আরব বিপ্লবের অবসান

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ২৭, ২০১৬

বিডিমর্নিং ডেস্ক- 

ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন দখলদারির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যেমন দীর্ঘদিনের পশ্চিমা সামরিক রোমাঞ্চের অবসান ঘটেছে, তেমনি সিরিয়ার ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে এটাও নিশ্চিত হয়েছে যে আরব বিপ্লবও আর হবে না। আর রাজনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস করতে ১৩টি রক্তাক্ত বছর লেগে গেছে, ২০০৩ থেকে ২০১৬। রাশিয়া, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া মুসলমানরা এখন অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। বাশার আল-আসাদ জয়ী হয়েছেন, সেটা দাবি করতে পারেন না, কিন্তু তিনি জিতে যাচ্ছেন।

দামেস্কের সেনা সদর দপ্তরে এক ব্রিগেডিয়ার মনমরা হাসি দিয়ে আমাকে বলেছিলেন, ‘মসুলের পতনের আগে দ্রুত আলেপ্পো দখল করে নিতে হবে।’ প্রায় এক মাস পর তা-ই ঘটেছে। সিরিয়ার বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট আলেপ্পো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, যেখানে সরকার ও সশস্ত্র জিহাদিরা ‘ভালো লোক’ ও ‘খারাপ লোক’ খেলা খেলছে, যেটা নির্ভর করছে কে কাকে ঘেরাও করছে তার ওপর। সুন্নি জঙ্গিরা যখন ফাওয়ারের মতো ছোট শিয়া শহরের ঘেরাওয়ের অবসান ঘটিয়েছিল, তখন বেসামরিক মানুষেরা সরকারের কাতারে যোগ দেওয়া শুরু করে। কিন্তু সরকারের বাহিনী যখন পূর্ব আলেপ্পোতে হানা দেয়, তখন সারা পৃথিবী হায় হায় করে উঠল—এটা যুদ্ধাপরাধ। আমি এটা বারবার বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গেছি যে উভয় পক্ষই যুদ্ধাপরাধ করছে। আলেপ্পোর ঘটনা পুরোনো বোতলে ঢোকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অর্থাৎ সাহসী কিন্তু মূলত ‘জিহাদি’ আত্মরক্ষাকারীরা এমনভাবে লুকিয়ে আছে, যাদের সহজে চেনা যায় না, আর তাদের বিরোধীদের মিলোসোভিচের সার্ব হত্যাকারী ও সাদ্দামের গ্যাস-বোমা পাইলটদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে ফিরে এসেছে। ইরান বাগদাদ-দামেস্ক-বৈরুত এই রাজনৈতিক অর্ধবৃত্তের হেফাজত করছে। আর উপসাগরীয় আরব বা মার্কিনরা যদি নিজেদের পুনর্নিয়োজিত করতে চায়, তাহলে তারা পুতিনের সঙ্গে কথা বলতে পারে

এসব কিছুই দ্রুত শেষ হবে। রাশিয়া বুঝতে পেরেছে, ওবামা ও ক্রন্দনরত উদার মানুষেরা বাশারের উৎখাতের বিষয়ে ধোঁকা দিচ্ছিলেন। বিষয়টা হচ্ছে, বাশার কিন্তু কিয়েভে বসবাসরত পুতিনের ইউক্রেনীয় মিত্রের মতো পালিয়ে যাননি। বরং তিনি সেনাবাহিনীকে সমর্থন দিয়েছেন। দ্য ইকোনমিস্ট সিরিয়ার সেনাবাহিনী নিয়ে ঠাট্টা করেছে, কারণ রাশিয়া তাদের সিরীয় বিমানঘাঁটিতে যে সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করেছিল, সেখানে তারা পা মেলাতে পারেনি। কিন্তু এই সিরিয়ার সেনাবাহিনী গর্ব করে বলে, তারা আইএস, নুসরা ও অন্যান্য ‘জিহাদি’ সংগঠনের বিরুদ্ধে ৮০টি ফ্রন্টে একসঙ্গে লড়াই চালিয়েছে। এটা হয়তো একভাবে সত্য কিন্তু এটা নিয়ে গর্বিত হওয়ার কিছু নেই। আইএসের হাত থেকে পালমিরার পুনর্দখল নেওয়া এক কথা, অন্যদিকে পূর্ব আলেপ্পোতে চলমান যুদ্ধের মাঝখানে তা আবার হারানো আরেক কথা।

সিরিয়ার সেনারা মিত্র হিজবুল্লাহ জঙ্গিদের অনেক সময় দিয়েছে, যারা সিরিয়ার সেনাদের চেয়ে উন্নত অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নেমেছে। আবার এক ইরানি সেনা কর্মকর্তা আমার সামনে সিরিয়ার এক জেনারেলকে ‘স্টুপিড’ বলেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রেভল্যুশনারি গার্ডের চেয়ে সিরিয়ার সেনারা আরও বেশি যুদ্ধ-প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ, যাদের অনেক সেনা প্রাণ হারিয়েছে, যেটা তারা বিশ্বাসের অতীত বলে মনে করত।

অদ্ভুতভাবে পশ্চিমা নেতারা সিরিয়ার প্রকৃত সংগ্রাম সম্পর্কে বিস্ময়করভাবে অজ্ঞ, এমনকি কোন যুদ্ধ সমর্থন দিতে হবে, সে সম্পর্কেও। অক্ষম ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদের কথাই ধরুন না কেন, তিনি গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘকে বলেছিলেন, রাশিয়া ও ইরানের উচিত হবে আসাদকে শান্তিচুক্তি করতে বাধ্য করা। তা নাহলে সিরিয়ার সঙ্গে তারাও ‘সিরিয়ার বিভাজন ও বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী’ থাকবে। সবকিছুই ভালো। কিন্তু এই ওলাঁদই তার দুই মাস আগে দাবি করেছিলেন, ইসলামপন্থী নুসরা ফ্রন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, আইএস পালিয়ে যাওয়ায় নুসরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। আইএস পালমিরার পুনর্দখল নেওয়ার আগে তিনি এ কথা বলেছিলেন।

কিন্তু সম্ভবত ওলাঁদ, তাঁর ইউরোপীয় মিত্র ও ওয়াশিংটন নিজেদের ভুল ও দুর্বল নীতি নিয়ে এতটা আচ্ছন্ন হয়ে আছে যে তারা বুঝতে পারছে না যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষমতা কীভাবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরে যায়। রাশিয়ার নির্মমতা নিয়ে মৃদু আওয়াজ না তুলে এবং তার সঙ্গে ইরানিদের নৃশংসতা ও হিজবুল্লাহর মিথ্যাচার গুলিয়ে না ফেলে তাদের এই সত্যে নজর দেওয়া উচিত, সিরিয়ার সুন্নি মুসলমানরা কীভাবে সুন্নি ‘জিহাদিদের’ বিরুদ্ধে লড়াই করছে। তারা সব সময় নুসরাকে আইএসের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক মনে করেছে। সিরিয়ার সেনাবাহিনী ঠিকই আছে। এখানে অন্তত ওলাঁদের অবশ্যই উচিত হবে, তাদের উপসংহারের সঙ্গে একমত হওয়া।

তা সত্ত্বেও ভ্রমের শক্তিই আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিম যদি আইএসের হাত থেকে মসুল নিতে না পারে, তাহলে তাদের পক্ষে আলেপ্পো দখল করা থেকে সিরীয়দের বিরত রাখা কঠিন হবে। কিন্তু তারা পশ্চিমা গণমাধ্যমকে উৎসাহিত করতে পারে, তারা যেন আলেপ্পোতে রুশদের নৃশংসতায় মনোযোগ দেয়, মসুলে মার্কিন মিত্রদের ভয়ংকরভাবে কতল হওয়ায় নয়। আলেপ্পোর যুদ্ধের ওপর গত কয়েক সপ্তাহে যে ধরনের সংবাদ-প্রতিবেদন করা হয়েছে তাতে মনে হয়েছে, ব্রিটিশ সাংবাদিকেরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রতিবেদন পাঠাচ্ছেন। আর রাশিয়াও তাদের পোষা গণমাধ্যমকে বলতে পারবে, তারা যেন পালমিরার পরাজয়ে নয়, আলেপ্পোর বিজয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। আর মুসলের ঘটনা তো আমাদের সংবাদ থেকে রহস্যজনকভাবে হারিয়ে গেছে। আমার মনে বিস্ময় জাগে, কেন এমনটা হলো?

আর পালমিরাতে কত মানুষ মারা গেছে? আর পূর্ব আলেপ্পোতে কত মানুষকে প্রকৃত অর্থেই বন্দী করে রাখা হয়েছিল। সংখ্যাটি কি সত্যি আড়াই লাখ? নাকি সেটা ছিল এক লাখ? কয়েক সপ্তাহ আগে এক সংবাদ প্রতিবেদনে দেখলাম, সিরিয়ার যুদ্ধে সর্বমোট মৃতের সংখ্যা বলা হয়েছে চার লাখ, যার কয়েক প্যারা পরেই বলা হয়েছে সংখ্যাটা পাঁচ লাখ। তাহলে সত্যটা কী? ১৯৪০-এর দশকে রটারড্যামে নাৎসিদের বোমাবর্ষণের কথা শুনেছি, যখন মিত্রবাহিনী ঘোষণা দিয়েছিল ৩০ হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। বহু বছর এটাই নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ছিল। যুদ্ধের পর খবর বেরোল, এই সংখ্যাটা ৯০০-এর মতো। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক বিবৃতির চেয়ে ৩৩ গুণ কম। বিস্ময় জাগে, তা-ই নয় কি?

আমরা যদি তার সঠিক হিসাব পাই, তাহলে সিরিয়ার যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে আমরা কী অভীষ্ট অর্জন করছি? কথা হচ্ছে, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে ফিরে এসেছে। ইরান বাগদাদ-দামেস্ক-বৈরুত এই রাজনৈতিক অর্ধবৃত্তের হেফাজত করছে। আর উপসাগরীয় আরব বা মার্কিনরা যদি নিজেদের পুনর্নিয়োজিত করতে চায়, তাহলে তারা পুতিনের সঙ্গে কথা বলতে পারে। অথবা আসাদের সঙ্গে।

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া।

রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইন্ডিপেনডেন্টএর মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি 

সূত্র ঃ প্রথম আলো

 

Advertisement

কমেন্টস