`এইভাবে মানুষ হত্যা? আর এভাবে জনগণের ওপর অত্যাচার? একি, ঈশ্বর নেই দুনিয়ায়?’ (ভিডিও)

প্রকাশঃ জুন ২, ২০১৭

রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস। পিতা মৃত নলিনী রঞ্জন বিশ্বাস। তৎকালীন ফরিপুর ও বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী থানার উত্তর ভেন্নাবাড়ি গ্রামে বসবাস করছেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ৮ নং সেক্টরে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। গুলি খেয়েছেন পায়ে। মাথায়। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েছেন তবু দেশমাতৃকার মুক্তির আশায় স্বপ্ন বেঁধেছেন বুকে। একের পর এক যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। খাবারের অভাবে ডেপ, ধানের শীষ, নর্দামার পানি পান করে জীবনধারণ করেছেন। সহজ-সরল উক্তিতে নিজের ফেলে আসা স্মৃতিচারণে কখনো কখনো চোখের কোণে পানি নিয়ে এসেছেন।

১২ মে বিকালে কাশিয়ানীতে বিডিমর্নিং এর পক্ষ থেকে তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন বিডিমর্নিং এর হেড অফ নিউজ; ফারুক আহমাদ আরিফ। ক্যামেরায় ছিলেন বিডিমর্নিং এর গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি আরমান খান জয় ও হেমন্ত বিশ্বাস। অন্যান্য সহযোগিতায় ভূপতি কানজিলাল ও তন্দ্রা কানজিলাল

বিডিমর্নিং এর হেড অফ নিউজ গোপালগঞ্জে ১২ থেকে ১৪ মে পর্যন্ত অবস্থানকালে ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। পর্যায়ক্রমে সাক্ষাৎকারগুলো প্রকাশ করা হবে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনাকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে কোন বিষয়টি উদ্বুদ্ধ করেছিল?
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: আমার বাড়ি ভেন্নাবাড়ি, সাতপাড়া। আমি মামা বাড়িতে থাকতাম। দেখলাম একদিন তখন যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গেছে। তখন আমি ক্লাস টেনে পড়তাম। দেখলাম হঠাৎ করে আমার দাদু, আমার ছোট দাদু তাকে সবার সামনে গুলি করে মেরে ফেললো। সঙ্গে সঙ্গে একটা ছোট বাচ্চাকে ধরে খান সেনারা উপর দিকে চালি মাইরা (ফিকে দিয়ে) বেয়নেট দিয়ে তার বুকে লাগায় দিয়া তাকে মেরে খালের ভিতর ফেলে দিল। তখন আমি চিন্তা করলাম এই পৈচাশিক অত্যাচারের কি কোন বিচার হবে না? এদের বিচার অবশ্যই দরকার। কীভাবে এদের দমন করা যাবে? এবং সেইভাবেই আমি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বো। কীভাবে? তখন আমাকে বললো চল ভারতে যায়।

ফারুক আহমাদ আরিফ: কে বললো এটা?
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: আমার ভাই, বড় ভাই। চল ভারতে যাই।

ফারুক আহমাদ আরিফ: কি নাম তাঁর?
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: বুদ্ধ দেব বিশ্বাস। আমার দাদা বললেন, চল এখানে থাকলে মারা যাবো। চল ভারতে। ভারতে যুদ্ধের ট্রেনিং চলছে সেখানে গিয়ে ট্রেনিং দিব। তখন আমার সারা গায়ের লোম শিহরিয়ে উঠলো। এইভাবে মানুষ হত্যা? আর এভাবে জনগণের ওপর অত্যাচার? একি, ঈশ্বর নেই দুনিয়ায়? যদি থাকে চল ইন্ডিয়ায়। ভারতে গিয়ে লবণহ্রদে গেলাম। লবণহ্রদে গিয়া মুক্তিযুদ্ধের ডাক আসলো। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিলাম। দেশের মাটি ধইরা উৎসর্গ করলাম। বললাম যে, দেশের জন্যে জীবন উৎসর্গ করলাম। আমার সেই উৎসর্গীয়জীবন ১৯৭১ সনে আমি ৩০/১০ (৩০ অক্টোবর) একাত্তরে আমি রিকুইটমেন্ট হই। বিরভূমে চলে যাই। বিরভূমে টারজা ক্যাম্পে পৌঁছে যায়। টারজা ক্যাম্পে পৌঁছানোর পরে ৩১/১০ অর্থাৎ ৩১ অক্টোবর পুরো দমে ট্রেনিং শুরু হয় আমার। ২১/১১ অর্থাৎ ২১ নভেম্বর পর্যন্ত আমার ট্রেনিং হয়। ঝারা ট্রেনিং ২১দিন। আমি তখন ছোট।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনাদের কমান্ডার ছিল কে?

রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: আমার কমান্ডার ছিল রাজপাল সিং এবং কিসান পাল সিং ছিল তার ভাই। সে বেশি ট্রেনিং দিত। তারা দুই ভাই মিলে। এখন আমারে একদিন ওই পাহাড় থেকে ডিগবাজি খেতে খেতে পড়তে হবে। আমি পারি না ছোট ত। টেনে পড়ি। আবার দুই ক্লাস ড্রপ দিছি। তখন আমার হাত ধরে ঘসে বলে ছালে পারতা নেহি কিয়া করতা? তখন হাত দিয়ে রক্ত বেরিয়ে গেল। কিসান পাল সিং অর্থাৎ হনোমান সিং উনি এসে রুমাল দিয়ে ধরলো। ধইরে ডিগবাজি দিয়ে বাসায় আসলাম। আসার পরে এভাবে ট্রেনিং চললো। রাইফেল ফায়ারে গেলাম। ফায়ারে যাওয়ার তিনদিন পরে। আমি দেখি, আমি ফায়ারে ৪টা, ৫টা টার্গেটের পরে আমি প্রথম টার্গেট দিয়ে ঢুকিয়েছি গুলি। রক্ত চলচল (ছলছল) করে বের হচ্ছে। তখন হনোমান সিং অর্থাৎ কিসান পাল সিং উনি আমার (কনুইয়ে) রুমাল ধরলেন। রুমাল ধরার পর আমি গুলি করলাম। তিনটা গুলি একি টার্গেট দিয়ে গেল। ট্রেনিংয়ে ফাস্ট হলাম। ফাস্ট হওয়ার পর ২১/১১/৭১ অর্থাৎ ২১ নভেম্বর পুরো ট্রেনিং শেষ হয়ে যায়। এখান থেকে কল্যাণী রেস্ট ক্যাম্পে আসলাম। কল্যাণী রেস্ট ক্যাম্পে আসার পর সেখানে আমরা ৪/৫ দিন অবস্থান করি। আমরা ২৭ থেকে ২৯ তারিখ নভেম্বরে বাংলাদেশে ঢুকি।
ঢুকে এসে আমরা কোথায় যাবো? কি করবো? যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। আবার রাজাকারের তাড়না। পিছনে রাজাকার আছে কিনা? আমরা এখনো অস্ত্র পাইনি। আমাদের বলছে যে, ইউ উইল নো ক্যারি আর্মস। তখন আমরা বাংলাদেশে প্রবেশ করি, বলে কি তোমরা যাও। দেখ ফরিদপুরে টেকেরহাটের পাশে ক্যাম্প আছে। ওইখানে চলে যাও। কোথায় ক্যাম্প জানি না। আইসা শুনলাম যে, রাওথলির ভূপতি বাবু আমাদের কমান্ডার। ভূপতি কানজি লাল উনি আমাদের এখানে মাস্টার ছিলেন। উনার কমান্ডিংয়ে আমাদের এখানে যুদ্ধ পরিচালনা হচ্ছে। আমরা সেখান থেকে সরাসরি খুব বাধাবিঘ্নের ভিতর দিয়া ইতিপূর্বে তালকড়িয়ায় যুদ্ধ হয়ে গেছে। কোন জায়গা আহারপাড়া না?
জনৈক: তালকড়ি, আহারপাড়া
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: কয়েকদিন আগে তালকড়ি, আহারপাড়া যুদ্ধ হয়ে গেছে। ওখান থেকে অনেক কষ্টে আমরা টেকেরহাট দিকনগরে ইসি এসে পৌঁছালাম।

ফারুক আহমাদ আরিফ: ওই যুদ্ধটা কয় তারিখে হয়েছে মনে আছে?
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: ওইটা আমি মনে নাই। বিসন হইছি আমি। ওই যুদ্ধটাই আমি অংশগ্রহণ করি নাই। এরপর আসলাম কোথায়? ননিঘেরে ক্যাম্পে আইসা দেখি এই ভূপতি বাবু, এই সুভাষ কাকু। উনার পেটে গুলি লাগা আছে। গুলি এখান থেকে লেগে ওইদিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। এখনো উনি জীবিত আছে। উনি আমাকে বললেন, তোরা ত যুদ্ধ, তোরা আইসিছ? তোরা ত আমাদের ভাই…।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনারা কি পূর্বপরিচিত ছিলেন?
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: হ্যাঁ, আমার পরিচিত ত। আমি আগে গান-বাজনা করতাম। তাদের সবার সাথে মিশতাম। সেই সুবাধে আমাকে খুব রেসপেক্ট করতেন ছোট ভাই হিসেবে উনারা। তখন বললেন, তোরা বস। তোরা রেস্ট নে। এইবার যুদ্ধ স্বাধীনতা এসে যাচ্ছে।এসে যাচ্ছে। এরমধ্যে ফাইট আরম্ভ হয়ে গেল। ফাইট আরম্ভ হয়ে গেলে, ফাইটে উনার গুলি লাগে পেটে। গুলি লাগে আমার ওই পিস ডিনামাইন্ড বান দিয়ে উড়ায় দিতে যাচ্ছিলাম। তখন ওরা গুলি করে খান সেনারা। পা উড়ে যায় এখান থেকে। এইধার দিয়ে গুলি ঢুকে এইদিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। আরেকটা যখন দেখি রক্ত চলচল (ছলছল) করে বের হচ্ছে। তখন আবার আস্তে আস্তে নেমে নেমে গুলি করে। গুলি লাগে মাথায়। এই মাথায় ছেছড়ায় যা, এই এখানে। জলের ভিতর পড়ে গেলাম। তো আমি বললাম যে তোরা আয় আমার মাথায় গুলি লাগছে, আমার মাথার খুলি উড়ে গেছে। উনি তখন ভূপতি বাবু ক্রলিং করে গিয়া আমার মাথা গামছা দিয়া বানলো (বাঁধলো)। তো বললো ভয় নাই মরবি না, আমি আছি। তখন রাত্রে তিনি আমাদের নিয়ে আসলো ধইরা, কচুরি মাথায় দিয়া জলের ভিতর দিয়া। পথে জঙ্গপুর দিয়ে কায়দা কইরা উইঠা (উঠে) ছোট্ট একটা ডিঙি নৌকায় জড়িপুর হইয়া নড়িখাল হইয়া আমরা…
ভূপতি কানজি লাল: তখন আমি আরেকটা কথা বলতাম যে, রবিন মায়ের বুকে তো বুক মিশিয়েছিস, ভয় নেই তোদের। অর্থাৎ মায়ের বুকে তো বুক মিশে আছে, মা-ই তোদের রক্ষা করবে। অতএব ভয় নাই তোদের।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: ভয় নাই তোদের। তোরা আমার সন্তান আয়। এইভাবে উনি আমাদের আগলাইয়া রাইখা উনি আমাদের…। মেজর হুদা সাহেব ছিলেন সাব-সেক্টর কমান্ডার এবং নুর আহমেদ বাবুল আক্তার। আমাদের সাব-সেক্টর কমান্ডারে। তারপর উনি আমাদের বিল অঞ্চলে কত কষ্ট করে! ভাত নাই। দুইদিন তিনদিন ওই ওইখানে একটা বিল আছে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: বিলটার নাম কি?
কয়েকজন: চানদার বিল।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: পাটকেল বাড়ি। চানদার বিল। চানদার বিলে একটি ভিটা আছে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধারা শুয়ে শুয়ে রইছে দিনে। খান সেনারা যায়, রাজাকারেরা যায়। তখন সেখানে কষ্ট কইরা এই বাড়ি ওই বাড়ি যাইয়া ধামায় কইরা চাটটা ভাত। দুই তিনদিন না খাওয়া। ধানের শীষ উঠাইয়া উঠাইয়া, ওই শাপলা। যে শাপলা আমাদের জাতীয় ফুল।
জনৈক: ডেপ।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: ডেপ, চালি ডেপ কুড়াইয়া কুড়াইয়া খাইয়া আমরা বাঁচি রইছি। জল ঘোলাইয়া গেছে জনগণের পাড়ায়। ওই জল, নোংরা জল খাইয়া আমরা বেঁচে রইছি। এইভাবে। এরপরে ওইখান থেকে আইসা আমরা আবার চলে গেলাম ননিখিরে। ওখানে মাঝে মাঝে এ্যাটাক হয়। এই জন্যে আমরা বিলে চলে আসি। এখান থেকে আবার টেকেরহাট যুদ্ধ আরম্ভ হলো। যুদ্ধ হওয়ার আগেই ইতিপূর্বে উনারা ৯৯জন খান সেনা ধরে আনেন, তখন স্বাধীনতা হয়ে যাচ্ছে।
ভূপতি কানজি লাল: ছাগলছিড়া থেকে ধরে নিয়ে আসি ১১০ জন।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: ছাগলছিড়া থেকে ধরে নিয়ে আসেন ১১০ জন মিলিটারি।

ফারুক আহমাদ আরিফ: এটা কয় তারিখে?
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: তারিখটা…
জনৈক: তারিখটা ফিক্স নাই আর কি।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: তারিখটা ডিসেম্বরের মোটামুটি ৯/১০ হতে পারে এ রকম।

ফারুক আহমাদ আরিফ: গোপালগঞ্জ স্বাধীন হয়েছে ৩ ডিসেম্বর। কিন্তু গোপালগঞ্জে পরবর্তীতে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধ হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: যুদ্ধ হইছে? তাহলে ৯/১০ তারিখ বোধ হয় এমনটা অনুমানিক (আনুমানিক)।
ভূপতি কানজি লাল: খান সেনারা যখন আত্মসমর্পণ করে। অর্থাৎ যখন পাকিস্তানী প্লেন উর্দুতে, বাংলায় লেখা উর্দুতে কাগজ ফেললো। পাকিস্তান কা ফোর্স কা ইন্ডিয়ান ফোর্সকায় হাতিয়ার ডাল দো। এই হাতিয়ার যখন ডাল দিল এই কাগজগুলো আমরা পেয়ে গেলাম। প্লেন থেকে ছাড়লো তো। আমাদের ক্যাম্পের পাশে পড়লো। নদীর ভিতরে পড়লো। আমি তখন জলিপাড় বাজারে। মেলিটারি লঞ্চ আসছিল তিনটি তাদের এ্যাটাক করলাম। এ্যাটাক করলে তারা ধরা খেলো। তখন ইতিমধ্যে দেখি একটা সি প্লেন উড়ে যাচ্ছে। দেখি সেখান থেকে কাগজ পড়ে। কি ব্যাপার? একটা ধরলাম। দেখলাম ওখানে বাংলায় উর্দুতে লেখা পাকিস্তান কা ফোর্স কা ইন্ডিয়ান ফোর্স কো হাতিয়ার ডাল দাও শুধু এ কথা টুকু। তখন আমি তাদের সবাইকে বলে ফেললাম হুররে হুয়া, দেশ কা স্বাধীন হো গিয়া।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: তখন আমাকে বললো ভয় নাইরে রবী আয়। এবার দেশ স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে।
ভূপতি কানজি লাল: তখনতো আমি উর্দু কিছু বুঝতাম। তখন তো লাফালাফি। কিয়ের কি।
আরমান খান জয়: উর্দুর কথাটা যদি বাংলায় একটু বলতেন? লিফলেটে কি লেখা ছিল?
ভূপতি কানজি লাল: উর্দুতে যা লেখা ছিল তার বাংলা হচ্ছে, পাকিস্তানের ফোর্স তোমরা ইন্ডিয়ান ফোর্সের কাছে আত্মসমর্পণ কর।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: এবং অস্ত্র জমা দাও।
ভূপতি কানজি লাল: অস্ত্রই আত্মসমর্পণ কর।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: আচ্ছা যাইহোক।
ভূপতি কানজি লাল: হাতিয়ার কো ডাল দাও, আত্মসমর্পণ কর।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনি মুক্তিযুদ্ধে গেলেন কোন মাসে?
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: আমি মুক্তিযুদ্ধে গেছি ২৯/১০/১৭ এ অর্থাৎ (২৯ অক্টোবর-১৯৭১) ভারতের লবণহ্রদ থেকে। ৩১/১০/৭১ অর্থাৎ ৩১ অক্টোবর একাত্তরে আমার পুরোপুরি ট্রেনিং শুরু হয়। বীরভূম রামপুরার টারজা ক্যাম্প থেকে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: সবচেয়ে মারাত্মক যুদ্ধ আপনি কোথায় করেছেন?
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: দিকনগরে গুলি খাওয়ার পরে। ওখান থেকে দাদা বললেন যে, ভূপতি বাবু বললেন যে, আর যুদ্ধ করা লাগবে না। দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। তোরা ক্যাম্পে রেস্ট নে। দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। এই লিফলেট পাইছি আমরা।

ফারুক আহমাদ আরিফ: ক্যাম্পে কতজন ছিলেন?
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: সেখানে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিলাম।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আমি বললাম যে, কতজন ছিলেন?
হেমন্ত বিশ্বাস: কতজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন সেখানে?
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: অনেক।
জনৈক: সাড়ে ৪ শ।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: ৪/৫ শ।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আরেকটা বিষয় হচ্ছে আপনি খাবারের কথা বললেন যে, কেউ কেউ ডেপ, শাপলা খেয়েছেন। তখন এই ক্রাইসিস মুহূর্তে খাবারগুলো অন্যান্য সেক্টর থেকে সংগ্রহ করার কোন ব্যবস্থা ছিল?
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: না না কোন ব্যবস্থা ছিল না। তখন আমাদের একিন আনছিল। আমাদের ভিতর থেকে যোদ্ধা। সহযোদ্ধা তারা ক্রলিং করে আইসা আইসা কারণ সাইড দিয়া রাজাকার থাকতো। হয়তো ভূপতির বাড়ি খানা দিছে ধানের গোলায়। ধানটান তো সব নষ্ট করে দিছে। কেউ চাল, খুদ। এইভাবে কায়দা করে আবার ধূয়া জ্বালাইলে সমস্যা। কায়দা করে নিয়া আধা ফোটা ফুটাইয়া ওই ধাপা করে নিয়া এক এক মুট খাইয়া এইভাবে জীবনযাপন। কঠি-ন সমস্যা।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনারা অস্ত্রগুলো পেতেন কিভাবে?
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: আমরা অস্ত্র পাইনি। আমরা ছিলাম হিয়ার নো কেরি আর্মস। দাদা বললেন অস্ত্র ক্যাম্পে আছে যথেষ্ট। সেখানে অস্ত্র আছে।
ভূপতি কানজি লাল: অস্ত্রের ব্যাপারে আমি কিছু বলি? অস্ত্র সাধারণত সাপলাই দিয়েছিল চাকোলিয়াতে। এবং এরাই ছিল প্রকৃত হায়ার ট্রেনিং। যেমন আমরা। এরা ছিল বিরভূম। এরা যখন আমাদেরও ব্যাচের পরে আসে।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: হু আমরা পরে যাই।
ভূপতি কানজি লাল: আমরা ভিতরে এসে ফাইট শুরু করছি দু এক মাস হয়েছে। এরা পরে আসে। আসল ব্যাপারটা হচ্ছে এখানে। আসার পর তো একজন কমান্ডিং লোকের দরকার? তখন আমাকে পেল। আমার সাথে সংযুক্ত হলো। এই ধরনের ৪ জন প্লাটুন কমান্ডার এক জায়গায় ছিলাম ননীখির ক্যাম্পে।

IMG_6305

ফারুক আহমাদ আরিফ: একটা প্লাটুনে তো ২৫ থেকে ৫০ জন সদস্য?
ভূপতি কানজি লাল: ২৬/২৭ জন ছিলাম। যেমন আমার প্লাটুনে ছিল ২৬ জন। ওখানে ছিল ৪ জন প্লাটুন কমান্ডার। ভূপতি কানজি লাল (আমি), অনিল বাড়ৈ, সাজান মোল্লা আর ছিল মঞ্জু। তিনজনই মারা গেছে। আমি একাই বেঁচে আছি। ওইদেশ (ভারত) থেকে যখন মুক্তিযোদ্ধাদের এদেশে পাঠায় অত অস্ত্র ইন্ডিয়া সরকার কীভাবে দিবে? বাস্তব কথা। আমি এ কথাটা পালাম কোথা তাজউদ্দীনের কাছ থেকে এবং হুদা সাহেবের কাছ থেকে। হুদা সাহেব বললো ‘ভূপতি এত অস্ত্র যদি বাংলাদেশ স্বাধীন করতে আমরা ইন্ডিয়া সরকারের কাছ থেকে নেই তাহলে তো আমরা পুরোটায় দেনা হয়ে যাবো’। এটা কিন্তু তখনকার ব্যক্তিগত কথা। তই অস্ত্র যাচ্ছে তাতো তোমরা ভিতরে গিয়া ধরবা। আর এরা যারা যাবে তাদেরকে এই অস্ত্র সাপ্লাই দিবা। ঘটনাটা তাই হলো। আমরা এখানে এসে যুদ্ধ করে করে অনেক অস্ত্র ধরে ফেললাম। আর যখন ছেলেরা আসলো তখন তাদেরকে সেই অস্ত্রগুলো সাপ্লাই দিলাম। এসব দিয়ে দিয়ে যুদ্ধ করালাম।
আরমান খান জয়: আচ্ছা যুদ্ধচলাকালীন সময়ে যুদ্ধের শেষ অব্দি আপনার যুদ্ধের শ্রেষ্ঠ একটি ঘটনা?

ফারুক আহমাদ আরিফ: উনারটা আমরা পরে নিব।
আরমান খান জয়: ও আচ্ছা।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: আমি আরেকটু কথা বলি?

ফারুক আহমাদ আরিফ: হ্যাঁ, আমরা আপনার শেষের দিকে যাবো।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: আমি যুদ্ধে আহত হওয়ার পরে তিনি আমাকে আর তাকে সুভাষ বাগচিকে নিয়ে আসলেন বানিয়ারচর ক্যাথলিক চার্চ মিশনে। সেখানে রাত্রে আমরা অাসলাম সন্ধ্যার পরে। রাত ৯/১০টার পরে। দিনে তো ভয়। মেলিটারি ও রাজাকারের ভয়।
ভূপতি কানজি লাল: তখন কিন্তু একটা সমস্যাও ছিল। ডাক্তারের কাছে মুক্তিযোদ্ধারা গেলে তখন তো ধরা পড়ে যায়। গোপনে ডাক্তারদের কাছে যেতাম। এবং এটা খুব সেকরেসি (সিকরেট) ব্যাপার ছিল। রক্ত পা ভেঙে গেছে। মানুষ মার্ডার হচ্ছে ডাক্তারের কাছে যেতে পারতাম না। ডাক্তার দেখালেই বিপদ।

ফারুক আহমাদ আরিফ: গোপালগঞ্জে তো বেশ কয়েকটি ধর্মপল্লি ছিল খ্রিস্টানদের।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: ওইটা মিশন চার্চ মিশন। ক্যাথলিক চার্চ। চার্চ মিশন। ওনারা আমাদের ট্রিটমেন্ট করেন নাই। ওনারা বলেন যে, এখনি মিলিটারি এসে যেতে পারে। এখান থেকে হাঁটেন। আমরা কোন রকমে ভাঙা একটা নৌকা, টাবুরে নৌকা দিয়ে চলে গেলাম। একদম দক্ষিণ দিকে ভাটিতে। ভাটিতে গিয়া কায়দা কাইরা বড়দির ওখান দিয়া নাইমা দুই তিনজন কৃষাণ নিয়া কান্দের উপর দিয়া ধইরা খুব কষ্ট কইরা বনগাথি গিয়া ট্রিটমেন্ট নিয়া সুস্থ্য হইয়া আবার চলে আসলাম স্বাধীনতার কয়েকদিন আগে। তখনো ক্ষত শুকায়নি। এই অবস্থা।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। না খেয়ে যুদ্ধ করেছেন। আহত হয়েছেন। আপনি কেমন বাংলাদেশ চান?
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস: আমি বাংলাদেশ চাচ্ছিলাম আমরা বাঙালি জাতি হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ যারা আছি তারা ভ্রাতিত্ববোধ এবং পিতৃত্ববোধ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সম্মান দিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্মান দিয়ে আমার প্রিয় নেতা শেখ সেলিমের নেতৃত্বে সুন্দর সোনার বাংলা গড়ে তুলবো। এই বাংলাটাই আমি চাচ্ছিলাম। আমি চাচ্ছিলাম সুন্দর সোনার বাংলা। ভ্রাতৃত্ববোধ, কাধে কাধ মিলিয়ে, বুকে বুক মিলিয়ে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান আমরা সবাই এক সাথে থাকবো। সবাই সহৃদ্যতাপূর্ণ থাকবে। যেখানেই যাবো সবাই আদর করবে আমাদের। আরেকটা কথা বলি আপনাকে। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা, সারা বাংলার মুক্তিযোদ্ধারা মিত্রবাহিনীসহ আমরা এদেশকে হাল রেকর্ড করাইছি বাঙালিদের নামে। এটা আমার চেয়ে বড় পাওনা। যে আমার মাটি ধরে বাংলাদেশের মাটি ধরে আমি জীবন উৎসর্গ করছি। আমার উৎসর্গীতজীবন, এই জীবনে আমাদের ভূপতি বাবুর নেতৃত্বে আমরা যারা যুদ্ধ করেছি। আমরা একটি সোনার, সুন্দর সমৃদ্ধির বাংলাদেশ চাই। এই আমার প্রত্যাশা ছিল।

কমেন্টস