ভালোবাসা দিবসের ছায়ায় ঢেকে গেছে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৮

ইসতিয়াক ইসতি।। 

লেফটেন্যান্ট জেনারেল হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ প্রায়শই ভাবতেন তিনি ছাড়া আর কেউ বাংলাদেশটাকে সঠিক ভাবে পরিচালিত করতে পারবেন না। আর এই ভাবনা থেকেই ২৪ মার্চ ১৯৮২ সালে দখলে নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। যাত্রা হয় স্বৈরশাসনের।

সেদিন যে ঘোষণার মাধ্যমে তিনি ক্ষমতায় আসেন তা হচ্ছে, “আমি লেফটেন্যান্ট জেনারেল হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাহায্য ও করুণায় এবং আমাদের মহান দেশপ্রেমিক জনগণের দোয়ায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বুধবার থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সকল ও পূর্ণ ক্ষমতা গ্রহণ করছি এবং ঘোষণা করছি যে গোটা বাংলাদেশ অবিলম্বে সামরিক আইনের আওতায় আসবে। প্রধাণ সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে আমি বাংলাদেশের সকল সশস্ত্র বাহিনীর পূর্ণ ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করছি।”

ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এরশাদ ও তাঁর শিক্ষামন্ত্রী ড.মজিদ খান একের পর এক বির্তকৃত শিক্ষানীতি প্রস্তার দিতে থাকে।

সে সময় শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খান প্রণয়ন করেন নতুন শিক্ষানীতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব ও রেজাল্ট খারাপ হলেও যারা ৫০% শিক্ষার ব্যয়ভার দিতে সমর্থ, তাদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে। আর এই নীতিতে দরিদ্ররা উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে তাই ছাত্ররা এর প্রবল বিরোধিতা করে। ১৯৮২ সালের ১৭ ই সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসে এই শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে ছাত্র সংগঠনগুলো ঐকমত্যে পৌঁছে।

এরই ধারাবহিকতায় ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারির জন্ম। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতি প্রত্যাহার, বন্দি মুক্তি ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি ও গণমুখী, বৈজ্ঞানিক ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতির দাবিতে ছাত্র জমায়েত ডাকে।

পূর্বঘোষিত কর্মসুচি অনুযায়ী কয়েক হাজার শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ মিছিলটি হাইকোর্টের গেটের সামনে ব্যারিকেডের সামনে বসে পড়ে এবং ছাত্রনেতারা তারের ওপর উঠে বক্তৃতা শুরু করে। এসময় পুলিশ বিনা উস্কানিতে তারের একপাশ সরিয়ে রায়ট কার ঢুকিয়ে দিয়ে রঙ্গিন গরম পানি ছিটাতে থাকে, বেধড়ক লাঠিচার্জ, ইট-পাটকেল ও বেপরোয়া গুলি ছুড়তে শুরু করে।পুলিশের লাঠিচার্জের পর ছাত্ররা ব্যারিকেড ভেঙ্গে যাবার চেষ্টা করে।

এরপর পুলিশ গুলিবর্ষণ আর বেয়নেট চার্জ শুরু করে। এরপর পুলিশ অনেক মৃতদেহ ট্রাকে করে নিয়ে যায়। এসময় গুলিবিদ্ধ হয় জয়নাল। এরপর গুলিবিদ্ধ জয়নালকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায় আন্দোলনকারীরা। কিন্তু চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে সেই মৃতদেহ বটতলায় নিয়ে এসে আবার তারা বিক্ষোভ শুরু করে। এ ঘটনার কয়েকদিন পর্যন্ত পুলিশের ধরপাকর ও নির্যাতন চলতে থাকে। এর কিছুদিন পরে সরকার শিক্ষানীতিটি স্থগিত ঘোষণা করে।আর এই ঘটনার পরে তৎকালীন ছাত্র নেতারা দিনটিকে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসাবে ঘোষণা করলে আজ তরুণ সমাকজের কাছ থেকে এই ইতিহাস অনেক দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আর বিষয়ে এক আলোচনা এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী ছাত্রনেতা ডা. মুশতাক হোসেন বলেছিলেন ‘ইতিহাস হারায় না,তাকে হারিয়ে ফেলার পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়।’

অন্য এক আলোচনা সভাতে ১৯৮৯ এর ডাকসু নেতা আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী বলেছিলেন মূলত নব্বইয়ের পর সোভিয়েত বিপর্যয়ের কারণে বাম সংগঠনগুলোতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ফলে যে কমিটমেন্ট থাকার কথা ছিল সেটার অভাব দেখা দিতে থাকে মূলত সাংগাঠনিক দুর্বলতার হয়ে যায়। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ছাত্র আন্দোলনের এই ইতিহাস মুছে ফেলা হয়। আর এই স্বৈরশাসক এখনও বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ভূমিকা পালন করে আছে। আর তাকে খুশি রাখার জন্যই এই ইতিহাস মুছে ফেলা হয়েছে।

কমেন্টস