আমরা গরিব বলেই কী বিচার পাবো না: তনুর মা

প্রকাশঃ মার্চ ২০, ২০১৮

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু হত্যার দুই বছর পূর্ণ হয়েছে আজ মঙ্গলবার। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সন্দেহভাজন হত্যাকারী হিসেবে কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি।

তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেছেন, ‘মেয়ে হারিয়ে আমি এবং আমার পরিবার যে কী কষ্টে আছি, তা বলে বোঝানোর মতো নয়। মার্চের ২০ তারিখ এলেই আমার বুকের ভেতর আগুন জ্বলে ওঠে। কে করবে আমার সন্তান হত্যার বিচার? আমার সন্তান নেই, সন্তানের বিচারও নেই।’

সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের  দুই বছরে মামলার অগ্রগতি নিয়ে এসব কথা বলেন গিয়ে অশ্রুসিক্ত তনুর মা বলেন,  ‘কিছুদিন আগে জালাল উদ্দিন নামে সিআইডির এক কর্মকর্তা আমাদের বাসায় আসেন। এরপর তনুর ঘাতকদের চিহ্নিত করা ও বিচারের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়ে গেছেন। দুই বছরেও এ দেশে কোনও হত্যার রহস্য উদঘাটন হয় না, এটা কেমন কথা! আমরা গরিব বলেই কী বিচার পাবো না।’

ধরে আসা গলায় তিনি আরও জানান, মেয়ের শোকে তনুর বাবা এখন শয্যাশায়ী। তার অফিসে যাওয়াও বন্ধ। আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘তার শরীরের যে অবস্থা, মনে হয় আর চাকরিটাও করতে পারবেন না।’

তিনি বলেন, ‘আমার দিন যে কীভাবে কাটে, বলে বোঝাতে পারবো না। আমার সংসারটার অবস্থাও বেহাল। বোন হারিয়ে আমার দুই ছেলেও অসুস্থ।’

আনোয়ারা বেগম দাবি করেন, ‘যারা আমার মেয়েকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে, আমি তাদের নাম সরাসরি বলেছি। সার্জেন্ট জাহিদের স্ত্রী অনেকটা জোর করে তার বাসায় তনুকে টিউশনি করার জন্য নিয়েছিলেন। এ টিউশনির তিন মাসের মাথায় আমার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের (সার্জেন্ট জাহিদ ও তার স্ত্রী) পূর্ব-পরিকল্পনা মতো আমার মেয়ে হত্যা করা হয়েছে। সার্জেন্ট জাহিদ ও তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যাকারীদের পরিচয় জানা যাবে। তাদের বিচারের আওতায় আনার জন্য আমি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, ‘সন্তান হারিয়ে আমি শয্যাশায়ী। শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো না। তিন মাসের মেডিক্যাল ছুটি নিয়েছি। হাঁটতে পারি না। তনুর জন্য মঙ্গলবার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের দুই মসজিদে দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘মেয়ে হত্যার বিচার দেখে যেতে পারবো কিনা আল্লাহ জানেন। দুই বছরেও কিছুই হলো না। এটা ভাবতে গেলে বুকের ভেতরে হাহাকার ওঠে। দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। কিছুই বলার নেই। যারা আমার মেয়েকে হত্যা করেছে, আল্লাহ তাদের বিচার করবেন।’

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেননি তনু। পরে তার স্বজনরা খোঁজাখুঁজি করে রাতে সেনানিবাসের ভেতরে একটি জঙ্গলে তনুর লাশ পান। পরদিন তার বাবা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। থানা পুলিশ ও ডিবির পর ২০১৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি কুমিল্লা। তনুর দুই দফা ময়নাতদন্তে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ মৃত্যুর সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখ করেনি। শেষ ভরসা ছিল ডিএনএ রিপোর্ট।

গত বছরের মে মাসে সিআইডি তনুর জামা-কাপড় থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানায়। পরে সন্দেহভাজনদের ডিএনএ ম্যাচিং করার কথা থাকলেও তা করা হয়েছে কিনা– এ নিয়েও সিআইডি বিস্তারিত কিছু বলছে না। সর্বশেষ সন্দেহভাজন হিসেবে তিনজনকে ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সিআইডির একটি দল ঢাকা সেনানিবাসে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদ করা ব্যক্তিরা তনুর মায়ের সন্দেহ করা আসামি বলেও সিআইডি জানায়। তবে তাদের নাম জানানো হয়নি।

এদিকে, সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২২ নভেম্বর ঢাকা সিআইডি কার্যালয়ে ইয়ার হোসেন, আনোয়ারা বেগম, তনুর চাচাতো বোন লাইজু ও চাচাতো ভাই মিনহাজকে দিনভর নানা বিষয় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন ঢাকা সিআইডির কর্মকর্তারা।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিআইডির কুমিল্লা-নোয়াখালী অঞ্চলের সহকারী পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন আহম্মদ বলেন, ‘এ সময়ে অন্তত দেড় শ লোককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের তালিকায় থাকা আরও ৪-৫ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাঁদের কেউ কেউ দেশের বাইরে ও প্রশিক্ষণে আছেন। জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই মামলার তদন্ত একটা পর্যায়ে যাবে।’

কমেন্টস