হেফাজত ইসলাম বুঝে, ভাস্কর্য আর বাঙালির সংস্কৃতি বোঝে না!

প্রকাশঃ এপ্রিল ১৪, ২০১৭

ইঞ্জিনিয়ার আরিফ চৌধুরী শুভ-

‘ঐতিহ্যের কোনো ইজারা হয় না। বাংলাদেশে স্থাপিত বিভিন্ন মুরাল বা ভাস্কর্য বাঙালির ঐতিহ্যের প্রতীক। যেমন আমি বলবো বাঙালির স্বাধীনতার প্রতীক ‘বঙ্গবন্ধু’। এভাবে কোনটা ভাষার, কোনটা স্বাধীনতার, আবার কোনটা আমাদের আত্মা ও সংস্কৃতির ভাস্কর্য। এসবের দিকে তাকালে আমরা কখনো অশ্রুসিক্ত হই, কখনো হই উদ্যোমী।

কারো কথায় বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মতামত ছাড়া ভাস্কর্য সরানো বা বসানোটা বাঙালি ঐতিহ্য ইজারার সামিল। বাঙালিরা কারো কথায় বা কারো কাছে তাঁদের ঐতিহ্য অতীতে ইজারা দেয়নি, ভবিষ্যতেও দিবে না। কোরআনকে সামনে দাঁড় করিয়ে যারা বিচার বিভাগের সামনে থেকে গ্রীক দেবির ভাস্কর্য সরানোর দাবি করেছেন, তারাই আবার প্রধানমন্ত্রীকে উল্টো প্রস্তাব দিয়েছেন সেখানে কোরআনের ভাস্কর্য বসাতে। ভাগ্যিস তারা রাসুলের ভাস্কর্য’র কথা বলেনি। এটা ভাস্কর্য’র অবমাননার সামিল। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর এপারমেটিভ ইঙ্গিত, অদূর ভবিষ্যতে বাঙালির সকল ঐতিহ্যের উপর ভয়াবহতারই একটা আভাস একেবারে অমূলক না।

তাদের কাছেই আমার প্রশ্ন, কোরআন কি ভাস্কর্য বানিয়ে প্রদর্শন করার জিনিস? কোরআন থাকে পবিত্র স্থান মসজিদে আর ধর্মপ্রাণ মুসলিমের অন্তরে। কোরআন সর্ব শ্রেষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ। কোরআন ন্যায় বিচারের প্রতীক হতে পারে মুসলিমদের বিচারে, কিন্তু অন্যদের বিচারে বাইবেল, গীতা, ত্রিপিটককে উপেক্ষা করবে কিভাবে? তবুও কোরআন কি ভাস্কর্য বানানোর বস্তু? যদি তাই হয়, তাহলে এতদিনেও আপনারা বাংলাদেশের কোন মাদ্রাসার সামনে কোরআনের ভাস্কর্য বানাননি কেন? আপনারাতো সব ধরণের ভাস্কর্য বিরোধী। হঠাৎ কোরআনের ভাস্কর্য’র পক্ষে সাফাই গাইছেন কেন? আজ যারা কোরআনের ভাস্কর্য স্থাপন করতে বলেন, কাল যে তাদের মধ্য থেকে উন্মাদরা রাসুলের ভাস্কর্য বানানোর প্রস্তাব দিবে না, তা কি করে বিশ্বাস করি।

২০১৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর আওয়ামী ওলামালীগ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধব করে দাবি তুলেছেন, বঙ্গবন্ধুর নামের শেষে রহমতুল্লাহি আলাইহি (র.) উচ্চারণ করতে হবে। ২০১৬ সালের মে মাসে আল্লাহ ও রাসুল অবমাননার অযুহাতে নারায়ণগঞ্জে শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে শিক্ষার্থীদের সামনে কান ধরে শাস্তি প্রদানকারী সেলিম ওসমানের পক্ষ নিয়ে হেফাজতের নেতারা বলেছেন, আজকের সেলিম ওসমান হযরত উমরের সমতুল্য এবং এই সময়ের উমর। এই সময়ের বীর। আল মদিনা ইসলামী শিল্পী গোষ্ঠী সেলিম সাহেবকে নিয়ে একখানা ইসলামী গানও বানিয়েছেন। যদিও শেষ পর্যন্ত আদালতের রায় শ্যামল কান্তি ভক্তের পক্ষেই গিয়েছে। সেদিন উমরের সাথে সেলিম ওসমানের তুলনাকারীদের বিরোধিতা করেননি শফি সাহেব কিংবা বাবুনগরীরা। বরং তাঁদের বক্তব্যে তুলনাকারীদের প্রতি জোরালো সমর্থন ছিল। এই হলো ইসলাম লেবাজধারীদের অবস্থা। আমরা ধিক্কার জানাই এই সকল লেবাজধারী অতি মুসলিমদের, যারা রাসুল (সা.) ওমর (রা.), কোরআন এবং ইসলামকে ইসলামের জায়গায় রাখেন না। রাজনীতির মাঠে নিজেদের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেন। শাপলা চত্বরের মাঠ হেফাজত যে রাজনীতি শিখেছে, আজ সেই রাজনীতিরই স্পষ্ট ফসল আদালত ভবনের সামনে থেকে ভাস্কর্য সরানোর হুমকি।

আদালতে কোরআন না থাকলে, আদালতের সামনে কোরআনের ভাস্কর্য স্থাপন করে কি হবে? হেফাজতের বড় হুজুর ‘আল্লামা শফি’, যাঁকে এ সমাজ কদিন আগেও চিনতো না। হঠাৎ তিনি সবার কাছে নারী বিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে, তেতুল তত্ত্বের প্রবক্তা, তেতুল হুজুর নামে পরিচিত হয়ে উঠলেন। হতে পারে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্যে এটি হেফাজতের একটি রাজনৈতিক কৌশল ছিল। তেতুল হুজুরের কাছেই আমার প্রশ্ন, বাংলাদেশ কি আজও কোরআনি শাসনের পক্ষে? নাকি শুধু একটি সংগঠন? এ দেশের স্বাধীনতা কি পাগলিওয়ালারা এনে দিয়েছেন, নাকি মুক্তিযোদ্ধারা? কাওমি মাদ্রাসার সিলেবাসে কি জাতীয় সঙ্গিত পড়ানো হয়? আপনাদের মাঝে বঙ্গবন্ধু, জিয়া, ভাসানী, বেগম রোকেয়া, জাহানারা ইমাম, সেলিনা পারভীন, জহির রায়হান কিংবা রবীন্দ্রনাথ কতটা জীবিত? কয়টা স্থাপত্য, ভাস্কর্য, যান বা প্রযুক্তি আপনাদের ছাত্ররা আবিষ্কার করেছে, নাকি তার সুফল ভোগ করছেন? সব সময় সত্য বলার সাহস কি রাখেন? শাপলা চত্ত্বরে মৃতের সত্য সংখ্যাটা কি আজও বলতে পেরেছেন?

এই সব প্রশ্নের উত্তর শুধু শফি সাহেব কেন, সংগঠনের মহাসচিব জুনায়েদ বাবু নগরীর কাছেও নাই। থাকবে কি করে? কারণ তাঁরাতো কাওমি ছাত্রদের শিখান নারী দেখলে তেতুলের মতো মুখে লালা আসে। অথচ দুদিন আগে তিঁনিই নারীর কাছে এসেছেন বকশিস চাইতে। নারী যে মায়ের জাত ও অর্ধাঙ্গী, সেটি শফি সাহেবদের অজানাই থেকে যায়। হাজার হাজার (প্রায় ৭০ হাজার) কাওমি শিক্ষার্থীদের শুধু আযান দেওয়া আর তাবলীগের বাণী শুনিয়ে কি কাওমি সনদের সম্মান দাবি করা যৌক্তিক? যারা আধুনিক প্রযুক্তিগত শিক্ষার বাহিরে এখনো, এদেশের জাতীয় সংগীত যাদের অন্তরে নাই, তারা কিভাবে সমমূল্য ডিগ্রির দাবিদার? দেখার অপেক্ষায় আছি সরকার কি করবেন?

জমি, নগদ অর্থ, ভবন, সনদ, স্বীকৃতি আর ক্ষমতার জন্যে শেষ পর্যন্ত নোংরা রাজনীতির স্রোতে হেফাজতও ঘা না ভাসিয়ে থাকতে পারলো না। হেফাজতও কুতকুত খেলতে শিখে গেছেন। পুঁজিপতির লোভ তারাও সামলাতে পারেননি। কেউ আবার স্বপ্নের রাজ্যে ঘোষণাহীন মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন। বঙ্গীয় ভোটের রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলো এক সময় স্বৈরাচার এরশাদকে তাসের একমাত্র তুরফ হিসাবে ব্যবহার করতেন। এখন থেকে সেই তুরফ হতে যাচ্ছেন আল্লামা শফি সাহেব ও বাবুনগরীরা। তাই শফি সাহেবরা ইসলামের নামে যত বক্তব্যই দেন না কেন, মানুষের সাদা দিলে আর কাদা লাগবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যে তরুণ প্রজন্ম আজ উদিত, তারাই এই সব খামখেয়ালীর জবাব দেবেন সময়মত।

এটা দ্রুব সত্যি যে, বঙ্গীয়সমাজ সত্যিই পরিবর্তন চায়, কিন্তু সেই পরিবহর্তন কতটা সাম্প্রদায়িক বা অসাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির পরিবর্তন? হেফাজতের সমাজ পরিবর্তন এককেন্দ্রিক ও অনেকটা সাম্প্রদায়িক। এ সমাজ বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন, ইসলাম, বাইবেল, গীতা, আর্ট, মুক্তমত ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিয়েই পরিবর্তিত হতে চায়। সামনে চলতে চায়। বাংলাদেশ এভাবে চলছে বলেই আজ মধ্যবিত্তের দাবিদার। হেফাজতে ইসলাম এইসব চেতনার ষোল আনার পনেরই বিরোধী। বিভিন্ন সময় তাদের বিভিন্ন বক্তব্যই তার প্রমাণ। আমরা সব সময় আমাদের সহযোগী হিসাবে হেফাজতকে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের পোড়া কপাল। শুধু হেফাজত কেন, আজ পর্যন্ত কোন ইসলামিক রাজনৈতিক দলকে বাংলাদেশ পাশে পায়নি। বরং ইসলামের নামে অপশক্তি দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের চেষ্টায় মত্ত ছিল তারা। এদের ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ পাশে পাবো এ আশা ক্ষীণ। বানরের মতো ডালে ডালে লাফিয়ে আমাদের গাছের ফল খেয়ে আমাদের গায়েই খোসা মেরেছে এই দলগুলো। যখনই বাংলাদেশ নিজেকে ধর্ম, বর্ণের উর্ধ্বে মনে করেছে, ঠিক তখনই এই দলগুলো বানর নাচ দেখিয়েছে দেশকে। তখনই বহির্বিশ্বে ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে দেশের। তখনই প্রশ্ন উঠেছে সাম্প্রদায়িকতার। প্রশ্ন উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার। এটাতো দ্রুব সত্য কথা।

আমরা আজ যে হেফাজতকে দেখছি, সেটি ২০১৩ সালের হেফাজত নয়, সেটি হল ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ও শুভাকাঙ্খী রাজনৈতিক হেফাজত। যদিও আওয়ামী নেতারা দাবি করেন, হেফাজতের সাথে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক কৌশলগত (প্রথম আলো ১৪ এপ্রিল ২০১৭)। প্রথমে মনে করেছিলাম অরাজনৈতিক ইসলামী সংগঠন, কিন্তু কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতির মাঠে হেফাজত নিজেদের গায়ে নিজেরাই কাদা মেখেছেন। এবার দেখবো হলি খেলা। পাবলিকের বলতে দোষ কোথায়? এই কলঙ্ক হেফাজত কি আজ অস্বীকার করতে পারবেন? যদিও অনেকে মনে করছেন হেফাজতের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দক্ষতা ও বুদ্ধি ঘুণে ধরা বাঁশের মতো। অপরিপক্ক এই বাঁশ যেকোন সময় জ্বলে উঠতে পারে শাপলা চত্বরের মতো। তখন আবার আাগুন জ্বলবে দেশের শরীর। সেই শঙ্কা থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়তো ১১ এপ্রিল হেফাজতিদের দাবিতে হাঁ সূচক উত্তর দিয়েছেন গণভবনে।

 তখনই বেশি দু:খ হয় যখন অতি মুসলিমরা রাষ্ট্রকে পেছনে টানার যুক্তি দেয়। ৯৭% মুসলমানের দেশ বলে এদেশের আকাশে এই অতি মুসলিমরাই সাঈদীকে চাঁদে দেখতে পেয়েছেন। নিকট ভবিষ্যতে যে তারা আল্লামা শফি সাহেব বা বাবুনগরীকে সূর্য দেখতে পাবেন না, তার নিশ্চয়তা কি? আমরা চাঁদে দেখার দখল সইছি মুমূর্ষ হয়ে, কিন্তু সূর্যে দেখার দখল দেখার আগেই সচেতন হচ্ছি না কেন? আজ সিদ্ধান্ত নিতে যদি ভুল করেন ক্ষমতাসীন দল তাহলে এর মাসুল হয়তো নিকট ভবিষ্যতেই সবাইকেই দিতেই হবে। যেমন ৭১ এ পাকিদের কাছে আমরা মাসুল দিয়েছি ত্রিশ লাখ তাজা প্রাণ ও দুলাখ মা-বোনের ইজ্জ্বত।

 যারা ৭১ এর হেফাজতদের দেখেননি, তারা ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বর দেখেছে। আর দেখছে আজকের হেফাজতকে। পাকিরা রাতের আঁধারে আগুন দিলেও একটি স্বাধীন দেশে হেফাজতিরা আগুন দিয়েছে দিনের আলোতে। ৮ ঘণ্টার হেফাজতি তাণ্ডবে ২০০ শতাধিক গাড়ি পুড়েছে। ক্ষতবিক্ষত হয়েছে মসজিদ, মন্দির, দোকান, নিরীহ মানুষ, পুলিশ এমনকি সাংবাদিকও। কে বাদ গিয়েছেন তাদের ছোবল থেকে? রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে কোটি কোটি টাকা। অথচ আজ তাদের এত কদর সরকারে? সেদিনের বিভীষিকাময় দৃশ্য ও আতঙ্ক রাজনৈতিক দলগুলো ভুলে যেতে পারে নিজেদের স্বার্থে, কিন্তু সাধারণ মানুষ এত তাড়াতাড়ি ভুলে যেতে পারে না।

আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং দৃঢ়বিশ্বাসী মুসলমান। আরো বড় কথা হলো আমি একজন বাঙালি। এ দেশকে আমার রক্তের প্রতিটি ফোটায় ও নিঃশ্বাসে উপলব্ধি করি। কোনটা রক্ত আর কোনটা রং এটা বুঝতে ইসলাম লাগে না। পানি আর জলের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে গীতা আর কোরআনে হাফেজ হতে হয় না। মাদ্রাসার কতজন ছাত্রই জানে যে, জল খাঁটি বাংলা শব্দ আর পানি হিন্দি? বাঙালি সংস্কৃতিতো দূরের কথা মাতৃভাষার মর্যাদাও তাদের কাছে অনেকটা অনুপস্থিত। অথচ কোন সচেতন ব্যক্তি জল বললেই তারা তাঁকে উল্টো প্রশ্ন করেন, আপনি কি হিন্দু? স্বয়ং নিজেই যখন এমন হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি, তখন দু:খ পাওয়ার পাশাপাশি উপলব্ধি করেছি তাদের অজ্ঞতা ও মূর্খতার।

মাদ্রাসায় দীর্ঘদিন খণ্ডকালীন শিক্ষকতার সুযোগে পাগলিওয়ালাদের সাথে মেশার সুযোগ ও জানার আগ্রহ হয়েছে। সম্মান প্রাপ্তিতে আমি কৃতজ্ঞ তাদের কাছে, কিন্তু মাদ্রাসা পড়ুয়া আমারই ভাই বোনদের এক কেন্দ্রিক জ্ঞান অর্জনে সন্তুষ্ট নই। আমার ভাইরাও আমাদের সাথে এগিয়ে যাক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্জনে আমিও এটা চাই। আমি ধর্ম ও বিজ্ঞান জানলে তারা শুধু কোরআন জানবে না কেন? আমি আবিষ্কারক হলে তারা হতে পারবে না কেন? আমি নজরুল রবীন্দ্রনাথকে জানলে তারা শুধু কেন নজরুলকে জানবে? কোথায় নিষেধ বঙ্গবন্ধু, জিয়া, রোকেয়া, জাহানারা ইমাম, জহির রায়হান, সেলিনা পারভীন কিংবা সৈয়দ শামসুল হককে জানতে? রবীন্দ্রনাথ জাতীয় সংগীত লিখেছেন বলে কি তা পড়ানো যাবে না? সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব, মুসলমানের উর্ধ্বে মানুষ এটা সবার ভাবা উচিত। বিজ্ঞান তাঁদের মাঝে যেমন অনুপস্থিত, তেমনি তাঁদের দর্শনও এককেন্দ্রিক মনে হয়েছে আমার কাছে। এক কেন্দ্রিক দর্শন দিয়ে নিজে চলা যায়, কিন্তু অন্যকে এগিয়ে নেওয়া যায় না। হেফাজতিরা ইসলাম বোঝে, কিন্তু ভাস্কর্য আর বাঙালির সংস্কৃতি বোঝে না। বোঝে না বাঙালির মান-অভিমান। এরা কি করে জানবে জল আর পানির পার্থক্য। আমি কার কাছে কই বীরাঙ্গণার গল্প?

৭১ সালে যারা শুধু ধর্মকে সামনে এনে পুরুষের লুঙ্গি খুলে লিঙ্গের আগা কাটা না অকাটা দেখে হত্যা করেছে, তাদের অনুসারীরাই বাংলা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। তারাই আজ ভাস্কর্য সরানোর দাবিতে বাংলাকে উত্তাল করতে চায়। স্বাধীন দেশে দাবি তোলার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের, কিন্তু পেশিশক্তি দিয়ে সেটি পূরণের ইতিহাস এই ৪৫ বছরের বাংলায় অনেক। প্রধানমন্ত্রীর ভাস্কর্য সরানোর প্রশ্নে হ্যাঁ সূচক ইঙ্গিত হয়তো আরো একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে বঙ্গবাসীর কাছে। যারা ৭১ এ পেশি শক্তি দেখিয়েছেন, জুলুম করেছেন, আজ তারা বিচারের কাঠগড়ায় বিড়ালের মতো মাথা নত ও ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ ভিক্ষাতেও বঞ্চিত। এটা মুক্তিযুদ্ধের চেতান ও তরুণ প্রজন্মেরই ফসল। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। আজকের প্রজন্ম যতটা উদার তার চেয়ে বেশি আধুনিক ও সচেতন। তারাই ইতিহাস গড়বে ইতিহাসের জন্যে।

৪৫ বছরের বাংলাদেশে হেফাজত ইসলামের অবদান আমার জানা নাই। হেফাজতের কি জানা আছে? অথচ আজ রাষ্ট্র তাদের হুমকি মনে করছে। কদিন আগেও যারা খাওয়া আর আযান দেওয়া ছাড়া কিছু বুঝতো না, হঠাৎ তারা চিন্তিত বিচার বিভাগের সামনের ভাস্কর্য সরাতে। দেশেতো আরো অনেক অনেক সমস্যা আছে। তারা কেন সেই সব সমাধানের পথ বলেন না। শুধু ভাস্কর্য সরালে কি জাতির কাছে দুধে দোয়া হেফাজত হয়ে যাবেন?

যারা আজ অবধি বাংলা নববর্ষ বুঝে না, তারা কিভাবে বাঙালির আত্মা বুঝবে? তাদের শিক্ষার্থীরাতো শিখে নারী দেখলে লালা কিভাবে আসে জিবে, বিধর্মীদের ঘরে ঢিল মারলে বেহেস্ত পাওয়া যায় ইত্যাদি, ইত্যাদি। কিন্তু সবকিছুর উর্ধ্বে বিধর্মীও যে একজন মানুষ, সেটি কি তারা শিখেন? বাংলা নববর্ষ বাঙালিদেরই নিজস্ব সংস্কৃতি। হেফাজতের কাছে এটা হিন্দি সংস্কৃতি ও ইসলাম বিরোধী। আমি বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে যদি বাংলা সংস্কৃতিই লালন না করি, তাহলে আমার বাঙালিত্বের পরিচয় কি? আমরা ভাত না খেযে চাইনিজ খেয়ে যেমন বাঁচতে পারি না, তেমনি বাংলা সংস্কৃতি ছাড়া বাঙালির আত্মা বাঁচবে কি করে? হেফাজতিরা বাঙালিদের আত্মাকে মাড়িয়ে মারতে চায়, ঐতিহ্যকে মুছে দিতে চায় পোড়া মবিল দিয়ে। ১৪২৪ বাংলা বর্ষবরণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আঁকা দেয়ালচিত্রে পোড়া মবিল ঢেলে দিযেছে কারা?

যে সফি হুজুর বলেছেন, তেতুলের মতো নারীকে দেখলে মুখের লালা ঝরে, সেই শফি সাহেব ১৩ জন সহযোগী নিয়ে দুদিন আগেই ভাস্কর্য সরানো আর কাওমি স্বীকৃতির জন্যে ছুটে গিয়েছেন একজন নারীর কাছে। ভাস্কর্য সরানোর প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, হাইকোর্টের সামনে গ্রিক থেমেসিসের মূর্তি লাগানোর বিষয় তিনি জানেন না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীতো ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্ত্বরের হেফাজাতকে আমাদের চেয়ে বেশি জানেন। নীতির সাথে প্রধানমন্ত্রীতো কখনো আপোস করেননি। কিন্তু হেফাজতে ইসলামের সাথে কি এই প্রথম প্রধানমন্ত্রী আপোস করলেন?

লেখক সাংবাদিক ও উদ্যোক্তা ও সংগঠক, নো ভ্যাট অন এডুকেশন।

তারিখ: ১৪/০৪/২০১৭

কমেন্টস