বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের অতীত ও বর্তমান

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ২৯, ২০১৬

হাকিম মাহি-
বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগ-সেতু হিসেবে বিবেচিত। এশিয়ার দুই বৃহৎ দেশের মধ্যখানে বাংলাদেশের অবস্থান, যার একটি উদীয়মান ভারত এবং অন্যটি চীন। চীন বাংলাদেশের অকৃত্রিম ও পরীক্ষিত বন্ধু।

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আড়াই হাজার বছরের পুরনো। এ কথাটি যেমন সত্য, তেমনি আরেকটি চরম ও পরম সত্য হল; চীন আমাদের শুধু বন্ধু নয় বরং শত্রুও বটে। যেমনটি পরীক্ষিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের মধ্যদিয়ে। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী ও বৈরি সম্পর্ক নতুন কিছু নয়; এ সম্পর্ক প্রাচীন কিন্তু স্বার্থ সাপেক্ষে।

বাংলাদেশকে চীনের সঙ্গে যুক্ত করেছিল একটি পথ, সেটির নাম রেশম পথ, যা সিল্ক রোড নামে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। একটি পূর্ব সিল্ক রোডও ছিল, যার উৎপত্তি হয়েছিল দক্ষিণ চীনের কুনমিং থেকে। মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে তা সংযোগ স্থাপন করেছিল বাংলাদেশের সঙ্গে। এই দুটি পথ ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল, বৃদ্ধি পেয়েছিল সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান। পশ্চিমা সিল্ক রোড, যার সূচনা হয়েছিল রাজধানী সিয়ান (তৎকালীন ছাংআন) থেকে। সেই পথ আফগানিস্তান, ভারত, বাংলাদেশেকে একত্রিত করেছে।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের অকৃত্রিম ও পরীক্ষিত বন্ধু চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল। যার কারণে বাংলাদেশকে পড়তে হয়েছিল অর্থনৈতিক সংকট ও চরম দুর্ভিক্ষে । প্রাণ হারাতে হয়েছে নিরহ ৩০ লক্ষ মানুষকে। এতদসত্তেও বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও চীন দেয় ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু হত্যার মাস ৩১ শে আগস্টে।

চীন ও বাংলাদেশ উভয়ই সমুদ্র উপকূলীয় দেশ তাই সমুদ্রপথে তাদের মধ্যকার আদান-প্রদান প্রাচীনকাল থেকেই ছিল চমৎকার। প্রায় ৬শ’ বছর পূর্বে চীনের মিং রাজবংশের পরাক্রমশালী সম্রাট ছিলেন ইয়ংলে। সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ নাবিক অ্যাডমিরাল ঝেং হে ছিলেন রাজার শান্তির বার্তা বাহক; যিনি ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর ভ্রমন করেন। আর তিনিই সমুদ্রপথে চীনা সিল্ক রোড তৈরি করেন। ১৪০৫ থেকে ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অ্যাডমিরাল ঝেং হে শতাধিক জাহাজের বিশাল বহর নিয়ে সাতটি আন্তসমুদ্র অভিযান পরিচালনা করেন এবং এশিয়া ও আফ্রিকার ৩০টি দেশ ও অঞ্চল পরিভ্রমণ করেন।

অ্যাডমিরাল ঝেং হের নৌবহর দুবার চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছিল।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা ঘটে ১৯৭৫ সালে। এর সূচনা ঘটান জিয়াউর রহমান, যাঁর দৃষ্টি ছিল পূর্বমুখী। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু হওয়ার পর থেকে আজ অবধি দুধে-ভাতেই রয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার ভিন্নতা সত্ত্বেও এই দুই দেশের মধ্যকার চমৎকার কূটনৈতিক সম্পর্ক একটি রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে, অর্থনৈতিক অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প এবং প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রেও চীন সহযোগিতা করে এসেছে।

প্রতিরক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চীন সফরকালে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ২০০২ সালে। সেটি একটি সাধারণ সামগ্রিক চুক্তি, যেখানে সামরিক প্রশিক্ষণ, যৌথ অভিযান, লজিস্টিক লাইনসমূহ উন্নয়ন, সন্ত্রাসবাদ দমন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য সম্ভাব্য ক্ষেত্র যেমন- সমুদ্রতলের মূল্যবান হাইড্রো-কার্বনসহ আমাদের সামুদ্রিক সম্পদের সুরক্ষার জন্য সমুদ্রসীমার সার্বভৌমত্ব নিরাপত্তা আমাদের সশস্ত্র বাহিনীগুলোর আধুনিকায়ন ও শুক্তিশালিকরণে চীন আমাদের পাশে প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে চীন সফর করেন এবং একই বছর চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ আসেন। শি এখন চীনের প্রেসিডেন্ট, সর্বোচ্চ নেতা। শি জিনপিং সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশে আসেন এবং দুই হাজার ৪শ’ কোটি ডলারের অর্থ সহায়তা এবং বিনিয়োগ করবেন। উপকূলীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কর্ণফুলী টানেল নির্মাণসহ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে সই করেছে বাংলাদেশ ও চীন।

বাংলাদেশ-চীন ২৭ চুক্তি: দুদেশের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী চীন বাংলাদেশকে ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দেবে বিভিন্ন খাতে এই সফরের সময় এটা একটা রেকর্ড। এর বেশিরভাগই অবকাঠামো খাতে। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম এবং খুলনায় দুটি বড় তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, যার একেকটির ক্ষমতাই হবে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে একটি টানেল তৈরির প্রকল্পেও অর্থ সহায়তা দিচ্ছে চীন।

এছাড়া একটি সার কারখানা, ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট’ নামে একটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে চীনা অর্থ সাহায্যে।

উদ্বোধন হলো ৬ প্রকল্প: প্রকল্পগুলো হলো ১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ইনস্টিটিউট স্থাপন, ২. কর্ণফুলী নদীর নিচে একাধিক লেনের টানেল নির্মাণ, ৩. পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, ৪. চার স্তরের জাতীয় তথ্যভান্ডার, ৫. চট্টগ্রামে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, ৬. শাহজালাল সার কারখানা নির্মাণ প্রকল্প।

উল্লেখযোগ্য সমঝোতা স্মারক: ১. দুর্যোগ মোকাবিলা ও হ্রাসকরণ, ২. সেতু নির্মাণ, ৩. বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা সহযোগিতা, ৪. বাংলাদেশ-চীন মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সম্ভাব্যতা যাচাই, ৫. সামুদ্রিক সহযোগিতা, ৬. দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ৭. জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, ৮. জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতা, ৯. ইনফরমেশন সিল্ক রোড, ১০. তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সহযোগিতা এবং ১১. সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা সহযোগিতা।সই হওয়া দুটি রূপরেখা চুক্তি হলো কর্ণফুলী নদীর নিচে একাধিক লেনের টানেল নির্মাণ, দাশেরকান্দিতে সাগরকেন্দ্রিক ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। এ দুটি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য চারটি পৃথক ঋণচুক্তি সম্পাদিত হয়েছে।

উৎপাদন সক্ষমতা সহযোগিতা চুক্তি:
সফরের সময় চারটি অর্থনৈতিক চুক্তি সই হয়েছে। এগুলো হলো পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, চীনের জন্য বিশেষায়িত অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে প্রশস্তকরণ প্রকল্প, ব্রডকাস্টিং লাইসেন্স প্রটোকল চুক্তি।

এ ছাড়া দ্বিস্তরের পাইপলাইন-সমৃদ্ধ পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা এবং ডিপিডিসি এলাকা ও পাঁচটি টেলিভিশন স্টেশনের মধ্যে পাওয়ার সিস্টেম বর্ধিতকরণ চুক্তি।

দেশের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ ও চীনের সামরিক সহযোগিতা ও সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই চলমান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ সহযোগিতা ও সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এর সঙ্গে যুদ্ধকৌশলগত এবং ভূরাজনৈতিক বিষয়ও যুক্ত। চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি এ সামরিক সহযোগিতা দরকার বাংলাদেশেরও। আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থ বিবেচনায় রেখে এ সহযোগিতার পক্ষেই প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা। আমরা বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে শুধু চীন দেশের সাথেই নয়, চাই বৈশ্বিক সম্প্রীতি।

 

Advertisement

কমেন্টস