আকাশে বিমান মাটিতে বিএনপি

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ২৮, ২০১৬

পীর হাবিবুর রহমান।।

পঁচাত্তর-উত্তর আওয়ামী লীগ রাজনীতির পুনরুত্থানের নায়ক তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাকের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল ২৩ ডিসেম্বর, শুক্রবার। সেদিন তার স্মরণসভায় যোগ দিতে চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য, তার আদর্শের রাজনীতির অনন্যসাধারণ সংগঠক আবদুর রাজ্জাক ষাটের দশকে ছাত্রলীগের দুবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। স্বাধীনতা-উত্তরকালে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক,  বাকশালের অন্যতম সম্পাদক ও পঁচাত্তর-পরবর্তী দুবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আদর্শিক নেতা-কর্মীদের সুসংগঠিত করার মধ্য দিয়ে তিনিই হয়েছিলেন দলের মধ্যমণি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দলের সভানেত্রী নির্বাচিত হয়ে দেশে আসা পর্যন্ত আবদুর রাজ্জাকই ছিলেন আওয়ামী লীগের সেই নেতা, যিনি বঙ্গবন্ধুর পর সাংগঠনিক দক্ষতায় দলের জনপ্রিয় সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রধান আবদুর রাজ্জাকের নাম বাদ দিয়ে এদেশের ছাত্র রাজনীতি, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আওয়ামী লীগের ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়।

গেল বছর আবদুর রাজ্জাক স্মৃতি সংসদের আমন্ত্রণে ঢাকায় টিএসসির আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। এবার চট্টগ্রামের মুসলিম ইনস্টিটিউটে সেখানকার স্মৃতি সংসদের রাশেদ মনোয়ার, জামশেদ আলম চৌধুরীদের আমন্ত্রণে যোগ দেই। প্রচুর লোকসমাগম হয়েছিল। ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, চট্টগ্রামের জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ সালাম, খোরশেদ আলম সুজনসহ অনেকেই ছিলেন। আওয়ামী লীগের দুর্দিনের কর্মীরা এসেছিলেন বিভিন্ন থানা থেকে।

পীর হাবিবুর রহমান

পীর হাবিবুর রহমান

আমি আওয়ামী লীগ করি না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে স্কুলজীবন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ছাত্রলীগ করেছি। এটা আমার গৌরবের। হূদয়, আবেগ, অনুভূতি দিয়ে বিশ্বাস করি— বঙ্গবন্ধু আমার নেতা, মানুষ আমার দল, একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, উন্নত, আধুনিক, মানবিক বাংলাদেশ আমার স্বপ্ন। আওয়ামী লীগের বাইরে অনেকের সঙ্গে এমনকি বিএনপির দুই-চারজন নেতার সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। সেই চাকসু ভিপি নাজিম উদ্দিন বিএনপির মাঠের জনপ্রিয় নেতা হলেও জামায়াতের সঙ্গে তার দলের ঐক্য এখনো মানতে পারেন না। বিএনপির অনেকের মধ্যেই দেখেছি হতাশা।

গিয়েছিলাম রিজেন্ট এয়ারওয়েজে। কাঁটায় কাঁটায় ৮টায় ফ্লাইট ছেড়েছে। শনিবার পৌনে ১০টায় বিমানে আসার কথা। এয়ারপোর্টে গিয়ে দেখি এক ঘণ্টা বিলম্বে ফ্লাইট ছাড়বে। বিমান যাত্রীদের ফ্লাইট বিলম্বের তথ্যটা জানানো প্রয়োজনও মনে করে না। ঢাকায় নামার পর যাত্রীদের বেশ কিছু সময় বিমানের ভিতরেই দাঁড়িয়ে থাকতে হলো। বিমানের বাস যাত্রীদের আনতে তখনো পৌঁছেনি। বিলম্বে হলেও বাস যাত্রীদের নিয়ে অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে নামানোর আগে আন্তর্জাতিক টার্মিনালে নামিয়ে দিয়েছে। ফ্লাইটটি ছিল কাতারগামী। বিড়ম্বনার পর বিড়ম্বনা। যাত্রীদের মুখের ভাষা মন্ত্রী, চেয়ারম্যান, এমডিরা শুনেন না!

বিমানের চাকা ফেটে যায়। তবুও বলি না বিমানমন্ত্রী পদত্যাগ করুন। রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে উড়ে যাওয়া বিমানে ত্রুটি, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে উড়ে যাওয়া বিমানের বিশেষ ভিভিআইপি ফ্লাইটের নাট-বল্টু খুলে যায়। রাষ্ট্রনায়কসহ যাত্রীরা মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসেন। তবুও বলি না বিমানমন্ত্রী পদত্যাগ করুন। সিলেটের ফ্লাইট কলকাতায় চলে যাক, ইয়াংগুনের ফ্লাইট চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় ফিরে আসুক, বিমানের যাত্রীসেবা বলে কিছু না থাক, সিডিউল বলে কিছু না থাক, আন্তর্জাতিক নিকৃষ্ট ২১টি এয়ারলাইনসের মধ্যে বিমান দ্বিতীয় স্থান লাভ করুক; তবুও বলব না এতবড় রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, আপনি পদত্যাগ করুন, বিমানের এমডি-চেয়ারম্যানরা সরে দাঁড়ান। বিমান লোকসান দিক, জাতীয় প্রতিষ্ঠান চরম বিতর্ক আর ভয়ের কবলে পতিত হোক, তবুও বলব না আপনাদের আরাম, আয়েশ, ক্ষমতা ছেড়ে দিন। শুধু বলব— জনগণের এই প্রতিষ্ঠানের বেহাল অবস্থা কেন? বিমান কবে সুনাম অর্জন করবে? বিমানে কবে লাভের পাল্লা ভারী হবে? জনগণের জানার অধিকার আছে, জনগণকে জানতে দিন।

সরকারবিরোধী শক্তিশালী রাজনৈতিক দল বিএনপি ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ইতিহাসের কঠিন বিপর্যয়ের মুখে। আকাশে বিমান আর মাটিতে যেন বিএনপির একই অবস্থা। সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে অবাধ, গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং উত্সবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিশাল ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের পরাজয় দলটির নেতা-কর্মীদের স্তম্ভিত, বিস্মিত করেছে।

এমন পরাজয়ের জন্য দলের নেতৃত্ব যে প্রস্তুত ছিল না, সেটি তাদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশের নানামুখী মন্তব্যই প্রমাণ করেছে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে তেমন কোনো অসন্তোষ বা প্রশ্ন না থাকলেও এত ভোটের ব্যবধানে পরাজয় তাদের যে আরেক দফা হতাশ ও বিভ্রান্ত করেছে সেটি ফলাফল ঘোষণার পর নেতাদের মন্তব্যেই প্রমাণিত হয়েছে। নেতাদের এই মন্তব্য বিএনপির শুভকাঙ্ক্ষী ও নেতা-কর্মীরা যেমন গ্রহণ করেননি; তেমনি সরকার ও শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিএনপির দিকে তাকিয়ে হাস্য-কৌতুকই করছেন না, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি নির্বাচন নিয়ে এতদিন যে অভিযোগ করত, তার উপযুক্ত জবাব নারায়ণগঞ্জবাসী দিয়ে দিয়েছে। বিচার বিভাগীয় তদন্তের আজগুবি দাবির যুতসই জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘তারা আজকে আর কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছে না। কি যে বলবে, যখন কথা বলার কিছু নেই; তখন একটা কিছু তো বলতে হবে। ’ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরই এটিকে হাস্যকর দাবি বলেছেন তা নয়, বিএনপিতেও মাঠ পর্যায়ে এ নিয়ে হাসাহাসি চলছে।

তবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কারামুক্ত নাগরিক ঐক্যের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্নাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের রাজনৈতিক ভাষায় যথার্থ মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেছেন, ‘নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনের ভিতরের খবর কি তা আমরা এখনো জানি না। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। জনগণ ভোট দিতে এসেছেন। আর তার মধ্যদিয়ে ভোটের অধিকারের পক্ষে আমাদের সংগ্রাম কিছুটা হলেও সফল হয়েছে। ’ তার বক্তব্যের মধ্যদিয়ে ভিতরে কী হয়েছে— এই সংশয় কার্যত ফলাফল যে তাদের জন্য আচমকা ঝাঁকুনি, তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্যদিকে জনগণের অংশগ্রহণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে তাদের আন্দোলনের আংশিক বিজয় বলে নির্বাচন যে গ্রহণযোগ্য হয়েছে সেটি স্বীকার করেছেন। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ বিএনপির নেই। কারণ নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যা ঘটেছে তা দেশবাসীর সামনে ঘটেছে। দেশবাসী যেমন নির্বাচন চায়, তেমন নির্বাচনই হয়েছে। নির্বাচনের আগে বিএনপির তরফ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় ব্যক্তিগতভাবে আড্ডায় আলোচনায় আমার কথা হয়েছে। তারা বলেছেন, এই নির্বাচন নিয়ে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রতি রাতে তাদের কথাবার্তা হয়েছে। নির্বাচন যে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল তা নিয়ে তারা বৈঠকে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বেগম খালেদা জিয়া তার দলের প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে বলেছিলেন, আপনি শামীম ওসমানকে নিয়ে কোনো বক্তব্য দেবেন না। ওকে ঘুমিয়ে থাকতে দিন। তিনি আইভীর বিরুদ্ধেও ব্যক্তিগত আক্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বিএনপি নেতারাও পরিবর্তনের স্লোগান তুলেছিলেন। আইভীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেননি। এ বিষয়ে বিএনপির দায়িত্বশীল এক নেতা বলেছিলেন, প্রার্থী হিসেবে আইভী শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য। ইমেজ নিয়েই ভোটযুদ্ধ করছেন। তার বিরুদ্ধে বলার মতো তেমন বক্তব্য তারা পাচ্ছেন না যা জনগণ গ্রহণ করবে। তবে ওই নেতা বলেছিলেন, তারা মনে করেন তাদের পক্ষে নীরব ব্যালট বিপ্লব ঘটবে। আর যদি তা না ঘটে এবং নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হয় তাহলে বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক অবস্থা নির্ণয় করার একটি সুযোগ পাবেন। তিনি আরও বলেছিলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের পর যতগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়েছে কোনোটিতে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করারই সুযোগ পাননি যে, উপলব্ধি করবেন বিএনপির অবস্থা কার্যত কোথায় আছে? নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্য হলে তারা তাদের দলীয় রণকৌশল ও লক্ষ্য নির্ধারণে সুবিধা পাবেন।

বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাও বলছেন, ভোট গ্রহণযোগ্য হয়েছে। একজন শক্তিশালী প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিএনপি দুর্বল প্রার্থী দিলেও যে নির্বাচনী ফলাফল এসেছে, তা বিচার-বিশ্লেষণ করে আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এখনই বাস্তবসম্মত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের জন্য বিএনপি শক্তিশালী, কার্যকর নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতির দুয়ারে গেছে। প্রধানমন্ত্রীও এর আগে তাদের বঙ্গভবন দেখিয়েছেন। বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে তারা উত্ফল্ল ও খুশি হয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদও আশাবাদী বলে জানিয়েছিলেন। তখন থেকেই টকশো ও লেখায় বলে আসছি, বঙ্গভবন নয়; একটি গ্রহণযোগ্য, শক্তিশালী, আলোচনাভিত্তিক নির্বাচন কমিশন দিতে পারে গণভবন। রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দিলেও সাংবিধানিকভাবেই সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় সব ক্ষমতার উত্স প্রধানমন্ত্রী। কার্যত কেমন নির্বাচন কমিশন আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে গঠিত হবে তা নির্ধারণ হবে সরকারপ্রধানের ইচ্ছার ওপর।

নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনী পরিবেশ শুরু থেকেই যেভাবে পরিচ্ছন্ন, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল তাতে একাধিক টকশোতে বলেছি, সরকার তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাইছেন, এই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হোক, তাই হচ্ছে। এমনকি নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশন একটি গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ভোট উপহার দেওয়ার কৃতিত্ব নিয়ে যে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছিলেন তার জবাবে সে রাতেই টকশোতে বলেছি, এই কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে সিলেট, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী এমনকি গাজীপুরে তারও আগে চট্টগ্রামে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিয়েছিলেন। তখন সরকারবিরোধী জনমত ছিল বিএনপির অনুকূলে। আওয়ামী লীগের শক্তিশালী, জনপ্রিয় ও সফল মেয়ররা উন্নয়নের চিত্র সামনে নিয়ে বিএনপির দুর্বল, আনকোরা প্রার্থীদের কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে বিগত উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচনকে নারায়ণগঞ্জের মতো রকিব কমিশন উপহার দিতে পারেননি। তাই এই রকিব কমিশনের মুখে বড় কথা বা তৃপ্তির ঢেঁকুর মানায় না। এই কমিশনের কাঁধে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বোঝা রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের এই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য কৃতিত্ব সরকার, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর।

নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলেও রাজনৈতিকভাবে কোনো লোকসান ছিল না। কিন্তু আওয়ামী লীগ এখানে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী থাকলেও এত ভোটের ব্যবধান প্রত্যাশা করেনি।

২০১২ সালের নির্বাচনে যখন সরকারবিরোধী জনমত প্রবল, তখন আওয়ামী লীগ প্রার্থী করেছিল শামীম ওসমানকে। শামীম ওসমানের হাতে সেখানকার সাংগঠনিক শক্তি। আইভী হয়েছিলেন নাগরিক কমিটির প্রার্থী। বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার। আইভী হয়ে উঠেছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী সব শক্তির প্রার্থী।

এমনকি শামীম ওসমান ঠেকাতে ভোটের আগের রাতে তৈমুর আলম খন্দকারকে বিএনপি হাইকমান্ড জবাই করে আইভীর বিজয়কে আরও নিরঙ্কুশ করেছিলেন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগেরও একটি অংশ ছিল আইভীর পক্ষে। বামপন্থি ও সুশীলরা তো ছিলেনই। আইভী একটি স্বতন্ত্র ইমেজ নিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দাঁড়িয়ে গেছেন সাহসের সঙ্গে। এবারের নির্বাচনে তৃণমূল অন্যকে চাইলেও শেখ হাসিনা প্রার্থী করেন আইভীকেই। দাবার চালটি এখানে দিয়েই তিনি বসে থাকেননি। আইভীকে প্রার্থী করায় আওয়ামী লীগের যারা নাখোশ হয়েছিলেন তারা মনে করলেও আইভীকে ছাড়তে পারেননি।

অন্যদিকে আইভীর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের কাণ্ডারি শামীম ওসমানের সামনে তার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের পরীক্ষার ও পুরস্কার প্রাপ্তির বিষয়টি ছেড়ে দেন। আওয়ামী লীগের উত্থান-পতনের সঙ্গে বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে থাকা ওসমান পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম শামীম ওসমান তার নেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি নির্মোহ আনুগত্য দেখাতে গিয়ে আইভীকে শর্তহীনভাবে সমর্থনই করেননি, তার কর্মী-সমর্থকদেরও মাঠে নামিয়ে দেন। গোটা আওয়ামী লীগের শক্তি আইভীর পক্ষে দাঁড়িয়ে যাওয়ায় বিএনপি কার্যত ভোটের যুদ্ধে একা হয়ে পড়েছিল। নারায়ণগঞ্জের প্রথম সিটি নির্বাচনে আচমকা আগের রাতে কোরবানি হওয়া তৈমুর আলম খন্দকার বিএনপির সাংগঠনিক শক্তির সমর্থনপুষ্ট হওয়া সত্ত্বেও প্রার্থী হতে চাননি। কারণ যদি আবার নির্বাচন সুষ্ঠু না হয়, আর ভোটের দিন সকালবেলায় দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশে তাকে সরে দাঁড়াতে হয়; এই প্রশ্নে আর নিঃস্ব হতে রাজি হননি। ভোটের ফলাফলে প্রমাণ হয়েছে, দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় নন, ক্লিন ইমেজের আইনজীবী, ভদ্র, সজ্জন মানুষ অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত প্রার্থী না হয়ে তৈমুর হলেও পরাজয় ছিল নিশ্চিত। ভোটের ব্যবধান হয়তো কিছুটা কমত। বিএনপি জামায়াতকে দূরে রেখে নিজেদের শক্তি পরীক্ষার যে চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল, সেখানে হোঁচট খেয়েছে। আইভী আওয়ামী লীগের গোটা ভোটব্যাংকই পাননি, নিরপেক্ষ এমনকি বিএনপির অনেক ভোটারদেরও পাশে পেয়েছেন। অন্যদিকে সাখাওয়াত বিএনপিরই সবার মন জয় করতে পারেননি। নতুন ভোটারদের সামনে আইভী যতটা আকর্ষণীয় বিএনপি ততটাই প্রশ্নবিদ্ধ। বিএনপি তার রাজনীতিকে বিভ্রান্তির চোরাবালিতে একদিকে যেমন ডুবিয়েছে, অন্যদিকে হটকারী আন্দোলনের পথে গিয়ে সরকারবিরোধী দমন নির্যাতনের মুখে পড়ে মামলার জালেই বন্দী ও সাংগঠনিক শক্তিই ক্ষয় করেনি, কার্যত রাজনীতির গতিপথ থেকেই বিচ্যুত হয়ে পড়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের বাইরে যেখানে রাজনীতির সুযোগ নেই, সেখানে বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেনি, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে দেশজুড়ে, অলিতে-গলিতে আওয়ামী লীগের রোজ কর্মসূচি থাকলেও বিএনপির কোনো কর্মসূচি নেই। এমনকি কাউন্সিলের পর বিএনপির যেভাবে দল গোছানোর কথা ছিল, সেভাবে গোছাতে পারেনি। কি রাজনৈতিক, কি সাংগঠনিক; কোনো কর্মসূচিই নিতে পারেনি।

এদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বিজয় অর্জন করেছে। সেই বিজয়ের পর সদ্য স্বাধীন দেশে ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে পরিবার-পরিজনসহ হত্যা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে যে নেতারা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন, তাদের জেলখানায় খুন করা হয়েছে। সারা দেশের নেতা-কর্মীদের জেল-জুলুম, নির্যাতনের দুঃসহ পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ কখনই দুটি পথ ত্যাগ করেনি। এক. গণআন্দোলন, দুই. নির্বাচন।

আওয়ামী লীগ কোনো নির্বাচনই বিনা চ্যালেঞ্জে ছাড়েনি। গণআন্দোলন তীব্র করা সম্ভব নয় যখন মনে করছে, তখন জনসভা, জনসংযোগের মতো কর্মসূচি দিয়েছে। সেনাশাসন জমানায় কখনো ফুটপাথের পাশে চেয়ার টেবিল নিয়ে সভা করেছে, কখনো কর্মীরা খেয়ে না খেয়ে কেন্দ্রীয় বড় নেতাদের নিয়ে ছোটখাটো জনসভা করেছে। জনগণ থেকে সাংগঠনিক তত্পরতাকে বিচ্ছিন্ন করেনি। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ দলীয় ফোরামে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ কখনো ছাড়েনি।

অন্যদিকে বিএনপিতে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন, সহিংস কর্মসূচি গ্রহণ পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয় থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য লাগাতার হরতাল, অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা কোনোটাই দলীয় ফোরামে আলোচনার ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি। গায়েবি বার্তায় নেওয়া হয়েছে। আর সেই ভুলের খেসারত এখনো দল ও কর্মীরা দিচ্ছে। রাজনীতিতে যেখানে ইতিহাসের শোধ চলছে, সেখানে লন্ডনে বসে তারেক রহমানের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বঙ্গবন্ধুকে কটাক্ষ করে দেওয়া বক্তৃতা সেটিকে আরও উসকে দিয়েছে।

’৭৫-এর পর আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের পথে ২১ বছর টানা সংগ্রাম করেছে। অন্যদিকে শাসকরা ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে সব প্রচার মাধ্যমে, জাতীয় দিবসগুলোতে নিষিদ্ধই করেনি তার খুনিদের পৃষ্ঠপোষকতা করে রাজনীতিতেও পুনর্বাসিত করেছিল। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের জন্য ইতিহাসের সেই ক্ষতগুলো তীব্র যন্ত্রণার হলেও ২০০১ সালের নির্বাচনে হেরে দলটি গণতন্ত্রের পথে হেঁটেছে। কিন্তু একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা আর একের পর এক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতারা নিরাপদে বিরোধী দলের রাজনীতি করতে পারবেন— এই বিশ্বাসটুকুকে শেষ করে দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করার মধ্য দিয়ে রাজনীতির যে কূটকৌশল নিয়েছিল বিএনপি তড়িঘড়ি ক্ষমতায় আসার পথ বেছে নিতে গিয়ে কঠিন বিপর্যয়ে পড়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করলে আজকের বিপর্যয়ে বিএনপিকে পড়তে হতো না। নারায়ণগঞ্জের সুষ্ঠু নির্বাচন মানুষকেই নয়; দেশবাসীকেও ভুলিয়ে দিয়েছে ৫ জানুয়ারি থেকে অনুষ্ঠিত বিগত সব স্থানীয় নির্বাচনের চিত্র। নির্বাচন কমিশন আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে গঠিত হলেই বিএনপি জাতীয় নির্বাচন নারায়ণগঞ্জ মডেলে পাবে এমনটি এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। যদিও এই নির্বাচন সরকারের উপরেও একটি অবাধ সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ভোটযুদ্ধের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছে।

২০১৩ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের নেপথ্যে ছিল নানা কেলেঙ্কারিতে সৃষ্ট সরকারবিরোধী জনমত। বিএনপি ছিল সংসদে বিরোধী দল। সেই ফসল ঘরে তুলতে পারেনি বিএনপি। মাঝখানে জল অনেক গড়িয়েছে। বিশ্ব রাজনীতি শেখ হাসিনার অনুকূলে আরও জোরেশোরে বইছে। পদ্মা সেতুর কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। অনেক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চিত্র ভাসছে। শেখ হাসিনা, সরকার ও তার দলের জন্য এমন সুসময় আর অতীতে কখনো আসেনি। যেমন— বিএনপির এমন দুঃসময় অতীতে আর কখনো আসেনি।

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া মামলার হাজিরায় আদালতমুখী। সারা দেশের নেতা-কর্মীদের মাথায় মামলার পাহাড়। আওয়ামী লীগ জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সংগঠনকে সংগঠিতই করেনি, সাংগঠনিক কর্মচাঞ্চল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। বিএনপির মিত্র জামায়াতকে দুর্বল করে দিয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের অনেককে আওয়ামী লীগে যোগদানেও বাধা দিচ্ছে না। বিএনপি এখনো আশা করছে, একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন হবে আর ’৯১ সালের মতো প্রার্থী দিয়ে তারা ক্ষমতায় চলে আসবেন।

রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথে সবসময় এক ফর্মুলা কাজ করে না। আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি যখন সুষ্ঠু ভোট আশা করছে, তখন কয়েকটি প্রশ্ন অমীমাংসিতই থেকে যাচ্ছে। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলার রায় কী হবে? চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর সরিয়ে নেওয়া হবে কিনা?

বিএনপির নেতা-কর্মীদের ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কথা একটাই— সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, সাংগঠনিক কর্মসূচির পথ ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শর্টকাট পথ দূরে রেখে রাজনীতির গতিধারায় শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন। সেই লক্ষ্যে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রণকৌশল নির্ধারণ। রণকৌশল নিয়ে দলীয় ফোরামে আলোচনার ভিত্তিতে তৃণমূলকে সম্পৃক্ত ও সুসংগঠিতকরণ। সরকারের অভ্যন্তরে বা সঙ্গে থাকা অনেকেই বিএনপি নিশ্চিহ্ন বা শেষ হয়ে যাবে বলে যে চিন্তাভাবনা করছেন পর্যবেক্ষকরা তা বিশ্বাস করেন না। মুক্তিযুদ্ধ বিজয়ী দেশের একক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকেও ’৭৫-এর পর নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু পারা যায়নি, আওয়ামী লীগ রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবিলা করেছে। বিএনপিকেও তাই নারায়ণগঞ্জের ভরাডুবি থেকে শিক্ষা নিতে হবে অতীতে হঠকারী, ভ্রান্ত নীতি দলকে যে বিপর্যয়ে ফেলেছে, যে শক্তি ক্ষয় করেছে সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে দলীয় নেতা-কর্মীদের মতামতের আলোকেই রণকৌশল নির্ধারণ করতে হবে; গায়েবি আদেশে নয়।

নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পরদিন পরাজিত প্রার্থীর বাসায় ফুল ও মিষ্টি নিয়ে আইভীর গমন, সাখাওয়াতের সহযোগিতার অঙ্গীকার, অন্যদিকে এক সময়ের রাজনৈতিক সতীর্থ কারামুক্ত মাহমুদুর রহমান মান্নাকে হাসপাতালে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের দেখতে যাওয়া ইতিবাচক রাজনীতি প্রত্যাশী মানুষের মনে আশার আলো জাগিয়েছে।   এটাও বা কম কি!

লেখক : প্রধান সম্পাদক, পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজ।

 

কমেন্টস