আমি নিজেকে পথশিশু ভাবতেই ভালোবাসি

প্রকাশঃ মার্চ ২৯, ২০১৭

হাকিম মাহি-

পবিত্র কুরআনের তাফসিরে এসেছে, একদিন আল্লাহ্‌র নবী (সা) কে আল্লাহ্‌ নিজে প্রশ্ন করেছিলেন, “হে রাসুল আপনি আমার কাছে কি হতে চান, সাহায্যকারী নাকি সাহায্যগ্রহীতা? তখন নবী (সা) বলেছিলেন, আমি সাহায্যগ্রহীতা হতে চাই। কারণ, সাহায্য বা উপহার নেওয়ার মাঝে আনন্দ রয়েছে এবং সাহায্যগ্রহীতা অহংকার মুক্ত থাকে”। প্রতিটি ধর্মীয় গ্রন্থে সম্পদশালী মানুষগুলোকে তাঁর নিজ সম্পদের রক্ষিতা বলা হয়েছে এবং রক্ষকের কাজ হল তাঁর নিজ সম্পদের সঠিক ও সুসম বণ্টন করা। কারণ, তাঁর এই সম্পদগুলো প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের রক্তের সমপরিমাণ পরিশ্রমের ফসল। মানবতার প্রথম পদক্ষেপই হচ্ছে কামিনী রায়ের এই বাণীটিকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করা আর প্রাত্যহিক জীবনে তাঁর বহিঃপ্রকাশ ঘটানো-

“পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলই দাও

তার মতো সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও।

আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে

সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।”

হতদরিদ্র বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম নিয়েছি ভেবেই নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করি। ক’জনের ভাগ্যে জুটে দারিদ্র্যতার সাথে লড়াই করে প্রতিযোগিতাময় সমাজে বেঁড়ে ওঠা? আমি দেখেছি এবং বুঝেছি পথশিশু ও পথবাসীদের রোজনামচা(দিনাতিপাথ) কতটা ভয়ংকর দারিদ্র্যতার মধ্যদিয়ে অতিবাহিত হয়। আমার বাবার নাম আব্দুল লতিফ খান আর মায়ের নাম কুলসুম বিবি। ৩ ভাই আর ২ বোনের মাঝে আমি চতুর্থ কিন্তু ভাইদের মাঝে দ্বিতীয়। আমার বড় দুই বোন ও ১ ভাই রয়েছে। বাড়ী শিবচর, জেলা মাদারীপুর, পদ্মা নদীর পাড়ে। বাবা প্রথমে ঢাকায় ‘চাঁদ টেক্সটাইল’ মিলে ৩/৪ হাজার টাকা মাইনে চাকরি করতেন। তিনি ছোট বেলায় মাদ্রাসায় ১/২ ক্লাস পড়েছিলেন, তাই চাকরির পাশাপাশি ঝাড়ফুঁক ও তাবিছ তামার বিক্রি করে ঢাকায় নিজের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। আর মাইনের টাকা আমাদের জন্যে গ্রামে পাঠাতেন।

আমার মনে পড়ে, প্রতিমাসের ৫ তারিখ হলেই আমরা নদীর ঘাটে ট্রলার বা নৌকার দিকে তাকিয়ে থাকতাম, যে বাবা কবে আসবে। কারণ, যে টাকা আমাদের সংসারের খরচের জন্যে দিতেন, তা দিয়ে খাওয়া-পড়া, পোশাক-পরিচ্ছদ কোনটাই ঠিক মতো হত না। আমরা (ভাই বোনেরা) স্কুলে যেতাম খালি পায়ে, টিফিনের জন্যে কানা-কড়িও নিতে পারতাম না। আমার সহপাঠীদের কতকিছু খেতে দেখতাম! আমি অবশ্য খেতাম তবে আমাদের স্কুলে এক মালাইওলার মালাই বিক্রি করে দিলে এক/দুই টাকা দিতো তা দিয়ে বন্ধুদের নিয়ে আনন্দে খেতাম। অনেক দিন পর বাবা আসবে চকলেট, বিস্কুট, কমলা আরও কত কী আনবে! ভাবতেই জিভে পানি এসে যেতো। তাই চেয়ে থাকতাম বাবার পথ পানে। বাবা সবকিছুই অল্প অল্প করে আনতেন, আমরা ভাগাভাগি করে খেতাম। কতটাই না মজার হত!

বাবাকে ঢাকা থেকে নতুন জামা-কাপড় কিনে আনতে বলতাম, বাবা টাকার স্বল্পতায় পুরান জামা-কাপড় নিয়ে চোখের আড়ালে কান্না রেখে বলতেন, ঢাকার সবচেয়ে দামী কাপড় তোমাদের জন্যে এনেছি। আমরাও অল্পতেই খুব খুশি হয়ে যেতাম। মাঝে মাঝে ঈদের সময়ও নতুন কাপড় পেতাম না, পেলেও ঐ শার্ট-প্যান্ট হয় আমাদের মাপের চেয়ে বড় হত, না হয় এতো ছোট হত, যে গায়ে লাগতই না। মায়ের কথা আর কি বলবো, তাঁর এক কাপড়ে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা ও বসন্ত চলে যেতো। ঈদের সময় তো নতুন কাপড়ের কথা ভাবাটাই তাঁর জন্য পাপ ছিল। আমাদের স্কুলে পড়ালেখা করতে কোন টাকা লাগতো না। কারণ, ক্লাসে বরাবরই ভালো ছাত্র ছিলাম। মেধাবী বলে শিক্ষকরা ফ্রি পড়তে দিতেন। ছোট বেলা থেকে আমাদের ভাই বোনদের একটা সাধারণ গুনছিল, আমরা সুন্দর কণ্ঠে গান করতে পারতাম আর কারো সাথে ঝগড়া-বিবাদ করতাম না, তাই সবাই ভালোবাসতো।

আমি বড় হতে না হতেই বাবা চাকরি থেকে অবসরে চলে আসলেন। এমনিতেই অভাবের সংসার আরও বাবার চাকরি নেই। স্কুলে পড়ার আর সুযোগ হল না। কারণ, উচ্চ মাধ্যমিকে পড়তে হলে প্রাইভেট পড়তে হয়, আরও আনুষঙ্গিক অনেক খরচ। তাই পরিবারের সবাই মিলে আমাকে কওমি মাদরাসায় ভর্তি করে দিলেন। মাদরাসাটি অনেক বড় ছিল, এখানে প্রায় চার হাজারের মতো ছাত্ররা পড়াশুনা করতো। আমি বাড়ির সবাইকে ছেঁড়ে ওখানে থাকতে পারতাম না, তাই প্রায় সময় পালিয়ে বাড়ি এসে পড়তাম। এখানেও থাকা, খাওয়ার ও পড়ার জন্যে কিছু টাকা লাগতো। আমি মোটামুটি ভালো ছাত্রই ছিলাম আর বিশেষ করে বাংলা, আরবি, ফারসি ভাষায় অনেক সুন্দর করে গজল পরিবেষণ ও কুরআন তেলাওয়াত করতে পারতাম। কণ্ঠের একরকম যাদুতে সবাই আমাকে একনামেই চিনতো। ধীরে ধীরে মাদরাসার মালিক পক্ষ এতটাই স্নেহ করতে লাগলেন, যে আমাকে এখানেও বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ করে দিলেন।

ছোটবেলা থেকে একটি স্বপ্ন লালন করতাম, যে বড় হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হব। যখন একটু বুঝতে শিখলাম, তখন ভাবলাম কওমি মাদরাসায় পড়ে ম্যাজিস্ট্রেট হওয়া যাবে না। কারণ, এখানে সরকারি কোন সার্টিফিকেট পাওয়া যায় না। তাই, পড়াশোনায় এতো সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বাড়ি থেকে পালিয়ে আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হলাম। এই মাদরাসাগুলো স্কুল, কলেজের সমমান সার্টিফিকেটে। বাড়িতে আর যায়গা হল না, আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব ও লজিন বাড়িতে থেকে পড়তে লাগলাম। কিছু দিন যেতেই বাবা-মা আমাকে বাড়ীতে নিয়ে আসলেন। কিন্তু সমস্যা হল বাড়ীতে থাকবো কোথায়? একটি মাত্র কুঁড়ে ঘর। ছোনের ছাউনি, টিনের ঢালা আর টিনের বেড়া। ঝড়-তুফান আসলে অন্যের বাড়ীতে চলে যেতাম। অনেক রাত পর্যন্ত যদি পড়তে যাই, তবে কেউ ঘুমাতে পারবে না। আর বিদ্যুৎও যেহেতু নাই, বাতিতে এতো তেল কোথায় পাবো? তাই বাধ্য হয়ে বাড়ীর পাশে যে পাঞ্জেগানা মসজিদ ছিল, সেখানে একা একা রাতদিন থাকতাম আর পড়তাম।

এখন আর বাড়ি থেকে টাকা নেই না। টিউশন করি, পদ্মা নদীতে বড় ভাইয়ের সাথে মাছ ধরে বিক্রি করি, আর কাওড়া কান্দি ফেরী ঘাঁট বাড়ীর কাছে থাকায় মাঝে মাঝে হকারি করেও নিজের সকল খরচ যোগাতাম। প্রাইভেট পড়তে অনেক টাকা লাগতো, তাই পড়তে পারতাম না। আমি আমার শিক্ষকদের সাথে কথা বলে তাঁদের বাড়ি চলে যেতাম ফ্রি পড়তে। তাঁরা দিনে তো সময় পেতেন না, তাই তাঁরা আমাকে ভোর ৫ টার আগে তাঁদের বাড়ীতে যেতে বলতেন। আমার বাড়ি থেকে এক শিক্ষকের বাড়ি প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ছিল। তাই এতো সকালে পৌঁছতে হলে আমাকে প্রায় রাত ৩ টার দিকে রওয়ানা দিতে হতো। আমি শেখার জন্যে তাই করতাম। মাঝে মাঝে ভয় হতো, কিন্তু ভয়ের চেয়ে শেখার আগ্রহের মাত্রাটা বেশি ছিল। আমার একটা অভ্যাস ছিল, একটি ক্লাসের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই অন্য ক্লাসের বই পড়ে ফেলতাম। আর নতুন ক্লাস শুরু হলেই আমার ক্লাসের ছাত্রদের প্রাইভেট পড়াতাম।

এভাবে শিক্ষকদের সহযোগিতা, প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন বৃত্তি ও নিজে পরিশ্রম করে পড়াশুনা করে দাখিল বা সমমান এসএসসি পরীক্ষায় A+ পেলাম। মাদরাসার শিক্ষক, শিক্ষার্থী, এলাকার লোকজন, বাবা-মাসহ পরিবারের সবাই মহা খুশি। রেজাল্টের পরের দিন আমাদের থানার সাংবাদিকেরা এসে বাড়ি ভর্তি। দেশের কয়েকটি জাতীয় পত্রিকায় নিউজ হল “মসজিদের আলোতে পড়ে হতদরিদ্র ঘরের ছেলে হাকিম A+ পেয়েছে”। এরপর কত উপহার, কত সাহায্য যে পেলাম তা বর্ণনাতীত। সর্বশেষ, জেলার ডিসি সাহেবও নিজের হাতে আমাকে পুরস্কার দিলেন। এভাবে একই মাদ্রাসা থেকে আলিম বা সমমান এইচএসসিতে A+ পেলাম, তাও আবার আমাদের থানায় সর্বপ্রথম। পরিবার, শুভাকাঙ্ক্ষীদের একটিই চাওয়া, রাজধানী শহরের বড় কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে মানুষের মতো মানুষ হয়ে দেশের সেবা করা।

বাবা ততদিনে বৃদ্ধ বয়সে আর কী করবে, ঘাঁটে বাস টার্মিনালের একটি মসজিদের খাদেম হিসেবে যা মাইনে পায় তা দিয়ে কোন রকম সংসার চলে কিন্তু জীবন চলে না। বাবার অনেক ধনী বন্ধুরাও আমাদের অনেক সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্যে একদিন আমি চলে আসলাম ঢাকায়। অবশেষে ভর্তির সুযোগও পেলাম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু পড়াশুনার সুযোগ পেলাম না। ভর্তি হওয়ার মাস খানেক এর মধ্যে, একদিন রাত ১২ টার পরে গ্রামের বাড়ি থেকে একটি ফোন আসলো, যে আমার বাবা আর পৃথিবীতে নেই। আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। এখন আর কার ভরসায় ঢাকায় থেকে পড়াশুনা করবো? এরপর দু’বছর পড়তে পারিনি। বন্ধুদের ম্যাছের ফ্লরে রাত কাটিয়ে কিছু টাকা যোগাড় করে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। এ সময়ে জীবনে আরও অনেক অমানবিক ঘটনা ঘটে গেছে তা বর্ণনাতীত। এখনও নিজে কাজ করে পড়ালেখা করি, বাড়িতে মা ও ছোট ভাইকে কিছু টাকা পাঠাই।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এমন দুটি মানুষ আমাকে সহযোগিতা করার জন্যে ছায়ার মতো লেগে থাকে, তাঁদেরকে আমি আমার বাবা-মায়ের মতো মনে করি।

পথশিশু, পথবাসী, পতিতা ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষগুলোর ইতিহাস বড় করুণ ও বিচিত্র। কখনও সমাজের শাসকশ্রেণী তাঁদের সুবিধার জন্যে কাউকে বানিয়েছে পথশিশু, পথবাসী এবং ভোগ ও মনোরঞ্জনের সামগ্রী হিসেবে কাউকে করেছে পতিতা। আবার মনস্কামনা শুদ্ধ করার জন্যে শাস্তি পেতে হয়েছে এই শোষিতদেরই। পৃথিবীতে এদের জন্ম যেন আজন্ম পাপ। সভ্যতার গোঁড়া থেকে যখন মানুষ একদিনের খাবার অন্য দিনের জন্য পুঁজি করতে শিখল, তখন থেকেই সমাজে দুটি শ্রেণি; অর্থের কুমির ও পথবাসীদের জন্ম হল। যদি একটি দেশের সকল বিত্তশালীরা তাঁদের অর্থের সঠিকভাবে সুষম বণ্টন করতো তাহলে এই সমাজে আর কোন উঁচু-নিচু, ধনী-গরীব এবং কেউ দশ তলার আর কেউ গাছ তলার মানুষের সৃষ্টি হত না। জীবনের পথ চলায় থাকতো না কোন ভেদাভেদ।

একটা মানুষের বেঁচে থাকার জন্যে কত টাকা চাই, একশো কোটি/দু’শো কোটি বা দশ হাজার কোটি? এর পরেও যখন কোন মানুষ মিলিয়ন/বিলিয়ন কোটি টাকার মালিক হওয়ার মাঝে সুখ খুঁজে, সে আসলে মানুষ নয় বরং সর্বগ্রাসী। সারা পৃথিবীটাও যদি তাঁর নামে লিখে দেয়া হয়, তবুও তাঁর আত্মসাতের পিপাসা মিটবে না। যদিও এ ধনকুবেররা কাউকে সাহায্য করে, শেষ পর্যন্ত অভাবী মানুষগুলোই তাঁদের আত্মপ্রচারের বিজ্ঞাপন হয়ে দাঁড়ায়। ভেব না, মৃত্যুই তোমার সকল তৃষ্ণা মিটানোর জন্যে যথেষ্ট, যদি তোমার সম্পদের সুষম বণ্টন না কর। আসুন সবাই মিলে, ঐ রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষগুলো কেউ আমাদের ভাই আবার কেউ আমাদের বোন, ওদের জন্যে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই। কিন্তু সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ দান করা এবং ভিক্ষা দেওয়া বন্ধ করে বেকার সম্প্রদায়ের জন্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে চির দিনের জন্যে পথশিশু, পথবাসী হওয়ার রাস্তা বন্ধ করি। তা না হলে ওদের জন্যে সকল দান দক্ষিণা মায়া কান্না ছাড়া আর কিছুই হবে না অথবা শুধু বিজ্ঞাপনই হবে। আশাকরি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি মাতৃস্নেহে ভরা পৃথিবী গড়ে তুলা অবশ্যই সম্ভব। মনে রাখবো, “মানবের তরে কাঁদে না যার মন, কে বলেছে মানুষ সে পশু সেই জন”। মানব সেবাই পরম ধর্ম। আর সেই মানবতারই জয় হোক।

লেখক: শিক্ষার্থী ও কর্মী নো ভ্যাট অন এডুকেশন

 

Advertisement

কমেন্টস