‘বিশ্ব দাপাচ্ছে বাংলাদেশি ওষুধ’

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৭

মো:জুনায়েদ, এনআইএমসি প্রতিনিধি-

বেশী দিন কিন্তু হয়নি, এইতো সেদিনের কথা, অনেক কষ্টে মাত্র ২০শতাংশ ওষুধ এই দেশে তৈরি হতো, আর এখন দেশের প্রায় ৯৮শতাংশ প্রয়োজন মিটিয়ে বিশ্বের ১২৭টি দেশে এই দেশের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। কি ছিল আর কি হল, মাত্র চার দশকের ব্যবধানে এক আমূল পরিবর্তন।

একাত্তরে স্বাধীনতার পর যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশে রক্তের দাগ তখনও শুখায়নি। এদেশের মানুষের নুন আনতে পান্তা ফুরায় এই অবস্থা। অন্নের সাথে সাথে ওষুধেরও তখন সংকট। বাঁচতে হলে তো দুটোই দরকার। কিন্তু সদ্য স্বাধীন দেশে ডলারের রিজার্ভও তখন এতো ছিল না যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ওষুধ আমদানি করবে। সেই দুঃসময়ে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল পূর্ব ইউরোপের হাঙ্গেরি। বিনিময় প্রথা তথা পণ্যের বিনিময়ে ওষুধ দেওয়ার চুক্তিতে এই দেশে ওষুধ আমদানি হতে থাকল আর পাট ও অন্যান্য দ্রব্য সামগ্রী রপ্তানি হতে থাকল হাঙ্গেরিতে। আর আজ বাংলদেশ নিজেই আন্তর্জাতিক বাজারে ওষুধ রপ্তানি করে। বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের পরই ওষুধ শিল্পের বিপ্লব ঘটেছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, দেশে মোট ২৬৮টি অ্যালোপ্যাথিক, ২০৭টি আয়ুর্বেদিক, ৭৯টি হোমিওপ্যাথিক, ৩২টি হারবাল এবং ২৬৭টি ইউনানি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং বর্তমান বিশ্বের ১২৭টি দেশে ৫৪টি প্রতিষ্ঠানের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। আমেরিকা, ইউরোপসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে বাংলাদেশের ওষুধের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

কিছুদিন আগে, ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের হৃদরোগ প্রতিরোধী কার্ভিডিলোল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের অনুমোদন পায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওষুধের মান ও নিরাপত্তা ধরে রাখতে পারলে খুব শিগরিরই ১৫০টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করা সম্ভব হবে। তাই এই গুণগত মান ধরে রাখাটাই বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রতি বছরই রপ্তানির পরিমান ও দেশের সংখ্যা বাড়ছে। দেশে উৎপাদিত ওষুধ ২০১৬ সালে বিশ্বের ১১৭ টি দেশে রপ্তানি হয়েছে। যা বর্তমানে ১২৭টিতে দাঁড়িয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) পৃথিবীর ৮৭টি দেশে ৪২১ কোটি ২২ লাখ টাকার ওষুধ রপ্তানি করা হয়। পরের বছর একই সংখ্যক দেশে রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা। ২০১৩ সালেও দেশে ৬০৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা রপ্তানি হয়। ২০১৪ সালে ৯৫টি দেশে ৭১৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ২০১৫ সালে ১০২টি দেশে ৮৩২ কোটি টাকার ওষুধ ও কাঁচামাল রপ্তানি হয়েছে। সেখানে ২০১৬ সালে প্রায় ৩ গুণ ২২শ’৪৭ কোটি টাকার ওষুধ রপ্তানি হয়েছে। এ বছরের ৬ মাস পার না হতেই ইতোমধ্যে ওষুধ রপ্তানি ১৫শ’ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ বিগত ৭ বছরের ব্যবধানে রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে ১৮শ’ কোটি ডলারেরও বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওষুধ খাতে এসব অর্জনের পেছনে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। দেশের অনেক কোম্পানিই এখন আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ তৈরি করছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সার্টিফিকেশন সনদও পেয়েছে বেশকিছু কোম্পানি। এ কারণে ওইসব দেশসহ অন্য দেশে ওষুধ রপ্তানি পর্যায়ক্রমে বাড়ছে।

এদিকে, বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) জন্য ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্বে বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ছাড়ের সুযোগ রয়েছে অর্থাৎ আগামী ১৭বছর ওষুধ তৈরি ও রপ্তানি ক্ষেত্রে মেধাস্বত্বখাতে বাংলাদেশকে কোন অর্থ ব্যয় করতে হবে না। সরকারের পক্ষ থেকেও ওষুধ শিল্প বিকাশে সব ধরনের সহযোগিতা পাওয়া গেলে আগামীতে বাংলাদেশ ওষুধ রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে যা গার্মেন্টস রপ্তানি রেমিটেন্সকেও ছাড়িয়ে যাবে বলে তারা মনে করেন।

রপ্তানিতে শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে যথাক্রমে বেক্সিমকো ফার্মা লিমিটেড, স্কয়ার ফার্মা লিমিটেড, ইনসেপ্টা ফার্মা লিমিটেড, নোভারটিস (বিডি) লিমিটেড, রেনেটা লিমিটেড, দ্য একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড, এ্যারিষ্টো ফার্মা লিমিটেড, এসকেএফ ফার্মা বাংলাদেশ লিমিটেড, এসিআই লিমিটেড, পপুলার ফার্মা, পপুলার ইনফিউসন, বায়ো ফার্মা, অপসোনিন, গ্লোব ফার্মা, বীকন ফার্মা, ড্রাগস ইন্টারন্যাশনাল, হেলথকেয়ার ফার্মা, ওরিয়ন ফার্মা, জেসন, নাভানা, জেনারেল, ডেলটা, ইবনেসিনা, রেডিয়ান্ট, নভো হেলথকেয়ার ফার্মাসহ আরও কয়েকটি কোম্পানী।

এ শিল্প সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা- মাত্র আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্পের পরই ওষুধ রপ্তানি থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সক্ষম হবে। এই প্রত্যাশা নিয়ে এখন কেবলই সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা আর বিশ্ববাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই ওষুধ রপ্তানিতে এশিয়ার শীর্ষে উঠে আসবে বাংলাদেশ।

কমেন্টস