বাংলাদেশে যারা থাকেন তাঁরা যেন দেশ ও জাতির জন্য ভাল কাজ করেন

প্রকাশঃ জুলাই ১৭, ২০১৭

আশরাফুল করিম,সাউদ আফ্রিকা প্রবাসী-

আমি সাউথ আফ্রিকার পার্শ্ববর্তী দেশ বোতসোয়ানায় প্রায় দশ বছর ছিলাম। বর্তমানে আমি সাউথ আফ্রিকায় বসবাস করছি। বোতসোয়ানায় আমি বিজনেস এন্ড মার্কেটিং কনসালটেন্ট হিসেবে পরিচিত ছিলাম সাউথ আফ্রিকায়ও তাই। বোতসোয়ানায় বাংলাদেশীরা মোটামুটি শান্তিতে থাকলেও সাউথ আফ্রিকায় কিছু সমস্যা রয়েছে। তন্মধ্যে কাগজপত্রের সমস্যা , ব্যবসায়ের জন্য পুঁজির অভাব, বাংলাদেশীদের অনৈক্য ও হিংসা বিদ্বেষ এবং ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত প্রভৃতির কারণে অনেক বাংলাদেশী উন্নতি করতে পারছে না।

আমি মোটামুটি বোতসোয়ানায় ভালভাবেই ছিলাম কিন্তু কিছু বাংলাদেশীর ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের কারণে বোতসোয়ানায় না থেকে পাশ্ববর্তী দেশ সাউথ আফ্রিকায় চলে এলাম।বোতসোয়ানায় বাংলাদেশীদের কোন সমিতি বা সংগঠন নেই। তবে বিভিন্ন দিবস উদযাপনে কিছু ব্যক্তির উদ্যোগে নানা কর্মসূচী গ্রহণ ও পালন করা হত। আমিও যথাসাধ্য সাহায্য সহযোগিতা করতাম। সাউথ আফ্রিকায় বাংলাদেশ পরিষদ সহ ২/৩টি সংগঠনের কার্যক্রম থাকলেও তা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।এখানকার প্রবাসীদের মধ্যে সমিতি বা কমিউনিটির কাজকর্ম করার মত লোকজনের খুব অভাব এবং অনেকেরই সে রকম সময় সুযোগ ও মনমানসিকতা নেই।

তাছাড়া নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব নিয়েও সমস্যা রয়েছে। একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে বলেন বা কেউ কাউকে সহ্য করতে পারেন না।সাউথ আফ্রিকার সভ্যতা ও সংস্কৃতি আমাদের মতো নয়। এখানে মাত্র ৫ভাগ মুসলিম এবং ৯০ ভাগ খ্রিষ্টান। সাদা কালো সংঘাত এখন তেমন নেই। তবে আমরা  মাইনরিটির  মত সমস্যা ও অসুবিধায় থাকি।এখানে বিবাহপূর্ব সম্পর্ক এবং বিয়ের পূর্বে ছেলেমেয়েজন্ম দান করা সম্ভব। তাছাড়া মদ ও জুয়া নিষিদ্ধ নয়। কিছু বাংলাদেশী সেজন্য বিপথগামী হচ্ছে।

সাউথ আফ্রিকায় অনেকেই বাংলাদেশ চিনে না। আমরা এখানে ইন্ডিয়ান হিসেবে পরিচিত ।তবে ক্রিকেট খেলার কারণে এখন অনেকেই বাংলাদেশকে চিনে ও জানে।বাংলাদেশকে জনবহুল ও সমস্যাগ্রস্থ দেশ হিসেবে প্রতিদিন মিডিয়ায় তথা টিভিতে দেখানো হচ্ছে।বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল ও মিটিং মিছিল সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতিবেদন দেখে সবাই আমাদের সম্পর্কে বিভিন্ন মন্তব্য করে থাকে।বাংলাদেশ সম্পর্কে এখানে খুব নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। এখানে বাংলা মিডিয়ার কোন অস্তিত্ত্ নেই।বাংলা ভাষায় কোন পত্র-পত্রিকার প্রকাশনা নেই এবং বাংলা টিভি চ্যানেল বা রেডিও স্টেশন নেই।তবে আমরা ডাকযোগে ও ইন্টারনেটে পত্র পত্রিকা পেয়ে থাকি। তাছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সব টিভি চ্যানেল দেখি।

সাউথ আফ্রিকায় বাংলাদেশীদের জন্য বাংলাদেশ সরকারের তেমন কোন প্রকল্প কল্যাণমূলক কার্যক্রম নেই।আমরা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বিশেষ করে ঢাকা বিমান বন্দরে আফ্রিকায় ভিসা ও পারমিট নিয়ে নতুন আসা লোকজনের হয়রানি তথা বিমান বন্দর থেকে ফেরত দেয়ার বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নেবার অনুরোধ জানাচ্ছি।আদম ব্যাপারী ও দালালদের হাত থেকেও বাঁচার জন্য সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। সাউথ আফ্রিকায় বিভিন্ন মত ও দলের লোক থাকায় এবং হিংসা-বিদ্বেষ ও পরশ্রীকাতরতার কারণে কোন ভাল সংগঠন বা সমিতি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। আমি ব্যক্তিগতভাবে বহু লোকের সমস্যা ও অসুবিধা উপকার করেছি এবং ভবিষ্যতেও করে যাব ।সাউথ আফ্রিকায় আমি বহুবার বিভিন্ন বিরূপ পরিস্থিতির শিকার হয়েছি। আমার বিরুদ্ধে প্রচুর সমালোচনা করা হয়। এমনকি বিভিন্ন দপ্তরে বেনামী দরখাস্ত করা হয়েছে এবং আমার ক্ষতির চেষ্টাও করা হয়েছে বহুবার, কিন্তু সততা, কর্মনিষ্ঠা, কষ্ট ও পরিশ্রমের মাধ্যমে আমি সব ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করেছি।

আমার বিজনেস এন্ড মার্কেটিং কনসালটেন্সি ব্যবসা আছে, যার জন্য বেশীর ভাগ সময় আমাকে বাইরে থাকতে হয়।এছাড়া এম এড ডিগ্রির জন্য ক্লাস ও লেখাপড়াতো আছেই। আমার কাজ হলো লোকজনকে পরামর্শ দেয়া এবং বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা করা।তাছাড়া স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচীতে অংশ গ্রহণ করি। আমি ভবিষ্যতে লন্ডনে এল এল বি ডিগ্রি লাভ করে বার এট ল’ করতে চাই। তবে জীবনের শেষ ভাগে অর্থাৎ পঞ্চাশ বছর বয়সের পর (যদি বেঁচে থাকি) দেশে জনকল্যাণ ও সমাজসেবা করতে চাই, আমি ছাত্রজীবন এবং কর্মজীবনের শুরুতে বাংলাদেশে প্রচুর লোকজনের উপকার করে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছিলাম।

বাংলাদেশ থেকে আফ্রিকায় অভিবাসীর সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা আছে । বাংলাদেশ থেকে প্রচুর লোক আফ্রিকায় আসছে।কিন্তু আদম ব্যপারী ও দালালের মাধ্যমে যারা আসে, তারা সমস্যায় পড়ে। নিকট আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু বান্ধব না থাকলে আফ্রিকার দেশসমূহে আসা উচিত নয়।প্রবাসে সহজে কেউ কাউকে সাহায্য সহযোগিতা করে না। তাই আদম ব্যাপারী ও দালালদের হাত থেকে সাবধান হতে সবার কাছে অনুরোধ রইলো। আফ্রিকায় বাংলাদেশীরা একে অপরের উপকার কিংবা ক্ষতির চেষ্টা করে । আফ্রিকায় আমার জানা ও বিশ্বাস মতে বাংলাদেশী অধিবাসীরা অনেকেই একে অপরের ক্ষতি করার চেষ্টায় লিপ্ত। হিংসা-বিদ্বেষ-পরশ্রীকাতরতা, সমস্যা ও অসুবিধা এবং ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তে অনেকেই জড়িত।

আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আসতে চাইলে ইংরেজী জানা ও বোঝা উচিত।দোকানে চাকরির অভিজ্ঞতা, কম্পিউটার ও ড্রাইভিং জানা থাকলে ভালো হয়।আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে প্রচুর লোক বেকার, এখানে শ্রমিকের চাহিদা নেই। কেউ যদি টেকনিক্যাল কোয়ালিফিকেশন নিয়ে আসতে পারেন তাহলে ভাল হয়।আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে প্রচুর লোক বেকার। শ্রমিক শ্রেণীর কোন বাংলাদেশী সেখানে যাবার প্রয়োজন নেই।অশিক্ষিত বা ইংরেজী না জানার লোক সেখানে গিয়ে খুব বিপদে পড়ে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, চাটার্ড একাউন্টেন্ট, ফার্মাসিষ্ট সহ কমপক্ষে গ্র্যাজুয়েট লোকজনের আফ্রিকায় যাওয়া উচিত।

সেখানে দোকানপাট খুলে ব্যবসা বাণিজ্য কিংবা দোকানে চাকুরী-বাকুরী করা যায়। কোন বন্ধু বান্ধব বা  আত্মীয়  স্বজন না থাকলে আফ্রিকায় গিয়ে সুবিধা করা যায় না। আদম ব্যাপারী ও দালালদের প্রলোভনে পড়ে কেউ আফ্রিকায় না যাওয়াই উত্তম।সেখানে গিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকায় যাবার মিথ্যা আশ্বাসে কেউ যাবেন না। আফ্রিকায় কেউ চাকুরীর মানসিকতায় আসবেন না, তবে প্রথম দিকে কিছুদিন চাকুরী না করলে অভিজ্ঞতা হয় না।এখানে বেশীর ভাগ লোক ব্যবসা করে। সেজন্য ব্যবসায়ের অভিজ্ঞতা ও পুঁজি লাগে। তাই সে বিষয়ে সমস্যা ও অসুবিধা সকলের খেয়াল রাখতে হবে।সাউথ আফ্রিকায় বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা: সাউথ আফ্রিকা ও কেনিয়াতে বাংলাদেশ হাই কমিশন রয়েছে।

জিম্বাবুয়ের কনসাল অফিস বন্ধ হয়ে গেছে। সাউথ আফ্রিকায় বাংলাদেশ হাই কমিশন থেকে অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পদ তুলে নেয়া হয়েছে।বাংলাদেশের সরকার তথা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে হয় আফ্রিকায় বাংলাদেশীদের কথা চিন্তা-ভাবনা করে না।এখানে বাংলাদেশীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু সরকারের দৃষ্টি তেমন নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশের ঢাকায় সাউথ আফ্রিকার হাই কমিশন (দূতাবাস) স্থাপন করার দাবী দীর্ঘদিনের । সে ব্যাপারেও সরকারের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।এখানকার হাই কমিশনে আরও কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের প্রয়োজন। বিশেষ করে একজন লেবার সেক্রেটারী থাকা উচিত।

সাউথ আফ্রিকায় বাংলাদেশীদের সমস্যা ও অসুবিধা: আফ্রিকায় বিভিন্ন লোকজনের থাকা ও খাওয়ার সমস্যা, কাগজপত্রের সমস্যা, বৈধ কাজকর্ম করতে পারা, ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চুরি ডাকাতি, পার্টনারশীপে গন্ডগোল, একে অন্যের টাকা পয়সা মেরে দেয়া, বেঈমানী ও বেয়াদবীর শিকার, সকলের বড়লোক হবার শখ, হিংসা, বিদ্বেষ ও পরশ্রীকাতরতা, ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত, একজন আরেকজনের বিরোধীতা করার মত ঘটনাই মূল সমস্যা ও অসুবিধা।সেজন্য  আত্মীয় স্বজন বা পরিচিত বন্ধু-বান্ধব ও লোকজন থাকলে ভাল হয়।

অন্তত সমস্যা ও অসুবিধা, প্রতারনা ও ক্ষতি থেকে রেহাই পাওয়া যায়।প্রবাস থেকে বাংলাদেশীদের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে যারা থাকেন তাঁরা যেন দেশ ও জাতির জন্য ভাল কাজ করেন।হিংসা ও হানাহানির রাজনীতি পরিহার করে দেশের উন্নয়নের কথা ভাবেন। আদম ব্যাপারী ও দালালদের হাত থেকে সাবধান থকেন। মিথ্যা প্রলোভনে আফ্রিকায় কেউ না আসেন। এতে বেশ ক্ষতিগ্রস্থ হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

কমেন্টস