প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর; প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

প্রকাশঃ এপ্রিল ১৭, ২০১৭

হাকিম মাহি-

সহস্র বছরের ভ্রাতৃত্ব ৭০ বছরের গাণিতিক ধাঁধাঁয় এভাবে বিলীন হয়ে যাবে তা এখনও বুঝা ভাঁড় দু’দেশের সংস্কৃতি ও সভ্যতার মিলন মেলায়। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ ও ভারত নামক দুটি রাষ্ট্র থাকলেও ভারতীয় উপমহাদেশে এরা একই সুতোয় গাঁথা। বিভেদ শুধু স্বার্থের কাঁটাতারের বেড়ায়, তিস্তা ও মহানন্দায়। ২০১৬ সালে, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের ৫০ তম বার্ষিক সম্মেলনে ঢাকায় পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান একজন শ্রেষ্ঠ সন্তান দিপেস চক্রবর্তী প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান করলে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। আপনি দু’বাঙলাকে কি হিসেবে দেখেন? তিনি বলেছিলেন, কাঁটাতারের বেড়াই দুবাংলাকে পৃথক করেছে কিন্তু বিশ্বাসে নয়। নরেন্দ্র মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এটাই শেখ হাসিনার প্রথম সফর। তাই বাংলাদেশী প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির যোগফলের চেয়ে দু’বন্ধু প্রতিম দেশের সৌহার্দর অটুট বন্ধনটাই বেশি কাম্য ছিলো। যে জন্য প্রায় অর্ধশত রকমের দেশীয় উপহার সামগ্রী ও পদ্মার রুপালী ইলিশ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় স্বার্থের কাছে ভালোবাসার পরাজয়।

‘ইংরেজি শেখা হারাম’ আঠারো শতকে মধ্যযুগীয় কোন এক ধর্মীয় পৃষ্টপোষকদের ফতুয়ায় এখনও অন্ধ ২১ শতকের অত্যাধুনিক সিংহভাগ এক জনগোষ্ঠী। এমনই এক গুরুর বচনের মোহে পতিত হয়েছিলাম আমি নিজেও। ছোটবেলা মাদরাসায় পড়তাম। ইংরেজি বই ছিল কিন্তু শেখানোর মত মাস্টার ছিল না। কারণ, তখনও মাদরাসায় ভালো কোন ইংরেজি ভাষার পণ্ডিত আসেনি। তাই, বাধ্য হয়ে ইংরেজি শিখতে পাশের স্কুলের এক শিক্ষকের শরণাপন্ন হতাম। পড়া না পারলে গুরুমসাই বল্লা মারার লাঠি দিয়ে আমাদের পেটাতেন। আর মাঝে মাঝে এই দেশের শাসক ও শোষিতের মাঝে সম্পর্কের চরম অসংগতি দেখে চমৎকার কিছু গল্প বলতেন। একদিনের গল্প ছিল এমন-

“কোন এক হাসপাতালে মুমুর্ষ একজন রোগী ছিল, যার দুরারোগ্য ব্যাধি সারানো ঐ হাসপাতালের ডাক্তারদের সম্ভব ছিল না। তাই বিরক্ত হয়ে রোগীকে মেরে ফেলার জন্যে বড় ডাক্তার বাবু রাতে একটি বিষের সুঁই দিয়ে দিলেন এবং পাশে একটি ডেথ সার্টিফিকেট লিখে রেখে গেলেন। নিয়মানুযায়ী সকালে মৃতদেহ নেয়ার জন্য ডুম কর্মীরা চলে এলো। রোগীকে কোন প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই মৃতের কফিনে তুলে ফেললো। এদিকে রোগী বিষের সুঁই পেয়ে রাতে ভালো হয়ে গেলো। সে কফিন থেকে উঠে ডুম কর্মীদের বুঝাতে চাইলো যে, সে মরেনি। কিন্তু তাঁরা বেচারা রোগীকে আরও ধমক দিয়ে বলল, তুমি কি ডাক্তারের চেয়ে বেশি বুঝো? তুমি রাতে মরে গেছো, তাই বড় ডাক্তার বাবু তোমার ডেথ সার্টিফিকেট রাতেই লিখে গেছে”।

পাঠকরা ভেবেছেন ‘কিসের মধ্যে কি আর পান্তা ভাতে ঘি’ আমি এতক্ষণ শুধুই বকলাম, তাই না? না! সত্যিই না, আমি আমাদের দেশের প্রাত্যহিক রাজনৈতিক মহলের সাধারণ চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করলাম মাত্র। শাসক শ্রেণি মনে করে, দেশের সকল মানুষ মূর্খ ও বোকা। এদের যদি দিন দুপুরকে রাত বলি, এরা তখন রাতই বিশ্বাস করবে। আসলে কি তাই?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সচিবগণ দেশের মানুষগুলোকে তাই মনে হয় ভাবেন। তাঁরা ভারত সফর করে দেশে ফিরে ভারতের সাথে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের সংখ্যা নিয়ে দেশবাসীকে একের পর এক বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দিয়েই যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ৩৫ টি, কিন্তু ভারতের নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকের ভাষ্যমতে, এ সংখ্যা ৩৬টি। সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি কী কী নিয়ে- এই প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্র সচিব হাসতে হাসতে বলেন, ‘এখনও গুণে শেষ করতে পারিনি’। পক্ষান্তরে, দুই পক্ষের চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক বিনিময়ের পর ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র দেশটির গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল এই সংখ্যা ২২ এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও একই সংখ্যা উল্লেখ রয়েছে। এরপর দুই দেশের যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়, তাতেও চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের সঙ্গে ‘বিজনেস ডকুমেন্ট’ মিলিয়ে ৩৪টি দলিল স্বাক্ষরের কথা জানানো হয়। (ঢাকা টাইমস, মঙ্গলবার, ১১ এপ্রিল ২০১৭)

বৃহদাকারে তিনবার সামরিক অভ্যুত্থান ও ২০০৯ সালে বিডিয়ার বিদ্রোহে বিধ্বস্ত আমাদের এই ছোট্ট দেশটি। একে সমর সাঁজে সাজানো এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি সামরিক কেনাকাটায় ৫০ কোটি ডলারের একটি ঋণ সহায়তার সমঝোতা স্মারক সই হয়।যে টাকার অস্র বা সরঞ্জাম যেকোনো রাষ্ট্র থেকেই কেনা সম্ভব।  শীর্ষ বৈঠকে  দু’দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহায়তা বাড়াতে আরও তিনটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।

২২টি চুক্তি ও সমঝোতার বিষয়বস্তুগুলো হলো:
১. ‘বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রূপরেখা’ সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক। ‘কৌশলগত ও ব্যবহারিক শিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে’ ঢাকার মিরপুরের ডিফেন্স সার্ভিস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ ও ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের ওয়েলিংটনে (নিলগিরি) ডিফেন্স সার্ভিস স্টাফ কলেজের মধ্যে সমঝোতা স্মারক। ‘জাতীয় নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও কৌশলগত শিক্ষার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে’ ঢাকার ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ ও নয়া দিল্লির ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের মধ্যে সমঝোতা স্মারক।

২. প্রতিরক্ষা খাতের এই তিন সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের পক্ষে সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ও ভারতের প্রতিরক্ষা সচিব সই করেন।
৩. ‘মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে সহযোগিতার বিষয়ে’ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমঝোতা স্মারকে সই করেন বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) ও ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশনের (আইএসআরও) চেয়ারম্যান।

৪. ‘আণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে সহযোগিতার’ বিষয়ে দুই দেশের সরকারের মধ্যে চুক্তিতে সই করেন বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব এবং ভারতের আণবিক শক্তি বিভাগের সচিব।

৫. পরমাণু নিরাপত্তা ও বিকিরণ নিয়ন্ত্রণে কারিগরি তথ্য বিনিময় ও সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি অথরিটি (বিএইআরএ) ও ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি বোর্ডের (এইআরবি) মধ্যে বন্দোবস্তনামায় দুই সংস্থার চেয়ারম্যান সই করেন।

৬. বাংলাদেশে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিএইআরসি) ও ভারতের গ্লোবাল সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার এনার্জি পার্টনারশিপের (জিসিএনইপি) মধ্যে চুক্তিতে দুই সংস্থার চেয়ারম্যান সই করেন।

৭. তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেক্ট্রনিকসের ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং ভারতের ইলেক্ট্রনিকস ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক।

৮. সাইবার নিরাপত্তা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম (বিজিডি ই-জিওভি সিআইআরটি) ও ইন্ডিয়ান কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিমের (সিইআরটি-ইন) মধ্যে চুক্তি।
বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব ও ভারতের ইলেক্ট্রনিকস ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব এ দুটিতে সই করেন।

৯. বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তজুড়ে বর্ডার হাট স্থাপনের বিষয়ে সমঝোতা স্মারকে সই করেন দুই দেশের বাণিজ্য সচিব ।

১০. বিচারিক ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতায় দুই দেশের সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সই করেন।

১১. ভারতে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা তৈরির কর্মসূচির বিষয়ে সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও ভারতের ন্যাশনাল জুডিশিয়াল অ্যাকাডেমির (এনজেএ) পরিচালক সই করেন।

১২. নৌবিদ্যায় সহায়তার বিষয়ে সহযোগিতা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের নৌপরিবহন বিভাগের সচিব ও ভারতের লাইটহাউস অ্যান্ড লাইটশিপসের মহাপরিচালক (ডিজিএলএল) সই করেন।

১৩. ভূবিদ্যা নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে পারস্পরিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারকে জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাশের (জিএসবি) মহাপরিচালক ও জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (জিএসআই) উপ-মহাপরিচালক সই করেন।

১৪. কোস্টাল ও প্রটোকল রুটে যাত্রী ও পর্যটন সেবায় দুই দেশের সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক ও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস (এসওপি) দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিনিময় করা হয়।

১৫. ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকল রুটে সিরাজগঞ্জ থেকে লালমনিরহাটের দইখাওয়া এবং আশুগঞ্জ থেকে জকিগঞ্জ পর্যন্ত নাব্য চ্যানেলের উন্নয়নে সমঝোতা স্মারক। এই সমঝোতা স্মারক দুটিতে সই করেন দুই দেশের নৌসচিব।

১৬. গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব ও ভারতের তথ্য সচিব স্বাক্ষর করেন।

১৭. অডিও-ভিজ্যুয়াল সহ-প্রযোজনা চুক্তিতেও তারা দু’জন সই করেছেন।

১৮. বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫০ কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা ঋণ সহায়তা সমঝোতা স্মারকে সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সই করেন।

১৯. মোটরযান যাত্রী চলাচল (খুলনা-কলকাতা রুট) নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চুক্তি ও চুক্তির স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরসে দুই দেশে সড়ক বিভাগের সচিব স্বাক্ষর করেন।

২০. তৃতীয় ঋণ সহায়তার আওতায় বাংলাদেশকে সাড়ে ৪০০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার বিষয়ে সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সই করেন।

২১. বাংলাদেশে ৩৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণে অর্থায়নের চুক্তিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার সই করেন।

২২. বিচার বিভাগের সহযোগিতা, সাড়ে চারশ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা, মহাকাশ গবেষণা এবং যাত্রীবাহী নৌচলাচলে স্বাক্ষরিত সমঝোতাপত্রগুলো অনুষ্ঠানে বিনিময় হয়। (যায়যায়দিন)

এই ২২ চুক্তি ও সমঝোতার মধ্যে  চতুর্থ, ১১তম, ১৫তম ও ২১তম চুক্তি-স্মারক দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই বিনিময় করা হয়। (দৈনিক আজাদী)এতোসব বিভ্রান্তির মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী জানান, চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক ৩৫টি। এর মধ্যে ১১টি চুক্তি ও ২৪টি সমঝোতা স্মারক। আর ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে ভারতের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। সচিব বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে এবং বঙ্গবন্ধুর বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও বঙ্গবন্ধুর নামের সড়ক উদ্বোধন দ্বিপক্ষীয় বন্ধুত্তের অনন্য দৃষ্টান্ত।

লেখক: শিক্ষার্থী ও কর্মী নো ভ্যাট অন এডুকেশন

Advertisement

কমেন্টস