলিম পরিচয়ের সূত্রে এদেশে আত্মীকরণের কোন দায় বাংলাদেশের নাই এবং এমন কোন দাবি অগ্রহণীয়।

উপরোক্ত মূল কারণ ছাড়াও অন্তত আরো চারটি গ্রাউন্ডে বাংলাদেশ নিপীড়িত রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দানে ‘অনাগ্রহ’ প্রদর্শন করে আসছে: (ক) ১৯৫১ সালের জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক কনভেনশন এবং এই সংক্রান্ত ১৯৬৭ সালের প্রটোকলে ১৪৫ টি রাষ্ট্র সমর্থন দিলেও বাংলাদেশ অদ্যাবধি সাক্ষর করে নাই। তাই শরণার্থীদের আশ্রয়দানে বাংলাদেশ আইনত বাধ্য নয়।

(খ) শরণার্থীদের আশ্রয়দানের নিশ্চয়তা প্রদান করে অদ্যাবধি বাংলাদেশ কোন জাতীয় আইন প্রণয়ণ করে নাই। (গ) রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয়ের অধিকারের স্বীকৃতি ও জাতিগত নিপীড়ন বন্ধ আন্তর্জাতিক জটিল ভূ-রাজনৈতিক বিষয় যার সমাধান বাংলাদেশের আয়ত্তে নাই। (ঘ) যে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা পূর্বে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এখনো তাদের প্রত্যাবর্তন সম্ভব হয়নি, বেশিরভাগ রোহিঙ্গা অনিবন্ধিত রয়ে গেছে এবং এসব অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের একটি অংশের অপকর্ম ও অপরাধ প্রবৃত্তির কারনে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

শরণার্থী বিষয়ক কনভেনশনে সাক্ষর না করলেও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিলের সাক্ষরকারী হিসেবে বাংলাদেশ জাতিগত নিপীড়নের শিকার আশ্রয়প্রার্থীদের আশ্রয়দানের দায় এড়াতে পারে না: (ক) ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন মূলত সৃষ্টি হয়েছে ১৯৪৮ সনের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ (UDHR) এর অনুচ্ছেদ ১৪ কে ভিত্তি করে। বাংলাদেশ এই সনদে সাক্ষরকারী সদস্যরাষ্ট্র। (খ) ১৯৮৪ সালের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন (Convention Against Torture -CAT) অনুযায়ী- ‘কোন ব্যক্তিকে অন্য কোন দেশে ফেরত পাঠালে যদি নির্যাতনের সম্মুখীন হওয়ার আশংকা থাকে তাহলে কোন সদস্যদেশ ওই ব্যক্তিকে বিতাড়ন, প্রত্যর্পণ, ফেরত পাঠানো বা তাকে প্রবেশে বাধা দিতে পারবেনা’।

১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ এই CAT সাক্ষর করে সদস্য হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি – ‘Principle of non- refoulement’ বা আশ্রয়প্রার্থীকে ফিরিয়ে না দেওয়ার নীতির প্রথাগত বাধ্যবাধকতা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা তো আছেই।

দেশে এবং আন্তর্জাতিকভাবে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা চলে আসছে যে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদানে অস্বীকার করছে। আশ্রয় প্রদানে ‘অস্বীকার’ এবং বাস্তবিক কারনে বাড়তি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় প্রদানে ‘অনাগ্রহ’ এক নয়। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দানের অনুরোধ ও চাপ প্রদানে যেরূপ উচ্চকণ্ঠ- রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানে মায়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগে ততটাই অনাগ্রহী ও নির্লিপ্ত।

সত্যটা হচ্ছে অনাগ্রহ ও ডিরেক্ট আইনি বাধ্যবাধকতার অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বাংলাদেশ রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে আশ্রয়দানে পৃথিবীর শীর্ষদেশ। আল- জাজিরার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে ১৯৭০ সাল থেকে অদ্যাবধি রোহিঙ্গা শরণার্থী গ্রহণকারী বিশ্বের শীর্ষ দেশ সমূহ হচ্ছে-
(ক) বাংলাদেশ: ৬ লক্ষ ২৫ হাজার
(খ) পাকিস্তান: ৩ লক্ষ ৫০ হাজার
(গ) সৌদিআরব: ২ লক্ষ
(ঘ) মালয়েশিয়া: ১.৫ লক্ষ
(ঙ) ভারত: ৪০ হাজার
(চ) ইন্দোনেশিয়া: ১ হাজার।
চলমান নিপীড়নে বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গার যে ঢল নেমেছে তাতে এই সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও সাহায্য প্রদানে বাংলাদেশকে সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুরোধকারী দেশ তুরস্কের নাম তালিকায় নাই!

এতদসত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিয়েছে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন, জেলা প্রশাসনের তদারকিতে আগত লক্ষ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও জরুরি ত্রান সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, উখিয়ার বালুখালিতে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শনের ঘোষণা দিয়েছেন। বাংলাদেশের সব মানুষ রোহিঙ্গাদের প্রতি সহমর্মী ও তাদের অধিকারের প্রতি সংবেদনশীল।
এই জাতীয় সহৃদয়তা ও মানবিক সহায়তা উদ্যোগ খুবই প্রশংসনীয়, সময়োপযোগী ও যথার্থ। কিন্তু একইসাথে মনে রাখা দরকার:

রোহিঙ্গাদের এই সাময়িক আশ্রয়দান ও মানবিক সাহায্য স্থায়ী সমাধান নয়। তাদের জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি ও আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রত্যার্পণের জন্য মিয়ানমারের উপরে আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত না রাখলে মায়ানমারের জান্তা সরকারের অসৎ ইচ্ছাই চরিতার্থ হবে এবং রোহিঙ্গারা হবে আমাদের ‘গোদের উপর বিষফোঁড়া’।

আশ্রিত সব রোহিঙ্গার বাধ্যতামূলক বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করাতে হবে- যাতে পরিচয় গোপন করে বাংলাদেশী নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে না পারে।

জাতিসংঘের সাথে সমন্বয় করে রোহিঙ্গাদেরকে মানবিক সুযোগ- সুবিধাসহ পৃথক আবাসস্থলে রাখতে হবে, বাঙালি- রোহিঙ্গা বিয়ে নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে রোহিঙ্গাদের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

ইউরোপে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতপ্রসূত শরণার্থী সমস্যার সমাধানের আদলে প্রতিবেশী ও সাহায্য ইচ্ছুক দেশসমূহের সাথে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থী ভাগাভাগি করে গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
সাময়িক মানবিক আশ্রয়দানের পাশাপাশি আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে বাংলাদেশের দুরাবস্থা ও অসহায়ত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিগোচর করতে হবে, কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে এবং অং সান সুচি ও মায়ানমার সরকারের এই কর্মকাণ্ডের নিন্দা ও জোরালি প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে হবে, রোহিঙ্গা যে বাঙ্গালী নয়; মায়ানমারের স্বতন্ত্র নৃগোষ্ঠী- এই ঐতিহাসিক সত্যের পৌনঃপুনিক প্রচার চালাতে হবে।

মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে ফেলা ছাড়া এই সমস্যা উত্তরণে আমাদের আপাত কোন বিকল্প নাই।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক আইন অনুষদ; চট্টগ্রাম বিশ্বিবিদ্যালয়

Advertisement

Advertisement

কমেন্টস