Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৯ বুধবার, সেপ্টেম্বার ২০১৮ | ৪ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

দিয়ার বাবার দুটি কথা, সড়কের নৈরাজ্য ও তারুণ্যের প্রতিবাদ

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২ আগস্ট ২০১৮, ০৫:০০ PM আপডেট: ০২ আগস্ট ২০১৮, ০৫:১১ PM

bdmorning Image Preview


আল আমিন হুসাইন।।

‘আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ, স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি, আঠারো বছর বয়সেই অহরহ বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।’ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখনিতে উঠে এসেছে আঠারোর জয়গান, তারুণ্যের জয়গান। দেশের যেকোন বিজয়ে জাতীয় পতাকা নিয়ে আনন্দে মাঠে নেমে এসেছে তরুণরা। তারুণ্যদীপ্ত এই কণ্ঠগুলো বলেছ, এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।

‘আঠারো বছর বয়স ভয়ঙ্কর, তাজা তাজা প্রাণে অসহ্য যন্ত্রণা। এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়, আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা।’

দেশে যখন সড়ক দুর্ঘটনায় অসহায়ভাবে একের পর এক তাজা প্রাণ বির্সজন যাচ্ছিলো। যখন এক একটা মৃত্যু আর লাশ নিয়ে স্বজনরা ডুকরে কাঁদছে। সেই মুহূর্তে সহপাঠীর মৃত্যু নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে এই তারুণ্য। এই বয়সটা যে মাথা নোয়াবার নয়, তারা কাঁদেনি তারা আর সড়ক দুর্ঘটনার নামে হত্যাকাণ্ডে আর কাউকে কাঁদতে দিবে না। তাইতো টানা পঞ্চম দিনের মতো রাজধানী বিভিন্ন পয়েন্টে অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা। জাতীয় পতাকা নিয়ে বিক্ষোভ আর স্লোগানে মুখর করেছে পুরো রাজধানী।

যাদেরকে কোমলমতি আখ্যা দিয়ে এতদিন আদর করে ঘরে আগলে রাখতো মা-বাবা। সেই মা বাবাও হয়ত আজ সেই কোমলমতি সন্তানকে বলেছে, যাও রাস্তায় নামো। বলবেই না কেন। একদিন যে রাজীব ও দিয়ার মতো নিজের কোমলমতি সন্তানের লাশ বুকে নিয়ে কাঁদতে হবে না তার কী কোন নিশ্চয়তা আছে।

কিছুদিন আগেই রাজীব নামের তিতুমীর কলেজের ছেলেটা দুই বাসের রেষারেষিতে হাত হারিয়ে অবশেষে মারা যান। সে সময় দুই বাসের মাঝখানে আটকা পড়া রাজীবের ডান হাত জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। এরপর থেকে গত কয়েক মাসে সড়ক দুর্ঘটনার অঙ্গহানির মিছিল যেন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুলিশের হিসাবে শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৫ হাজার ৬৫৪ জনের। এই পরিসংখ্যানটা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের হিসাব আর বর্তমানের তুলনায় যে অনেক বেশি সেটা সহজেই অনুমেয়। কম বয়সের গাড়ির চালক বনে যাওয়া, টাকার বিনিময়ে সকল নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিজেদের পকেটে নিয়ে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো, রাস্তায় নেমে এক গাড়ির সাথে অন্য গাড়ির প্রতিযোগিতা, বেশি বার পরিবহন কর্মীদের ভাষায় খ্যাপ মারার তাড়া,ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকাসহ অনেকগুলো কারণ এর জন্য দায়ী।

এগুলোর কারণে সংগঠিত হওয়া দুর্ঘটনাকে শুধুমাত্র দুর্ঘটনা বলা ভুল হবে। এটা এক ধরণের হত্যা, এক ধরনের নৈরাজ্য। যে হত্যার প্রতিবাদ হলে, সাজা হলে রাস্তায় নেমে যায় স্বার্থানেষী একটি দল।

ঢাকা শহরের প্রতি বাসে আজ সংঘর্ষের দাগ। কতশত রাজিব,নার্গিসদের হাত-পা হারানোয় অবদান রেখে চলেছে প্রতিদিন তার হিসাবটা কে রাখে। মীম-রাজীবদের প্রাণ হারানো রক্তের দাগ লেগে আছে এসব যানবাহনে। যেখানে মানুষের ভীড়ে রাস্তায় হেটে যেতেও অনেক কষ্ট হয়। সেখানে একটু ফাঁকা রাস্তা পেলেই এক গাড়ি অপর গাড়ির সাথে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে। তখন তাদের কাছে এগুলো একটা খেলা মনে হয়। যে অন্য গাড়িকে ধাক্কা দিতে পারলেই নিজের   জয়।

এই উন্মাদ প্রতিযোগিতায় হয়ত তাদের জয় হয়। কিন্তু হারিয়ে যায় তারুণ্য,হারিয়ে যায় তাজা তাজা প্রাণ, নিভে যায় জাতির ভবিষাৎ, হারিয়ে যায় তারেক-মিশুক মনিরের মত দেশের সম্পদ।

কোন দুর্ঘটনা প্রত্যাশিত না। কিন্তু চালকের ভুলে,পরিবহনের কারণে প্রাণ যাওয়া কাম্য নয়। গত রবিবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর কুর্মিটোলা এলাকায়  তিন বাসের রেষারেষিতে কুর্মিটোলায় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের  দুই শিক্ষার্থী আবদুল করিম ওরফে রাজীব (১৭) এবং একই কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মীম (১৬) নিহত হয়। রাস্তার পাশে  দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর যেভাবে নির্বিচারে গাড়ি চালিয়ে পিষে মারা হলো সেটা একটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডই বলা যেতে পারে। এছাড়া কয়েক দিন আগে পায়েল নামে এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বাসে উঠতে গিয়ে পড়ে গিয়ে আহত হলে হাসপাতালে না নিয়ে তাকে নদীতে ফেলে দেয় বাস চালক ও হেলপার। পরে নদীতে থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

এসব ঘটনা আমাদেরকে আবারও দেখিয়ে দিলো দেশে পরিবহন খাতে এক ধরনের নৈরাজ্য চলছে। পরিবহন খাতের শ্রমিকদের অদক্ষতা, এই  খাতে সাথে সংশ্লিষ্টদের উদাসীসনতাকেই প্রমাণ করে। দিয়া-রাজীব নামের যে দুই কলেজ শিক্ষার্থীকে পিষে মারা হয়েছে। সেই বাসের চালকের বাস চালানোর কোন লাইসেন্সই ছিল না। হালকা যানবাহন যেমন মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার বা লেগুনার মতো পরিবহনগুলো চালানোর লাইসেন্স আছে। কিন্তু সে কিভাবে বাস চালানোর অনুমতি পেল। সেটা নিশ্চয় এই খাতের সাথে জড়িতদের উদাসীনতা অথবা নিজেদের পকেট ভারী করে দেয়া হয়েছে।

পরিবহন শ্রমিকদের বর্তমান অবস্থা কেমন সেটা মেয়ে হারানো দিয়ার বাবার আর্তিতে বুঝা যায়, মেয়ে হারিয়ে পাগলপ্রায় দিয়ার বাবা বলেছেন, ‘২৭ বছর ধরে আমি মহাসড়কগুলোতে গাড়ি চালাই। আমার গাড়িতে কখনও এমন দুর্ঘটনা ঘটেনি। অথচ আমার মেয়েই বাসচাপায় নিহত হয়েছে।’

দিয়ার বাবা বলেছেন, ঢাকা শহরে যারা হেলপার, তারাই দুই দিন পর হয়ে যাচ্ছেন ড্রাইভার। তার ভাষায়, ‘এরা মানুষ মারবো না তো কী? এদের কোনো ঠিকানা নাই। আপনারা আসল জায়গায় হাত দেন।’

দিয়ার বাবা সবার জানা কিন্তু বাস্তবায়ন না করা দুটি সত্য কথা বলেছেন, এক. বাসের হেলপার ওস্তাদের  হাত ধরে দুদিন পরে হয়ে যাচ্ছেন বাসের ড্রাইভার। ওস্তাদও তার যোগ্য সাগরেদ যে কীনা দুদিনেই ড্রাইভার বনে গেলেন তার হাতেই তুলে  দিচ্ছেন এতগুলো মানুষের জীবন। দুই. আসল জায়গায় হাত দেয়া। এই আসল জায়গাটা কোথায় সেটা সবার জানা। এই খাতের সবাই জানে সেই জায়গায় কতশত ঘাবলা।

নিজের সহপাঠীদের হারিয়ে তাই এবার সেই আসল জায়গায় হাত দেয়ার দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছে তারুণ্য। এই তারুণ্যের যেন মাথা নোয়াবার নয়। অবাক করে দেয় তাদের প্রতিবাদের ভাষা। আবেগাপ্লুত হয়ে যেতে হয় তাদের আর্তিতে, এক ছোট্ট স্কুলগামী শিশু প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে বলেছে, ‘পুলিশ অ্যাংকেল, আপনার চা-সিগারেটের টাকা আমার টিফিনের টাকা থেকে দিয়ে দিবো, আপনি এসব গাড়ি চালাতে দিয়েন না।’

‘এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য, বাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে, প্রাণ দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্য,সঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে।’

নিচের সহপাঠীর,নিজের ভাইয়ের তাজা রক্ত, তাজা প্রাণ এই তরুণদের রক্ত দিতে শিখিয়েছে। পুলিশের  দমনের মুখে রক্ত ঝরেছে অনেক কোমলমতি শিক্ষার্থীর। এরপরও তারা দমে যায়নি। নিজেদেরকে রক্ত ঝরাকে পুণ্য মনে করে আবারও নেমে এসেছে রাস্তায়। প্ল্যাকার্ড হাতে নেমে এসেছে প্রতিবাদের মিছিলে।

আমরা দেখেছি চলমান আন্দোলনের মধ্যে পুলিশের নিষ্ঠুর অত্যাচারের মধ্যে নিজেদের সঁপে দিয়েছে আন্দোলনের কোলাহলে। চলন্ত গাড়ির সামনে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন এসব শিক্ষার্থীরা।

‘আঠারো বছর বয়সে প্রাণ তীব্র আর প্রখর, এ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা।’ আমাদের দেশে যেকোন আন্দোলনের শুরুটা ঠিক থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেটা গিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয় অথবা পরিণত করা হয়। আন্দোলনকারীরা কতশত সু-কুমন্ত্রণায় নিজেদের ভাসিয়ে দেয়। কিন্তু এই তরুণেরা কোন কিছুতে কান দেয়নি। শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করেছে। গাড়ি ভাংচুর না করতে একে অপরকে তারা বাঁধা দিচ্ছেন। যদিও শুরুতে কিছু গাড়ি ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে।

বাস,প্রাইভেটকার,ট্রাকের, মোটরসাইকেলের লাইসেন্স দেখছেন। আমাদের দেশে এসব চালকদের বা গাড়ির লাইসেন্স সঠিক না থাকলেও সেটা একপাশে গিয়ে ঠিক করা যায় সহজে অথবা অপরাধের একটা কাগজের বিনিময়ে কিছু কাগজে নোট পকেটে মেরে দিলেই সব ঠিক।

আমরা দেখেছি, অনিয়ন্ত্রিত রিকশার নগরীর রিকশাগুলোকে কত সুষ্ঠুভাবে লাইন ধরে চলার সুবিধা করে দিয়েছে এই তারুণ্য। অ্যাম্বুলেন্সকে ভীড় ঠেলে দ্রুত  বের করে দিচ্ছে। পুলিশের গাড়ি থেকে শুরু করে মন্ত্রীর গাড়ি পর্যন্ত আটকেছে শুধু তারুণ্যের এই সাহসে। এই তারুণ্য দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা যায়।

চলমান আন্দোলনের বিষয়ে বেশিরভাগ লোকের স্বতস্ফূর্ত সমর্থন আছে সেটা আমরা জেনেছি। আমরা দেখেছি, অনেক পথচারী সহসায় বলেছেন, আমাদের দুটি দিন কষ্ট হোক তারপরর শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সফল হোক। কেনই বা বলবে  না, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও মানুষ বাঁচতে চায়। আপনি আমি সবাই আজ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আছি। ঘর থেকে প্রিয়জনের মুখ দেখে বের হয়ে আবার হাসিমুখে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারবেন তার কোন নিশ্চয়তা নেই। চলমান আন্দোলনের  মধ্যেই গত মঙ্গলবার কুমিল্লায় স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে যাত্রীবাহী বাসচাপায় আকলিমা আক্তার (১৬) নামে এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। অসুস্থ বান্ধবীকে বাসায় নিয়ে যাচ্ছিল আকলিম।

এছাড়া আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার দোহার উপজেলায় ট্রাকের ধাক্কায় মো. রেসাদ (১২) নামে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। ফলে এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে, সড়কের এই নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে তারুণ্যের এই প্রতিবাদে সবাই সমর্থন দিচ্ছেন। রিকশাচালকের সাথে কথা বলে জেনেছি, তারাও শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের সমর্থন দিচ্ছেন। যদিও তাদের সাময়িক অসুবিধা হচ্ছে।

কিশোর কবি সুকান্ত বলেছেন, তবু আঠারোর শুনেছি জয়ধ্বনি, এ বয়স বাঁচে দুর্যোগে আর ঝড়ে, বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী,এ বয়স তবু নতুন কিছু তো করে।

এই আঠারো বছর আবারও দেখিয়ে দিল এই বয়স ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে নতুন কিছু করতে পারে। আজকের পরিবহন খাতের নৈরাজ্যের মধ্যে, বিপদের মধ্যে তারাই তো অগ্রণী ভূমিকা পালন করলো। এক একটা প্রাণ যাওয়ার পরে ব্যানার হাতে যে প্রতিবাদ  আলোর মুখ দেখেনি এতদিন। তারুণ্যের মুখরিত প্রতিবাদে আজ তার জয় হতে যাচ্ছে। তারুণ্যের জয় হোক। গড়ে উঠুক নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ নগর। তারুণ্য ইতিহাস তৈরি করুক।

Bootstrap Image Preview