জলরংয়ে জীবন প্রকৃতির বাস্তবতা!

প্রকাশঃ মার্চ ৮, ২০১৮

আরিফ চৌধুরী শুভ।

জীবনের রং কেমন, প্রকৃতির সাথে প্রাণের মিল অমিল, বাস্তুসংস্থানে যোজন বিয়োজনেরও প্রাণের অদ্ভুত অন্তমিল, নদী ও ফুলের মাঝেও প্রগাঢ় সম্পর্ক মানব হৃদকে রোমঞ্চিত করতে পারলেও চাকার সাথে সংগ্রামী জীবনের ক্ষয়ের দৃশ্যে সেই রোমাঞ্চ খুঁজতে গিয়ে চোখ আটকে যায়। জাতীয় চিত্রশালার ৩ নং গ্যালারিতে  চোখ আটকানো এমন অর্ধসহস্রাধিক চিত্রের প্রদর্শন চলছে। শিল্পীর আপন চিন্তায় জলরংয়ে যেভাবে ফুটে উঠেছে ফুল, প্রকৃতি, নদী, অতীত ও ঐতিহ্য, তার সাথে আধুনিকতার মিল কোথায়?

৬ মার্চে প্রথম বারের মতো আয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার কালার বিয়েনাল ২০১৮ এর ‘ওয়েব অব কালার’ শীর্ষক জলরং চিত্রপ্রদর্শনীতে বিশ্বের প্রায় ৪৫টি দেশের ৫০০ জন শিল্পীর বাচাইকৃত জলরং আধুনিকতাকে তুলির মাধ্যমে তুলে ধেরেছে।

প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া জলরংগুলো থেকে মোট ১২টি ক্যাটাগরিতে দেশি বিদেশী ২৭জন শিল্পীকে পুরস্কার ও সনদ প্রদান করা হয়েছে। প্রদর্শনীটি শেষ হবে আগামী ৯ মার্চ।

বাংলাদেশের (আই ডব্লিউ এস বি) আয়োজনে ৬ মার্চ সকাল ১০টায় তুরষ্কের বিখ্যাত জলরং শিল্পী এবং ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটারকালার সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি শিল্পী আতানুর দোগানের ছবি আঁকার মাধ্যমে দোগানের ছবি আঁকার মাধ্যমে বিয়েনালিটির শুরু হয় জাতীয় চিত্রশালা ইনস্টিটিউটে।

এরপর দেশি বিদেশী প্রায় ৬জন শিল্পী আমন্ত্রীত অতিথিদের ছবি এঁকে দেখান। ক্ষুদে চিত্রশিল্পরাও সারাদেশ থেকে দেখতে ভীড় জমিয়েছে চিত্রশালায়।

পুরো প্রদর্শনী ঘুরে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিনদেশের প্রকৃতি, হাজার বছরের সংস্কৃতি ও জীবন জীবিকার সরল গরল যেন বাস্তব করে ধরা দিয়েছে দর্শনার্থীর চোখে। বাংলাদেশের ইলিশের কদর আর হারিয়ে যাওয়াকে শিল্পী যেন বাক্যহীন ভাবে ব্যক্ত করেছেন জলংয়ে।

হয়তো আরেক শিল্পী দেখাতে চেয়েছেন শহরের জীবনে চাকচিক্যের মাঝেও কিভাবে চাকা ঘুরছে কোটি কোটি জীবনের। সুখ আর সংরামের এই শহর থেকে মানবতা যেন বন্দি থেকে শান্তি খুঁজে  মুক্তি চায়, তালাবদ্ধ ছবিটি দেখে শিল্পীর মনের ব্যাখ্যা যেন চোখকে অশ্রু টলমলে দৃশ্যপট দেখায় বহু ত্যাগি ইতিহাসের কথায়।

বিলাসিতার যুগে রাখালের বিলাসিতা ও মনের আনন্দ গরুর পালকে উদয় থেকে অস্তের দিগন্তে নিয়ে গেলও আমরা এখন আর ব্যস্ত শহর ছেড়ে গ্রামেই খুঁজে পাই না সেই দিগন্ত। কখনো রাখালের জলে খেলা, কখনো বা দিন শেষে প্রভুত্ব মেনে সেই গরুর পিঠে বসে বেলা অবেলার স্মৃতিতে সাঁতরিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা এই শহরের কোথায় আছে এমন দৃশ্য?

জীবনের  প্রকৃতির অমিলীন এ সম্পর্ক শিল্পীর জলরংই বদ্ধ না কি বাস্তবিকও।

ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটারকালার সোসাইটির কান্ট্রি হেড মো. কাওসার হোসেনের সভাপতিত্বে ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার কালার বিয়েনাল এ প্রদর্শনীতে বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে তুরষ্কের মহামান্য রাষ্ট্রদূত মি. ডেভরিম ওজতুরক এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক জনাব লিয়াকত আলী লাকি এবং বিজেএমই এর সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলাম।

অতিথি হিসাবে আরো উপস্থিত ছিলেন, শিল্পী অমিত কাপুর, পরিচালক ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটারকালার সোসাইটি এবং শিল্পী জিজি লাই, সহসভাপতি ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটারকালার সোসাইটি।

বাংলাদেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী আরকেশ ঘোষকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার ২০১৮ প্রদান করা হয়। এছাড়া শিল্পী আশরাফ হোসেন, বিরেন সোম, হামিদুজ্জামান খান, মুস্তফা মনোয়ার, সমরজিৎ রায় চৌধুরী এবং শহীদ হোসেন এই প্রদর্শনীতে সম্মানিত শিল্পী হিসাবে অংশগ্রহণ করেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় বাংলাদেশের ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়।সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে বিজয়ী শিল্পীদের মাঝে পুরস্কার ও সনদ তুলে দেন অতিথিবৃন্দ। মোট ১২টি ক্যাটাগরিতে দেশি বিদেশী ২৭জন শিল্পীকে পুরস্কার ও সনদ প্রদান করা হয়েছে। প্রদর্শনীটি শেষ হবে আগামী ৯ মার্চ।

প্রতিযোগিতায় অংশ নেন জামালপুরের ইর্ন্টার সেকেন্ড ইয়ারের শিক্ষার্থী প্রবাল দে। সে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে ২০১২ ও ২০১৪ সালে অংশ গ্রহণ করে প্রথম স্থান অর্জন করলেও আন্তর্জাতিক কোন প্রতিযোগিতায় প্রথম বারের মতো তার এই ছবিটি স্থান পায়। ছবিটি বেশ আকৃষ্ট করেছে দর্শনার্থী ও বিচারকদের। কথা হয় প্রবাল দের সাথে।

প্রবাল দে বিডিমর্নিংকে বলেন, আমার ছবি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর জন্যে নির্বাচিত হয়েছে এটতেই আমি খুশি। তবে ছবিটি নিয়ে আগত অনেকেই প্রশংসা করেছেন। ভবিষ্যতে আমি আরো ভালো ছবি আঁকতে চাই।

ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটারকালার সোসাইটি ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে প্রায় বিশ্বের ৮৮টি দেশে এর শাখা ও গ্যালারি রয়েছে। জলরংকে জনপ্রিয় করতে এবং শিল্পীদের প্রশিক্ষণ ও আন্ত:যোগাযোগের জন্যে ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটারকালার সোসাইটি সারা পৃথিবীতে কাজ করে যাচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটারকালার সোসাইটি বাংলাদেশের শিল্পীদের নিয়ে আর্ট ক্যাম্প, প্রদর্শনী এবং প্রশিক্ষণ আয়োজন করে থাকে। এই বিয়েনালে প্রদর্শনীর পাশাপাশি বৃহৎ ছবিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে শিল্পী ও দর্শকদের জন্যে।

কমেন্টস