‘২১ ফেব্রুয়ারি গুলি চালানোর পর থেকে ভাষা আন্দোলনের মূল কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ালো মেডিকেল হোস্টেল’

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৭

ছবি- মাজেদুল হক তানভীর

ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক। ৪ জানুয়ারি ২০১৭ সালে তাঁর নিজ বাসায় বিডিমর্নিং এর মুখোমুখি হন। ভাষা আন্দোলন, ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনসহ ৭০ পর্যন্ত বিভিন্ন আন্দোলন, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নেন বিডিমর্নিং এর হেড অফ নিউজ ফারুক আহমাদ অারিফ ও ক্যামেরায় ছিলেন মাজেদুল হক তানভীর। ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর দুই পর্বের সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব আজ প্রকাশিত হলো।

ফারুক আহমাদ আরিফ: স্যার, কেমন আছেন?
আহমদ রফিক: বলতে হয় আমি ভালোই আছি।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনি শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বসম্পদ। কারণ বিশ্বে একমাত্র একটি আন্দোলন যা ভাষাকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হয়েছিল। আপনি তার একজন সংগঠক, নেতৃত্ব স্থানীয় ব্যক্তি। আপনাদের পেয়ে আমরা ধন্য, বিশ্ববাসী আপনাদের কাছে ঋণী। স্যার, আমরা আপনার শৈশব, কৈশর সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।

আহমদ রফিক: ১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার শাহবাজপুর গ্রামে আমার জন্ম। ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত গ্রামেই আমার শৈশব কেটেছে। গ্রামীণ অভিজ্ঞতা, পাঠশালার পাঠ্যক্রম, আমাকে বিশেষ করে প্রভাবিত করেছিল আবহমান বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। যা এখন বোধহয় নেই। সবকিছু অর্থাৎ গাছপালা, নদী, মাটি, প্রকৃতি, শস্যক্ষেতের নানা রঙ এসব কিছু মিলিয়ে। আমি পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। আমার দেড় বছর বয়সে বাবার মৃত্যু হয়। এসব প্রাকৃতিক পরিবেশে পিতৃহীন বালকের মধ্যে একটি একাকিত্ববোধ তৈরি হয়েছিল। ১৯৩৭ সালে বড় ভাইয়ের কর্মস্থল যশোরের নড়াইলে চলে গিয়েছিলাম। এটি ছিল চিত্রা নদীর ধারে গাছ-গাছালী, পাখপাখিতে ভরা রাজনীতি-সংস্কৃতির প্রধান শহর। সেখানে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ১০ বছর স্কুলজীবন কাটাই। জাগতিক ও প্রাকৃতিক দুই পরিবেশের কারণে সাহিত্য তথা বইপড়া-লেখা, রাজনীতি এই দুই দিকে আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল।

ফারুক আহমাদ আরিফ: বইপড়া কি আপনাদের পারিবারিকভাবেই ছিল?
আহমদ রফিক: হ্যাঁ, মোটামুটিভাবে। কারণ বড় ভাই বইয়ের পোকা ছিলেন, গল্পের বইপড়ার। তৎকালীন নামকরা করা পত্রিকা প্রবাসী, ভারতবর্ষ ইত্যাদি মোটা মোটা বাইন্ডিং করা বলিউমগুলো তিনি পড়তেন। আমার বেশ মনে আছে। আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। তখন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দেড় মাস বিছানায় ছিলাম। ক্লোরিন ট্যাবলেট ও সাগুবালি খাওয়া। ওই সময় ঐ মোটামোটা বলিউমগুলো পড়া। আর বয়সের তুলনায় একটু পাকাই বলতে পারেন কেননা তখন বঙ্কিম চন্দ্র, হেমচন্দ্র, মধূসুদন তাদের কাব্যগ্রন্থগুলো পড়ে ফেলি। মেঘনাদবধের বহু অংশ তখন আমি মুখস্ত করে ফেলি। রবীন্দ্রনাথের সাথে আমার পরিচয় তার গোরা বইটি থেকে। আমরা দুই বন্ধু রথের মেলায় গিয়েছিলাম। এস এম সুলতানের রুপগঞ্জে। সেখানে আমরা দুই বন্ধু গোরা ও নৌকাডুবি কিনলাম একজন আরেকজনকে বই উপহার দেওয়ার জন্যে। আমার ভাগ্যে পড়ে গোরা বইটি। সেখানে একটি জিনিস আমাকে আকর্ষণ করেছিল। গোরা জৌগসপুরের নীলকুঠি নায়েব ও বিদ্রোহী কৃষক সরদারের ছেলে তমিজ নাপিতে ঘরে গোরা বড় হচ্ছে। গোরা প্রথম দিকে বিষণ হিন্দুত্ববাদী ছিল। ওইখানে গিয়ে তার মোহভঙ্গ হয়। এসব ঘটনার পরিপেক্ষিতে স্কুলের লাইব্রেরি থেকে বই পড়া। এখন ছেলে-মেয়েরা বইপত্র পড়ে কিনা, আমাদের সময়ে অনেক গোয়েন্দা সিরিজের বই ছিল। আমরা প্রচুর বই পড়তাম।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আমরা মাসুদ রানা পড়তাম।
আহমদ রফিক: আপনারা মাসুদ রানা পড়তেন। গয়েশ্বর হরির উপন্যাস মালা, গয়েস্বর সিরিজ, হেমন্দ্র কুমারের বই আমরা পড়তাম। এসবের পাশাপাশি সিলেক্টেট পয়েমস অব শেলি অ্যান্ড ওমর খৈয়ম পড়ে আমি খুব অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। ওমর খৈয়মের চতুষ্টপদ আমার ভিষণপ্রিয়। এটি অনুবাদ করেছিলেন কান্দি চন্দ্র ঘোষ, নরেন্দ্র চন্দ্র ঘোষ। বুক মানে পকেট সাইজের বই। এটির ভূমিকা লেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বড়টির ভূমিকা লেখেছিলেন প্রমথ চৌধুরী।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আচ্ছা স্যার, তখনতো আব্বা-আম্মারা এত টাকা-পয়সা ছেলে-মেয়েদের দিতেন না। আপনা কীভাবে বইগুলো কিনতেন?
আহমদ রফিক: না, এটি স্কুল লাইব্রেরি থেকে আনা।

ফারুক আহমাদ আরিফ: ও আচ্ছা।
আহমদ রফিক: বইটি আনতে গেলে লাইব্রেরিয়ান আমাকে বইটি দিতে ইতস্তত করলেন। তার চিন্তা হচ্ছে নাইনের একটি ছোট ছেলেকে কিভাবে এই বইটি দেওয়া যায়?

মাজেদুল হক তানভীর: এত কম বয়সের হ্যাঁ?
আহমদ রফিক: হ্যাঁ। স্কুলে ফাস্টবয় হিসেবে আমার খুব সুনাম ছিল। তখন সেখান দিয়ে মাস্টার মশাই যাচ্ছিলেন। মাস্টার মশাই লাইব্রেরিয়ানকে বললেন বইটি দিয়ে দাও, দিয়ে দাও। ওমর খৈয়মের দার্শনিক প্রশ্নগুলো মানুষের জন্ম-মৃত্যু, কেন আসা, কেন যাওয়া ইত্যাদি। এগুলো এখনো আমার কাছে প্রশ্নবোধক। এসব নিয়ে দার্শনিকদের নানা মত আছে কিন্তু কোন উত্তর এখনো মিলেনি।

IMG_7169

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনি রবীন্দ্র গবেষক। বলা হয় রবীন্দ্রনাথ শেখ সাদীর বা ইরানী সাহিত্যে-সংস্কৃতিতে অনেকটা ঝুঁকে গেছেন। এটি কতটুকু সত্য?
আহমদ রফিক: না, এটা সত্যইতো। কারণ হলো ঠাকুর বাড়ীর যে সংস্কৃতি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নাতির বইয়ে লেখেছেন যে, তাঁর বাবা হাফিজের গজল অসম্ভব পছন্দ করতেন। সুফি সাহিত্য নিয়ে দেবেন্দ্রনাথের খুব আকর্ষণ ছিল। আর রবীন্দ্রনাথের ছিল তরুণ বয়সে মানে কৈশর বয়সে বৈশব পদাবলী। বৈশবপদাবলী তার সারা জীবনকে প্রভাবিত করেছিল। তাদের এক ইশ্বরবাদী ব্রাহ্মণধর্মের সঙ্গে মিল রেখে সুফি সাধনা পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ যখন শিলাইদহে আসলেন সেখানে বাউল সাধনা এগুলো প্রায় একই ধারারই মোটামুটি। এক ইশ্বরকে গ্রহণ করেও তাকে মানবিক চরিত্র দান করা। এই সহজিয়া চেতনা তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। সে হিসেবে এটি রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও ছিল। শিলাইদহে এসে গগণ হকারের গান ‘আমি কোথায় পাবো তারে/আমার মনের মানুষেরে’ বাউল গান শুনে অভিভূত হন। পরে তিনি বাউল গান সংগ্রহ করে প্রবাসী পত্রিকায় ছাপলেন। স্বদেশি গান। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা পালন করলেন। প্রতিবাদী ভূমিকা। তখন তিনি অনেকগুলো স্বদেশি গান রচনা করলেন। তার মধ্যে বাউলঙ্গনের গান। তার মধ্যে বিশেষ করে ‘আমার সোনার বাংলা’ও একটি বাউলাঙ্গনের গান। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু সহজিয়া সাধনার দিকে আকর্ষিত হয়েছিলেন। এ জন্যো তাঁর ভক্তিবাদ মানবিক চতেনায় সমৃদ্ধ। এখানে তিনি তার অনেকগুলো গানে ও কবিতায় বলেছেন ‘আমার নইলে ত্রিভূনেশ্বর তোমার হতে দেয় মুছে’ অর্থাৎ ত্রিভূবনেশ্বর অনেক উপরে নয় মাথার খুব কাছাকাছি। তার সাহিত্য সৃষ্টি ও সংস্কৃতিক জীবনের একটি বড় ত্রিভূজ। তার শিকড়ে যদি ইশ্বর থাকেন তার পাশে মানুষ ও প্রকৃতি। তারমধ্যে মানুষ-প্রকৃতি-ইশ্বর এই তিনটির মধ্যে সংমিশ্রণ। তার গীতিমাল্য গীতালী এই পর্বের ভক্তিবাদী পর্ব ১২, ১৩, ১৪ এখানে প্রচুর ভক্তিমূলক গান রয়েছে। এখানে প্রচুর বহু গান আছে যা ইশ্বর প্রধান, মানুষ প্রধান।

ফারুক আহমাদ আরিফ: রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে ছিলেন। এই অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে তিনি কি ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন?
আহমদ রফিক: শিক্ষাব্যবস্থা তিনি এখানে কোন করেননি। করেছেন শান্তি নিকেতনে ‘বিশ্ব ভারতী’। সেখানে স্কুল, বর্ডিং। সেই স্কুলকে ১৯২২ সালে বিশ্ব ভারতী। এখানে বিশ্বের সব শিক্ষা-সংস্কৃতিবানরা আসবে মিলিত হবে। এখানে (শিলাইদহে) তিনি করেছিলেন গ্রাম উন্নয়ন পল্লি পুনর্গঠন। তারমধ্যে ছিল অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর সমাজ, সেই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সংস্কৃতি চর্চা। শিলাইদহে শুরু করলেও নানা কারণে সেটি পতিসরে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে ৮০ শতাংশ মুসলমান ছিল। এটি করতে গিয়ে তিনি দুটি জিনিস হাতে নিলেন। তারমধ্যে একটি সমবায় আন্দোলন আরেকটি গ্রামের দারিদ্র বিমোচনে ক্ষুদ্র ঋণ সহায়তা। আজকে যা ড. মো. ইউনূস সাহেব করেছেন।

ফারুক আহমাদ আরিফ: এটি তিনি এত আগে শুরু করেছিলেন?
আহমদ রফিক: ১৯০৫ সালে তিনি কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কৃষকদের ধার দিয়েছেন নামে মাত্র লাভ নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে এসে গ্রামের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে সময় কাটাতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেননি। গ্রামের দারিদ্র কমানো, স্বনির্ভর করার জন্যে তিনি এসব করেছিলেন। ১৯০৪ সালে তিনি স্বদেশি সমাজ প্রবন্ধে তিনি এসব ‘অবস্তুর ব্যবস্থা’ সব আছে। ১৯০৮ সালে পাবনায় কংগ্রেসের সম্মেলনের সভাপতির ভাষণে গ্রাম উন্নয়নের বিষয়গুলো বলেন। তিনি বলেছিলেন গ্রাম পড়ে আছে মধ্যযুগে, আর শহ আধুনিক যুগে। অনেক ব্যবধান। দারিদ্র কমিয়ে আনা। এখনো তো দারিদ্রও বিমোচন বলছে এটি আসলে দারিদ্র হ্রাস। কারণ এখনতো দারিদ্র আছে। বিমোচন তো হচ্ছে না, হ্রাস পেলে তো শ্রেণিবৈষম্য কমে যেত কিন্তু এখন তা কমেনি।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনার শিশুকাল। আপনার দূরন্তপনা কেমন ছিল?
আহমদ রফিক: আমি খুব শান্তশিষ্ট ছেলে ছিলাম। দূরন্তপনা ছিল না। খেলাধুলা করতাম ব্যাটমিন্টন, ফুটবল। মূলত আমার ঝোঁক ছিল বইপড়া। শুনলে অবাক হবেন সেই বয়সে আমি একটি গোয়েন্দা উপন্যাস লেখে ফেললাম। এত বেশি গোয়েন্দা উপন্যাস পড়ার ফলাফলেই হয়তো এটি লেখতে সক্ষম হয়েছিলাম এবং সেই দেব সাহিত্য কুটির (প্রকাশনী) পাঠিয়ে দিলাম। কিন্তু সেই বয়সের এতটুকু ছেলের এই জ্ঞান ছিল না যে, কোন পা-লিপির দুই পৃষ্ঠায় লেখতে নেই।

মাজেদুল হক তানভীর: ও আচ্ছা।
আহমদ রফিক: হাসি।

IMG_7159

ফারুক আহমাদ আরিফ: তখন আপনি কোন ক্লাসে স্যার?
আহমদ রফিক: তখন আমি ক্লাস এইটে না ক্লাস নাইনে, নাইনে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: ওই বয়সে আমরা একটি বই পড়লে তার চরিত্রগুলো নিজের মধ্যে কল্পনা করতাম। মানে নায়ক নায়ক একটি ভাব চলে আসতো। আপনাদের বেলায় এমন একটি চিন্তা আসতো কিনা?
আহমদ রফিক: না, সেটাতো বটেই। আমার স্কুল জীবন শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলাম অভিবক্ত বঙ্গে। শতকরা ৮১ মার্কস নিয়ে পাস করেছিলাম। মেধা তালিকায় নাম এসেছিল। তারপর দেশভাগ হলো। আইএসসি পড়লাম মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে। সেখানেও স্ট্যান করেছিলাম। মেধা তালিকায় ১৮ তম হয়েছিলাম। মুন্সিগঞ্জে থাকাবস্থায় ১৯৪৮ এর ভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম। সেখানে দেড় বছরে আমি মার্কসবাদী সাহিত্য পড়ে ফেলি। আমার শিক্ষক রবীন্দ্র পোদ্দারের কাছ থেকে বামপন্থী সাহিত্যগুলো পড়ি। সেই সময় প্রচুর বই পড়ি। ১৯৪৯ সালে ঢাকায় আসি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যামিস্ট্রিতে ভর্তি হওয়ার কথা ছিল। ঢাকা মেডিকেলেও নাম ছিল। পারিবারিক কারণে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলাম। অনেকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও। সেখানে গিয়ে আমার তেমন খারাপ লাগেনি। সেখানে গিয়ে দেখি মেডিকেলের ছাত্ররা ডাক্তারি বই পড়ার চেয়ে সাহিত্য, সংস্কৃতি নাটকের বই পড়ছে। নৃত্য, নাটক, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অসম্ভব আসক্ত। ২০টি ব্যারাক (ছাউনি) ছিল। আমি ২০ নম্বর ব্যারাকের ৬ নং রুমে থাকতাম। সেখানে গিয়ে সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা হলো ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। সেই ভাষা আন্দোলন ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেছিলাম। তার আগে কলেজজীবনে ১৯৪৮ সালেও অংশ নিয়েছিলাম। আমার স্কুলজীবন থেকে দুইজন ব্যক্তিকে রাজনৈতিকজীবনে প্রাধান্য দিয়েছি। একজন কবি কাজী নজরুল ইসলাম অপরজন নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসু। দুজনই বিপ্লোবীধারার মানুষ। কাজেই এখানে স্বভাবই আমি সেই রাজনৈতিক ধারায় যুক্ত হলাম। যেহেতু আমি ইতিপূর্বে পাকিস্তানে কোন রাজনীতি করিনি, ছাত্র রাজনীতিও করিনি। ঢাকায় এসে বামপন্থী ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছি। এর পরিপেক্ষিতেই ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনে সার্বিকভাবে অংশগ্রহণ। সাংগঠনিক কাজ করা, ঢাকা অপেন্দ কলেজেবন্ধুদের সাথে যোগাযােগ রাখা, মিডফোর্ড স্কুলে বামপন্থী ছাত্র সংসদের সাথে যোগাযোগ রাখা। নানা সাংগঠনিক কাজে ভাষা আন্দোলনের সময়টা গেছে। তার সাথে গেছে ১৯৫৩-৫৪ সালের…।

ফারুক আহমাদ আরিফ: যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন?
আহমদ রফিক: যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে আমরা ছাত্ররা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেছিলাম। শুধু আমি নই সব ছাত্রই অংশগ্রহণ করেন। একটি ঘটনা আপনাকে আমি বলবো-ফজলুল হক সাহেব খুব তালবাহানা করছিলেন। তিন প্রধানকে দিয়েই তো যুক্তফ্রন্ট? হক, ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী। গাজীউল হক, সাঈদ আতিকুল্লাহ, আনোয়ারুল হক। আমরা সবাই মিলে ভোরবেলা, একেবারে খুব ভোরবেলায় ফজলুক হক সাহেবের বাড়ি ঘেরাও করলাম। আমাদের চিৎকারে এবং স্লোগানে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। বেরিয়ে এসে তিনি তার যাদুকরি সেই ভাষণ যা সব সময়কার। সেই ফিস ফিস ভাষণ যা দিয়ে তিনি বাংলার কৃষকদের অভিভূত করেছিলেন। আমাদের বুঝিয়ে বললেন আমি এই এই তোমরা বাড়ি যাও ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর অবশ্য তিনি এলেনও। আরেকবার মন্ত্রিসভা গঠনের সময়, তার ভাগ্নে নান্না মিয়াকে মন্ত্রী করছেন এটার প্রতিবাদ করতে গিয়েছিলাম। যুক্রফ্রন্ট বিজয়ের পিছনে মওলানা ভাসানী কথাটা বলতেন। আমাদের মেডিকেল হোস্টেলের খাবারের খুব সুনাম ছিল। খিস্তিগার, তোদের হোস্টেলে নেতাদের খাওয়ালে ভালো হয়। আমরা তিন প্রধানকে একসাথে নিমন্ত্রণ করলাম খাওয়ার জন্যে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: তখন এত বড় নেতারা আপনাদের ছাত্রদের কাছাকাছি চলে আসতেন?
আহমদ রফিক: আমাদের হোস্টেলে আসেনি এমন কোন নেতা নেই।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আচ্ছা, আচ্ছা।
আহমদ রফিক: ফজলুল হক সাহেব, ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান, গাজিউল হক, খন্দকার মুশতাক থেকে শুরু করে কে না?

ফারুক আহমাদ আরিফ: তখন এত ব্যবধান ছিল না।
আহমদ রফিক: ব্যবধানের জন্যে না। আমাদের মেডিকেল হোস্টেলের ছাত্ররা খুব রাজনীতি প্রধান ছিল। যেমন সংস্কৃতি চর্চা তেমনি পড়াশোনা এক বছর, দুই বছর ডেফার করতেছে। সংস্কৃতি চর্চা, কবিতা লেখা, পত্রিকা বের করা, নাটক মঞ্চ, আর রাজনীতি ইত্যাদি।

'২১ ফেব্রুয়ারি গুলি চালানোর পর থেকে ভাষা আন্দোলনের মূল কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ালো মেডিকেল কলেজ হোস্টেল'

তানভীর: এ জন্যে হয়তোবা ভাষা আন্দোলনে মেডিকেলের ছাত্রদের বেশি সম্পৃক্ত ছিল?
আহমদ রফিক: বেশি ছিল। আর সেই জন্যে ২১ ফেব্রুয়ারি গুলি চালানোর পর থেকে ভাষা আন্দোলনের মূল কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ালো মেডিকেল কলেজ হোস্টেল। এখানে আব্দুল মতিন, অলি আহাদ, এমাতুল্লাহ, জাহিদী স্থায়ীভাবে থেকে আন্দোলন পরিচালনা করেছে। যতদিন তাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি না হয়েছে। ওই আমন্ত্রিত হয়ে ভাসানী, ফজলুল হক সাহেব খুব খাওয়া-দাওয়া করলেন। প্রচুর। আস্ত রোস্ত, পাকা রুইয়ের রেজেলা, পাকা আম, প্রাণহরা এবং দই। হক সাহেব খাওয়া-দাওয়া করে চলে গেলেন। সোহরাওয়ার্দীকে পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি নিয়ে আপনি কি মনে করেন? তিনি রাগ-টাগ করে চলে গেলেন। মওলানা ভাসানী খানিকক্ষণ থেকে একটি বক্তব্য রাখলেন যে, যুক্তফ্রন্টের বিজয় ছাত্রদের বিজয়, সাধারণ মানুষর, শ্রমিক-কৃষকের বিজয়। আধা ঘণ্টা বক্তৃতা দিলেন। তিনি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির বিরুদ্ধে ছিলেন। ১৯৫৭ সালে যেটা নিয়ে আওয়ামী লীগ ভাগাভাগী হলো টাঙ্গাইলের কাগমারী সম্মেলনে। এসব রাজনৈতিক মাধ্যমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৪ সালের ৩০ শে মে যখন ৯২ ক ধারা জারি হলো, ইস্কান্দার মির্জার গভর্নরি শাসন শুরু হলো। তখন মেডিকেলে একমাত্র আমার নামে হুলিয়া জারি হয়। ৩০ শে মে, হোস্টেল ছাড়লাম মাঝরাতে। আমার ফাইনাল পরীক্ষার বাকী ছিল মাত্র এক মাস।

ফারুক আহমাদ আরিফ: ৫৭ তে স্যার?
আহমদ রফিক: ৫৪, ১৯৫৪ সালের ৩০ শে মে। তো দেড় বছরের মতো আত্মগোপনে থাকার পর যাকে আন্ডারগ্রাউন্ড বলি আমরা। পরে এসে অনেক কষ্টে ভর্তি হতে দেবে না। তারপর ভর্তি-টর্তি হয়ে, পরীক্ষা দিয়ে বেরুনের পর ইন্টার্নিশিপ। ইন্টার্নিশিপও দিল না। আমি অনেক রাগ করে! সরকারি চাকরিও হবে না জানি। তখন ডাক্তারি ছেড়ে দিলাম।

 

Advertisement

কমেন্টস