টাটা মাই কান্ট্রি ফর ফাইভ ডেইজ; ভ্রমণপিয়াসু পিয়াসের শেষ স্ট্যাটাস

প্রকাশঃ মার্চ ১৪, ২০১৮

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

বিমানে ওঠার আগে হজরত শাহ্জালাল বিমানবন্দরে বসে সেলফি তুলে ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন ভ্রমণ পাগল পিয়াস রায়। লিখেছিলেন ‘টাটা মাই কান্ট্রি ফর ফাইভ ডেইজ’। তবে কে জানতো এই দেশ ছেড়ে এই যাওয়ায় হবে তার চিরদিনের জন্য বিদায়।

গতকাল মঙ্গলবার(১৩মার্চ) বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের তালিকা। সেখানে পিয়াসের নাম রয়েছে। এ খবর জানতে পেরে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দাড়িয়াল ইউনিয়নের মধুকাঠি গ্রামে চলছে আহাজারি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পিয়াস বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দাড়িয়াল ইউনিয়নের মধুকাঠি গ্রামের বাসিন্দা বাবা সুখেন্দু বিকাশ রায়, মা পূর্ণা রানি মিস্ত্রি ও বোন শুভ্রা রায়ের আর্তনাদে পুরো গ্রাম শোকে স্তব্ধ।

জানা গেছে, বরিশাল নগরের নতুনবাজারস্থ মথুরানাথা পাবলিক স্কুলসংলগ্ন একটি ভবনের চতুর্থতলার একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন পিয়াস। তিনি গোপালগঞ্জের শেখ সাবেরা খাতুন মেডিক্যাল কলেজের এমবিবিএস কোর্সের শেষ বর্ষে ছাত্র ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ওই মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রলীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন।

বাবা সুখেন্দু বিকাশ রায় বলেন, ‘আমাদের এক ছেলে ও এক মেয়েসন্তান। দুজনের মধ্যে পিয়াস বড়। সে বরিশাল জিলা স্কুল থেকে এসএসসি ও ঢাকা নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে। পরবর্তী সময়ে গোপালগঞ্জের শেখ সাবেরা খাতুন মেডিক্যাল কলেজের এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হয়। এ বছর শেষে এমবিবিএস কোর্সে শেষ বর্ষের পরীক্ষা সম্পন্ন করে। নেপালে ঘুরতে গিয়েছিল।’

জানা যায়, ভ্রমণ পিয়াসু পিয়াস এসএসসি পরীক্ষার পর থেকে অবসর সময়ে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াত। এর আগেও ভারতে ছয়বার ও নেপালে দুইবার গিয়েছিল। কয়েক দিন আগে তার মেডিক্যাল কলেজের শেষ বর্ষের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। পরীক্ষা দিয়েই ঘুরতে প্রথমে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও পরে সে নেপালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

মা পূর্ণা রানি মিস্ত্রি বলেন, ‘রবিবার রাতে বরিশাল থেকে লঞ্চযোগে ঢাকায় যায় পিয়াস। ওকে লঞ্চঘাট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এসেছিলাম। পরের দিন সকালে ঢাকায় চাচাতো ভাইয়ের বাসায় গিয়ে ওঠে। সেখান থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যান নেপালের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করার জন্য।’ তিনি বলেন, বিমানে ওঠার আগে সোমবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সর্বশেষ ছেলের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। তখন পিয়াস জানিয়েছিল সে কিছুক্ষণের মধ্যে প্লেনে উঠবে। এরপর আর কোনো খবর তার পাওয়া যায়নি। কাঠমাণ্ডুতে এ দুর্ঘটনার পর থেকে আর পিয়াসের কোনো খোঁজ পাননি। শুনেছেন সে মারা গেছে।

ক্রন্দনরত সন্তান হারা ওই মা বলেন, ‘আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব। ওই ছিল আমাদের ভরসার মানুষ। তাকে নিয়ে অনেক স্বপন দেখতাম। সেই স্বপ্ন আমার পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’

পিয়াসের বোন শুভ্রা রায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ঢাকা বিমানবন্দর থেকে রওনা দিয়ে কাঠমাণ্ডুতে দুপুর সোয়া ২টায় পৌঁছানোর কথা ছিল। এই প্লেনে আগামী ১৬ মার্চ বিকাল ৩টায় কাঠমাণ্ডু থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা ছিল। সে ফিরতি টিকিট নিয়ে গিয়েছিল। দুটি টিকিটই অগ্রিম কাটা ছিল।’

বোনজামাই শুসময় সরকার বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ভ্রমণপিপাসু পিয়াস ছুটি পেলেই ঘুরতে বেরিয়ে পড়ত দেশ থেকে দেশান্তরে। আর আজ সেই ভ্রমণই তার বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাকে অনিশ্চিত করে দিয়েছে।’

এদিকে গোপালগঞ্জ শেখ সায়েরা খাতুন মেডিক্যাল কলেজ এখন শোকে স্তব্ধ। মেধাবী পিয়াসকে হারিয়ে শিক্ষক-সহপাঠীরা শোকে কাতর। কলেজের এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছিলেন পিয়াস। পরীক্ষা শেষে নেপালে ঘুরতে গিয়ে যে আর কোনোদিন ফিরবেন না তা কে ভেবেছিল। পিয়াসের মৃত্যুতে গতকাল মঙ্গলবার ওই মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ক্লাস ও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়।

উল্লেখ্য, নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার বিমানটি সোমবার স্থানীয় সময় বেলা ২টা ২০ মিনিটে অবতরণের কথা ছিল। নামার আগেই এটি বিধ্বস্ত হয়ে বিমানবন্দরের পাশের একটি খেলার মাঠে পড়ে যায়। বিমানটিতে চারজন ক্রু ও ৬৭ যাত্রী ছিল। উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় ২৬ বাংলাদেশিসহ ৫১ জন নিহত হন। আহত হয়ে হাসপাতালে রয়েছেন ৮ বাংলাদেশিসহ ২১ জন।

কমেন্টস