মাননীয় মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যকে অভিনন্দন

প্রকাশঃ জানুয়ারি ৫, ২০১৭

ফারুক আহমাদ আরিফ-
‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেয়ার জন্য শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ওবায়দুল কাদের।’ মন্ত্রী মহোদয়ের এই উদ্যোগী বক্তব্যটি আমাদের আশান্বিত করেছে।

গত ৪ জানুয়ারি অপরাজেয় বাংলার সামনে ছাত্রলীগের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর র‌্যালির উদ্বোধনীতে তিনি বলেন, আমি আবারো শিক্ষামন্ত্রীকে বলব, ক্যাম্পাসে যদি গণতন্ত্রচর্চার একটা সুন্দর চমৎকার পরিবেশ গড়ে তুলতে চান, তাহলে ঢাকসুসহ সকল ছাত্র সংসদের নির্বাচন দেয়ার ব্যবস্থা করুন। ২৫ বছর ধরে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে আছে সকল ছাত্র সংসদ’ (দৈনিক ইনকিলাব- ৫ জানুয়ারি-২০১৭)। আমরা মাননীয় মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

আমরা দীর্ঘ ৩ বছর যাবত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র সংসদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছি। ২০১৪ সালে স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের কো-কারিকোলার এক্সিকিউটিভ শিক্ষক জয় আতিক স্যারের কাছে আমরা প্রথম দাবি উত্থাপন করেছিলাম। তারই ধারাবাহিকতায় ‘Sub All Event Activities’ নামের ফেসবুক পেজ খুলে সেখানে সবগুলো ক্লাবের সদস্যদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার চেষ্টা শুরু। তখন স্টেটের কোন কর্মসূচি বা নিউজ করলে আমরা সেখানে তা শেয়ার করতাম। সেই থেকে কাজ শুরু। মাঝখানে বিষয়টি নিয়ে আর কাজ করা সম্ভব হয়নি। ২০১৫ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যায়লয়, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীদের যাবতীয় ব্যয়ভারের ওপর প্রথম ১০ এবং পরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রতিবাদে আমরা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ি। নো ভ্যাট অন এডুকেশনের দীর্ঘ ৪ মাসের আন্দোলনে ১৪ সেপ্টেম্বর সরকার উচ্চশিক্ষায় ভ্যাট প্রত্যাহার করে সুন্দর সিদ্ধান্ত নেন। তার পর আমরা বই লেখাসহ ব্যস্ত অন্যান্য উন্নয়নমূল কাজ নিয়ে।

বাংলাদেশের দুঃখজনক অধ্যায়টি ছিল ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা। এটি আমাদের দেশের ছাত্র সমাজের জন্যে কলঙ্ক বয়ে আনে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ জুলাই গণভবনে মঙ্গোলিয়ার একাদশ এশিয়া-ইউরোপ সম্মেলনে (আসেম) যোগদান শেষে প্রধানমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনে একজন নারী সাংবাদিক প্রশ্ন করেন ‘জঙ্গি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি চালু করা হবে কিনা’? জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, ‘বাংলাদেশের কোথাও রাজনীতি নিষিদ্ধ নয়’।

১৭ জুলাই বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের সাথে স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতবিনিময়ের সভায় ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির দ্বার উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান।

সোহাগ বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিমুক্ত বলা হলেও আসলে তা নয়। সরব রাজনীতি নেই। নীরব রাজনীতির আড়ালে সেখানে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস আছে।’ আমরা তাদের এই কথার প্রতিবাদ করি। কেননা জঙ্গিবাদ শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বের জন্যে একটি অভিশাপ। এটি দেশের জন্যে কলঙ্ক। সেখানে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী জড়িত ছিল। আমরা এসব অন্যায় কাজকে কখনো সমর্থন করি না, করবো না। সেই বক্তব্যের সারমর্ম ছিল হয় ছাত্র রাজনীতি অথবা জঙ্গিবাদকে। আমরা এটির প্রতিবাদ করেছিলাম। আমাদের দাবি ছিল ‌’ছাত্র রাজনীতি নয় ছাত্র সংসদ প্রয়োজন’-(বিডিমর্নিং ১ আগস্ট-২০১৬)।

এই নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আমরা একটি প্রচারণা শুরু করি যাতে করে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ চালু করার দাবি উত্থাপন করা হয়। ২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর বিডিমর্নিং এ ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ চাই, দিতেই হবে’ বিপ্লব মল্লিক কর্তৃক আমার বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। তা ছাড়া ১৪ ডিসেম্বর ‘স্বাধীনতার ৪৫ বছরে ছাত্র সংসদ নেই ২৬ বছর’ ও ১৬ ডিসেম্বর ৪৫ তম বিজয় দিবসের অঙ্গীকার হোক ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার’ এবং চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ‘২০১৭ সাল হোক শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে দৃপ্তিময়’ শিরোনামে আমার তিনটি কলাম প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকার ও এসব কলামগুলোতে আমরা ছাত্র সমাজের প্রাণের দাবি ছাত্র সংসদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছি।

কেননা দীর্ঘ ২৬ বছর যাবত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নেই। আছে ছাত্র রাজনীতির নামে দলীয় কোন্দল। সহপাঠীসহ বিভিন্ন ছাত্রদের সাথে হাতাহাতি গণ্ডগোল। কারো রক্ত ঝরানো। কারো প্রাণ কেড়ে নেয়া। এটি কখনোই কাম্য হতে পারে না। আমরা চাই প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ। নির্বাচন পদ্ধতিটিও প্রস্তাব করেছিলাম একাধিক লেখা ও ১ আগস্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির জঙ্গিবাদ বিরোধী সমাবেশে। নির্বাচন পদ্ধতিটি হবে ‘প্রতিটি ব্যাচ থেকে সেই ব্যাচের শিক্ষার্থীরা একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন। সবগুলো ব্যাচের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নিজ বিভাগের জন্যে একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন। সবশেষে প্রত্যেকটি বিভাগের নির্বাচিতদের ভোটে একজন সভাপতি ও একজন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন। সেখানে বিভিন্ন বিভাগের নির্বাচিত সদস্যরা এক একটি বিভাগে এক বছরের দায়িত্বের জন্যে নির্বাচিত হবেন। প্রতিটি ব্যাচ থেকে নির্বাচিতরা ব্যাচের দায়িত্ব পালন করবেন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু হল ভিত্তিক কাজ হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রে প্রতিটি হল থেকে একজন করে নির্বাচিত হবেন। সেই নির্বাচিত ব্যক্তিদেরই ভোটের মাধ্যমে ভিপি নির্বাচিত হবেন। একই পদে শুধুমাত্র একবারই দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। নির্বাচনে শিক্ষকরা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালন করবেন’ (বিডিমর্নিং ১ আগস্ট ২০১৬)। এমনকি ১৫ ডিসেম্বর স্টেট আয়োজিত স্বাধীনতার ৪৫তম মহান বিজয় দিবসের আলোচনা সভায়ও একই দাবি উত্থাপন করি। সেখানে ঢাবির সাবেক উপাচার্য এস এম ফায়েজসহ স্টেটের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য মে. জে. (অব.) ডা. শাহজাহান স্যার উপস্থিত ছিলেন।

বর্তমানে বাংলাদেশে পাবলিক-প্রাইভেট মিলে ১৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি-সেনা বাহিনী মিলে মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ আছে ৯৪টি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনার্স ও মাস্টার্স কলেজ আছে ২২০০টি। সবমিলে ২৪৫৫টি প্রতিষ্ঠান আছে ইন্টার (এইচএসসি) পর পড়াশোনা করায়। এই লেভেলে ছাত্র সংসদ চালু হলে ২৪৫৫ জন নেতা (প্রতিনিধি) কাজ করবে। আমরা বিশ্বাস করি এসব প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ চালু থাকলে আশপাশে কোন ধরনের অন্যায় হতে পারবে না।

মন্ত্রী মহোদয়ের উদ্যোগী বক্তব্যটি আমরা সমর্থন করি এবং আশা করি অচিরেই সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের ভোটে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে কোন ধরনের হস্তক্ষেপ ও শক্তিপ্রয়োগন হবে না। সবাই সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মানে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষকমণ্ডলী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অধিকার আদায়ে কাজ করবে। দেশ-বিদেশের কল্যাণে নিজেদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-শিক্ষামন্ত্রণালয়সহ সরকারের সকল মহলের সহযোগিতার অপেক্ষায় রইলাম।

৫ জানুয়ারি-২০১৭, রাত- ৯টা ৫৪ মিনিট; ৮/ডি ধানমন্ডি-১৪, ঢাকা-১২০৫
ইমেইল: [email protected]

Advertisement

কমেন্টস