‘বি এস সি’ সম্পন্ন করতেই সুপ্রিয়ারা যায় গার্মেন্টসে

প্রকাশঃ নভেম্বর ১৪, ২০১৭

সুপ্রিয়া মধু

মেরিনা মিতু।।

গাছের পাতার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে উঠা জনসংখ্যার ঢল যেই শহরে, তার নাম ‘ঢাকা’। স্বপ্নের তাগিদে আশা মানুষগুলোর কেউ হয় হোটেল বয়, কেউবা গার্মেন্টসের কিনে নেয়া দাসী, কেউবা অস্তিত্বহীন। এমনি একজন স্বপ্নচারিনী সুপ্রিয়ার পরিচয় ‘গার্মেন্টস কর্মী’।

গোপালগঞ্জের কোটালি পাড়া গ্রামের মেয়ে সুপ্রিয়া মধু সুপ্তি, বি এস সি পড়ার স্বপ্নে ঢাকায় পাড়ি জমিয়ে থাকলেও, দুস্বপ্নের সাথে আজ সে দুই বাচ্চার মা। গেলো কুরবানির ঈদে সবে ২৪ এ পা দিয়েছে, তাও যেনো চোখে মুখে জীর্ণতার ছাপ লেগে আছে। তবুও থেমে থাকেনি তার স্বপ্ন পূরণের অভিলাষ। সংসারের ধকল, বাচ্চাদের দায়িত্ববান মা, পরিবারের একমাত্র খুটি এসকল দায়িত্ব কিংবা উড়ে আসা দায় কাঁধে নিয়েও গার্মেন্টেসের খাটুনি খেটে যান স্বপ্ন পূরণের চাহিদায়।

স্বপ্নভাষিণী এই নারী ২০০৯ সালে টি টি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা সম্পন্ন করেন।পরবর্তীতে খাদ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে ৪ বছরের একটি ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেন। লেখাপড়া করে নিজেকে শিক্ষার মানদন্ডে দাঁড় করার ভাবনা এখানেই শেষ হয়নি তার। স্বপ্ন ছিলো বি এস সি করে বড় মাপের চাকরি করে নিজের পায়ে সগৌরবে দাঁড়াবে। তবে দুর্ভাগ্যের সাক্ষী হয়ে মাঝখানে বাঁধা পড়ে যায় ‘পরিবারের আর্থিক অনটন’। বাবা অধিশংকর মধুর একার উপার্জনে ৮ সদস্যের দিন-খাওয়া সংসারে বিএসসি সম্পন্ন করার স্বপ্ন নেহায়ের অতি হাস্যকর শুনাবে। সেইসাথে খানিক পরিহাস আর ভাইদের গঞ্জনাতো আছেই।

তবে সেই পরিহাসকে পূজি করে শহরমুখী হয় সুপ্রিয়া, ২০১৪ সালের শেষের দিকে ৪ বছরের ডিপ্লোমা শেষ করে। পাতাসুলভ মাথার ভিড়ে সুপ্রিয়ার প্রথম ঠায় হয় নারায়নগঞ্জের একটি সুতা কারখানায়। ঘন্টা প্রতি ২০ টাকা ধরে সুপ্রিয়ার প্রথম উপার্জন। খুশিতে আত্নহারাও হলেও যেনো গলাফাটা চিৎকারও ছিলো বেশ জোরেশোরে। কারণ, উপার্জন দিয়ে যে লজ্জা নিবারণের কাপড়টুকুও গায়ে জড়াতে পারছেন না, মাথার উপরের ছাদের ভাড়া দিতে গিয়ে ঠাকুমার দেয়া নাকফুল টায় বিক্রি করতে হলো।

প্রাণের শহরে এতো তৃষ্ণা আর ছাদের দাম দিতে পরনের কাপড়টাও থাকছে না, সেই নিষ্ঠুর সত্যতা টের পাওয়ার সাথে সাথে সুপ্রিয়া গাটছড়া বাঁধে পল্লব সরকারের সাথে। পারিবারিক সম্মতিতেই তারা বিয়ের পিড়িতে বসেন। ২০১৬ সালের ১৫ আগস্ট, শোকের মধ্যে নববধুর চোখের জলে ঝিলিক দেয় পল্লব সরকারের সংসারে। নববধুর নতুনত্ব কাটিয়ে উঠতে উঠতে সুপ্রিয়ার সময় লাগে প্রায় মাসেক খানেক। ভয়-লজ্জার বিসর্জন শেষে যখন স্থির হয় স্বামী পল্লব সরকারকে তার স্বপ্নের কথা জানাবে, তখন দুর্ঘটনায় সুখ বাণী নিয়ে মিষ্টি হাতে স্বামী জানায়, ‘মধু আমি বাবা হতে যাচ্ছি’। সুপ্রিয়ারা তখণ মাতৃত্বে মিশে যায় স্বপ্নের জলাঞ্জলিতে।

দিন-ক্ষণ পর সুপ্রিয়া-পল্লবের কন্যা শিশুর জন্মের সাথে সাথে যেনো সুপ্রিয়ার স্বপ্ন আবার জেগে উঠে। কন্যা শিশুর চিৎকারে সুপ্রিয়া ভাবতে থাকে যেভাবেই হোক নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে, স্বপ্ন পুরণ করতেই হবে। যেই ভাবনা সেই কাজ, স্বামীকে বলে দেয় নিজের স্বপ্নের কথা। অল্প সময়ের ব্যবধানেই স্বামী তার সিদ্ধান্ত জানায়, তবে মজার বিষয়, জায়গা বদলালেও বাঁধাগুলোর মধ্যে মিলগুলো স্পষ্ট টের পাওয়া যায়। তা হলো, ‘পারিবারিক অনটন’। সুপ্রিয়ারা কাছ থেকে সেই অনটন দেখতে পায়, তাই তাদের কিছু বলার থাকেনা।

স্বপ্নালু, সুপ্রিয়া এবার সিদ্ধান্ত নিলো। কঠিন সিদ্ধান্ত। বাস্তবতা ডিঙ্গিয়ে আগুনে ঝাপ দেয়ার মতো। কোলের বাচ্চাকে সাথে নিয়েই ‘প্রাইমোর্ডিয়াল’ নামক গার্মেন্টসে ঘন্টা বেঁধে খাটনিতে নামলো। খাটনির সাথে পাল্লা দিয়ে কোলের শিশু হাটতে শিখেছে, কন্যার বাবার  ইচ্ছে হলো ছেলে সন্তানের। তর্ক-যুদ্ধে বাবার জয় হলো, ঘরে এলো দ্বিতীয় কন্যাসন্তান।  সৌভাগ্য নাকি দুর্ভাগ্য তা সুপ্রিয়াদের জানা নেই, সে শুধু জানে, তাকে নিজ পায়ে দাঁড়াতে হবে, ভাইদের তাড়িয়ে দেয়া বাবা-মার দায়িত্বও তাকে নিতে হবে। দুই কন্যার ভবিষ্যত গড়তে হবে।

এমন অসময়ে ভর্তি হয়ে যায় শাহবাগ ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটে। অসহায় বাবা-মাকে বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে, সেমিস্টার ফি  এর টাকা বাঁচিয়েও কন্যাদের জন্য কিস্তিতে অর্থ জমান এই ২৪ বছরের নারী। তার জন্য ভোর থেকে সংসারের রান্না-বান্না শেষে ৮ টা থেকে ৫ টা গার্মেন্টস এ কাজ করেও বাড়ি ফিরে টিউশনি করেন। এমনকি ছুটির দিন শুক্রবারেও ওভারটাইম করেন।

স্বশিক্ষিত সুপ্রিয়ারা এভাবেই মেধা আর যোগ্যতা থাকা স্বত্ত্বেও টিকে থাকার জন্য লড়ে যায় এভাবেই। শহর তাদের মাথা ঠেকাবার জায়গা করে দিয়েও মুখ লুকায় হাসে। চোখ কাঁদে সুপ্রিয়াদের।

কমেন্টস