প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ছাত্রলীগ নেতা রনির হাতে চড় খাওয়া সেই ব্যবসায়ী 

প্রকাশঃ এপ্রিল ২১, ২০১৮

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

চাঁদা দাবির জেরে চট্টগ্রাম ছাত্রলীগ নেতার হাতে মারধরের শিকার সেই কোচিং ব্যবসায়ী প্রাণভয়ে বাড়ি ছাড়া হয়েছেন। থানায় অভিযোগের পর ছাত্রলীগ নেতা নুরুল আজিম রনির কর্মকাণ্ডে স্বজনদের বাড়িতে বাড়িতে থাকছেন তিনি। সেই সঙ্গে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছেন তিনি।

এদিকে রনির বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্তে মারধরের সত্যতা পাওয়ার পর ব্যবসায়ীর দেয়া অভিযোগকে এজাহার ধরে মামলা নিয়েছে পুলিশ। আর এতে রনি ও নোমান চৌধুরী রাকিবসহ ৮-৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, এ মামলায় পাওয়ামাত্রই গ্রেফতার করা হবে রনি ও সহযোগীদের।

রনির একের পর এক অপকর্মে বিব্রত চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। বিষয়টিকে কেউ কেউ ব্যক্তিগত অপরাধ বলছেন, কেউ কেউ বলছেন- এটা জঘন্য ঘটনা। এতে ছাত্রলীগকে কলঙ্কিত করা হয়েছে।

১৭ ফেব্রুয়ারি এ ঘটনা ঘটলেও ভয়ে তিনি বিষয়টি প্রকাশ করেননি। এরই মধ্যে ১৩ এপ্রিল অপহরণ করে রনির অফিসে তুলে নিয়ে আরেক দফা মারধর করা হয় রাশেদকে। কেড়ে নেয়া হয় পাসপোর্টও।

এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী ওই কোচিং ব্যবসায়ী রাশেদ মিয়া জানান, থানায় অভিযোগ করার পরপরই দুপুরে রনি কয়েকটি মোটরসাইকেলে লোকজন নিয়ে নগরীর সুগন্ধা এলাকায় আমার বাসায় হানা দেয়। ওই সময় আমি ও আমার স্ত্রী বাসায় ছিলাম না। তবে তারা বাসায় থাকা লোকজনকে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসে। আমাকে বাসায় না পেয়ে সে আমার কোচিং সেন্টারে গিয়ে গালিগালাজ করে ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এছাড়া আমার মোবাইল ফোনে বেনামে বিভিন্নজন ফোন করে হুমকি দিচ্ছে।’

রাশেদ বলেন, আগে থেকেই ও আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে আসছিল। এসব ঘটনার পর আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। তাই রাতে (বৃহস্পতিবার) থানায় জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করেছি।

তিনি বলেন, ‘অব্যাহত হুমকির মুখে বাসায় থাকতে পারছি না। কখনও এর বাসায় কখনও ওর বাসায় গিয়ে থাকতে হচ্ছে। এ অবস্থায়ও নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারছি না। জানি না এ অবস্থায় আর কতদিন থাকতে হবে।’

রনি নিজেকে কোচিং সেন্টারটির ব্যবসায়িক অংশীদার বলে যে বিবৃতি দিয়েছে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন রাশেদ। তিনি বলেন, ‘সে (রনি) দুটি চেকের মাধ্যমে আমাকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা দেয়ার যে দাবি করেছে তা সত্য নয়। তার কাছে যদি ওই চেকের কোনো কপি থেকে থাকে, তাহলে দেখাতে বলুন। বিষয়টি তখন পরিষ্কার হয়ে যাবে। রনি বিভিন্ন সময় জোর করে আমার অফিসে ঢুকে চাঁদা চাইত। না দিলে গালিগালাজ ও মারধর করত।’

জিডির বিষেয়ে পাঁচলাইশ থানার ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘ইউনিএইড কোচিং সেন্টারের মালিক রাশেদ মিয়া বৃহস্পতিবার চাঁদা দাবি ও মারধরের যে অভিযোগ দিয়েছেন, তা সেদিনই মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। এতে প্রধান আসামি নুরুল আজিম রনি। এছাড়া নোমান নামে এক ছাত্রলীগ নেতাকে আসামি করা হয়েছে। এ দু’জনের বাইরে অজ্ঞাত আরও ৭-৮ জন মামলাটির আসামি। ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। আমরা আসামিদের খুঁজছি। তাদের পাওয়ামাত্রই গ্রেফতার করা হবে।’

গত বৃহস্পতিবার পাঁচলাইশ থানায় অভিযোগ করেন নগরীর জিইসি মোড় এলাকার ইউনিএইড কোচিং সেন্টারের মালিক রাশেদ মিয়া। এতে তিনি লেখেন, ২০ লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রনি অফিসে এসে তাকে ব্যাপক মারধর করেন। নুরুল আজিমের চড় মারার ভিডিও গতকাল বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

ভিডিও চিত্রটি গত ১৭ ফেব্রুয়ারির বিকালের। ওই দিন বিকেল ৫টা ২৬ মিনিট থেকে ৩২ মিনিট পর্যন্ত ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, রাশেদ মিয়া কোচিং সেন্টারে তাঁর কার্যালয়ে বসে আছেন। সেখানে ঢুকে নুরুল আজিম উত্তেজিত হয়ে যান। একপর্যায়ে রাশেদ মিয়ার চুল ধরে টানাহ্যাঁচড়া করতে থাকেন। এরপর চড়-থাপ্পড় মারতে থাকেন। ছয় মিনিটের ভিডিওতে দেখা যায়, রাশেদ মিয়াকে ১৩টি চড় মারেন নুরুল আজিম। এ সময় হাত জোড় করে ছিলেন রাশেদ মিয়া।

মারধরের ভিডিও ফুটেজ বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। রাতে ছাত্রলীগ তাকে পদ থেকে অব্যহতি দেয়।

এর আগেও ৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জাহেদ খান বাদী হয়ে নুরুল আজিমসহ ছাত্রলীগের সাত নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে নগরের চকবাজার থানায় ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে মামলা করেছিলেন। প্রবেশপত্রের সঙ্গে উন্নয়ন ফি বাবদ পাঁচ হাজার টাকা নেওয়াকে কেন্দ্র করে গত ২৯ মার্চ বিজ্ঞান কলেজে নুরুল আজিমের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেন। সেদিন কলেজ কর্তৃপক্ষ ৩১ মার্চ বাড়তি ফি ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেয়। এরপর কর্তৃপক্ষ টাকা ফেরত দিতে গড়িমসি করায় ৩১ মার্চ দুপুরে নুরুল আজিম আবারও ওই কলেজে যান। তখন টাকা ফেরত দেওয়া নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডার একপর্যায়ে নুরুল আজিম ও তাঁর কর্মীরা অধ্যক্ষকে শারীরিকভাবে আঘাত করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

কমেন্টস