শিক্ষাখাতে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দে জাতির সাথে প্রতারণা

প্রকাশঃ জুন ১২, ২০১৭

ফারুক আহমাদ আরিফ-

এখন কান্না করা ভুলে গেছি। কেন কান্না করবো? কার জন্যে কান্না করবো? কান্নার ফলাফল কি দাঁড়াবে কোনটারই কোন কুল-কিনারা নেই। কেউ এসে কান্নার কারণও জিজ্ঞাসা করবে না! কেন জিজ্ঞেস করে বিপদে পড়তে যাবে? বাঙালি জাতি এতটা বোকা নয় নিশ্চয়-ই।

ভারতবর্ষে যতগুলো বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে তার বেশির ভাগই বাঙালি জাতির লোকদের দিয়ে শুরু করা হয়েছে। আবার বাঙালিই এমন জাতি যাদেরকে কোনভাবে কোন বিষয় বোঝাতে পারলে তারা নিজের, অর্থ, শ্রম, মেধা, সময়, প্রাণ দিয়ে আপনার জন্যে কাজ করবে। নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে বিজয় ছিনিয়ে আনবে। যার দুটি প্রমাণ ভারতবর্ষ থেকে ইংরেজ ও বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানিদের বিতাড়ন।

এখানে তাদের চাওয়া-পাওয়া কিছুই নেই। কখনো চাওয়ার পাত্রও নই বাঙালি।

বাঙালি শুধুই দিতে জানে। অর্থাৎ একই জাতির মধ্যে দুটি চরিত্র বিদ্যমান। আবার কারো ভালো দেখাও বাঙালির জন্যে আনন্দদায়ক নয়। অর্থাৎ পরশ্রীকাতর বাঙালি। অন্যের ভালো সহজে দেখতে চায় না বা দেখে না। কীভাবে সেটি নষ্ট বা ধ্বংস করা যায় তার চিন্তায় রাত-দিন অতিবাহিত করে। সম্পদ নষ্ট করে। অথচ ধ্বংসের পরিবর্তে সৃষ্টিশীল ব্যক্তিটাকে সহযোগিতা করলে দেশ-জাতি এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গন সবাই উপকৃত হতো। নিজের অহম দেখানোর জন্যে অন্যের ক্ষতিসাধনে ব্যস্ত থাকে।

এরা শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবর্তে খন্দকার মোশতাক, সোহরাওয়ার্দীর স্থানে খাজা নাজিমুদ্দীন, মোনায়েম খান, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, করম চাঁদ (মহাত্মা গান্ধী) পরিবর্তে সরদার প্যাটল তৈরিতে সময়, শ্রম ও কূটকৌশল একেঁ থাকে। সে অনুযায়ী নদীর গতিপথরুদ্ধ করে। নেতৃত্বের কাঠামো ভেঙে মেরুদণ্ডহীন আজ্ঞাবহ লোক তৈরিতে ব্যস্ত থাকে। অন্যের শ্রম, স্বপ্নকে ছুরি মারে, চুরি করে নিজের নামে চালিয়ে বাহবা কুড়ায়। মিথ্যা তৃপ্তি হাসি নিয়ে বাসায় ফিরে।

একটি জাতির মনন গড়ে উঠে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। পারিবারিক যে চরিত্রের বীজ ব্যক্তির মধ্যে রোপিত হয় শিক্ষকমণ্ডলী সেটিকে সবুজ পত্র-পল্লবে সু-সুভিত করে তোলেন। মানবসমাজে তাকে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে সহায়তা করেন। ফলে মানুষ তার ৫৫ শতাংশ পশুত্ব ছেড়ে ৫৫ শতাংশ মনুষত্ব পায়। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সে নিজেকে বিকশিত করে।

শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতেই ইসলাম ধর্মের প্রথম ৫টি আয়াত নাযিল হয় হেরাগুহায়। পড়, তোমার প্রতিপালকের নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন রক্তপিণ্ড থেকে। পড়, তোমার প্রতিপালক সম্মানিত। যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না। সুরা আলাকের এই পাঁচটি আয়াতই প্রথম নাযিল। এটি যে শুধু আল কোরআনের কথা তেমনটি নয় বরং বিশ্বের সবগুলো ধর্মগ্রন্থেই শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। বিশ্বের যে জাতিই উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছে তারা শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েই শিখরে উঠেছে।

বাংলাদেশের জন্মদাতা আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের জনগণকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এটাই সকলের প্রত্যাশা। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সেই দলের সরকারই যখন শিক্ষাকে কম গুরুত্ব দিচ্ছে তখন মানুষ যাবে কোথায়?

১ জুন চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। তিনি সেখানে ৬৫ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা যা মোট বাজেটের ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দ প্রস্তাব করেছেন শিক্ষা ও প্রযুক্তিখাতে। তিনি শিক্ষাখাতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের চেয়ে ১ শতাংশ কম অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন। কেননা গত অর্থবছরে শিক্ষাখাতে মোট বরাদ্দ ছিল বাজেটের ১১ শতাংশ আর চলতি বছর করা হয়েছে ১০ শতাংশ। শুনতে হয়তো প্রথমে ভালোই লাগে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ বাপরে বাপ! কিন্তু খোঁজ নিলেই ধরা পড়ে যাবে অর্থমন্ত্রী কি চালামিটা করেছেন বৃদ্ধ বয়সে।

২০১৭-১৮ অর্থবছরের ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে ৬৫ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা অর্থাৎ মোট বাজেটের ১৬ দশমিক ৪ ভাগ শিক্ষাখাতে। তারমধ্যে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ৫০ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষায় ২২ হাজার ২২ কোটি টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের ২৩ হাজার ১৪১ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য ৫ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

শিক্ষাখাতে একটি অংশ বরাদ্দ থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে। ২০০১-০২ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২৯৩.৫৭ কোটি টাকা, আর ২০১০-১১ অর্থবছরে তা বেড়ে  ১১০২.২৪ কোটি টাকা। জাতীয় বাজেটের মাত্র শুন্য দশমিক ৭৫ ভাগ বরাদ্দ থাকে শিক্ষা খাতে (২০০১-০২)। ২০১০-১১ অর্থবছরে এ পরিসংখ্যান বেড়েছে শুন্য দশমিক ৮৪ ভাগ। আবার যদি শুধু শিক্ষা খাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বরাদ্দের দিকে তাকালে দেখা যাবে (২০০১-০২) থেকে ৮ দশমিক ২২ ভাগ (২০১০-১১) অর্থবছরে এ বরাদ্দ মাত্র ৭ দশমিক ৮৫ ভাগ।

অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্যে অর্থের যোগান নেই। একটি দেশের বাজেটের মোট ২০ শতাংশ থাকতে হয় শিক্ষাখাতে। কিন্তু বিশ্বের খুব কম দেশই শিক্ষাখাতে তাদের পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ রাখে।

বাংলাদেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজগুলোর জন্যে বাজেট থাকলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে ন্যূনতম বাজেট নেই। এখানে মোট শিক্ষার্থীর ৬৮ শতাংশ পড়াশোনা করলেও সরকারের তাদের প্রতি কোন দৃষ্টি নেই। এখানকার, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারিদের জন্যে সামান্যতম পেনশন, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেন না। এদের জীবনমান কীভাবে চলছে তার কোন হদিস সরকার রাখে না। মালিক পক্ষই এখানে প্রতিপালকের স্থানে উন্নীত হয়েছে। তারা উপাচার্যকে ধমক দিয়ে বক্তব্যের ডায়াস থেকে নামিয়ে দেয়। অপমাণ করে। শিক্ষকদের আগামীকাল থেকে আসবেন না বলে চাকরি থেকে ছাটাই করে। হেয়প্রতিপন্ন করে। শিক্ষার্থীদের সম্মানহানী করে। তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ৮ ঘণ্টার পরিবর্তে ১২ ঘণ্টা কাজ করায় কিন্তু কোন পারিশ্রমিক দেন না।

আমি যদি শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নীতিমালা ২০১০ নিয়ে কথা বলি, সেখানে এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকার ত দূরে থাক তাদেরকে স্বীকারই করা হয়নি। এখানে বোর্ড অফ ট্রাস্টিজকে সৃষ্টিকর্তার চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান বানানো হয়েছে। এমন বেক্কলি কাজের তীব্র নিন্দা ও তা সংশোধনের জোর দাবি জানাচ্ছি।

দেশকে এগিয়ে নিতে হলে জাতিকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্যে শিক্ষাকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবৈতনিক করতে হবে। মানবসম্পদের চেয়ে বড় এবং শ্রেষ্ঠ সম্পদ পৃথিবীতে আর নেই। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শিক্ষাখাতে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দে জাতির সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। শুধু শিক্ষাখাতেই ২০ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে। প্রযুক্তিখাতে বরাদ্দ আলাদা হবে। যে জাতি শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারে না সে জাতি কখনো নেতৃত্বস্থানে যেতে পারে না। এই জাতিকে পদে পদে গোলামীর জিঞ্জির পড়ে থাকতে হয়। বাঙালি জাতি মেরুদণ্ড সোজা ও মাথা উঁচু করে বিশ্ববাসীকে নেতৃত্ব দিবে সেই স্বপ্নেই বুকে লালন করছি।

লেখক; লেখক: শিক্ষার্থী; জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ; স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও মুখপাত্র; নো ভ্যাট অন এডুকেশন

১২ জুন-২০১৭, রাত: ১০টা ৪৩

৫/৮ লালমাটিয়া, ঢাকা-১২০৭

ইমেইল; [email protected]

Advertisement

কমেন্টস