সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের  আনন্দভোজে একবেলা!

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৮

রাকিব হোসেন আপ্র।।

‘সবার আগে শিশু অন্তরে লিখে, চেয়ে দেখ বঞ্চিত শিশুদের দিকে/ ভালবাসা মমতায় ভরে দাও প্রাণ/ ওরাও আমাদেরই সন্তান…’ গানের কথাগুলো সমাজে হাজারো সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের বঞ্চনার অবস্থা অশ্রুন্সিক্ত নয়নে আমাদের হৃদয়ে নাড়া দেয়। ওরা আমাদের সন্তানের মতো হলেও আমাদেরই চারপাশে বেড়ে উঠছে বিনা যত্নে, অবহেলায় অভুক্তভাবে। লক্ষ্মীপুরের ১৮ নং কুশাখলি ইউনিয়নের ফরাশগঞ্জ গ্রামের ৮৩জন সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের একমাত্র স্কুল আলোকিত স্কুল।

‘জাতীয় পাঠাগার আন্দোলনের’ উদ্যোগে গত বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপুরে আলোকিত স্কুলের ৮৩জন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে একবেলা আনন্দভোজ ও সাংস্কৃতিক সারাদিনের। সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্যদিয়ে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন জাতীয় পাঠাগার আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জি. আরিফ চৌধুরী শুভ। খেলাধুলা আনন্দভোজ আর শিশুদের চমৎকার ও মনোমুগদ্ধকর সাংস্কৃতিক উৎসবকে সামনে রেখে আলোকিত স্কুলের শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্কুলকে সাজিয়েছে আপন ঢংয়ে।

এ আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসাবে সুবিধাবঞ্চিত এই শিশুদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন লক্ষ্মীপুরের সাবেক দুবারের সিভিল সার্জন ডা. সালাহ উদ্দিন শরীফ। ডা. মোমতাজ উদ্দিন আলোকিত স্কুল এন্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক এবিএম নোমান উদ্দিন এর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের সহযোগি অধ্যাপক খন্দকার ইউসূফ।

এছাড়াও আরো উপস্থিত ছিলেন আলোকিত স্কুল ও আলোকিত পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জি. আরিফ চৌধুরী শুভ,  ঝাউডগী দাখিল মাদ্রাসার সহকারি শিক্ষক আবু তাহের, আন্দারমানিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক  লুৎফুর রহমান, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য নাজিম উদ্দিন প্রমুখ।

নতুন বছরের শুরুতে প্রায় সব বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা সম্পূর্ণ হলেও সুবিধাবঞ্চিত এই শিশুদের ভাগ্যে জোটেনি বনভোজন, ভ্রমণ কিংবা নিজেদের ইচ্ছের অনেক আয়োজন। অনেকেরই নেই বিদ্যালয়ে বই নিয়ে আসার ব্যাগ। তবে বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যতিক্রমী আয়োজন যেমন, চকলেট উৎসব, পিঠা উৎসব, বৃক্ষ উৎসব করেছে আলোকিত স্কুল। আলোকিত স্কুলের বাচ্চারা অনেক দিক থেকে নানা ভাবে বঞ্চিত এমন আক্ষেপ করে আরিফ চৌধুরী শুভ তার ব্যক্তিগত ফেসবুক ওয়ালে একটি পোস্ট করেছেন ১ ফেব্রুয়ারি।

বিভিন্ন সময় আলোকিত স্কুলের ব্যতিক্রমী এই সব আয়োজন ও আরিফ চৌধুরী শুভ সেই ফেবু পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে নজরে পড়ে ‘জাতীয় পাঠাগার আন্দোলন-জাপাআ’ এর। তাই জাপাআ ফেসবুকে ‘আলোকিত স্কুলের বাচ্চাদের একবেলা আনন্দভোজের আয়োজন’ নামে একটি ইভেন্ট খুলেছে ৭ ফেব্রুয়ারি। গত বৃহস্পতিবার ১৫ ফেব্রুয়ারি ছিল সেই ইভেন্টের শেষ দিন।

সরেজমিনে আলোকিত স্কুলে গিয়ে দেখা যায় জাতীয় পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে স্কুলটি। পাশে একটি ফুসকা দোকানে কয়েকজন শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুসকা খাচ্ছে। আমাদের দেখে প্রথম শ্রেণির সানজিদা নামের এক শিক্ষার্থী চেয়ার ছেড়ে দিয়ে বলেন, আপনারা কি আমাদের খেলা দেখতে এসেছেন? আমি দৌঁড় খেলায় ফ্রাস্ট হয়েছি। এদিক সেদিকে আনন্দিত কয়েকজন শিক্ষার্থীও ক্যামেরা দেখে এগিয়ে এসে বলে আমাদের ছবি তুলতে এসেছেন। অামার একখান ছবি তুইল্লা দেন। আশপাশে ততক্ষণে জানা হয়ে গেছে লক্ষ্মীপুর থেকে আমাদের আগমনের কথা।

পুরো অনুষ্ঠানে শিশুদের নানারকম আনন্দের আয়োজনই আনন্দভোজের সময় ঘনিয়ে এল। তবে বেশি কিছু করার সামর্থ না থাকলেও সাদামাটা আয়োজনে একটি উৎসবমুখর দিন উপহার দিতে সক্ষম হয়েছে সদর উপজেলার ফরাশগঞ্জ গ্রামের ডা. মোমতাজ উদ্দিন আলোকিত স্কুল এন্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ।

ঝরেপড়া ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়টির যাত্রা ২০১৩ সালে। একই স্থানে ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আলোকিত পাঠাগার। প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জি. আরিফ চৌধুরী শুভ এ আয়োজন করাতে যারা আর্থিক সহযোগিতা করেছেন তাদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অশ্রুন্সিক্ত কণ্ঠে বলেন, আলোকিত স্কুলের শিক্ষার্থীরা যতদিন পর্যন্ত নিজস্ব আলোয় পথ চলতে পারবে না, ততদিন পর্যন্ত তাদের পাশে আমি থাকবো। তারা একদিন আলোকিত হবে। এ সময় তিনি অশ্রু মুছতে মুছতে অর্থাভাবে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অপূরণীয় ইচ্ছার কথা ও সমস্যার কথা বলেন।

প্রধান অতিথি লক্ষ্মীপুরের সাবেক দুবারের সিভিল সার্জন ডা. সালাহ উদ্দিন শরীফ বলেন, আমি দীর্ঘদিন সিভিল সার্জন ছিলাম। এখনো ডাক্তারি করি। মানুষের সেবা করে যাচ্ছি। কিন্তু আরিফ চৌধুরীর কাজই আজ তার চোখে আনন্দঅশ্রু এনেছে। আমাদের চোখেও অশ্রু এসেছে। তার এ উদ্যোগও আবেগ আমার জীবনে এক অনন্য উপলব্ধি ও শিক্ষা। আমাদের সন্তানরা যেন তার মতো সমাজ সচেতন ও আদর্শ অনুকরণ হতে পারে। আমরা যেন সেটি লক্ষ করি। আলোকিত স্কুলের বাচ্চারাও একদিন আলোকিত হবে আরিফ চৌধুরীর মতো, এটা আমার দৃড় বিশ্বাস।

বিশেষ অতিথি লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের সহযোগি অধ্যাপক খন্দকার ইউসূফ বলেন, যে ছেলে এতগুলো সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের আলোকিত করার দায়িত্ব নিয়েছে, সে একা  থাকতে পারে না। তার পাশে আমাদের দাঁড়ানো উচিত। আজ তার এ উদ্যোগ দেখে আমার মনে হলো আমরা সবাই নিজের জন্যে করি, কিন্তু যে সমাজে আমাদের বাস সে সমাজের জন্যে আমরা কতটুকু করছি? আরিফ চৌধুরী আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল স্বার্থহীনতার উর্ধ্বে কিভাবে সমাজের জন্যে কাজ করতে হয়।

বৃহস্পতিবার সারাদিনই উৎসবের আমেজে মেতে ছিল আলোকিত স্কুলের শিক্ষার্থীরা। কেউ সেজেছে মুক্তিযোদ্ধার মা, কেউ ঘটক, কেউ মাতব্বর, কেউ আবার ঘুষখোর ডাক্তার, সরকারি কর্মকর্তা। সবই যেন সমাজ বাস্তবতায় শিশুদের চোখে একটি দর্পন।

বিকাল ৩টায় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজয়ী প্রতিযোগিদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।  এর আগে আনন্দভোজ কর্মসূচীর অংশ হিসেবে আলোকিত স্কুলের শতাধিক শিক্ষার্থীর সাথে দুপুরের খাবার সম্পন্ন করেন আমন্ত্রিত অতিথি,  শিক্ষক এবং অভিভাবকবৃন্দ।

আলোকিত পাঠাগার ও জাতীয় পাঠাগার আন্দোলনের সার্বিক সহযোগিতায় এ অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন করা হয়।

অনুষ্ঠান শেষে আলোকিত পাঠাগার কর্তৃক প্রদত্ত ফরাশগঞ্জ গ্রামের হতদরিদ্র ৫টি পরিবারের মাঝে আলোকিত ঘরের প্রতিকী তুলে দেন অতিথিবৃন্দ।

এ আয়োজনে মিডিয়া পার্টনার ছিলো অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিমর্নিং।

কমেন্টস