নেত্রীর কাছে একটা অাবদার ‘আমি যেন নেত্রীর সাথে দেহা করতে পারি’ (ভিডিও)

প্রকাশঃ আগস্ট ১৯, ২০১৭

বঙ্গবন্ধুকে কাফন-দাফনকারী ব্যক্তিদের বেশিরভাগই মৃত্যুবরণ করেছেন। বর্তমানে বেঁচে আছেন কয়েকজনমাত্র। তাদের মধ্যে আইয়ুব আলী শেখ অন্যতম। তিনি বঙ্গবন্ধুর কফিন বক্স খুলেছিলেন। গোসল দিয়ে জানাজায় ছিলেন। চলতি ২০১৭ সালের ১৪ মে তিনি বিডিমর্নিংকে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন। সাক্ষাৎকারটি নেন বিডিমর্নিং এর হেড অব নিউজ ফারুক আহমাদ আরিফক্যামেরা ছিলেন বিডিমর্নিং এর প্রতিনিধি এম আরমান খান জয় ও হেমন্ত বিশ্বাস কৃষ্ণা। আজ সাক্ষাৎকারের শেষ পর্বটি প্রকাশিত হলো।

ফারুক আহমাদ আরিফ: এতো লোক কম কেন? ৩০-৩৫ জন মানুষ, বাকিরা কোথায় গেল?
আয়ুব আলী শেখ: তারা মারা গেছে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: না, মানে এই জানাজার সময় এতো অল্প লোকজন কেন?
আয়ুব আলী শেখ: বাহিরের কোন লোককে ঢুকতে দেয় নাই। তারপরে বঙ্গবন্ধুকে সমাধি দেয়ার পর শেখ বাড়ির এক লোক ছিল আব্দুল মন্নান শেখ। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির পূব সাইডে তার বাড়ি। কবর দেওয়ার পর তার সিকনেচার নিয়ে গেল ডায়রিতে ‘যে বঙ্গবন্ধুর লাশ বুঝে পায়ছি’। পরে মনে করেন এখানে ক্যাম্প কইরা দিল। বাইরে থেকে কেউ এখানে ঢুকতে পারে না। পাঁচজন মানুষ/তিনজন মানুষ এক সাথে হতে পারতো না।

1

ফারুক আহমাদ আরিফ: এটা কতদিন পরে?
আয়ুব আলী শেখ: এইটা ওই সময় থেকেই। ১৬ আগস্ট থেকেই শুরু। এখানে একটা ক্যাম্প খুইল্যা দিল। সব সময় ডিউটি দিত। কোন লোক এসে মিলাদ পড়তে পারবে না। আগরবাতি, মোমবাতি দিতে পারবে না। একটা লোক আসছিল যশোর থেকে। সে একটা বকুল গাছের চারা লাগাইছিল তারে এরেস্ট করে নিয়া গেছে। তার জন্যে মনে কষ্ট পালাম লোকটা এতদূর থেকে এসে একটা চারা লাগালো তারে ধইরা নিয়া গেল। আমরা তিনদিন পরে, তিন পরে বঙ্গবন্ধু ওইযে মোড়ে আসলেন? ওই মোড়ে পাটি বিছায় দিয়া আমরা কয়জন টঙ্গিপাড়ার মানুষ জিলাপি আয়না মিলাদ দিলাম। তিনদিন পরে পাটি বিছায়া দিয়া মিলাদ দিলাম। এইহানে আমাদের ঢুকতে দিল না।

ফারুক আহমাদ আরিফ: উনার (বঙ্গবন্ধুর) ফ্যামিলি মানে চাচাত ভাইয়েরা কেউ ছিল না?
আয়ুব আলী শেখ: না। উনারা সব পলাতক।

ফারুক আহমাদ আরিফ: সবাই পালাইছে?
আয়ুব আলী শেখ: হু, সব পলাতক। উনারে (বঙ্গবন্ধুকে) মাটি দেওয়ার পর আরেকটা টিম আসলো তারা বাড়ি সিলগালা কইরা দিয়া গেল। সরকার থাইক্যা লোক আইসা। কোন লোকের কোন সাড়া শব্দ নাই। কয়েকদিন পর নির্মল আসলো। এখনো নির্মল আছে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: নির্মলটা কে?
আয়ুব আলী শেখ: ওইযে কেয়ারটেকার।

ফারুক আহমাদ আরিফ: এখনো আছে?
আয়ুব আলী শেখ: আছে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: এইযে আপনি এতদিন, আপনার আয়-রোজগার কি ওই (কাঠমিস্ত্রি কাজ)
আয়ুব আলী শেখ: আমার আয়-রোজগার আমি মিস্ত্রি কাজ করি।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনার কয় ছেলে-মেয়ে?
আয়ুব আলী শেখ: আমার দুই ছেলে, তিন মেয়ে। মেয়ে একটা বিয়ে দিছি। আর বড় ছেলেটা অল্প কিছুদিন হলো চাকরিতে যাচ্ছে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: কি পড়াশুনা করেছে সে?
আয়ুব আলী শেখ: ও এসএসসি পাশ করছে।

ddd

ফারুক আহমাদ আরিফ: পরে কি টাকার জন্যে পড়াশুনা করাতে পারেননি, না অন্যকিছু?
আয়ুব আলী শেখ: টাকার জন্যে পড়াতে পারি নাই আমি বুচছেন! আমার জমিজমা নাই মিস্ত্রি কাম করে খাই তাই পড়াতে পারি নাই। আর ছোট ছেলেটা আমার সাথে কাম করে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: কি নাম তার?
আয়ুব আলী শেখ: ছোট ছেলের নাম নোমান, বড় ছেলের নাম রমজান।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আচ্ছা আপনারা যারা কাফন-দাফনে অংশ নিয়েছিলেন তাদের কেউ কেউ কি এখনো বেঁচে আছেন কি?
আয়ুব আলী শেখ: দুইজন তিন বেঁচে আছেন। একজন ইদ্রিস কাজী।

ফারুক আহমাদ আরিফ: কোথায় তার বাড়ি?
আয়ুব আলী শেখ: ওই, ওইখানে কাজী বাড়ি।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনি প্রধানমন্ত্রীকে কি বলতে চান কি?
আয়ুব আলী শেখ: আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই, প্রধানমন্ত্রী একজনের গাড়িতে উঠছে তাকে চাকরি দিছে। আমি এত বড় একটা চমৎকার কাজ করলাম আমাকে একবার জিজ্ঞাসা করল না? আমারে ডাইহা জিজ্ঞেস করার উচিত ছিল না? আমারে ডাইহা জিজ্ঞেস করবে না, যে আমার আব্বারে তুমি কি দেখেছো? যে আমার আব্বারে তুমি কি দেখেছো। এই মনের মধ্যে আমার আশাডাই। তারপর আমি তারে (প্রধানমন্ত্রীকে) বলবো কি দাবি আমার আছে কিনা। দাবি আমার নাই। সে যে আমারে জিজ্ঞেস করে এইডাই আমার বড় দাবি। সে যেন শুনে। মানুষের কাছে শুনছে বঙ্গবন্ধুর লাশ। সে দেখতে পারে নাই, সে বিদেশে ছিল। শরীরে রক্তমাখা অবস্থা দেখতে পারে নাই। রক্তমাখা দেখছি আমি। আমার ভিতরে সেই…।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনি বললেন যে তার (বঙ্গবন্ধুর) এইখানে (পেটে) গুলি। বুক কি ঝাঝরা ছিল?
আয়ুব আলী শেখ: না, বুক ঝাঝরা ছিল না। আতে (হাতে) কাইটা কাইটা গেছে। আমার মনে হয় রাইফেল বঙ্গবন্ধু ঢেকাইছে। আতে কাইটা কাইটা গেছে। আমার ধারণা যেটা। আর মুখটুখ সবি ঠিক আছে। আর জিয়ার রহমানের লাশ পায় নাই তার সাক্ষীও নাই ঠিক আছে? আর বঙ্গবন্ধুর লাশ তো গোসল করাইয়া একবারে ভেজা কাপড়ে থইয়া দিছে। এই অবস্থায় আমি দেখছি বুঝছেন? যারা দেখছে তারা অল্প কয়েকজন। তারা ৪০ থেকে ৪৫ জন।

IMG_6467

ফারুক আহমাদ আরিফ: ৫ নং ওয়ার্ড হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজের ওয়ার্ড।
আইয়ুব আলী শেখ:  ৫ নং ওয়ার্ড হলো প্রধানমন্ত্রীর নিজের ওয়ার্ড, শেখ হাসিনার নিজের ওয়ার্ড। আমারে  ৫ নং ওয়ার্ডের সভাপতি বানাইছে। আওয়ামী লীগের সভাপতি। নেত্রী আসলে কোন পাশও পাই না, দেখার জন্যে কোন সুযোগও পাই না। আমি যে দেখা করতে যাবো! লোকজন আইয়া জিজ্ঞেস করে, রিকোয়েস্ট করে তুমি একজন ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি। তুমি বঙ্গবন্ধুকে শেষবারের মতো গোসল করাইছো, জানাজা করাইছো, কফিন খুলেছো, তুমি আর তোমার আব্বা করছো। সব কিছু তোমরাই করছো। তোমাদের কি অবদান করে? আমার মনে বড় দুঃখ আজ পর্যন্ত কোন একটা কার্ড পাই নাই নেত্রীর সাথে দেহা করার। তাই আপনাদের মাধ্যমে নেত্রীর কাছে একটা অাবদার আমি যেন নেত্রীর সাথে দেহা করতে পারি। সে যেন আমার কথা কয়টা শোনে। আমার কোন চাওয়া-পাওয়ার নাই। আমি যদি ভিক্ষা কইরা খাই তাইলেও আমার কোন চাওয়া-পাওয়া নাই। কিন্তু ইতিহাস তো ঠিক হতি হবে, ইতিহাস কথা বলবে। আমি করছালাম, আমার কি অবদান। আপনার সবাই সাক্ষী আপনারা কাইটেন না। পুরা দেহায়েন, সারা বিশ্বরে দেহায়েন যে, আমরা সাধারণ মানুষ এই কাজ করতে পারছি শেষবারের মতো। বড় প্রভাবশালী নেতা চান্স পায় নাই। আমার মতো মানুষ চান্স পাইছে। তখন ১৭ বছর, এখনতো দাড়ি পাইকা গেছে। ৬৫ বছর বয়স। আমি বয়স্কভাতার একটা কার্ডও পাই না। আমার চেয়ে ছোট যারা তারা বয়স্কভাতার কার্ড পায়ছে। আমি বয়স্কভাতার একটা কার্ডও পাই নাই। তাই মনে খুব কষ্ট বুঝলেন, এতো একটা ভালো কাজ কইরা আমারে জিজ্ঞেস করলো না! যার হক তাকে যদি না দেয় আল্লাহয় আছে। যার হক তাকে যদি না দেয় সেটা আল্লাহয় দেহে এটা হাদিসের কথা। তাই এই বইল্যা আমার কথা শেষ করলাম খোদা হাফেজ। আপনারা আমার জন্যে দোয়া করবেন।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনি কি এই হাতে শক্তি পান? বা চিকিৎসা করাচ্ছেন?
আইয়ুব আলী শেখ: হাতে ধরতে পারি না। শক্তি পাই না। চিকিৎসা করাচ্ছি।

ফারুক আহমাদ আরিফ: কি চিকিৎসা করাচ্ছেন?
আইয়ুব আলী শেখ: ওই যে ওইখানে শেখ হাসিনা হাসপাতাল খুলছে না … অটিজিয়াম। সেইহানে থেরাপি-টেরাপি লাগাইছি। কোন কাজ হচ্চে না।

(ভিডিও যুক্ত হবে)

কমেন্টস