ড. ফাহমিদুল হকের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা, প্রতিবাদহীনতা কাপুরুষতা না বিশ্বাসঘাতকতা?

প্রকাশঃ জুলাই ২১, ২০১৭

ফারুক আহমাদ আরিফ-

অধ্যাপক ড. ফাহমিদুল হক স্যারের নাম আমি প্রথম শুনি ২০১৫ সালের ২১ আগস্ট সময় টেলিভিশনের সাংবাদিক শাহীন ভাইয়ের কাছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীদের যাবতীয় ব্যয়ভারের ওপর সরকার ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রথমে ১০ ও চূড়ান্তভাবে ৭ দশমিক ৫ ভ্যাট আরোপের প্রতিবাদে ১৩ আগস্ট ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’ শাহবাগ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পদযাত্রা কর্মসূচি পালনে জাতীয় জাদুঘরের সামনে একত্রিত হয়েছিলাম। সেদিন সংবাদ সংগ্রহ করতে এসেছিলেন শাহীন ভাই।

২১ আগস্ট আমি কণ্ঠশীলনের বৈঠকে অংশ নিতে সকালে টিএসসিতে গেলে সেখানে শাহীন ভাইকে দেখতে পেয়ে সালাম দিলাম। আন্দোলনের নানা বিষয়ে কথা বললাম, মিডিয়ার সহযোগিতা কীভাবে পাওয়া যাবে সে সম্পর্কে পরামর্শ চাইলাম তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন আপনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ফাহমিদুল হক স্যারের সাথে কথা বলুন। তিনি শিক্ষায় ভ্যাট আরোপের বিরুদ্ধে আপনাদের নিয়ে কথা বলতে পারেন। সেদিন আমি প্রথম ড. ফাহমিদুল হক স্যারের নাম শুনলাম।

১৬ আগস্ট নো ভ্যাট অন এডুকেশনের প্রধান সমন্বয়কের পরিবর্তে আমাকে মুখপাত্র নির্বাচিত করার পর যখন আন্দোলন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে দিতে দিনরাত কাজ করছি এমনি একদিন ২৬ আগস্ট রাত ৮টা ৫১ মিনিটে আমাদের শিক্ষক তানিয়া মুন ম্যামের সাথে আলোচনার ফাঁকে তিনি জানালেন, ফাহমিদ স্যার তার ফেসবুকে আপনাদের নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। আপনি ফাহমিদ স্যারের সাথে কথা বলুন, তিনি সহযোগিতা করতে পারে। আমি স্যারের ফেসবুক খোঁজে দেখলাম তিনি ৩ আগস্ট ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেছেন, ‘সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এক রকম নয়। এনএসইউ বা ইউডা এক নয়। সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বেতন সমান নয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর পিতা-মাতার আর্থিক সামর্থ সমান নয়। অনেকেই খুব কষ্ট করে কিংবা সম্পত্তি বিক্রিবাটা করে সন্তানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করছেন। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বলতেই একটা স্টেরিওটাইপ আমাদের মাথায় আসে-এখানে বড়লোকের পোলাপান পড়ে। সরকারের মাথায়ও তাই এসেছে। কর ফাঁকির বিষয়ে তিনি লেখেন, বাস্তবতা হলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মনোলিথিক বিষয় নয়। সরকারের প্রয়োজন করের টাকা। কিন্তু যাদের কর প্রদান করার কথা, বিপুল অর্থের মালিক অনেকেই কর ফাঁকি দেন। কিংবা কেউ কেউ ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা লোপাট করেন। সেসব ঘাটতি বা ব্যর্থতা সামাল দিতে যত্রতত্র কর বসানোর প্রবণতা আপত্তিজনক। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর আরোপিত কর অবিলম্বে উঠিয়ে নেয়া হোক।’

অপরদিকে ৫ আগস্ট সময় টেলিভিশনে তুষার আব্দুল্লাহ ভাইয়ের উপস্থাপনায় টকশোতে ভ্যাট আরোপের প্রতিবাদে বিভিন্ন কথাও বলেছেন তিনি। সেটি নিয়ে ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত কর উঠিয়ে নেয়া হোক: ড. ফাহমিদুল হক‘ শিরোনামে ২৭ আগস্ট একটি কলাম দাঁড় করিয়ে প্রকাশ করলাম। অবশ্য ২৬ আগস্ট রাত ৯টা ৫৫ মনিটে তাকে ‘স্যার, আমি আরিফ-স্টেট ইউনিভার্সিটি। প্রফেসর রোবায়েত ফেরদৌস স্যারের ছাত্র’ লিখে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালাম। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে স্টেট ইউনিভার্সিটিতে তিনি একটি সেমিনারে এসেছিলেন। তারও পর তিনি আমাদের জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টে এসেছিলেন আমি স্যারকে রিসিভ করে নিয়ে গিয়েছিলাম। প্রকাশক দ্বীপক হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে মানববন্ধনে প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ হয় এবং আমার পরিচয় দিয়ে কথা বলি রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে। এভাবেই আমি চিনতে থাকি ড. ফাহমিদুল হক স্যারকে। তিনি আমার সরাসরি কোন ক্লাসের স্যার নয় তবে তিনি আমাদের অনেক শিক্ষকের শিক্ষক ও বন্ধু। এতো কিছু লেখার মূল কথা হচ্ছে ড. ফাহমিদ স্যারের সাথে আমার কোনভাবেই কোন ধরণের সম্পৃক্ততা নেই সেটি তুলে ধরা।

এবার আসছি কি জন্যে কলম ধরলাম। ২ জুলাই দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র সমকাল ‘নম্বরপত্রে ‘ঘষামাজা’ ঢাবির সাংবাদিকতা বিভাগের ফল প্রকাশে ১৪২ দিন‘ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। সেই প্রতিবেদনে ৫৬ দিনে ফল প্রকাশের বিষয়টি কেন ১৪২ দিন অতিবাহিত হলো তা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত মৌখিক পরীক্ষা বোর্ড ও পরীক্ষা কমিটির প্রধান (ছিলেন বিভাগের শিক্ষক) অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিনকে অভিযুক্ত করা হয়। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা হলে তাদের নিজস্ব গ্রুপে ড. ফাহমিদ লেখেন, ‘সামান্য এই বিষয় নিয়ে এরকম জটিল করে তোলার জন্য সেই টেবুলেটর ড. আবুল মনসুর আহামদের অবদান অসামান্য। ফলাফল প্রকাশে বিলম্বের কারণ যতটা না গীতি আপা, তার চাইতে বেশি এই বানিয়ে তোলা জটিল পরিস্থিতি। এই পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া এমনকি বিভাগের চেয়ারপারসনকেও ড. আবুল মনসুর সংশ্লিষ্ট রাখেননি। সবচেয়ে বড় কথা সহকর্মীসুলভ বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে যার সহজ সমাধান করা যেত, তা অযথা জটিল করা হয়েছে। এই ধরনের শত্রুতামূলক উদ্যোগ বিভাগে আর কখনোই দেখা যায়নি। বর্তমান সিনেট সদস্য ড. মনসুর এই প্রক্রিয়াটি কন্ট্রোলার অফিস এবং প্রশাসনকে সঙ্গে রেখেই করেছেন।’ এই লেখা নিয়েই সিনেট সদস্য অধ্যাপক আবুল মনসুর আহমদ ড. ফাহমিদুল হকের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা দায়ের করেন।

এর প্রতিবাদে কিছু সংখ্যক ছাত্র, শিক্ষক, লেখক, বুদ্ধিজীবী প্রতিবাদ করেছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঢাবির সচেতন মহল এর প্রতিবাদ করছেন না। মুষ্টিমেয় কয়েকজন মাত্র এর প্রতিবাদে সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখি করেছেন। তাদের মধ্যে সাহস মুস্তাফিজ, তানিয়া মুন, অনিক বিশ্বাস, পলাশ রহমান, ফরিদ ফারাবি, জহিরুল ইসলাম, দিলসাদ হোসাইন দোদুল, রিমন আহমেদ রিপন, ১৪ জুলাই জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘বাংলাদেশ লেখক ঐক্যর উদ্যোগে এক মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয় : সমকালে ‘ফাহমিদুল হকের নামে মামলা বাতিলের দাবি‘:। মাহমুদুল হাসান, সৈয়দ নিজার, স্বাধীন সেন, আহমেদ কামাল, মাসুদ ইমরান, সামিনা লুৎফা, রুসাদ ফরিদী, সুস্মিতা চক্রবর্তী, সাখাওয়াত আল আমিন ১৫ জুলাই চ্যানেল আই অনলাইনে ‘ঢাবি শিক্ষকের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারার মামলার নেপথ্যে‘ শিরোনামে কলাম লেখেন, জানা সৈয়েদা গুলশান ফেরদৌস, নূর ই আলম, নজরুল কবির, প্রত্যয় ব্যানার্জী, সিদ্ধার্থ টিপু, আনোয়ার হোসাইান মজুমদার, অসীম সাহা, রেজা ঘটক, আজমল হক, আসাদ জামান, ১৬ জুলাই পরিবর্তনে মারুফ রসূল ‘ফাহমিদুল হক, ৫৭ ধারা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন‘ শিরোনামে কলাম, ১৭ জুলাই রফিকুল আনোয়ার রাসেল ‘অ্যারিওপ্যেজেটিকা, সাতান্ন ধারা ও আমাদের ফাহমিদ স্যার‘ শিরোনামে লেখাতে জানা যায়, ‘১৬৪২ সালে গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে পিউরিটান’রা ক্ষমতা দখল, সেনানায়ক অলিভার ক্রমওয়েল এবং এর কারণে ইংল্যান্ডে পার্লামেন্ট সিস্টেমের অবস্থান নিশ্চিত হয়। পিউরিটানদের দ্বারা ১৬৪৩ সালে পার্লামেন্ট কর্তৃক পাশ করা Ordinance for the Regulating of Printing, (যা সাধারণত Licensing Order of 1643 নামে পরিচিত) মত প্রকাশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টির বিস্তারিত আলোচনা করা হয়’। তা ছাড়া আরো হয়তো অনেকেই প্রতিবাদ করেছেন যা আমাদের চোখ এড়িয়ে গেছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে কর্মরত ড. ফাহমিদের শিক্ষার্থী ও সহযোগিরা নীরব কেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মুষ্টিমেয় কয়েকজনের প্রতিবাদী আওয়াজ আমাদের যেমন সাহস যুগিয়েছে তেমনি অন্যদের নির্লিপ্ততা দেখে প্রশ্ন জেগেছে ‘ড. ফাহমিদুল হকের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা, ছাত্র-শিক্ষকদের প্রতিবাদহীনতা কাপুরুষতা না বিশ্বাসঘাতকতা’?

কিন্তু কথা হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা ড. ফাহমিদুল হকের বিরুদ্ধে করা ৫৭ ধারার মামলার প্রতিবাদ করছেন না কেন? তাদের এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে বাধা কোথায়?

ড. ফাহমিদ কি কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করেছেন? তবে তার শিক্ষার্থী আর সহকর্মীরা অন্যায়ের সাথে মিলেমিশে একাকার হচ্ছেন কেন? জানি না এসব প্রশ্নের জবাব পাব কিনা বা জবাব দেওয়ার সৎসাহস আছে কিনা? অন্যায় দেখে শিক্ষিতসমাজ নীরব থাকলে প্রশাসন ভেঙে পড়ে আর শিক্ষার্থীসমাজ নীরব থাকলে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ধ্বংস হয়ে যায়।

২০১৬ সালে আমার ডিপার্টমেন্টে ড. ফাহমিদ স্যারকে প্রশ্ন করেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা কত? তিনি বললেন ২৬০০ মতো হবে। বললাম অন্যায়ের প্রতিবাদে রাজপথে পান কতজনকে? তিনি বললেন ২০/২৫ জনকে। এবার বললাম স্যার আপনারা অন্যায়ের প্রতিবাদটা বাদ দিয়েন না। ঢাবি হচ্ছে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার একটি নেতৃত্ব দেওয়া স্থান। আপনারা থেমে গেলে অনেকেই থেমে যাবে।

আমরা স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ড. ফাহমিদুল হকের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় করা মামলার প্রতিবাদে একটি প্রতিবাদী মানববন্ধন করতে চেয়েছিলাম কিন্তু ‘২৫ মে জেসিএমএস উৎসবে’ এখানকার শীর্ষস্থানীয় ক্ষমতাধরদের অপ্রীতিকর কাজের কারণে এখানে আর কিছু করতে উদ্যোম, উৎসাহ বা আনন্দ কোনটাই পাই না।

আমরা চাই ৫৭ ধারা সরকার তুলে নিক। ড. ফাহমিদুল হকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করুন অধ্যাপক আবুল মনসুর আহমদ সাহেব। সকলের মধ্যে সত্যবাদিতা, সহযোগিতার মনোভাব বৃদ্ধি পাক, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ভালো কাজের প্রসংশায় আমরা ঐক্যবদ্ধ হই।

লেখেক: শিক্ষার্খী; জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও মুখপাত্র-নো ভ্যাট অন এডুকেশন
২১ জুলাই-২০১৭, বিকাল ৪টা ৪৪ মিনিট
৫/৮ লালমাটিয়া, ডি ব্লক, ঢাকা-১২০৭
ইমেইল; [email protected]

Advertisement

কমেন্টস