নারীর লড়াইটা জারি আছে…

প্রকাশঃ মার্চ ৮, ২০১৮

অংকুর সরকার, জাককানইবি প্রতিনিধি-

‘পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টির চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’ এই মহান উক্তিটি বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলে গেছেন।  আজকে আমরা যে ৮মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করি তার রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। মূলত এই দিবসটির শুরু হয়েছিলো নারী শ্রমিকদের বৈষম্যের অধিকার আদায়ায়ের প্রতিবাদে।

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মজুরি-বৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরা। সেই মিছিলে চলে সরকারের লেঠেল বাহিনীর দমন-পীড়ন।

১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে নিউ ইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ; জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন।

এরপর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন।

সিদ্ধান্ত হয়, ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চে নারী দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশ ১৯৭৫ সাল থেকে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করছে। বর্তমানে পৃথিবীজুড়েই পালিত হচ্ছে দিনটি, নারীর সমঅধিকার আদায়ের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে। সেই থেকেই আজ অবধি ৮ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব নারী দিবস’।

এই উপলক্ষে বিডিমর্নিং নারী দিবসকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নারী শিক্ষার্থীদের কথা তুলে ধরতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীদের কথা তুলে ধরে নারী দিবসকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।

চারুকলা’র আফসানা বাধন, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ’র ফাইজাহ ওমর তূর্না, ফোকলোর’র অনিন্দিতা সেজুতি ধর, ই এস ই’র মোহসিনা আক্তার এবং নাট্যকলা ও পরিবেশনা বিদ্যা বিভাগের কানিজ ফাতেমা জুইঁ এর সাথে কথোপকথনের মধ্য দিয়ে বলতে চাই তাদের কন্ঠে নারীর কথা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে সবাই মূলত আসে জীবনের একটা দীর্ঘ সময় পার করে। এসময়টাতে সবাই তারুণ্যের দোরগোড়ায় থাকে, কিন্তু যে বিষয়টি সবচেয়ে ভাল তা হল এসময়ের মধ্যেই সবার সামাজিক পরিপক্বতা আসা শুরু করে তাই ক্লাসগুলোতে সাধারণত মেয়ে বা ছেলে শিক্ষার্থীকে আলাদাভাবে দেখা হয় না এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সহপাঠীদের সাহায্য-সহযোগিতার পরিমাণটাই থাকে বেশি। নির্যাতন বা হয়রানির বিষয়গুলি সাধারণত থাকে না। শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের মাঝে মেয়ে বা ছেলে আলাদাভাবে দেখা হয় না কিংবা আলাদা কোনো সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় না।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ সকল শিক্ষার্থীদের ব্যাপারেই যথেষ্ট আন্তরিক। নারী শিক্ষার্থী বলে কখনও কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়নি।

মেয়েদের জন্য যাতায়াতের ক্ষেত্রে বলা যায় একা একা যাতায়াত করাটা একটু কঠিন। যেহেতু দেশের সকল পুরুষ নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন সেহেতু মেয়েদের নানা রকম তিক্ত অভিজ্ঞতার স্বাদ পেতে হয়। প্রথমত বসের সীট নিয়ে কিংবা যদি দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে হয় তাহলে এ তিক্ততার পরিমাণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাড়ে।

এদেশ এবং সমাজব্যবস্থায় নারীদের মতামতকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের মত প্রকাশের সুযোগ এবং স্বাধীনতা দেওয়া হয় না। এমন কি অনেক ক্ষেত্রে নারীদের চলাফেরা, পোশাক-আশাক, কর্মজীবন সম্পর্কিত সিদ্ধান্তগুলোও অভিভাবক কিংবা অন্য কোন পুরুষের হয়ে থাকে যার কারণ পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থা।

নারীদের জন্য আমার প্রত্যাশা খুব আহামরি কিছু নয়। খুব সহজ একটি সমাজব্যবস্থা যেখানে প্রতিটি নারী স্বচ্ছন্দে নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবে, তার নিজের জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নিজেই গ্রহণের সক্ষমতা অর্জন করবে, যেখানে সে নিজের মতো করে বাঁচতে পারবে। সে ভুল করুক বা শুদ্ধ সেই সিদ্ধান্ত নেবার অধিকারটা একান্তই তার এবং কেউ এটাকে বাঁধা দেওয়ার বা প্রভাবিত করবার অধিকার রাখে না, নারীর মত প্রকাশ হোক স্বাধীন।

ছেলে মেয়ে সমান অধিকার এই উক্তিটি প্রায় সকলেই বলি কিন্তু মানার সংখ্যাটা খুবই কম। তাইতো এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও নারী শিক্ষার্থী হিসেবে সহপাঠীর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির শিকার হতে হয়। তবে ভালো সহপাঠিও বর্তমান। কেবল সহপাঠি নয় অনেক শিক্ষকও আছে যারা নারী শিক্ষার্থীকে নিজের মেয়ে হিসেবে দেখার কথা সেখানে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। নারী শিক্ষার্থীদের প্রকাশ করলে ক্ষতি হওয়ার ভয়ে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয় অনেকে।

অন্যতম আরেক নিপীড়নের ক্ষেত্রের নাম পরিবহন বা যাতায়াত ক্ষেত্র। নিজেকে অনেক সময় গনপরিবহন বা এলাকার বখাটেদের খাদ্য মনে হয় কিন্তু কি করবো? আমি তো নারী সব কিছু করার অধিকার আমার নেই কেবল সহ্য করতে হবে আমায়। পরিবার নারীর আশ্রয় স্থল সেখানেও বৈষম্য। ছেলে সন্তানকে প্রাধান্য দেয় পরিবার। পরিবারের নারী সদস্যরাই যখন প্রাধান্য দেয় তখন সেই মাত্রা বর্ননাতীত। আমি এমন সমাজ চাই যে সমাজে আমায় নারী হিসেবে নয় দেখবে মানুষ হিসেবে। জীবন যেহেতু একটাই, এই একটা জীবন নাহয় নারী নিজের জন্য বাঁচুক। সবশেষে তাদের সকলের কন্ঠের মূল কথা হলো লড়াইটা জারি রেখো নারী …

কমেন্টস