হুমায়ূন আহমেদ ও চিকিৎসা ব্যয় প্রসঙ্গ

প্রকাশঃ মে ৮, ২০১৭

ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ-

জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। মধ্যবিত্তের জীবনকে কলমের লেখনীতে বোধহয় এত সুন্দরভাবে আর কেউ ফুটিয়ে তুলতে পারেননি। এই অসাধারণ প্রতিভার ফলাফলও তিনি পেয়েছেন হাতে হাতে। জীবিত থাকতেই যে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা তিনি দেখে গেছেন, তা সাহিত্যিক হিসেবে যে কারও জন্যই দারুণ আরাধ্য।

আজকে প্রসঙ্গটি টানলাম তার লেখালেখির জন্য নয়, বরং অন্য একটি কারণে। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে। রোগটা ধরা পড়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি চলে যান আমেরিকায় এবং তার পুরো চিকিৎসাটাই সেখানে করা হয়। সেখানকার অত্যাধুনিক এবং উন্নত চিকিৎসায়ও তাকে বাঁচানো যায়নি। অপ্রিয় হলেও এটাই বাস্তবতা। চিকিৎসকদের হাতে সবটুকু নেই। মহান আল্লাহতায়ালাই মানুষের জীবন একটা সময় পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। যে কারণে এ প্রসঙ্গটি উল্লেখ করলাম, তা হলো তার চিকিৎসা বাবদ অর্থ খরচ হয়েছে কোটি টাকারও বেশি এবং নিতান্ত নিরুপায় হয়েই এই বিপুল পরিমাণ টাকা তাকে খরচ করতে হয়েছে। অথচ দেশে তার চিকিৎসা হলে এর সিকি পরিমাণ অর্থও খরচ হতো না। এত বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ করার সামর্থ্য হয়তো বা এ দেশের হাতেগোনা কয়েকজনের আছে, তবে তা দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আমরা যদি ব্যয়ের ব্যাপারে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে মনে হবে আমাদের চিকিৎসা ব্যয় তো বেশ কম! কিন্তু কথা হলো উন্নত দেশের মানুষের খরচের সক্ষমতা আর আমাদের দেশের মানুষের ব্যয়ের সক্ষমতা সমান নয়। তাই ‘মূল্যের’ এই মূল্যায়নটা আমাদের দেশকে মাথায় রেখেই করতে হবে এবং লক্ষ্য রাখতে হবে, সবার জন্যই স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার।

আমাদের দেশে হু হু করে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়। ‘টাকা আছে যার, চিকিৎসা তার’ এমন একটি কথা এখন বহুল প্রচলিত। ফলে চিকিৎসা পাওয়া যে প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার, তা আজকের বাস্তবতায় সর্বাংশে সত্য নয়। বিশেষ করে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা এখন মৌলিক অধিকার নয়, বরং একটি সুযোগ, যা কেউ পাচ্ছে, আর কেউ পাচ্ছে না।

স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন শ্রেণির জনগোষ্ঠীর অসমতা এতটাই তীব্র ও প্রতিকূল যে, সমষ্টিগতভাবে তা দেশের অগ্রগতির অন্তরায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতে অর্জিত সাফল্য টিকিয়ে রাখাই কষ্টকর। সুচিকিৎসা এখনো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে। অর্থাৎ চিকিৎসা শুধু যে উচ্চবিত্তদের, এটা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তারা চাইলেই দেশের যে কোনো হাসপাতালে, যে কোনো ডাক্তারের সেবা যখন তখন গ্রহণ করতে পারেন বা চাইলে উড়ালও দিতে পারেন পছন্দের দেশে। এ কথা সত্য যে, দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, যাদের সামান্য কিছু টাকা খরচ করার সামর্থ্য নেই। যারা মধ্যবিত্ত তাদেরও চিকিৎসার জন্য কোনো বাড়তি বরাদ্দ নেই। দেশে নেই হেলথ ইনস্যুরেন্সের ব্যবস্থা। ফলে পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে গেলে তাদের ঋণের অথৈ সাগরে হাবুডুবু খেতে হয়।

চিকিৎসার পর রোগী সুস্থ হবে কিনা, এ নিশ্চয়তা না থাকলেও, পরিবারটা যে পথে বসে যাবে, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। সত্যিকার অর্থেই যাদের আয় সীমিত, নিম্নমধ্যবিত্ত বা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষ, তাদের অবস্থা সত্যিই করুণ। কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হলে অনেককেই চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় চলে যেতে হয় সুন্দর এ পৃথিবী ছেড়ে।

চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে দেশের সীমিত আয়ের মানুষ। আয়ের তুলনায় অনেকগুণ বেশি বেড়েছে চিকিৎসা ব্যয়। জটিল রোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে মধ্যবিত্তরা দরিদ্র এবং দরিদ্ররা হয়ে যাচ্ছে নিঃস্ব। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে বিভিন্ন কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়া মানুষের ২০ শতাংশের কারণ হিসেবে অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়ই দায়ী।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাষ্ট্রের ওপর দেশের নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায় থাকলেও বাস্তবে নাগরিকদের চিকিৎসার পেছনে সরকারের খরচ থাকে মাত্র ২৬ শতাংশ।

উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এখনো অনেকটাই জেলা, বিভাগ এবং শহরকেন্দ্রিক। ফলে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে গিয়ে চিকিৎসা করাতে যাতায়াত ও থাকা খাওয়ার জন্য অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা অধিকাংশ মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্তদের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না। আর এ কারণে দেশের জনগণের বড় একটি অংশ এখনো উন্নত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কম খরচে জটিল রোগের চিকিৎসার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে দরিদ্র মানুষ উপকৃত হতো।

কেন বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়? এককথায় কোনো সুনির্দিষ্ট কারণকে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ার পেছনে দায়ী করা কঠিন। অসংক্রামক রোগের হার বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, রোগ নির্ণয়ে আধুনিক পরীক্ষা পদ্ধতির ব্যবহার, দালালদের দৌরাত্ম্য, চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্তরের পেশাজীবীদের অনৈতিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কারণে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে। এ সমস্যাগুলোর সমাধানও পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। তাই যথাযথ কারণ অনুসন্ধান করে এগুলো সমাধানের পথ প্রশস্ত করা সময়ের দাবি।

ওষুধের দাম এবং অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রীর ব্যয়ও দিন দিন বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশের আড়াই শতাধিক ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি রয়েছে। এদের উৎপাদিত ওষুধের দাম ও মানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট তারতম্য রয়েছে। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। তার ওপর এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এত ওষুধের ভিড়ে নিজের পণ্যটি চালাতে কোম্পানিগুলো প্রায়ই চিকিৎসক এবং ফার্মাসিস্টদের উপহার, কমিশন, বিদেশ ভ্রমণে অনুদান দিয়ে থাকে বলে শোনা যায়। এই অর্থ পরবর্তীতে জনগণের পকেট থেকেই আদায় করা হয় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর ফলেও চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায় কয়েকগুণ।

সম্প্রতি কার্ডিয়াক স্টেন্টের মূল্য নিয়েও বিতর্ক উঠেছে। স্বাভাবিক মূল্যের চেয়ে লক্ষাধিক টাকায় বিক্রি করার যে দুর্নীতি হচ্ছে, তার পেছনে কি বড় কোনো চক্র নেই? অবশ্যই আছে। এমন অনেকগুলো চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে আছে এদেশের সাধারণ জনগণ।

সরকারি এবং বেসরকারি খাতে চিকিৎসার তুলনার ক্ষেত্রে প্রথমেই সরকারি হাসপাতালের অবস্থা নিয়ে কথা বলা যাক। নামমাত্র বা স্বল্প খরচে চিকিৎসা সেবা পাওয়া যায় সরকারি হাসপাতালে। অপারেশন, সিসিইউ, আইসিইউ ও ডায়ালাইসিস ইত্যাদি সেবার ক্ষেত্রে বেশ কম টাকা নেওয়া হয়। কিছু কিছু ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী বিনামূল্যে দেওয়া হয়। তুলনামূলক কম মূল্যে অধিকাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায়। সাধারণ পরীক্ষাগুলো তো কম খরচেই করা হয়, যেমন রক্তের সিবিসি, সুগার, প্রস্রাব, পায়খানা, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি ইত্যাদি। এমনকি বিশেষায়িত পরীক্ষাগুলোও কমমূল্যে করা হয়, যেমন করোনারি এনজিওগ্রাম, সিটিস্ক্যান, এমআরআই, ইকোকার্ডিওগ্রাম, কার্ডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশন ইত্যাদি। যে কোনো অপারেশনের জন্য রোগীকে কোনো চার্জ দিতে হয় না, খরচ বলতে শুধু কিছু সরঞ্জাম এবং ওষুধপত্র বাইরে থেকে কিনতে হয়। শুধু পেয়িং বেডের রোগীদের নামমাত্র চার্জ দিতে হয়। কিন্তু এখানে সমস্যা হলো, রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় সেবার সুযোগ খুব সীমিত। অনেক সময় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে রয়েছে দালালদের দৌরাত্ম্য, কিছু কর্মচারীর ট্রলি বাণিজ্য, বিভিন্ন পর্যায়ে বখশিশ দিতে গিয়ে পদে পদে ভোগান্তি ইত্যাদি। মূল চিকিৎসার খরচ কম হলেও, এসব বাড়তি খরচ জোগাতে গিয়ে রোগীর গাঁট থেকে বেরিয়ে যায় অনেকগুলো টাকা। দালাল ও কিছু অসাধু কর্মচারীর অর্থ লুট ও সীমাহীন হয়রানি সরকারি হাসপাতালের স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতির কারণে অনেক ওষুধ সরবরাহ থাকার কথা থাকলেও পাওয়া যায় না। অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর লোককে দিয়ে অপ্রয়োজনীয় বাড়তি সরঞ্জাম কিনিয়ে ফায়দা লোটে কিছু কর্মচারী। এভাবে পদে পদে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খরচ করতে গিয়ে, সরকারি ফ্রি চিকিৎসা আর ফ্রি থাকে না, বরং সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে! তবুও এই সরকারি চিকিৎসা নিম্নবিত্ত মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। এই খাতের দুর্নীতিগুলো বন্ধ করতে পারলে স্বাস্থ্যসেবার মান অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব। চিকিৎসা ব্যয়ও কমানো সম্ভব।

এবার দেখা যাক, বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসা ব্যয় কেমন। ব্যক্তি উদ্যোগে তৈরি বেসরকারি হাসপাতাল এবং প্রাইভেট ক্লিনিকসমূহের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূল চিন্তা থাকে মুনাফার দিকে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহর, জেলা শহর, শহরতলি সব জায়গাতেই ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। দেশের অর্থনীতির অবস্থা যাই হোক, চিকিৎসা খাতের ব্যবসা সব সময়ই রমরমা থাকে। কারণ মানুষ অসুস্থ হবেই। অসুস্থ হলে তাকে চিকিৎসাসেবা নিতেই হবে। আর বেসরকারি হাসপাতাল এবং প্রাইভেট ক্লিনিকসমূহের চিকিৎসাসেবার খরচ এবং বিশেষায়িত সেবাগুলোর মূল্য সাধারণের নাগালের বাইরে। বেড চার্জ, এডমিশন ফি, পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ সরকারি হাসপাতালের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। একই পরীক্ষা বারবার করানো হয় মনিটরিংয়ের নামে। অপ্রয়োজনে বিভিন্ন দামি ওষুধ দেওয়া হয় এবং হাসপাতালে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দিন রোগীকে রেখে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ আছে। প্রতি সেশনে ডায়ালাইসিস করাতে খরচ হয় প্রায় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। করোনারি এনজিওগ্রামে ১৮ হাজার টাকা, সিটিস্ক্যানে ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা, এমআরআই ৭ থেকে ১০  হাজার টাকা, ইসিজি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, ইকোকার্ডিওগ্রাম ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা, এক্স-রে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, আল্ট্রাসনোগ্রাম ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা, কার্ডিয়াক ক্যাথ ১৫ হাজার টাকা। এমনকি সাধারণ পরীক্ষাগুলোর ব্যয়ও সরকারি হাসপাতালের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি, যেমন ইউরিন ৩০০ টাকা, সুগার ২০০ টাকা এবং রক্তের সিবিসি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা। স্বল্প লাভে এ পরীক্ষাগুলো আরও কম টাকায় করা সম্ভব হলেও বেসরকারি হাসপাতাল এবং নামিদামি ক্লিনিকগুলো খরচ কমাতে চায় না। এসব ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগও আছে। পরীক্ষাগুলোর সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারিত থাকলেও সর্বোচ্চ মূল্যের বেলায় একেক হাসপাতাল একেক রকম মূল্য রাখে। কার্যকর হচ্ছে না মূল্য তালিকা প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখার বাধ্যতামূলক বিধানও। হাসপাতাল আর ডাক্তারদের অভ্যন্তরীণ কমিশনবাণিজ্য তো এখন ওপেন সিক্রেট। যদিও অধিকাংশ চিকিৎসকই কমিশন খান না, তবে কিছু অসাধু চিকিৎসক এ ন্যাক্কারজনক কাজে লিপ্ত আছে বলে শোনা যায়।

আইসিইউ সেবার ক্ষেত্রে রোগীদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। দেশের সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেড নিতান্ত অপ্রতুল, সারা দেশে মাত্র ২১১টি। সে হিসাবে প্রতি আট লাখ মানুষের জন্য একটি, অর্থাৎ প্রতি কোটি মানুষের জন্য মাত্র ১২টি আইসিইউ বেড আছে। এসব আইসিইউতে খরচ অনেক কম এবং সেটা সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলোতে আইসিইউ খরচ সাধারণ মানুষ তো বটেই, অনেক মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্তদেরও নাগালের বাইরে। এসব আইসিইউতে দৈনিক ২৫ থেকে ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ পড়ে। সঙ্গে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ভিজিট ভাতাসহ অন্যান্য খাতে আরও বেশ পরিমাণ টাকা ব্যয় হয়। সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা সংকটের সুযোগ নিয়ে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আইসিইউ সেবা নিয়ে রমরমা বাণিজ্য প্রায়ই চলে বলে শোনা যায়। সরকারি হাসপাতালে সিট খালি না থাকলেই রোগী বা তার আত্মীয়স্বজনরা নিতান্ত অপারগ হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকের আইসিইউতে ভর্তি হতে বাধ্য হয়। কিছুদিন থাকার পর যখন আইসিইউর বিল তাদের দেওয়া হয়, তা দেখে তো অনেকের চক্ষু চড়কগাছ। বিলের পরিমাণ লাখ লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়।

দেশের সরকারি হাসপাতালে অপারেশন চার্জ বেশ কম হলেও প্রাইভেট হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলোতে বর্তমানে অস্ত্রোপচারের ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে জ্যামিতিক হারে। অপারেশন চার্জ রাখা হচ্ছে আকাশচুম্বী, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণের নাগালের বাইরে। হার্নিয়া, সিজারিয়ান সেকশন, এপেন্ডিসেক্টোমি এমনকি পিত্তথলির পাথরের অপারেশনসহ অন্যান্য মাইনর অপারেশনের ক্ষেত্রেও মাত্রাতিরিক্ত চার্জ নেওয়া হয়। কোনো কোনো হাসপাতালে এসব অপারেশনে খরচের অঙ্কটা লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

মানসম্মত চিকিৎসা, স্বাস্থ্য এবং সহনীয় চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়টি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং সেবাদানকারীদের মনমানসিকতার ওপর নির্ভর করে। বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্বারা স্বল্পমূল্যের সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে যারা অহেতুক ব্যয় বাড়িয়ে সাধারণ জনগণের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে তাদের দৌরাত্ম্য কমানোর মাধ্যমে সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও রোগীবান্ধব করা যায়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মূল্য কমানো, ওষুধপত্র বিশেষ করে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম কমানো, কমিশনের বদলে রোগীদের ছাড় দেওয়া, অপারেশন এবং আইসিইউ চার্জ সহনীয় মাত্রায় রাখা, ভর্তি রোগীর ফলোআপ দেখার জন্য অধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার তুলনায় ক্লিনিক্যাল জাজমেন্টকে প্রাধান্য দেওয়ার মতো ছোটখাটো কিছু পরিবর্তন দ্বারা চিকিৎসা ব্যয় বর্তমান অবস্থার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব।

চিকিৎসা পেশা ও মানবিকতা পরস্পর সম্পূরক। সমাজের প্রত্যেকেই ডাক্তার নয়, কিন্তু রোগী আমি আপনি প্রত্যেকেই। কাজেই চিকিৎসা ব্যয়কে একটি সহনীয় পর্যায়ে রাখার মাধ্যমে আমাদের বিশাল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক বড় ধরনের উপকার করা সম্ভব। যুগ পরিবর্তনের হাওয়ায় এখন দৃশ্যপট অনেকটাই পাল্টে দিয়ে চিকিৎসাসেবাকে এখনো ঐশ্বরিক দায়িত্ব হিসেবে ভাবা হয়। ডাক্তাররা একা নয়, প্রাইভেট হাসপাতাল এবং ক্লিনিকের মালিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিসহ চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক পেশাজীবীর সদিচ্ছার মাধ্যমেই চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও বেশি রোগীবান্ধব করা যায়।

চিকিৎসাসেবা পাওয়া জনগণের একটি মৌলিক অধিকার। তাই পথঘাটের ছিন্নমূল মানুষদের থেকে শুরু করে শত কোটি টাকার মালিক সবার জন্যই যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। যাদের আয় নির্দিষ্ট, যারা নিম্ন মধ্যবিত্ত বা দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ, তাদের মধ্যেও একজনও যাতে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে এ সুন্দর পৃথিবী থেকে বিদায় না নেয়, এ বিষয়টা উপলব্ধি করে তা নিশ্চিত করা জরুরি।

লেখক : ডিন, মেডিসিন অনুষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে সংকলিত

কমেন্টস