রোহিঙ্গা সমস্যা এবং বাংলাদেশে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব

প্রকাশঃ অক্টোবর ২৫, ২০১৭

তারিকুল ইসলাম তারিক, হাবিপ্রবি প্রতিনিধি-

রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের কাছে নতুন বা অপরিচিত কোন সমস্যা নয়। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। সফল কুটনৈতিক কারণেই হোক আর আন্তর্জাতিক চাপেই হোক মিয়ানমার প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত নিতে বাধ্য হয়।

এরপর ৯০ দশকেও ঠিক একই সূত্রে গাঁথা রোহিঙ্গা নিয়ে আর একটি সমস্যার বাংলাদেশ সম্মুখীন হয় বাংলাদেশ। মোট তিনবার রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়। সর্বশেষ রোহিঙ্গা নিয়ে বাংলাদেশ এ বছরে বড় একটি সমস্যায় পরে। মানবতার জন্যই হোক বা ইউএনএইচসিআর এর তাগাদার কারণেই হোক বাংলাদেশ প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা নর-নারীদের আশ্রয় দেয়। খুব অল্প কিছু বছর আগেও আমরা ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা নিয়ে বেশ বড় একটা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছি। এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনেকটাই স্থিতিশীল। ঠিক এই মুহূর্তে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে মানবতার পরিচয় দেয়ার বিষয়টি বাংলাদেশকে আর একবার হয়তো অদূর ভবিষ্যৎ এ ভাবিয়ে তুলবে।

রোহিঙ্গা নিয়ে বর্তমানে বা ভবিষ্যতে ঠিক কী ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে সে বিষয়ে কথা বলার আগে আসুন একটু পিছনের ইতিহাস নিয়ে কথা বলি। ১৯৭৮ এবং ১৯৯২ সালে বেশ কয়েক হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। এসব রোহিঙ্গা দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সমস্যার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা পালন করে আসছে।

অভিযোগ করা হয়, স্থানীয়ভাবে বাংলাদেশিদের শ্রমবাজার নষ্ট করা, বাংলাদেশি পরিচয় পত্র নিয়ে ভোটে অংশগ্রহণ, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রম অভিবাসন ইত্যাদি কাজে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। অপরাধমূলক কাজেও পিছিয়ে নেই তারা। ছিনতাই, রাহাজানি, মাদক ও মানব পাচার এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততাসহ অনেক অপরাধমূলক কাজের অভিযোগ রয়েছে তৎকালীন সময়ে এ দেশে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে। আমরা হয়তো ১৯৯২ সালের পর ভুলেই গিয়েছিলাম যে কিছু ভিনদেশি জাতি আমাদের সাথেই বসবাস করছে এবং এ দেশের অনেকাংশে খারাপ প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি বঙ্গোপসাগর দিয়ে মালয়েশিয়ায় মানব পাচার ও অভিবাসন ঘটনায় আমাদের আর একবার রোহিঙ্গাদের মনে করিয়ে দেয়। সর্বশেষ মিয়ানমারের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রোহিঙ্গা ইস্যুটি বাংলাদেশ তথা সাড়া বিশ্বের সামনে চলে আসে।

বাংলাদেশ জঙ্গিদের বেড়ে ওঠা বা বিস্তার ঘটার জন্য একটি উর্বর আবাস্থল। গত বছর ১৭ই এপ্রিলে হলি অার্টিজেন রেস্তোরায় বড় ধরণের জঙ্গি আক্রমণের ঘটনার আগে আমরা কখনই স্বীকার করাতাম না যে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি থাকতে পারে। এরপরে গাইবান্ধা, রাজশাহী, ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন অভিযানে আমরা দেখতে পাই যে বাংলাদেশে জঙ্গি আছে এবং খুব গোপনেই তারা বিস্তার করছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, জঙ্গি অভিযান হয়তো বন্ধ আছে, কিন্তু জঙ্গিরা বসে নেই। তারা তাদের কাজ সুকৌশলে চালিয়ে যাচ্ছে। জঙ্গি সংগঠন গুলোর ফাঁদে খুব সহজেই পা দিতে পারে রোহিঙ্গারা। এর পেছনে যথেষ্ট কারনও আছে। আসুন এবার কারণগুলো জেনে আসা যাক।

প্রথমত, আমাদের মনে রাখতে হবে রোহিঙ্গারা তাদের জন্মের পর থেকেই নিজেদের অধিকার পায়নি। নাগরিকত্ব তো দূরে কথা নিজেদের চিকিৎসা, খাদ্য, শিক্ষা এমনকি স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকারও কখনো পায়নি। তাই খুব সহজেই তাদের লোভের ফাঁদে পা দিতে অনুপ্রাণিত করা যাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে রোহিঙ্গারা পাহাড়ে বসবাস করছে। আর পাহাড়ি এলাকা বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের জন্য বেশ অনুকূল পরিবেশ। শিক্ষা মানুষের বুদ্ধি বিবেক জাগিয়ে তোলে। ন্যায় অন্যায় বোঝার ক্ষমতা প্রদান করে শিক্ষা। রোহিঙ্গারা তাদের দেশে তারা শিক্ষার সুযোগ পায়নি। তাই খুব সহজেই তারা অন্যায় কাজের দিকে ধাবিত হবে। এতোগুলো জঙ্গিবাদ নিয়ে সমস্যা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে স্থিতিশীল। আর এ স্থিতিশীলতা কতদিন থাকবে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরাও অনিশ্চিত। রাজনৈতিক দুর্দিনে কোন রাজনৈতিক দল রোহিঙ্গাদের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করবে না, এ সম্ভাবনা নাকচ করে দেওয়াটা হবে আমাদের জন্য বড় বোকামি।

আমাদের মোট আয়তন ১৪৭৫৭০ বর্গ কিলোমিটার। প্রতিবছর জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়লেও মোট ভূমির পরিমাণ কিন্তু একটুও বাড়েনি। একে তো নিজেদের জায়গা নিয়ে সমস্যা, তার উপর ৪ লাখ মানুষের জায়গা দেয়া নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য সামনের দশকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ১৯৭৮ সালে আন্তর্জাতিক পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা পাওয়া সত্ত্বেও প্রতিদিন প্রায় ১৮-১৯ জন মানুষ পুষ্টির অভাবজনিত কারণে মারা গেছে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও বাংলাদেশ সরকারকে যথেষ্ট ভাবিয়ে তুলবে রোহিঙ্গা সমস্যা।

যাইহোক, এতকিছুর পরেও সুখের সংবাদ এই যে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। মিয়ানমার সরকারের সাথে আলোচনা চলছে। আশা করছি খুব দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হবে। শান্তিপূর্ণভাবে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিবেন এবং তাদের নাগরিকত্ব দিয়ে সকল অধিকার নিশ্চিত করবেন।

কমেন্টস