উৎসবের দিন ঢাকার ক্যাফেগুলো হয়ে উঠে পতিতালয়

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৮

ইসতিয়াক ইসতি।।

‘বাসায় এরকম কোনো সুযোগ নেই বলেই স্পেশাল একটা দিনে এখানে আসা। আমরাতো আর রাস্তার মানুষ না যে রাস্তায় থাকবো, এই জায়গাটা আমাদের জন্য অধিক সিকিউর। বিয়ে করতে চাইছিলাম সেটাও তো মেনে নেই নাই। সব জায়গাতেই সমস্যা। এখানেও দেখছি আপনি বিরক্ত করতেছেন। যান তো।’

এভাবেই সিসা টানতে টানতে ঘোরের মধ্যে থাকা দু’জন তরুণ-তরুণী জানায় তাদের কথা। শুধু এই দুজন নয়, এরকম আরো অনেক তরুণ-তরুণীর সাথে কথা বলে যা জানা যায়, প্রত্যেকেই গোপনীয়তার জন্য এই সিসা লঞ্জ আর ক্যাফেগুলোতে আসেন।

‘ভালবাসা দিবস’ ও ‘পহেলা ফাল্গুনকে কেন্দ্র করে ঢাকার বুকে গড়ে উঠা ক্যাফে এবং সিসা লাউঞ্জগুলোতে চলছে নেশা ও মাদকপণ্য বেচাকেনার রমরমা বাণিজ্য। এছাড়া কথিত ক্যাফে ও লাউঞ্জগুলোতে (‘মেকওভার রুম’) রিলাক্সেশন কক্ষের নামে চলছে অবৈধ শরীরিক সম্পর্ক এর বৈধিক স্বীকৃতি।

যদিও এই সকল বিষয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর বলছে, সিসা মাদকের তালিকায় না থাকায় সিসা বারগুলোতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা যাচ্ছে না এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অধিক মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে অবৈধ পথে হাঁটছে ব্যবসায়ীরা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের জরিপের তথ্য বলছে, রাজধানীতে সিসার প্রচলন অনেক আগে থেকেই। কিন্তু সে সময় যে সিসা পাওয়া যেত তা বিভিন্ন ফলের নির্যাস দিয়ে তৈরি করা হত। কিন্তু বর্তমানে যে সিসা লাউঞ্জগুলোতে সিসার সঙ্গে মেশানো হচ্ছে হেরোইন, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে থেকে জানা যায়, শুধুমাত্র রাজধানীতে ‘সিসা বার’, মিউজিক ক্যাফে, আধুনিক ক্যাফে সংখ্যা এখন ৫০ হাজারেরও বেশি।

ঢাকায় অভিজাত স্থানগুলোতে ক্রমে গড়ে উঠছে আধুনিক রেস্তরাঁগুলো। বিশেষ করে রাজধানির বেইলি রোড, উত্তরা, ধানমন্ডি, গুলশান প্রভৃতি স্থানে কখনো গোপনীয়তা বজায় রেখে আবার কখনো প্রকাশ্যে দেদারছে চলছে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। সিটি করপোরেশন থেকে সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এই ক্যাফেগুলো। যদিও রেস্টুরেন্টের মালিকরা দাবি করছেন, সিসায় কোনো মাদকদ্রব্য মেশানো হয় না।

অভিজাত শ্রেণীর মানুষের পাশাপাশি হাই সোসাইটি কালচার ফলো করতে গিয়ে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের আনাগোনাই দিন দিন বেড়ে চলেছে এই স্থানগুলোতে। তা বাইরে থেকে বুঝার উপায় নেই এসব ক্যাফে ও সিসা লাউঞ্জের ভেতরে কি চলছে। এসব স্থানে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের ঢোকার ব্যাপারে কড়াকড়ি দেখে কিছুটা ধারণা করা যায় ভিতরে কি কি হয়।

রাজধানীর উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর সড়কে অবস্থিত গেস্ট হাউসটির কথা ধরা যায়। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই পহেলা ফাল্গুন উপলক্ষে ভিতরে পার্টি চলছে। কালো কাচে ঘেরা তৃতীয় তলার একটি অংশ এবং রুফটপের প্রতিটি টেবিল সাজানো রাজকীয় হুক্কা দিয়ে। হালকা ভলিউমে বাজছে ইংরেজি গান। দুপুরের একটু পর থেকে তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ এসে হাজির হয়েছে এই স্থানে। কালো কাচের ভিতরে অবস্থান করতে হলে খাবার সাথে প্রতি ঘন্টায় গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ৭০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা।

১৪ ফেব্রুয়ারি ভালবাসা দিবসের সকালে গুলশান-২ নম্বরের ১১৩ নম্বর সড়কের ছয়তলা বিশিষ্ট একটি অভিজাত হোটেলের ভিতরের একই চিত্রও দেখা যায়। শুধু মাত্র এখানে উত্তরা চেষ্টা বেশি টাকা খরচ করতে হয়েছে আগত তরুণ তরুণীদের এবং অতিরিক্ত হিসাবে পাচ্ছে বিদেশি মদ।

ধানমন্ডির ২৭ নাম্বারের একটি সিসা বারে গিয়ে দেখা যায়, নামের শেষে যুক্ত করা হয়েছে ‘ফুড অ্যান্ড লাউঞ্জ।’ নিচতলায় জুস বার। আর পাশে সরু সিড়ি বেয়ে দোতালায় উঠতেই চোখে পরে লাল-নীল আলোর ঝলকানি, কানে ভেসে আছে হিন্দি গান। ঝাঁঝাল গন্ধ আর ধোঁয়ার দিয়ে ভঁরা ফ্লোরটি। ছোট ছোট টেবিলগুলোতে সিসা ও কোমল পানীয় রাখা। চারজন বা ছয়জন করে বসা টেবিলে।

পাশেই আলাদা করে কাপলদের একটু প্রাইভেসি দেওয়ার জন্যই ছোট খুপরি। যার ‘মেকওভার রুম’ ও ‘রিলাক্সজেশন রুম’ নামে পরিচিত। রুমগুলোতে মেকিং ওভারের জন্য সিসার মূল্যসহ আলাদা করে প্রতি ঘন্টায় ৬০০ টাকা দিতে হয়।

এসব ক্যাফে, সিসাবারগুলোতে নিয়মিত যাতায়াত করা তরুণ তরুণীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিশেষ দিনগুলো একটু বিশেষ করে রাখার জন্য তাঁরা এই স্থানগুলোতে তাদের পছন্দের মানুষদের সাথে এসে কিছু সময় কাটিয়ে যায়।

তারা আরো বলেন, বাসা বাড়িতে সেভাবে প্রাইভেট স্পেস না পাওয়ার কারণেই এখানে আসেন। আলাপকালে একাধিক তরুণ-তরুণীর আরো জানান ,শুরুর দিকে তারা কেবল ফ্যাশনের জন্য সিসা সেবন করলেও এখন নিয়মিত সিসা বারের খদ্দের।

র‍্যাব-১ অধিনায়ক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম সাথে এই বিষয়ে কথা হলে তিনি জানান, সিসা বারগুলোতেও বিভিন্ন সময় মাদক মিশিয়ে পরিবেশন করা হচ্ছে বলে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। এড়াছাও অনেক যুবক-যুবতী সিসায় আসক্ত হয়ে পড়ছে এমন অভিযোগও আমাদের কাছে এসেছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলেন, আমাদের বিশেষ গোয়েন্দা টিম এই সব ক্যাফে চিহ্নিত করে তালিকা তৈরি করছে। দ্রুত আমরা অভিযান পরিচালনা করবো।

উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র মো. ওসমান গনির সাথে এই বিষয়ে কথা হলে তিনি জানান, ‘যেসব রেস্তোরাঁয় প্রলোভনমূলক কথা বলে তরুণ সমাজকে অবৈধ কাজের দিকে ঠেলে দিচ্ছি তাদের ট্রেড লাইন্স বাতিল করে দেওয়া হবে।’

ডিএনসির মহাপরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন জানান, ‘বর্তমান আইনে সিসা মাদক হিসেবে চিহ্নিত না হলেও নতুন মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে সিসার ভয়াবহতা বিবেচনায় এনে মাদক হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। আমরা সংশোধনীতে দিয়েছি। আইনটি চূড়ান্ত হলে সিসা বিক্রি ও ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।’

কমেন্টস