বাড়িতে বাবার লাশ, আইসিইউতে মা, মাহিকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় স্বজনরা 

প্রকাশঃ মার্চ ১৯, ২০১৮

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

নেপালে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত ইউএস বাংলার পাইলট আবিদ সুলতানের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। রাজধানীর বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে আবিদ সুলতানকে। এদিকে হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন আবিদ সুলতানের স্ত্রী আফসানা খানম। তার শারীরিক অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎিসকরা।

এই অবস্থায় ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান ও আফসানা খানমের একমাত্র সন্তান তামজিদ মাহিকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় সবাই। একদিকে বিমান বিধ্বস্তে বাবাকে হারিয়েছেন অন্যদিকে হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন মা। বাবার মৃত্যু ও মায়ের এমন অবস্থায় ভেঙে পড়েছে মাহিম। কিভাবে সহ্য করবেন এই ধাক্কাস কি বলে সান্ত্বনা দেবেন স্বজনরা সেই ভাষাই খুঁজে পাচ্ছেন না।

এটুকুন ছেলেকে একবার হাসপাতালে ছুঁটতে হচ্ছে মায়ের অবস্থা জানতে, অন্যদিকে বাবার মরদেহের জন্যও তাকেই যেতে হয়েছে।

তামজিদ মাহি রাজধানীর উত্তরার মাস্টারমাইন্ড ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র। তার এবার ‘ও লেভেল’ পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু এ অবস্থায় পরীক্ষা না দিতে পারাসহ তার বর্তমান অবস্থা নিয়েও শঙ্কিত স্বজনরা।

আজ সোমবার আগারগাঁওয়ের নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে আফসানা খানমকে দেখতে আসা স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা যায়।

চিকিৎিসকরা জানিয়েছেন, জীবনরক্ষাকারী ভেন্টিলেটর মেশিনের সাহায্যে কৃত্রিম উপায়ে অক্সিজেন দিয়ে তার শ্বাস-প্রশ্বাস (হার্ট) চালু রাখার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। তবে এ ধরনের জটিল রোগীদের কৃত্রিম উপায়ে যতটুকু অক্সিজেন টানার কথা (শতকরা ৯০ ভাগ) সে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার অক্সিজেন টানতে পারছেন না তিনি। অক্সিজেনের মাত্রা ৯০ ভাগের কমে উঠানামা করছে।

তার চোখের মণি বড় হয়ে আছে। ফলে তার মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কাজ না করায় শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচিয়ে রাখা আদৌ সম্ভব হবে কি-না তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন আইসিইউ চিকিৎসকরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, আফসানা খানমের শারীরিক অবস্থা খুবই জটিল। এ ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে ব্রেন অকেজো, কিডনি বিকল ও প্রস্রাব বন্ধসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অচল হয়ে পড়ে। তাকে সুস্থ করে তুলতে চেষ্টার কমতি নেই মন্তব্য করে ওই কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে ‘মিরাকল’ না হলে বাঁচিয়ে রাখা বেশির ভাগ সময়েই সম্ভব হয় না, এটাই চরম সত্য ও বাস্তব কথা।

আফসানার সবশেষ শারীরিক অবস্থা নিয়ে আইসিইউতে কর্মরত চিকিৎসক ডা. মাসুদ খান বলেন, আমরা দুই শতাংশ সম্ভাবনা নিয়ে এগোচ্ছি। ওনার কিডনি, ফুসফুস ও হার্ট এখনো সচল রয়েছে।

এর আগে গতকাল রবিবার রাজধানীর উত্তরার বাসায় স্ট্রোক করেন পাইলট আবিদ সুলতানের স্ত্রী আফসানা খানম। পরিবারের সদস্যরা তাকে আগারগাঁওয়ের নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করেন। তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হওয়ায় অস্ত্রোপচারের পর নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়।

গত ১২ মার্চ ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বিএস-২১১ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয়। দুর্ঘটনায় পাইলট আবিদ সুলতানকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হলেও একদিন পর ১৩ মার্চ চিকিৎসাধীন অবস্থান তিনি মারা যান।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, এভাবে তার মৃত্যুকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না সহধর্মিণী আফসানা খানম। স্বামীকে হারিয়ে কখনও বাকরুদ্ধ কখনও অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। তার স্বামী মারা যাননি, সবাই মিথ্যা কথা বলছে, আবিদ ফিরে আসবে, আবিদ তাকে সঙ্গে না নিয়ে মরতে পারে না এমন প্রলাপ বকতেন। স্বামীর শোকে কাতর অাফসানা গতকাল রোববার বাসায় ব্রেইন স্ট্রোক করেন।

এর আগে সোমবার বাংলাদেশ সময় আড়াইটার দিকে নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দর থেকে বিমান বিধ্বস্তে নিহতের মরদেহবাহী বিমানটি বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। বিকাল ৩টা ৫৫ মিনিটে মরদেহবাহী বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি কার্গো বিমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

গত ১২ মার্চ কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণকালে বিধ্বস্ত হয় ইউএস-বাংলার ফ্লাইট বিএস২১১। এতে নিহত হন ৪৯ জন। তাদের মধ্যে ২৬ জনই বাংলাদেশি। এদের মধ্যে শনাক্ত করে ঢাকায় আনা হয়েছে এই ২৩ জনের মরদেহ।

যাদের মরদেহ আনা হয়েছে- আঁখি মনি, বেগম নুরুন্নাহার, শারমিন আক্তার, নাজিয়া আফরিন, এফএইচ প্রিয়ক, উম্মে সালমা, বিলকিস আরা, আখতারা বেগম, মো. রকিবুল হাসান, মো. হাসান ইমাম, মিনহাজ বিন নাসির, তামারা প্রিয়ন্ময়ী, মো. মতিউর রহমান, এস এম মাহমুদুর রহমান, তাহারা তানভীন শশী রেজা, অনিরুদ্ধ জামান, রফিক উজ জামান, পাইলট আবিদ সুলতান, কো-পাইলট পৃথুলা রশিদ, খাজা সাইফুল্লাহ, ফয়সাল, সানজিদা ও নুরুজ্জামান।

শনাক্ত না হওয়ায় আনা হয়নি পিয়াস রায়, নজরুল ইসলাম ও আলিফুজ্জামানের মরদেহ।

কমেন্টস