আহালের দিন কেউ কি শিন্নি খা?

প্রকাশঃ এপ্রিল ২৪, ২০১৭

ফারুক আহমাদ আরিফ-

‘আহালের দিন কেউ কি শিন্নি খা? তাইলে আর তাগর আহাল কে কইল? হুদায় এরুম হরে।’ এই কয়েকটি লাইন আমার ছেলেবেলার কথা। তখন আমাদের ময়মনসিংহ এলাকায় প্রচুর অভাব-অনটন দেখা দেয়। মানুষের খাবার-দাবার নেই। ঘরে চাল নেই। মাঠে ধান নেই। এই অবস্থায় এক বাড়ি থেকে পোলাও রান্নার ঘ্রাণ আসছে। সে বাড়ির লোকজনও খুব দরিদ্র। অন্যের বাড়িতে দিন মজুরি করে। এই অবস্থায় সে কেন পোলাও রান্না করছে এটি নিয়ে এলাকায় হৈ চৈ পড়ে যায়। অনেকে রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ছে।

একটি শ্রেণি বিষয়টি ভালোভাবে নেইনি। তাদের কেউ কেউ তো এসে আমার দাদার কাছে নালিশ জানালো। ‘দেহুন মাস্টুর সাইব তাগর নাহি আহাল। আর আহালের দিন কেউ শিন্নি খা?’ দাদাতো রীতিমত হতভম্ব হয়ে পড়লেন, কি করবেন এদের, কি বলবেন তাদের? তিনি কয়েকজনকে নিয়ে সেই বাড়িতে উপস্থিত হয়ে জানতে পারলেন তারা আজ পোলাওয়ের চাল দিয়ে ভাত রান্না করেছে। আর এই চালগুলো তারা জমিয়ে রেখেছিল ঈদে পোলাও রান্না করার জন্যে। আত্মীয়-স্বজনদের জন্যে। কিন্তু দুর্ভাগ্য এখন এমন অভাব কোথাও কাজ নাই। মাঠে কোন লতাপাতাও নেই যে তারা সেখান থেকে কিছু তুলে এনে খাবে। দাদা তখন সেই বাড়ির মুরুব্বিকে এনে আমাদের ঘর থেকে কিছু চাল ও ধান তুলে দিলেন হাতে।

আজ যখন লেখতে বসেছি তখন দেশের ৬ ভাগের এক ভাগ অঞ্চল সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলবীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চল পানির নিচে ডুবে গেছে। সেখানকার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়ে গেছে।

শুধু সুনামগঞ্জে ফসলই নষ্ট হয়েছে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি। নেত্রকোনায় ৬৫ হাজার হেক্টর বোরো পানির নিচে। মত্স্যসম্পদ নষ্ট হয়েছে প্রায় ২৪ কোটি টাকার। কিশোরগঞ্জে ২৩ হাজার, হবিগঞ্জে সাড়ে ১৩ হাজার ও মৌলভীবাজারে ১৩ হাজার হেক্টর বোরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাওরের পানিতে ডুবে যাওয়া ধান পঁচে পানিদূষণে প্রায় ৪১ কোটি টাকার ১ হাজার ২৭৬ টন মাছ মারা গেছে। আর মরেছে ৩ হাজার ৮৪৪টি হাঁস।

দেশের এমন দুর্যোগ গণমাধ্যমে তেমন গুরুত্ব পায়নি। চলতি মাসের শুরু থেকেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ ভাঙার কারণে অকালে বন্যার পানির ঢলে হাওরের সকল ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। এই নিয়ে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন করেছে। ১৬ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত মহামান্য রাষ্ট্রপতি হাওর অঞ্চল ঘুরে দেখেছেন। তিনি ১৭ এপ্রিল সুনামগঞ্জের জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বক্তব্যে বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য মজুদ রয়েছে। আপনার হওরের মানুষ না খেয়ে থাকবে না। কৃষকের ঋণ মওকুফের ব্যাপারেও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলব।’ কিন্তু সেই হাওরের মানুষের জন্যে কোন খাবার নেই। সরকার ২৩ এপ্রিল তাদের পরিবার প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল ও ৫ শ টাকা করে অনুদান ঘোষণা করেছে। এটি যদিও তাদের জন্যে তেমন কিছুই না। কেননা এক ব্যক্তি তার প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে সে বছরে আড়াই হাজার মন ধান পান কিন্তু অকাল বন্যায় সেগুলো সব নষ্ট হয়ে গেছে। এখন তিনি মান-সম্মানের মাথা খেয়ে ওএমএসের চালের জন্যে লাইনে দাঁড়িয়েছে।

হাওরের মানুষ ফসল হারিয়ে দিশেহারা। তাদের ঘরে চাল নেই, ডাল নেই, নেই নুন তেল। জীবন বাঁচানো তাদের জন্যে দুর্বিসহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রপতির আশ্বাসেও কোন কাজ হয়নি। আজ ২৪ এপ্রিল হাওরের মানুষের পাশে দাঁড়াতে সকলের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারের এই দেরিতে বোধোদয়কেও আমরা অভিনন্দন জানাবো। ২০ এপ্রিল হাওরের সংবাদটি শুনে আমরা একটি উদ্যোগ নেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে। অসংখ্য মানুষের আগ্রহও দেখতে পেলাম। অনেকেই ত্রাণবিষয়ে সহযোগিতায় কাজ করতে সম্মত। এখন নেমে পড়তে হবে মাঠে।

কিন্তু কথা হচ্ছে আমরা সমাজের সব স্তরের মানুষ কেন নেমে আসছি না? আমাদের মন-মানসিকতা কি শুকিয়ে যাচ্ছে? মানুষের প্রতি মানুষের আকাঙ্খার পারদ কি কমে যাচ্ছে। ৬টি জেলার লাখ লাখ মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে আছে আর আমরা এখনো তাদের পাশে সাহায্যের হাত নিয়ে এগিয়ে আসছি না। এটি কেমন মানবতা আমাদের বুঝতে খুব কষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে পারে হাওরের মানুষগুলোর এই অসহায় সময়ে।

সন্ধ্যা ৬টা ৫২ মিনিট
২৪ এপ্রিল-২০১৭, ৫/৮ লালমাটিয়া, ঢাকা।

লেখক: হেড অফ নিউজ; বিডিমর্নিং
ইমেইল[email protected]

Advertisement

কমেন্টস