বিএনপির স্বপ্নপূরণে কি বাধা দেবে সরকার

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ২৬, ২০১৬

কাজী সিরাজ-

গুরুত্বপূর্ণ সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে নিজস্ব বিবেচনায় একটি সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন কমিশন গঠনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট মো. আবদুল হামিদ সক্ষম হবেন বলে একটা আশাবাদ জাগ্রত হয়েছে। রাষ্ট্রপতির উদ্যোগে সরকারি দলের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির অনুকূল সাড়া এক্ষেত্রে ইতিবাচক বলেই মনে হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার সমঝোতা আমাদের জাতীয় রাজনীতির অনেক বড় সংকটেরই সহজ সমাধান দিতে পারে। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে আলোচনার সূচনাটা ভালোই হয়েছে বলতে হবে। কিন্তু শাসক দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের উদ্যোগটাকে নিরুৎসাহিত করতে চাচ্ছেন বলে কারও কারও মনে হতে পারে। বিএনপির সঙ্গে রাষ্ট্রপতির এ সংক্রান্ত আলোচনার পর তার কিছু মন্তব্য অযাচিত মনে হয়েছে অনেকের কাছে। তার মন্তব্য রাষ্ট্রপতির বক্তব্য এবং প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন খুঁচিয়ে দিতে পারে। তবুও জাতীয় রাজনীতিতে এখন আলোচনার মুখ্য বিষয় হচ্ছে নির্বাচন কমিশন গঠন উপলক্ষে রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট মো. আবদুল হামিদের সংলাপ। ১৮ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়ার সূচনা হওয়ার পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। আমরা সবাই জানি যে, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন তখন অপরিহার্য হয়ে পড়বে। কেমন হবে সেই নির্বাচন কমিশন, তা নিয়ে কথাবার্তা চলছে দীর্ঘদিন ধরেই। সবার প্রত্যাশা হচ্ছে, নবগঠিতব্য নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে স্বীয় ক্ষমতা প্রয়োগে সক্ষম ও শক্তিশালী কমিশন হবে, কমিশনের মেরুদণ্ড শক্ত হবে এবং তা সবার কাছে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হবে।

আলোচনাটা শুরু হয়েছে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে নয়, কমিশন গঠনের লক্ষ্যে সার্চ কমিটি গঠনের বিষয় নিয়ে। আমাদের দেশে নির্বাচন কমিশন গঠনে যে প্রক্রিয়াটি এ যাবৎকাল অনুসরণ করা হচ্ছে তার আইনগত ভিত্তি নিয়ে ইদানীং বেশ জোরালো সমালোচনা হচ্ছে। যারা বিভিন্ন সময় সরকার পরিচালনা করেছেন তারা কেউ এই কঠোর সমালোচনার হাত থেকে মুক্ত থাকছেন না। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি সবাই অভিযুক্ত; নেতা হিসেবে অভিযুক্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা।

এরা বিভিন্ন সময়ে দলীয় সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সংবিধানের নির্দেশ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির। বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে যে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে কোন আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন। ’ কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, যে আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেবেন, স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ ৪৫ বছরেও প্রয়োজনীয় ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ এ আইনটি প্রণীত হয়নি। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে, একটি দক্ষ, নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে নিজেদের সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগে সক্ষম ও সাহসী একটি নির্বাচন কমিশনের ওপরই নির্ভর করে দেশে একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।

কিন্তু ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারসমূহ সজ্ঞানে সচেতনভাবেই বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন বলে দৃঢ়ভাবে বলা যায়। কারণ এ সংক্রান্ত আইন হয়ে গেলে নির্বাচন কমিশন গঠনের ব্যাপারে কিছু নীতি নির্ধারিত হয়ে যাবে। নির্ধারিত নীতিমালার মধ্য থেকে গঠিত নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন সরকারের ‘সুইট ডিজায়ার’ অনুযায়ী কাজ নাও করতে পারে। আমাদের দেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলসমূহ যখন যারা ক্ষমতায় ছিল তারা সব নির্বাচনে দলীয় সুবিধা লাভে নির্বাচন কমিশনকে কাজে লাগাতে চেয়েছে এবং কমবেশি লাগিয়েছেও। আইন না থাকায় নিজেদের পছন্দের লোকদের নিয়ে কমিশন গঠনের সুযোগ নেওয়ার জন্যই কেউ এই সম্পর্কিত আইনটি প্রণয়ন করেনি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রধান দুই দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পরস্পরের প্রতি এত বৈরী, ‘পান থেকে চুন খসলেই’ একের বিরুদ্ধে অপরে খিস্তি-খেউর ছোড়ে, সংঘাতেও কখনো কখনো লিপ্ত হয়।

অথচ নির্বাচন কমিশন গঠনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট আইনটি প্রণয়ন না করার জন্য কেউ কাউকে দায়ী করে অভিযোগ করে না, দোষারোপ করে না। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা নিয়োগপ্রাপ্ত হন। যেহেতু এই সংক্রান্ত কোনো আইন নেই, রাষ্ট্রপতি তার একক ক্ষমতাবলে কার্যটি সম্পাদন করতে পারেন না। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ তার জন্য আবশ্যিক করে রেখেছে আমাদের সংবিধান। তাই আমরা দেখেছি যে, সব সরকারের আমলে নিয়োগকৃত নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধী দল ভিন্নমত প্রকাশ করেছে, আন্দোলন-হরতালও পালন করেছে।

ওই সব নির্বাচন কমিশনের কার্যকলাপ স্মরণ করলে নিশ্চয়ই বলতে হবে, সন্তোষ প্রকাশ করার মতো কাজ তারা করেননি। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন সরকার এবং পরবর্তীকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিচারপতি মো. হাবিবুর রহমান এবং বিচারপতি লতিফুর রহমানের প্রধান উপদেষ্টা থাকার সময় তিনটি নির্বাচন মোটামুটি দেশে-বিদেশে প্রশংসা পেয়েছে। ওই তিন নির্বাচন নিয়েও বেশ কথা উঠেছিল। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে— যাতে বিএনপি দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল— আওয়ামী লীগ সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ করেছিল।

বিচারপতি মো. হাবিবুর রহমান সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে হেরে গিয়ে বিএনপি বলেছিল, ‘এটা পূর্ব পরিকল্পিত, ষড়যন্ত্রমূলক ও কারচুপিপূর্ণ। ’ বিচারপতি লতিফুর রহমানের আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে হেরে গিয়ে আওয়ামী লীগ বলেছিল ‘এবার স্থূল কারচুপি হয়েছে’। কিন্তু এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১০টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে দ্বিতীয়, পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রথমদিকে পরাজিত দলগুলো সমালোচনামুখর থাকলেও পরে সবাই ফলাফল মোটামুটি মেনে নেয়। বাকি ছয়টি নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশন নিয়ে (ড. হুদা কমিশনসহ) নিন্দা-সমালোচনার অন্ত নেই। যে নির্বাচন কমিশনটি আগামী ফেব্রুয়ারিতে বিদায় নেবে, সেই কাজী রকিবউদ্দীন কমিশনের অধীনেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মহাবিতর্কিত এবং দেশ-বিদেশে কঠোরভাবে সমালোচিত নির্বাচনটি (১০ম) অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে ১৫৩ আসনেই কোনো নির্বাচন হয়নি, অটো এমপিদের নিয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ফেলে।

একাদশ সংসদ নির্বাচন আমাদের দ্বারে কড়া নাড়ছে। সরকার এবং বিরোধী পক্ষের মাতামাতি দেখে মনে হয় নির্ধারিত সময়ের আগেও নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হতে পারে। নির্ধারিত সময়েও যদি হয়, কেমন হবে সে নির্বাচনটি? ভাবছেন অনেকেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় কাউন্সিল শেষে বলেছেন আগামী নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হোক তা তিনি চান না। এর আগে কাউন্সিলে ভাষণদানকালে দলীয় নেতাদের আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। আগামী নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হোক তা তিনি চান না বলে কার্যত বহুদিন পরে হলেও পূর্বাবস্থান থেকে সরে এসে বিগত নির্বাচনটি যে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল তাই তিনি স্বীকার করেছেন। এটা তার সৎসাহসী উচ্চারণ। এ উচ্চারণে শুধু বিরোধী রাজনৈতিক দলেরই নয়, জনমতেরও প্রতিফলন ঘটেছে।

সবাই চায় আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনটি প্রশ্নাতীত, অবিতর্কিত, সব নিবন্ধিত দলের অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হোক। কীভাবে তা হবে? নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত। অবশ্য প্রধান দুই দলই পূর্বাবস্থান ত্যাগ করেছে প্রকাশ্যেই। বিএনপি এখন আর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলছেন, এখন তারা বলছে নির্বাচনকালীন ‘সহায়ক সরকারের’ কথা। আওয়ামী লীগও তাদের দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন করতে হবে তেমন অবস্থানে নেই। দশম সংসদ নির্বাচনের সময়ই তারা ‘সর্বদলীয় সরকারের’ ফর্মুলা দিয়ে রেখেছে। বোঝা যায় নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে প্রধান দুই দল খুবই কাছাকাছি আছে। সময়ে এ ব্যাপারে একটা ঐকমত্য বা সমঝোতায় পৌঁছানো যাবে বলে আস্থা রাখা যায়। সমন্বয়, সমঝোতা ও সহাবস্থান গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। বড় প্রশ্ন হচ্ছে, যে নির্বাচন কমিশনের অধীনে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে সেটি কেমন হবে।

নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে সমঝোতা হলেও নবগঠিতব্য নির্বাচন কমিশনটি যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয় তাহলে নির্বাচনকালীন সমঝোতার সরকার থাকার পরও নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে; নির্বাচনটি অশংগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য এবারও না হতে পারে। তাই একটি গ্রহণযোগ্য ও শক্তিশালী নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন খুবই জরুরি। যে প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন তা সংবিধান সমর্থিত না হলেও বিএনপিসহ সব দলই তা মেনে নিয়েছে। এখন আলোচনা হচ্ছে কমিশন গঠনের উদ্দেশ্যে ‘সার্চ কমিটি’ গঠনের লক্ষ্যে। সংবিধানে ‘সার্চ কমিটির’ কোনো অস্তিত্ব নেই। আছে আইনের বিধানের কথা। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুুর রহমান সার্চ কমিটির ধারণাটি চালু করেন। সে যাই হোক, উদ্যোগটা মূলত নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যেই। ধারণা করা যায়, প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিতেই রাষ্ট্রপতি উদ্যোগটি ভালোভাবে নিয়েছেন। সবাই তাকিয়ে আছেন এর ফলাফলের দিকে। বিএনপিকে আলোচনার জন্য রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণ, বিএনপির অংশগ্রহণ, আলোচনা শেষে রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রদত্ত প্রতিক্রিয়া আশাব্যঞ্জক।

রাষ্ট্রপতি বলেছেন, বিএনপির প্রস্তাব গণতন্ত্রের জন্য শুভ, নির্বাচন কমিশন গঠনে সহায়ক হবে। বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনায় তারা সন্তুষ্ট। সব দলের মতামতের ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতি ভূমিকা রাখবেন বলে তারা আশাবাদী। কিন্তু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের মন্তব্য দুর্ভাগ্যজনক বলে অভিহিত করছেন পর্যবেক্ষকরা। তার বক্তব্যে নেতিবাচকতাই শুধু নয়, কটাক্ষ আছে। রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ ও বিএনপিকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ, বিএনপির অনুকূল প্রতিক্রিয়া বোধহয় তার কাছে ভালো লাগছে না। বিএনপি আলোচনায় না এলে তিনি বোধহয় তা নিয়ে রাজনীতি করতে চেয়েছিলেন। বিএনপিকে আলোচনার প্রক্রিয়ায়ই শুধু নয়, মনে হয় আগামী নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে এবারও বাইরে রেখে ফাঁকা মাঠে আবারও গোল দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন তিনি। হয়তো ভাবেননি যে, তার অবস্থানটা দলের নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদিচ্ছা ও প্রকাশ্য অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে গেছে।

তিনি বিএনপির প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিদ্রূপের সুরে বলেছেন, ‘বিএনপির এ আনন্দ, বেশি বেশি আনন্দ শেষে না বিষাদে পরিণত হয়ে যায়। ’ তার বক্তব্যে এমন ইঙ্গিতই আছে যে, আলাপ-আলোচনা যতই হোক ‘তালগাছ’ তারা ছাড়বেন না। তখন কোথায় যাবে বিএনপির এ আনন্দ! পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, তার বক্তব্য তার দলের বা তাদের দলীয় সরকারের নয়। দলগতভাবে আওয়ামী লীগ এবং তাদের সরকার নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে আলোচনা ফলপ্রসূ করতে আগ্রহী বলে মনে করছেন অভিজ্ঞজনরা। তারা এমনও বলছেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দলের সাধারণ সম্পাদক থাকলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য করতেন না। কেননা একটি জাতীয় নির্বাচনকে অর্থবহ ও অবিতর্কিত করার জন্য সব দায়িত্বশীল দলকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত করা বা রাখা ক্ষমতাসীন সরকারেরও একটা উদ্দেশ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। আলোচনা থেকে কাউকে বের করে দেওয়া সরকার ও সরকারি দলের উদ্দেশ্য হওয়া কাম্য নয়।

নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতির একক সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বিএনপি জানে না তা নয়। তবুও তারা আলোচনায় এসেছে, আনুষ্ঠানিকভাবে ১৩ দফা প্রস্তাব দিয়েছে। তারা এমন দাবি করেনি যে, তাদের সব দাবি মেনেই কমিশন গঠন করতে হবে। বরং সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতার কথা বলেছে। সবার মধ্যে আওয়ামী লীগও আছে। ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে বিএনপিকে অবজ্ঞা ও অগ্রাহ্য করার অরুচিকর ধ্বনি আছে। এক্ষেত্রে সর্বসাধারণের কাছে বিএনপির অবস্থানটা রুচিকর ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে বলে মনে হয়। রাষ্ট্রপতি যে উদ্যোগ নিয়ে প্রক্রিয়াটি শুরু করেছেন, সবার উচিত একে সফল করার জন্য সর্বোত সহযোগিতা করা।

রাষ্ট্রপতি বিএনপির প্রস্তাবকে গণতন্ত্রের জন্য ভালো এবং কমিশন গঠনে সহায়ক হবে বলে যে মন্তব্য করেছেন, ওবায়দুল কাদের এবং আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন বিএনপির প্রস্তাবকে অন্তঃসারশূন্য বলে রাষ্ট্রপতিকে বিব্রত ও বিপন্ন করেছেন। আশা করি, এমন একটি উদ্যোগ বিনাশ করার কোনো খেলা আর খেলবেন না তারা। তাতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি নন, বিপন্ন হবে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা, ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ, জাতি ও সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রশাসনের সৌন্দর্য। আগামী নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার সঙ্গে প্রধান দুই দলেরই স্বার্থ আছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে ভাবমূর্তি সংকটে আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ সংকট কাটানো না গেলে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ইমেজ, তার দলের ইমেজ এবং সর্বোপরি দেশের ইমেজ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মতো আরেকটি নির্বাচনের বোঝা প্রধানমন্ত্রী বয়ে বেড়াতে চান না, তা তিনি নিজেই স্পষ্ট করেছেন। তাই একটি অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। অপরদিকের পর পর দুটি নির্বাচন বর্জন করলে বিএনপি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন সংকটে পড়তে পারে।

তাছাড়া নির্বাচনমুখী দল হিসেবে বারবার নির্বাচন বর্জন করলে বিএনপির সাংগঠনিক অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার মুখে পড়বে। তাই আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের একটা সম্মানজনক পথ খুঁজে নিতে হবে তাদের। গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমে নানা বিষয়ে একটা সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। বিএনপি বহুদিন ধরেই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের সঙ্গে সংলাপের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। সরকার পক্ষ বারবার তা নাকচ করেছে।

নির্বাচন কমিশন গঠন উপলক্ষে তারা সংলাপের একটা সুযোগ পেয়েছে। এটাকে কাজে লাগাতে চাইবে তারা যাতে এ আলোচনার সূত্র ধরে পরবর্তী নির্বাচন নিয়েও সরকারের সঙ্গে একটা সমঝোতায় পৌঁছতে পারে। ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য যদি সরকারি বক্তব্য হয় তাহলে ধরে নিতে হবে সরকার পক্ষ সমঝোতা চায় না। যদি শেষ পর্যন্ত তা-ই হয়, এর পরিণাম কারও জন্যই সুখকর হবে না। প্রার্থনা করি, দেশ যেন আবার স্বস্তির জায়গা থেকে অস্বস্তি-অশান্তির দিকে ধাবিত না হয়।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

ই-মেইল : [email protected]

‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ থেকে সংগৃহীত।

কমেন্টস