ট্রাম্পের ১০০ দিনের শাসনেও সাংবাদিক বিদ্বেষ ও আমাদের লাল গোলাপ

প্রকাশঃ এপ্রিল ৩০, ২০১৭

ফারুক আহমাদ আরিফ-

ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ করে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের কার্যক্রম শুরু করেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বাছাইপর্ব থেকেই তিনি সমালোচিত, নিন্দিত হচ্ছিলেন নানা বিকর্তিত বক্তব্য ও আচরণের কারণে। ট্রাম্পের ১০০ দিনের কর্মসূচি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তিনি ২০ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে বহিষ্কার, ওবামাকেয়ার বাতিল, মেক্সিকোর সঙ্গে দেয়াল নির্মাণ, সুপ্রিম কোর্টে একজন রক্ষণশীল বিচারপতির মনোনয়ন এবং মেক্সিকো ও কানাডার সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নাফটা বাতিলসহ ‘আমেরিকার সঙ্গে আমার চুক্তি’ নামে ১৮টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে শুধুমাত্র একটি নিলগরসাচকে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। বাকি ১৭টিই ফক্কা। ১৯৩৩ সালে রুজভেল্ট তাঁর প্রথম দফা শাসনামলে ১০০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। সেটি থেকেই এই কার্যক্রম।

ট্রাম্প ১০০দিনেও তার পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা গঠন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সিনেটের সমর্থন লাগে এমন ৫৫৬টি পদের মধ্যে ৪৭০টি নিশ্চিত করে ৮৬ জনের কোন হদিস নেই। তিনি নিজ হ্যাডমবলে ২৬টি নির্বাহী নির্দেশ জারি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম আগমন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নির্বাহী আদেশ দিয়েছিলেন তা তিন মাস পরও আদালতের হস্তক্ষেপে সেটির আশার আলো নেই। হোয়াইট হাউসের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে নানা স্ক্যান্ডাল। নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন ইত্যাদি ইত্যাদি ব্যর্থতা তার চারপাশকে ঘিরে রেখেছে। সাংবাদিকরা যখন এসব বিষয়গুলো নিয়ে লেখেন তখনি তিনি সাংবাদিকদের উপর চড়াও হলেন।

তার বিতর্কিত ব্ক্তব্য বিতর্কের আকাশে কালো মেঘ যেমন এনেছে তেমনি মাটিতে পুতেছে বিষবৃক্ষ। বিশ্বের দিকে দিকে তার কথার সমালোচনার ঝড় উঠে। কিন্তু কান কাটা রমজানের মত তার কোন হুশ হয়নি। ট্রাম্প সাহেব নিজের চিরাচরিত স্বভাবের পথেই হেঁটেছেন। মেতেছেন। মানুষকে আঘাত করেছেন। বিশেষ করে ক্ষমতাগ্রহণের পর সাংবাদিকদের নিয়ে তিনি বিরোপ মন্তব্য করেছিলেন। বিশ্বের কোন প্রান্তেই সাংবাদিকরা  এটিকে পাগলের প্রলাপ বলে আমলে নেয়নি।

কিন্তু তাতেও ট্রাম্পের স্বভাবসূলভ আচরণ বা কথার বিষ শেষ হয়নি। তিনি চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে ঠিক তার পরের দিন ২১ জানুয়ারি শনিবার হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের নিয়ে বেফাস বক্তব্য শুরু করেন। তার ১৫ মিনিটের ভাষণের ৯ মিনিটই শুধু সাংবাদিকদের প্রতি বিদ্বেষমূলক কথা। তিনি বলেছিলেন, ‘সাংবাদিকেরা পৃথিবীর সবচেয়ে ‘অসৎ’ মানুষদের শ্রেণিভুক্ত’। আমরা ২২ জানুয়ারি ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেফাস বক্তব্য ও সাংবাদিকদের দায়’ শীর্ষক কলাম লেখে তার প্রতিবাদ করি। আমার শিক্ষক কাজী আনিছ স্যারও ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে ট্রাম্পের বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ত দূরে থাক বিশ্বের কোন সাংবাদিক বা সাংবাদিক সংগঠন তার বক্তব্যের প্রতিবাদ করেনি। আমি বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিক সাংবাদিককে বক্তব্যটির প্রতিবাদ করছেন না কেন প্রশ্ন করলে জবাবে তারা যা জানালো তার সারমর্ম হচ্ছে পাগলের প্রলাপের সাথে কথা বলে লাভ কী? দারুণ যুক্তি। যাই হোক আমরা ছোট চুনোপুটি। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের প্রতিবাদ করলাম। তার কথা প্রত্যাহার করার দাবি জানালাম।

২৯ এপ্রিল শনিবার ছিল ট্রাম্পের ক্ষমতাগ্রহণের ১০০তম দিন। ‘এই দিন পেনিসেলভিনিয়ার এক সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি একের পর এক প্রতিশ্রুতি রেখে যাচ্ছেন কিন্তু সাংবাদিকরা তা তুলে ধরছেন না বরং ‘বাস্তবতার সাথে সম্পর্কহীন মিথ্যা সংবাদ’ তারা প্রকাশ করছেন। তার ১০০ দিন নিয়ে গণমাধ্যম যেসব কথা বলেছে, সেজন্যে তাদের ‘বড় একটা ফেলের গ্রেড’ দেয়া উচিত। তা ছাড়া সাংবাদিকদের নৈশভোজকে তিনি নীরস বলেও আখ্যায়িত করেন। খবর বিবিসির’

অর্থাৎ সময় পাল্টেছে কিন্তু ট্রাম্পের চরিত্র বা কথার ধরণ পাল্টেনি। তিনি যা তা মুখে বলে যান। আঘাত করেন কথার তির দিয়ে।

এমন বক্তব্য নিঃসন্দেহে নিন্দার পাত্র। কাউকে আঘাত ছাড়া কি কথা বলা যায় না? তবে ট্রাম্প কেন সেই পথে বার বার পা বাড়ান।

আমরা ট্রাম্পের ২৯ এপ্রিলের সেই ব্ক্তব্যগুলোর প্রতিবাদ করছি। নিন্দা করছি। প্রত্যাহার চাচ্ছি।

ইতিপূর্বে ২১ জানুয়ারি ট্রাম্পের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ও সাংবাদিক লোকমান হত্যার প্রতিবাদে ২৫ জানুয়ারি আমরা স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে একটি করে লাল গোলাপ দিয়েছিলাম। সেদিন বক্তব্যে বলেছিলাম বিশ্বের বিভিন্নপ্রান্তে সাংবাদিকদের অপমান, অপদস্থ, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, আহত ও নিহত করার প্রতিবাদে একটি করে লাল গোলাপ দেয়া হলো। বিশ্ববাসী আমাদের আঘাত করলে প্রতিঘাতে আমরা আরো ভালো ব্যবহার করবো। গোলাপের স্টিকে কাঁটা থাকে। কিন্তু ফুল ও পাতার মধ্যে একটি বিশেষ দূরত্ব থাকে যেখানে কোন কাঁটা নেই। আমরা চাই বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে মানুষকে সেইভাবে মূল্যায়ন করা হোক। কাঁটার পরিবর্তে একে অপরকে ফুল দিয়ে অভিনন্দিত করি।

ফিরে আসি আবার ১০০ দিন পরে। আজ ৩০ এপ্রিল আবারও ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিবাদ লেখছি। আজ মনে হচ্ছে ট্রাম্প তার চারিত্রিকবৈশিষ্ট পাল্টাবে না। সে যখনি সুযোগ পাবে সাংবাদিকদেরকে বিষ দাঁতে কামড় দিবে। এই কামড় খেয়ে হলেও সাংবাদিকদের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে তার অন্যায় বক্তব্যের প্রতিবাদ করতে হবে। লেখতে হবে।

কারণ সাংবাদিকরা হচ্ছে স্বঘোষিত শিক্ষক। রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক পাঠ, রাষ্ট্রনায়কদের রাষ্ট্রপরিচালন, অধ্যাপকদের শিক্ষাদান পদ্ধতি, ধর্মপ্রচারকদের ধর্মের মহিমা,, সমাজকর্মীদের সমাজভাবনা, মানবতাবদীদের মানবমমতা, পথচারীদের পথপ্রদর্শক, বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারে পথ দেখিয়ে থাকে।

সাংবাদিকরা নিজেদের ভাষা তৈরি করবে। রাজনীতিবিদরা সাংবাদিকদের ভাষা ঠিক করে দিবে না। সাংবাদিকদের স্বকীয়তা বজায় রাখতে হবে। মাথা উঁচু করে সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে হবে, লেখতে হবে। প্রাণ গেলেও মান দিব না মনোভাব নিয়েই সাংবাদিক হতে হবে।

একটি দেশের কোথায় কি হচ্ছে, কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি কি বক্তব্য দিচ্ছে সেটির ঠিক সেটুকুই প্রকাশিত হয় যা গণমাধ্যম প্রকাশ করে। গণমাধ্যমকে নিজের শক্তি-সামর্থের ওপর পূর্ণাঙ্গ আস্থা রেখেই এগিয়ে যেতে হবে। আমেরিকান প্রেসিডেন্টের মেয়াদ ৪ বছর। দু’বার নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পেলে ৮ বছর। কিন্তু একজন সাংবাদিকের কাছে তথ্য সারা জীবনের জন্যে ক্ষমতা। সময় ও সুযোগমত সেটি প্রকাশ হবে।
নারী গর্ভে কোন কিছু গচ্ছিত রাখলে সেটি প্রস্ফুটিত নাও হতে পারে। মাটির বুকে কোন কিছু রোপণ করলে সেটি অঙ্কুরিত না হয়ে নষ্ট হতে পারে কিন্তু সাংবাদিক বা সৃষ্টিশীল মানুষের কাছে কোন তথ্য থাকলে সেটি কখনো নষ্ট হয় না।

তাই সাংবাদিকের সত্যপথে টিকে থেকে সত্যপ্রকাশে আপোষহীন হয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ট্রাম্পের সুচিন্তা জাগ্রত হোক। মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করা শিখুক এটিই আমাদের কাম্য।

লেখক: হেড অফ নিউজ; বিডিমর্নিং

রাত ৮টা ৫২ মিনিট
৩০ এপ্রিল-২০১৭, ৫/৮ লালমাটিয়া ধানমন্ডি-১২০৭

কমেন্টস