অন্ধকার জগতের ভয়ংকর খুনিদের জীবনীঃ পর্ব-১

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৭

মো. সবুজ খান-

জিল দ্য রাইঃ

অন্ধকার জগতের ভয়ংকর খুনিদের জীবনীঃ পর্ব-১

জিল দ্য রাই পৃথিবীতে আধুনিক সিরিয়াল কিলারদের পথিকৃৎ। এই কুখ্যাত সিরিয়াল কিলারের জন্ম ১৪০৪ সালে ফ্রান্সে। তার পুরো নাম জিল দ্য রাই হলেও সবার কাছে তিনি জিল নামেই পরিচিত। জিল নিজ হাতে প্রায় শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিল যাদের বেশিরভাগই ছিল বালক শিশু। আশ্চর্জের ব্যাপার হলো তিনি যাদের হত্যা করে তারা সবাই ছিল ব্লন্ড চুল ও নীল চোখের অধিকারী। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে জিল নিজেও ছেলে বেলায় এদের মতোই ব্লন্ড চুল ও নীল চোখের অধিকারী ছিলেন। হত্যার করার পর সে বেশিরভাগ শিশুকেই আগুনে পুড়িয়ে ফেলত।

অন্ধকার জগতের ভয়ংকর খুনিদের জীবনীঃ পর্ব-১

জিলের শিকারের প্রকৃত সংখ্যা জানা যায়নি কিন্তু ধারণা করা হয় তার শিকার সংখ্যা প্রায় ৮০ থেকে ২০০টির মতো ছিল। আবার কারও কারও মতে এর সংখ্যা ৬০০টিরও বেশী। তিনি যাদের হত্যা করেছিলেন তাদের বয়স ছিল ৬-১৬ বছরের মধ্যে। হ্যানরিয়ে নামের জিলের এক চাকর তার মনিবের জন্য শিশুদের সংগ্রহ করে নিয়ে আসতো। জিলের পাশবিক কাজ শেষে তারা শিশুগুলোকে একটি রুমে নিয়ে হত্যা করতো এবং জিল এই শিশুদের রক্তে গোসল করতো। হ্যানরিয়েট যখন বাচ্চাদের উপর অত্যাচার করতো তখন জিল বাচ্চাদের চিৎকার ও আর্তনাদ শুনে আনন্দ পেত। জিলের সবচেয়ে আনন্দ হতো যখন অত্যাচারের কারণে বাচ্চাদের শরীর থেকে রক্ত বের হয়ে গড়িয়ে যেত। জিল দ্য রাইকে তার অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে ১৪৪০ সালের ২৬ অক্টোবর বুধবার ৩৬ বছর বয়েসে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

জেফরি ডামারেঃ

অন্ধকার জগতের ভয়ংকর খুনিদের জীবনীঃ পর্ব-১

জেফরি ডামারের জন্ম ১৯৬০ সালে। জেফরির শিকার সংখ্যা ১৭টিরও বেশি।  তার হত্যাকাণ্ডগুলো সংঘটিত হয়েছিল ১৯৭৮ সাল হতে ১৯৯১ সালের মধ্যে। ১৯৯১ সালের ২৭ মে সকালে দেখা যায় সিনথাসোমফোন নামের ১৪ বছরের এক বালক নগ্ন অবস্থায় দ্বিগবেদিক ঘোরাফেরা করছে। যার শরীরে অনেক আঘাতের চিহ্নও আছে। পুলিশ আসলে ডামার পুলিশকে জানায় তাদের মধ্যে মদ পানের সময় ঝগড়া হয়েছে। বালকটির প্রতিবাদ সত্ত্বেও পুলিশ বালকটিকে ডামারের পাশ থেকে সরিয়ে দেয়। কারণ তারা ডামারের প্রতি কোনও সন্দেহ অনুভব করেনি। কিন্তু সেই রাতের পরে ডামার সিনথাসোমফোনকে হত্যা করেছিল এবং তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল।

অন্ধকার জগতের ভয়ংকর খুনিদের জীবনীঃ পর্ব-১

১৯৯১ সালের গ্রীষ্মের পরে ডামার প্রতি সপ্তাহে অন্তত এক জনকে হত্যা করত। ১৯৯১ সালের ২২ জুলাই ডামার প্রলোভন দেখিয়ে ট্রেসি এডওয়ার্ডকে তার বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। ডামার এডওয়ার্ডকে মারার জন্য তাকে হ্যান্ড-কাফ পরাতে গেলে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। এডওয়ার্ড কোন একভাবে মুক্ত হয়ে পুলিশকে ডাকতে সক্ষম হয়েছিল যখন তার এক হাতে তখনও হ্যান্ড-কাফ ঝুলছিল। পুলিশ ডামারের বাড়িতে প্রবেশ করে এবং তাকে গ্রেফতার করে। ডামারকে গ্রেফতারের পর তার বাড়ি থেকে ভয়াবহ সব জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়। তার ঘর থেকে এসিড পানিতে ভেজা নো অনেক মৃতদেহ ও তার ফ্রিজ থেকে মানুষের অনেক কাটা মাথা উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও তার ঘরের মোমবাতির বেদি থেকে অনেক মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়। বিচারে ডামারকে ৯৩৭ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারের সময় ডামার কারাবাসের পরিবর্তে মৃত্যুদণ্ড কামনা করেছিল। ১৯৯৪ সালের ২৮ নভেম্বর জিমে কর্মরত অবস্থায় ক্রিস্টোফার স্কেভার নামক এক কয়েদির মারাত্মক পিটুনিতে ডামার মারাত্নক আহত হয়। হাসপাতালে নেয়ার পথে এম্বুলেন্সে ডামারের মৃত্যু হয়।

আন্দ্রেই রোমানোবিচ চিকাতিলোঃ

অন্ধকার জগতের ভয়ংকর খুনিদের জীবনীঃ পর্ব-১

তিনি একজন সাবেক সোভিয়েত সিরিয়াল কিলার যিনি ইতিহাসে দ্যা বুচার অফ রুস্থব, দ্যা রেড রিপার এবং রুস্থব রিপার হিসেবে কুখ্যাত হয়ে আছে। ইতিহাসের কুখ্যাত সিরিয়াল কিলারদের তালিকার করলে উপরের দিকেই থাকে এই লোকটির নাম। ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু করে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে সে প্রায় ৫২ জন মহিলা এবং শিশু হত্যা করে যাদের অধিকাংশেরই বয়স ছিল ১৭ বছরের নিচে। ১৯৭৮ সালে থেকে চিকাতিলো যখন একের পর এক খুন করা শুরু করে, তখন সোভিয়েত পুলিশের কানে এ খবর যায় কিন্তু তৎকালীন সময়ের রাজনৈতিক অবস্থা খুব খারাপ থাকার কারণে এই কুখ্যাত হত্যাকারী আড়ালেই রয়ে যায়।

একের পর এক হতে থাকা খুন গুলোতে বিভিন্ন আজব আজব পদ্ধতি ব্যাখ্যা করা হত। কিন্তু ১৯৮৩ সালের জানুয়ারিতে চারটি খুনের একই ধরনের মোটিভ দেখে ফোরেন্সিক এনালিস্ট ভিক্টর বোরাকভ এই খুনগুলোকে একজন সিরিয়াল কিলারের কাজ বলে জানান। এটা শুনে মস্কো পুলিশ তৎকালীন মেজর মিখেইল ফেতিসবকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করে। মেজর ফেতিসব চৌকস এবং নরম মনের বোরাকভকে প্রধান ইনভেস্টিগেটর হিসেবে নিয়োগ দেন যার পূর্বে কোন এ সম্বন্ধে কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। যেভাবেই হোক, বোরাকভ তার ইনভেস্টিগেশন শুরু করে। কিন্তু বিভিন্ন উচ্চপদস্থ নোংরা রাজনৈতিকদের হস্তক্ষেপের কারণে এই ইনভেস্টিগেশন খুব বেশি আগায়নি। এমনকি এই চিকাতিলোকে একবার গ্রেফতার করেও ছেড়ে দিতে হয়েছিল তাদেরই কারণে।

অন্ধকার জগতের ভয়ংকর খুনিদের জীবনীঃ পর্ব-১

এরপরে ১৯৮৪ সালের আগস্ট মাসে রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনে এই ঘটনা জনগনের সামনে প্রকাশ করা হয়। ইতোমধ্যে চিকাতিলো প্রায় ৩০ জনকে হত্যা করে ফেলেছে। এরপরে পুরোদমে শুরু হয় তদন্ত। ১৯৯০ সালের ১৪ই নভেম্বর শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার। অনেক চেষ্টার পরে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট এর সহযোগীতায় নভেম্বর এর ২৯ তারিখে সে তার সব দোষ স্বীকার করে। পুলিশ তাদের তদন্ত সম্পন্ন করে ১৯৯১ সালের ২০ আগস্ট তারিখে চিকাতিলোর মানসিক অবস্থা নির্নয়ের জন্য তাকে ৬০ দিনের জন্য একটি সাইকিয়াট্রি সেন্টারে পাঠায়। তার মানসিক অবস্থা পরীক্ষা করার পরে শুনানি হয়। বিভিন্ন শুনানী শেষে ১৯৯৪ সালের ৪ জানুয়ারী তাকে একটি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষে নিয়ে গিয়ে মাথায় গুলি করে এক্সিকিউট করা হয়

পরবর্তিতে চিকাতিলোর জীবনী নিয়ে নিয়ে চারটি বই লেখা হয়েছে এবং ৩ টি মুভি নির্মান করা হয়েছে। তবে এই ঘটনার উপর লেখা সবচেয়ে বিখ্যাত বই হল ১৯৯৩ সালে লেখক রবার্ট কালেন এর লেখা “দ্যা কিলার ডিপার্টম্যান্ট” নামে বইটি। এই বইটির উপর ভিত্তি করেই লেখক ও পরিচালক ক্রিস গেরল্মো   ১৯৯৫ সালে ‘সিটিজেন এক্স’ নামে অসাধারণ এক মুভি নির্মান করেন।

কমেন্টস