মুসলিমরা নাকি কলম্বাস- আমেরিকার আবিষ্কারক কে?

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৭

মো. সবুজ খান-

আমেরিকা। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সম্পদশালী প্রভাব বিস্তারকারী রাষ্ট্র। এর একদিকে প্রশান্ত মহাসাগর এবং অন্যদিকে আটলান্টিক মহাসাগর। কিভাবে আবিষ্কার হল আমেরিকা তা নিয়ে রয়েছে বেশ দ্বন্দ। কে বা কারা আবিষ্কার করল আমেরিকা? ইতিহাসে কলম্বাসকেই আমেরিকা আবিষ্কারক হিসেবে বলা হয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ বলছে আমেরিকা আবিষ্কার করেছে মুসলিমরা। কেউ বলছে মুসলিমরা বা কলম্পাস কেউ নয় আমেরিকা আবিষ্কার করেছে ভাইকিং নামক সমুদ্রযাত্রী জাতি।

মুসলিমদের আমেরিকা আবিষ্কার নিয়ে যা বলা হয়ঃ

মুসলিমরা নাকি কলম্বাস- আমেরিকার আবিষ্কারক কে?

তুরস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত লাতিন আমেরিকার ধর্মীয় নেতাদের এক সম্মেলনে দেয়া বক্তৃতায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান দাবি করেন, কলম্বাস আমেরিকার খোজ পায় পনেরো শতাব্দিতে কিন্তু মুসলিম নাবিকরা সে দেশে পৌঁছেছিলেন এর ও ৩০০ বৎসর আগে।

এরদোগান বলেন,“কলম্বাস নিজেই আমেরিকা আবিস্কারের সময় কিউবা উপকূলে একটি পাহাড়ের ওপর মসজিদের অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেছিলেন যা প্রমান করে ইসলাম ও লাতিন আমেরিকার মধ্যে পরিচয় হয়েছে কলম্বাস আমেরিকা আবিস্কারের ঘটনার পূর্বেই আর সেই কাজটি করেছিল মুসলিম নাবিকেরাকা পৌঁছেছিলেন ১১৭৮ সালেই। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, মসজিদের মতো দেখতে একটি প্রস্তরখণ্ডকে উপাসনালয় হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন ওই নাবিক।

আমেরিকার প্রথম মসজিদ

আমেরিকার প্রথম মসজিদ

ইতিহাস লেখক এস ফ্রেডরিক স্টার তার ‘আজকের ইতিহাস’ নিবন্ধে দাবি করেছেন, ১৪৯৮ সালের অনেক আগেই আমেরিকা আবিস্কার করেন আবু রাইহান। নিবন্ধ অনুসারে ৯৭৩ সালে আজকের মধ্য এশিয়ার দেশ উজবেকিস্তানে জন্ম তার। ওই ইতিহাস লেখকের মতে, আবু রাইহানই এশিয়া-ইউরোপসহ পৃথিবীর অজানা ভূমি আবিস্কারের প্রথম পথ প্রদর্শক।

ভাইকিং জাতির আমেরিকা আবিষ্কার নিয়ে যা বলা হয়ঃ

ভাইকিংদের সমুদ্রযাত্রা

ভাইকিংদের সমুদ্রযাত্রা

আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের প্রধান ড. সারাহ পার্কাক বলেন ১৪ শতকের ভ্রমণ বিষয়ক বই ‘The Saga of the Greenlanders’- এ বলা হয়েছে ভাইকিং জাতি ৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম আমেরিকা আবিস্কার করে। সেখানে বলা হয়েছে বিজারনি হ্যারজোল্ফসন তার দলবল নিয়ে নরওয়ে থেকে গ্রিনল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের পর এই ব্যক্তি ১০০২ সালে আমেরিকা অভিযানে যান।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, কানাডার দ্বীপাঞ্চল নিউ ফাউন্ডল্যান্ডের পয়েন্ট রোজিতে ভাইকিংদের বসতির প্রমাণ রয়েছে। বিভিন্ন পুরাতত্ত্ব পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন সেগুলো কোনো কোনোটি ৮০০ থেকে ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের। তা রমানে কলম্বাস পা রাখার আগেই সেই অঞ্চলে বসতি নির্মাণ করেছিল ভাইকিং জাতি।

ভাইকিংদের সমুদ্রযান

ভাইকিংদের সমুদ্রযান

ভাইকিং জনবসতির মধ্যে নিউ ফাউন্ডল্যান্ড অন্যতম স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। বিজ্ঞানীরা ১৯৬০ সালের দিকেই সেই বসতির প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমের এল আনসে আউক্স মিডোস নামক স্থানে ভাইকিংদের হারানো সভ্যতার সন্ধান পান।

কলম্পাসের আমেরিকা আবিষ্কার নিয়ে যা বলা হয়ঃ

কলম্বাস

কলম্বাস

কলম্বাস ছিলেন সে আমলের একজন বিখ্যাত ইতালীয় নাবিক। ভারতবর্ষের ঐশ্বর্যের কথা ইউরোপে কিংবদন্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলেই অনেকেই চাচ্ছিলেন স্থলপথ ছাড়াও সমুদ্রপথের সন্ধান করতে। তাই কলম্বাস জাহাজ নিয়ে ভারতবর্ষের খোঁজে বের হয়ে ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দের ১২ অক্টোবর একটা দ্বীপে গিয়ে পৌছান। দ্বীপটা বাহামা দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত, আগে নাম ছিল সান সালভেদর। বর্তমান নাম ওয়াটলিং আইল্যান্ড। কলম্বাস এই দ্বীপকে ভারত ভেবেছিলেন। বর্তমানে আটলান্টিক মহাসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জকে বলা হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এরপর কলম্বাস জাপানের পথে পাড়ি দিতে গিয়ে সান সালভেদরের দক্ষিণে হিসপানিয়োলা আর তারপর কিউবায় গিয়ে পৌছান। ভারতবর্ষ জলপথে আবিষ্কার করতে না পেরে ব্যর্থ মনোরথে কলম্বাস ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দের ১৩ মার্চ আবার স্পেনে পৌঁছেছিলেন।

১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর আরম্ভ হলো কলম্বাসের দ্বিতীয় নৌযাত্রা। সেবারও তিনি ভারতবর্ষ খুঁজে পাননি। ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে তৃতীয় নৌ-যাত্রায় কলম্বাস প্রথমে ত্রিনিদাদ এবং তারপর গিয়ে পৌঁছান দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের বর্তমান ভেনিজুয়েলাতে।

মুসলিমরা নাকি কলম্বাস- আমেরিকার আবিষ্কারক কে?

এদিকে সমুদ্রপথে ভারতবর্ষ আবিষ্কারের যখন এই সব কাণ্ড চলছিল তখন এক স্পেনীয় নাবিক ঘোষণা করেন যে, দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের মূল ভূখণ্ড পূর্বেই তিনি ১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জুন আবিষ্কার করে এসেছেন। এই নাবিকের নাম ছিল আমেরিগো ভেসপুচ্চি। অবশ্য বিশেষজ্ঞদের মত হলো তিনি ১৪৯৯ খ্রিস্টাব্দের আগে সমুদ্রযাত্রাই করেননি। কারণ সে বছরই আলন্সো দে ওখেদা ও ভেসপুচ্চি দক্ষিণ আমেরিকায় গিয়েছিলেন।

কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রা

কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রা

কলম্বাস যেমন স্পেনের রাজার সাহায্যে সমুদ্রযাত্রা করেন, আমেরিগো ভেসপুচ্চি তেমনি পর্তুগালের পতাকার নিচে ১৫০১ এবং ১৫০২ খ্রিস্টাব্দে যাত্রা করে দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলে গিয়ে উপস্থিত হন। ভেসপুচ্চি এটা ঠিকই বুঝেছিলেন যে কলম্বাস যাকে ভারতবর্ষ ভেবে ভুল করেছিলেন সেটা আসলে একটা অনাবিষ্কৃত নতুন মহাদেশ। ভেসপুচ্চির নিজের সমুদ্রযাত্রার বিষয়ের উপর লেখা এতই প্রসিদ্ধ লাভ করে ছিল যে, তাকেই দক্ষিণ আমেরিকার আবিষ্কারক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। জার্মানির ভূগোলবিদ ভাল্ডয়ে মুলার ব্রাজিলকে আমেরিগোর সম্মানার্থে আমেরিকা আখ্যা দেন। আমেরিকা নামটা এতই প্রচলিত হয়ে পড়ে যে, ব্রাজিল থেকে উত্তর আমেরিকা আর দক্ষিণ আমেরিকা দুই মহাদেশেরই নামকরণ হয় আমেরিকা।

কলম্বাসই সর্বপ্রথম আমেরিকা আবিষ্কার করলেও তার ভুলের কারণে আমেরিকা আবিষ্কারক হিসেবে আমেরিগোর নাম অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রের নাম আমেরিকা হয়ে যায়।

কমেন্টস