‘হাওড়ের রহিম মিয়া ঢাকার খোলা ম্যানহোলে নিখোঁজ’

প্রকাশঃ মে ৪, ২০১৭

হাকিম মাহি-

কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণ ও বানের পানিতে ফসলের ক্ষেত, হালের গরু, ছাগল এবং একমাত্র অন্ধের যষ্ঠি নাতনিটি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। দুঃখের দরিয়ায় কোন কূল না পেয়ে রহিম মিয়া পড়নে একটি লুঙ্গি, গায়ে একটি গেঞ্জি এবং অসহায়ত্তের ঘাম মুছার জন্যে কাঁধে যে গামছাটি থাকে, সেটি নিয়েই দেশের নীতিবান মানুষের পুণ্যভূমি, যেখানে কিছু না চাইতেই নাকি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে যায়, এমন জায়গা দু’মুঠো ভাতের জন্যে রাজধানী ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন রহিম মিয়া।

ক্ষুধার্ত পেট, খালি পকেট সব মিলিয়ে পা আর চলছে না রহিম মিয়ার। আমাদের দেশে একটি কথা চিরন্তন রয়েছে, ‘খালি পেট আর খালি পকেট যা শিক্ষা দেয়, তা পৃথিবীর কোন পুস্তুক সে শিক্ষা দিতে পারে না’। রহিম মিয়া কিছু দূর গাড়ীতে যায়, আবার যখন গাড়ীর কন্ট্রাক্টর ভাঁড়ার জন্যে নামিয়ে দেয়, তখন সে পায়ে হেঁটে ঢাকার পথে রওয়ানা দেয়। একসময় বর্ষার কোন এক সন্ধ্যায় রহিম মিয়া ঢাকা পৌছায়।

এমনিতে ৭০ বছরের সয়সম্বলহীন বৃদ্ধ, তারমধ্যে আবার ঝড় বৃষ্টির সন্ধ্যা। কোথায় থাকবে, কোথায় খাবে কোন হদিস নেই তার। হাওড়ে থাকাকালীন বৃদ্ধ সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। সন্ধ্যায় যখন বাড়ী ফিরতেন, ১৪ বছরের নাতনি তাঁর জন্য রান্নাবান্না করে রাখতেন। ঘর্মাক্ত শরীরটাকে একটু শ্রান্ত করতে টাওয়েল এগিয়ে দিতেন। কোন রকমের দুদণ্ড সুখ খুঁজে পেতেন দাদা নাতনি।

কোন এক চৈত্রের খড়া রোঁদ থেকে ফিরে বুড়োর ছেলে এবং ছেলের বউ ডাইরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।

কত পথ্য খাওয়ালেন গ্রাম্য কবিরাজকে দেখিয়ে, কিন্তু মরণব্যাধি আর সারল না। কিভাবে সারবে, এ অজপাড়া গায়ে কি কোন প্রভু ডাক্তাররা বসবাস করে? তাঁরা কোন রকমের এমবিবিএস পাস করে, অধিকাংশ ঘুষের টাকায় চাকরি নিয়ে, শহরের ঐ লাল লাল অট্রালিকায় বসবাস করে। রহিম মিয়ার মতো হতদরিদ্র চাষাদের কি তাঁদের দেখার সময় আছে?

গেলো বছর বৈশাখের খড়ায় হাওড়ের হাজার হাজার হ্যাক্টর ধানের জমি শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেছে। তাঁর মধ্যে বুড়োরও ১ বিঘে জমির ধান পুড়ে ছাই। পত্রপত্রিকায় দেশের হাওড়ের অসহায় দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এত করে বলা হল, কিন্তু সরকারি মহলসহ কোন বেসরকারি সংস্থাও তাঁদের কাকতি মিনতি ফিরে দেখেনি। অথচ এ সমস্ত কৃষকের রক্তসম ঘাম মিশ্রিত টাকা দিয়ে এদেশের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতিরও বেতন হয়। এর কিছু দিন না যেতেই হল-মার্কের ৪,৫০০ কোটি টাকার আত্মসাধ, বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনায়ও বিশ্বে প্রথম হ্যাকিং নামে চুরি, সব নাকি অর্থমন্ত্রীর দফতরের কিছুই না। এগুলো নাকি কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাত্র।

বৃদ্ধ সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে থরথর করে কাঁপছে। কোথায় যাবে সে? যেখানেই একটু আশ্রয় নিতে যায় নির্দয় মার্কেটের মালিকরা দুর দূর করে তাড়িয়ে দেয়, আবার যখন কোন পুলিশ ছাউনির নিচে গিয়ে দাঁড়ায় অমানবিক পুলিশ লাঠি পেটার ভঁয় দেখিয়ে সেখান থেকেও তাড়িয়ে দেয়। অবশেষে, রহিম মিয়া মৃত্যুর প্রহর গুণতে গুণতে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে চেষ্টা করে, তাও দুঃসাধ্য প্রায়। কারণ, ঢাকার শহরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফাঁদ কচ্ছপ গতির সাথেও হার মানায়। যানজট নিরসনের নামে ফ্লাইওভার নির্মাণের মিছিল আগের তুলনায় ভুগান্তির মাত্রা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি গবেষণায় দেখা যায়, আগামী ১০ বছরের মধ্যে ঢাকার প্রত্যেকটি রাস্তা ট্রাফিকে অচল হয়ে যাবে। তাঁর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াবে যত্রতত্র ফ্লাইওভার ও ড্রেন নির্মাণের নামে রাস্তা খুঁড়াখুঁড়ি করে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ।

রহিম মিয়া প্রচণ্ড ঝড়ের মধ্যে এক পা সামনে দিচ্ছে আর এক পা পিছনে দিচ্ছে। গাড়ীতে উঠতে গিয়েও ফিরে আসতে হচ্ছে তাঁকে। কারণ, লোকাল সিটিং সার্ভিস নামে যাত্রি ভোগান্তি এবং গণপরিবহনের নামে কুরবানির গরুর মত পাড়িয়ে পাড়িয়ে সাড়ি বেঁধে গাঁদাগাঁদি করে যাত্রি তুলা রহিম মিয়াকে একটু সুখের নীড় খুঁজে পাওয়ার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো। রহিম মিয়া ক্লান্ত হয়ে ঢাকার রাস্তা নামক বৃষ্টির পানিতে প্লাবিত হাওড়ের মধ্যে পড়ে গেলো। চলতি গাড়ির সাথে আসা বানের পানির খড়স্রোতে ভেসে গেলো খোলা ম্যানহোলে ৭০ বছরের আশ্রয় প্রার্থী একটি অসহায় প্রাণ।

এভাবে দেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে হাজারও মানবতা। একদিন ধ্বংস স্তূপে পরিণত হবে গোটা দেশ, যদি এভাবে চলতে থাকে গণমিছিলে অরাজকতা। এদেশটি যেন অকূল সাগরের মাঝে ভাসমান কাণ্ডারিহীন জাহাজ, আর দেশের জনগণ ঐ নিশ্চিত মৃত্যুর পথের নাবিকদের মতো, যারা ক্ষমতাসীন প্রভুদের শোষণে হারিয়ে ফেলেছে জীবনের গতিপথ। এই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে পরিত্রানের গণমানুষের একটিই পথ খোলা রয়েছে, আবার ৭১ এর মত সংঘবদ্ধ হয়ে দুর্নীতির ভয়ঙ্কর কালো থাবা হটাও এবং ব্রিটিশ কোম্পানি আমলের নব্য মীরজাফরদের বিতাড়িত করে সোনার বাংলা রক্ষা কর। জানি এ পথ অনেক কণ্টকাকীর্ণ, কিন্তু ফলাফল অনেক সুমিষ্ট ও সুপেয় সুনিশ্চিত হবে। (কয়েকটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা)।

লেখক- কর্মী: নো ভ্যাট অন এডুকেশন।

শিক্ষার্থী: স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

[email protected]

Advertisement

কমেন্টস