“২৩ শে মার্চ শেখ মুজিব ক্যা সাথ আপ ক্যা কেয়া ব্যাত হুয়া হ্যায়”

প্রকাশঃ মার্চ ২৫, ২০১৭

মোঃ মুজিবুল হক-

গৌরব আর অহংকারের মাস এই মার্চ। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলার বীরযোদ্ধারা ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতার লাল সূর্য। স্বাধীনতার এ মাসে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী সেই সকল শহীদদের, যারা একাত্তরে এই দিনে প্রাণ দিয়েছেন।

শ্রদ্ধা জানাই ত্যাগ স্বীকারকারী বীরঙ্গনাদের, অভিবাদন জানাই বীর মুক্তিযুদ্ধাদের। অগ্নিঝরা এ মার্চ মাস মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া আরও যে বিষয়ের কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে পাতায় সমুজ্জল হয়ে রয়েছে, তা হলো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম ও ৭ই মার্চের স্বাধীনতার দিকনির্দেশনার ভাষণ যার মাধ্যমে তিনি যুগ যুগ ধরে অনুস্বরণীয় হয়ে থাকবেন বাঙালি জাতির কাছে।

জাতির জনকের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী দেশবরেণ্য ব্যক্তি ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, যুক্তফ্রন্ট ও প্রাদেশিক পরিষদের এমএলএ শহীদ ডা. জিকরুল হকসহ অত্র শহরের বিশিষ্ট চিকিৎসক শহীদ ডা. সামছুল হক, শহীদ ডা. বদিউজ্জান, শহীদ ডা. ইয়াকুব, শহীদ আয়েজউদ্দিন, শহীদ আইয়ুব হোসেন, শহীদ বাবু তুলশীরাম আগরওয়ালা, শহীদ যমুনা প্রসাদ। শহীদ রামেশ্বর লাল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দেড় শত ব্যক্তিবর্গকে সৈয়দপুর সেনা নিবাসে দীর্ঘ সতেরো দিন নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে ১২ই এপ্রিল রংপুর নেসবতগঞ্জ বালার খাল বধ্যভূমিতে নিয়ে যেয়ে নির্মমভাবে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে। ঘটনা চক্রে অলৈকিক ভাবে তিনজন প্রাণে বেঁচে যান, তাঁরা হলেন নারায়ণ প্রসাদ,কমলা প্রসাদও মিন্টু নামে একজন ছাত্র।

স্বাধীনতার পর কমলা প্রসাদ ধর্মন্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন এবং নাম রাখেন মোঃ কামাল আহম্মেদ। তার নিকট হতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী শত অত্যাচার-নির্যাতন এবং মৃত্যু হতে ফিরে আসা লোমহর্ষক ঘটনাগুলি আমার নিকট বর্ণনা করে। সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হন ডা. জিকরুল হক। হানাদার বাহিনী তাঁর উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে নতুন প্রজন্মে নিকট কিছু স্মৃতি তুলে ধরছি।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট রাজনৈতিক সহকর্মী শহিদ ডা. জিকরুল হক ৭ই মার্চে স্বাধীনতার দিক নির্দেশনা পেয়ে দিন রাত রোগী দেখার সময় না পেয়ে তাঁর ডিস পেনসারিতে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য ছাত্র-যুবককে সংঘঠিত হয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলেন। এরমধ্যে ২৩শে মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওয়ার্লেসের মাধ্যমে সৈয়দপুর শহরের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন বিকাল চার ঘটিকার সময়। ২৬শে মার্চ দশ ঘটিকার পর নিজ বাসভবন থেকে ডা. জিকরুল হকসহ শহরের অন্যান্য চিকিৎসকবৃন্দ, চাকুরীজীবী, ব্যবসায়ী, ছাত্র, যুবক ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য সহ দেড়শত ব্যক্তিবর্গকে আটক করে।

পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনী ক্যাপ্টেন গুল ও মেজর জাভেদ ডা. জিকরুল হকের নিকট জানতে চায়, “২৩শে মার্চ শেখ মুজিব ক্যা সাথ আপ ক্যা কেয়া ব্যাত হুয়া হ্যায়”? এই কথা জানার জন্য হানাদার বাহিনী ডা. জিকরুল হকের উপর অমানুসিক শারীরিক নির্যাতন চালায় এবং এক পর্যায় রাইফেলের বাট দিয়ে হাঁটু ভেঙ্গে দেয় এবং মাথায় আঘাত করার ফলে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তার উপর অত্যাচার দেখে অন্যান্য বন্দীগণ হানাদার বাহিনীকে বলতে থাকেন, “আপ লোক ডাক্তার চাচা কোঁ ম্যাঁত মারো, আপ লোক হ্যাম লোক কে এক স্যাথ গুলি ক্যার দো”।

জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর ডা. জিকরুল হক বলেন, “মানুষ একবারেই মরে। তোমরা সবাই ধৈর্য ধারণ কর। তোমরা ভয় পেয়োনা আজ হোক কাল হোক এদেশ স্বাধীন হবেই। আমি না পারি, আমার ছেলেরা না পারুক ভবিষ্যৎ বংশ ধরেরা তো স্বধীনতার সুফল ভোগ করবে।”

১২ই এপ্রিল মৃত্যুর পূর্বে কোন এক দিন হানাদার বাহিনীর মেজর জাভেদ ডা. জিকরুল হক কে পাকিস্তানের পক্ষে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তান রক্ষা জন্য বিবৃতি প্রদান করলে তাকে পঞ্চাশ থেকে এক লক্ষ টাকার মত লাভ দেখান এবং তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানান। ডা. জিকরুল হক ঘৃণা ভরে মেজর জাবেদের প্রস্থাব প্রত্যাখান করে বলেন, “আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না, আমি বেঈমান হয়ে মৃত্যু বরণ করতে চাই না।”

রংপুর নেসবতগঞ্জ বালার খাল বধ্যভূমিতে প্রায় চার-পাঁচ হাজারের মত ব্যক্তিবর্গ শহীদ হয়েছেন। আজ আমরা গণকবরটি রক্ষার অনেক চেষ্টা করেও গণকবরটি রক্ষা করতে পারলাম না। উক্ত গণকবরের উপর দাঁড়িয়ে আছে জনৈক্য পাকিস্তানী প্রেতাত্মার বাস ভবন ‘রেহনা ভিলা’।

ডা. জিকরুল হক অত্র শহরের অন্যান্য চিকিৎসক, বুদ্ধিজীবী-ছাত্র, শিক্ষক, হিন্দু, মারওয়ারী ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টর সদস্য সহ দেড়শত ব্যক্তিবর্গকে ১২ই এপ্রিল ব্রাস ফায়ার করে হত্যা করে। স্বাধীনতার জন্য যাঁরা হাসি মুখে প্রাণ দিয়ে গেলে আমরা ৪৬ বছর পরেও ও শহীদদের শেষ স্মৃতি চিহ্নটুকু ভবিষ্যৎ প্রজন্মে নিকট তুলে ধরতে পারলাম না।”

মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশ মোতাবেক দেশের যে সমস্ত বধ্যভূমিতে (গণকবরগুলো) বসতবাড়ি নির্মাণ এবং দখল হয়েছে, সেইগুলো উদ্ধারের জন্য কোর্টের রায় বাস্তবায়নেয় সরকারের দৃঢ় বলিষ্ট ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাচ্ছি।

২৫শে মার্চ গণহত্যা দিবস মহান সংসদে পাশ হওয়ায় মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, স্পিকার ও সকল সংসদ সদস্যকে আন্তরিকভাবে অভিনন্দন জ্ঞাপন করছি। সাথে সাথে নেসবতগঞ্জ বালার খাল (গণ-কবরটি) রক্ষার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

লেখক: শহিদ ডা. জিকরুল হকের পুত্র

Advertisement

কমেন্টস