‘কাকু-কাকু আমাকে ইনজেকশন দিবেন না’ বাঁচার জন্য এভাবে আকুতি করেও ডাক্তারদের ভুল চিকিৎসায় প্রাণ হারাতে হয় সুমনকে
ফিরে এলো ২৬শে আগস্ট, এলে না তো তুমি!

প্রকাশঃ আগস্ট ২৬, ২০১৭

আব্দুল্লাহ আল কাফি-

মানুষের জীবন বলতেই সুখ-দুঃখ, কষ্ট-বেদনা, হাসি-কান্না, আনন্দ-উল্লাস সম্বলিত এক বৈচিত্রময় রুপের সমাহার। যা বুকের ভেতরে বেঁধে রাখা স্বপ্ন বা অতীতের কোন স্মৃতিকে নিয়ে বেঁচে থাকে। তবে এই মানবজীবনের কোন একটা দিন তার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের বা আনন্দের হয়ে থাকে। ঐ দিনটির স্মৃতিগুলো সে কোনভাবেই ভুলতে পারে না বা ভুলতে চায়ও না। চোখ বুজলেই সেই স্মৃতিগুলো যেন বাস্তবে তার সামনে এসে দাঁড়ায়।

দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলে গেলেও সেই স্মৃতিগুলো তার মাঝে হয়ে থাকে অমলিন। বছর ঘুরে যখন ঐ দিনটি ফিরে আসে তখন ভীষণভাবে মনে পড়ে সেই দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো, হতে পারে ঐ দিনটিই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের বা বিষাদময় একটি দিন।

কিন্তু তার জীবনে ঐ দিনটি এতো গুরুত্বপূর্ণ কেন? – হতে পারে সেই দিনটিতে ঘটেছিল এমন একটি ঘটনা, যা সে কখনো ভাবতেই পারেনি বা ঐ দিনটিতে তার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ দূরে.. বহুদূরে… এমনকি না ফেরার দেশে চলে গিয়েছিল। হতে পারে সে প্রিয়জন, নিকটাত্মীয় এমনকি বাবা-মা, ভাইবোন। যার কারণে বিশেষ দিনটি ত্যাগের বেদনা পুনরায় আঘাত হানে তার জীবনে, পুরোনো ক্ষত পুনরায় জাগিয়ে তোলে।

হ্যা, আমাদের জীবনেও একটি দিন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কেন? কি হয়েছিল ঐ দিনটিতে আমার জীবনে?

-আজ ২৬শে আগস্ট। ২০১৬ সালের এই দিনে আমাদের পুরো পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীদের কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান আমার বড় ভাই হাসানুল বান্না সুমন। ১৯৯৩ সালের ১৯ জুলাই জন্ম সুমনের। এ অল্প জীবনকালে পৃথিবীর বুকে সে তার কর্ম ও গুণের কারণে সকলের মন জয় করে নিয়েছিল।

বয়সে আমার চেয়ে মাত্র ৪ বছরের বড় হলেও ছিল বন্ধুর মত। ছোটবেলা থেকেই দু’ভাই ঘরে ভেতর চৌকির কোনায় বসে ট্রেন-ট্রেন খেলতাম। খেলাশেষে কখনও সে লাঠি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিতেন আবার কখনও বা গল্প-কৌতুক বলে আমাদের আনন্দ দিতেন। তাছাড়া ছোট থেকেই বিল থেকে মাছ ধরার প্রতি ছিল তার অগাধ নেশা। আম্মু বারংবার নিষেধ করা সত্বেও লুকিয়ে-লুকিয়ে সে প্রায়দিনই মাছ ধরত।

ধীরে ধীরে যখন বড় হতে লাগলাম তখন প্রায় সময়ই ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, ফুটবল খেলা একসাথে খেলতাম। খেলায় আমি কম পারদর্শী থাকলেও সুমন ভাই ছিল খুবই পারদর্শী। প্রায়সময় একসাথে খেলাধুলা, বন্ধুর মত ব্যবহার করা সত্বেও সুমন ভাইকে সবচেয়ে বেশি ভয় পেতাম, কারণ আমাদের পরিবারের মধ্যে সেই একমাত্র আমাকে শাসন করত। তাকে ভয় পেলেও ভাইদের মধ্যে তাকেই সবচেয়ে বেশি ভালবাসতাম। কারণ সমাজের দরিদ্র লোকদের সাহায্য, এলাকার বিয়ে বাড়িতে বাসরঘর সাজানো থেকে শুরু করে বিয়ে সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত স্বেচ্ছায় সহযোগিতা, অসুস্থ লোকদের সাহায্য-সহযোগিতা এমনকি ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সমাজের উন্নয়নমূলক কাজে সে সক্রিয় থাকত।

এলাকায় যখন যুবকদের কোন ক্লাব ছিল না তখন তার নিজ প্রচেষ্টায় এবং আঃ জব্বার, সেলিম, সোহাগ, মুছা, রাসেলসহ আরো কয়েকজনের সহযোগিতায় ২০১০ সালে ‘বন্ধু একতা ক্রিড়া সংঘ’ নামে একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে যেটি বর্তমানে ধর্মীয় এবং জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য ত্রিশাল থানার মধ্যে অন্যতম একটি ক্লাবে পরিণত হয়েছে।

খেলাধুলায় পারদর্শীতা থাকলেও লেখাপড়ায় ছিল তুলনামূলক কম পারদর্শী। তবে সংস্কৃতির দিকে তার ছিল দারুণ পারদর্শীতা। একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে জাতীয় কবি কাজী নজরুর ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আবৃত্তি করার পর এলাকার অনেক লোক তাকে কবি বলে ডাকতো। কবিতা আবৃত্তির পাশাপাশি সংগীত এবং নৃত্যেও ছিল তার চমৎকার পারদর্শীতা। কোনদিন সে আর্ট স্কুলের দ্বারপ্রান্তেও যায়নি কিন্তু তার আঁকা দৃশ্য বা ছবি ছিল মনোমুগ্ধকর। সে যখন কোন শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ত, যখন প্রাইভেট কোর্স শেষ হতো তখন নিজের হাতে আঁকা দৃশ্য বা ছবি স্যারকে উপহার দিয়ে আসত সেটি শিক্ষকরা স্বযত্নে নিজ দেয়ালে টানিয়ে রাখতেন।

অংকনের দিকে তার খুব আগ্রহ থাকলেও আগ্রহের কমতি ছিল না ধর্মীয় কাজে। মহল্লায় ব্যয়বহুল মসজিদ নির্মাণে পর একটানা তিন রমজানে সে ইতিকাফে বসে। এমনকি ২০০৯ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সে মসজিদের ভেতরেই থাকতো।

তার অল্প জীবনকালে নিজ পায়ে দাঁড়ানোর জন্য লেখাপড়ার পাশাপাশি করেছে ব্যবসা। ২০১৪ সালে স্থানীয় বাজারে ‘সুমন ইলেকট্রনিক্স’ নামে একটি দোকান শুরু করে। মোবাইলের সরঞ্জাম বিক্রি এবং টেলিভিশনসহ অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী মেরামতের পাশাপাশি বাসাবাড়ির প্রয়োজনীয় ইলেক্ট্রিক্যাল কাজেও ছিল তার চতুরতা। কারো বাসাবাড়িতে বৈদুতিক লাইন নষ্ট হলেই তারা বলতো- সুমন আমার লাইনটা একটু ঠিক করে দিয়ো তো বাবা। পরবর্তীতে সে ঠিক করে দিত। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে কোন টাকা বা বিনিময় গ্রহণ করত না।

তার ব্যবসায়িক জীবনে দোকানটি সবসময় থাকতো জাকজমকপূর্ণ। দোকান গোছানোর ধরণ, দোকানের ভেতর বিজলী বাতি, উন্নত লাইটিং সবসময় দোকানটিকে চাকচিক্যপূর্ণ করে রাখত। দোকানটি এতোই চাকচিক্যপূর্ণ ছিল যে, দিনের বেলায়ও লাইটিং, বিজলী বাতি সবকিছু জ্বালিয়েই রাখত। তখন মাঝে মধ্যেই কয়েকজন তার সাথে ঠাট্টা করে কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের অন্যতম একটি বাণী ‘যেজন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি আশু গৃহে তার দেখিবে না আর নিশীথে প্রদীপ ভাতি’ শুনাতো। কিন্তু সুমন কখনও ভাবেনি যে কিছু দিনের ব্যবধানে পৃথিবীর বুক থেকে নিভে যাবে তার আলো।

দিনটি ছিল ২৬ শে আগস্ট। দিনটিতে সে পৃথিবীর বুক থেকে চিরনিদ্রায়……… দূরে……… বহুদূরে……….. অনেক দূরে চলে যায় যেখান থেকে কেউ কোনদিন ফিরে আসে না। ২৪ বছর বয়সী সুমন সবাইকে ব্যথিত করে চলে গেল না ফেরার দেশে।

ফিরে এলো ২৭শে আগস্ট, এলে না তো তুমি!

কিন্তু কি হয়েছিল? কেনইবা অকালেই ঝড়ে গেল সুমন নামের নক্ষত্রটি?

– সুমন নিজেকে অসুস্থ অনুভব করে স্থানীয় একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তারের পরামর্শে অসুস্থ থেকে আরোগ্য লাভের জন্য ওষুধ খাওয়া শুরু করে। কিন্তু দিনদিন সুস্থ হয়ে উঠার পরিবর্তে তার অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তার এ অবনতি দেখে ১১ই আগস্ট আম্মু, জোসনা খালা, মামুন কাকা এবং নুরুল্লাহ ভাইয়ের সহযোগিতায় ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে মোশারফ ভাইয়ের সহযোগিতায় ভর্তি করলাম।

তারপর আমি গাজীপুর এর শ্রীপুরের মাওনায় চলে আসলাম ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং এর জন্য। সেখান থেকে যখনি ফেরদৌসি আপু বা নুরুল্লাহ ভাইকে কল দিয়ে সুমনের শারীরিক অবস্থার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করি তখন তারা বলে- ‘সুমনের শরীর জ্বরে কাতরায়, কিন্তু টেস্টে কোন রোগ ধরা পড়েনি।’ ধাপে ধাপে ৪ বার এক্সরে, আল্ট্রাসনোগ্রাম, ব্লাড টেস্টসহ যাবতীয় টেস্ট করানোর পরও কোন রোগ ধরা পড়েনি, সবকিছুই ছিল নরমাল। তবুও ডাক্তারদের পরামর্শে নার্সরা ১০ দিনে প্রায় ৪৮ টি ইনজেকশন পুশ করেছিল তার শরীরে। টেস্টে কোন রোগ ধরা পড়েনি তাহলে কেন এত ইনজেকশন পুশ করছেন ডাক্তার এবং নার্সদের এমন প্রশ্ন করা হলে তারা জানায়, ‘আমাদেরকে কোর্স শেষ করতে হবে। তাই এতো ইনজেকশন দিচ্ছি।’

মাওনা থেকে যখন হাসপাতালে আসলাম সুমন ভাইয়ের কাছে। তখন আম্মু এবং জোসনা খালার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি তাদের মুখে বিষন্নতার ছাপ; তারা এতটাই চিন্তিত এবং হতাশাগ্রস্থ ছিল যে তারা মুখ দিয়ে কাথা বলতেও কষ্ট পাচ্ছিল। হাসপাতালে সুমনকে দেখাশোনা করতে করতে তার নিজেরাই রোগী হয়ে পড়েছিল।

সুমন ভাইকে যখন দেখলাম তখন দেখি ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার মানুষটি শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে গেছে। মুখ দিয়ে কথা বলতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল তার। যেখানে রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় সুমনকে দেখে মনে হতো যেন একটি আস্ত দৈত্য এগিয়ে আসছে সেখানে সেই সুমন আজ অসুখের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে প্রায় পুতুলে পরিণত হয়েছে।

কিছুক্ষণ পরে নার্স এসে বলল, ‘ওষুধ খাওয়ার সময় হয়েছে। সুমনকে এখন ওষুধ খাওয়াতে হবে।’- ৪ বারের টেস্টে যদিওবা কোন রোগ ধরা পড়েনি তবুও তাকে ডাক্তাররা যে কিসের ওষুধ খাওয়াচ্ছে ডাক্তাররাই জানে।

ফিরে এলো ২৭শে আগস্ট, এলে না তো তুমি!

তারপর সুমন ভাইকে বললাম, ‘ভাই ওষুধ খেতে হবে একটু সোজা হও।’

সুমন ভাই বললো, ‘হাসপাতালেই আইছি ভালো হওয়ার লাইগ্গা, তাহলে ওষুধ খাব কেন? হাসপাতালের ডাক্তররাই তো আমারে ভালো করবো, আমি ওষুধ খাবো না।’ অনেক আকুতি-মিনতি করে তাকে ওষুধ খাওয়ালাম।

এদিকে, সুমনের অসুখ অবনতি হওয়ায় ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে লাগলো পুরো পরিবার। সুমনের শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখতে-দেখেতে আব্বু মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। বড়ভাই নুরুল্লাহ একদিকে সাংসরিক চাপ, ব্যবসা সামলানো, অপরদিকে সুমনের পাশে থাকা, সবমিলিয়ে সেও হয়ে পড়ে গভীর চিন্তিত। বড়বোন ফেরদৌসি ও নাসরিন তারাও পড়ে যায় মানসিক চাপে। সারাক্ষণ শুধু তারা ভাবে সুমন কবে সুস্থ হয়ে উঠবে।

মামুন কাকার ঘাড়ে এসে পড়ে দ্বিগুণ চাপ। একদিকে তার নিজের সংসার, স্কুল, আমাদের সাংসরিক কাজে সহযোগিতা এবং সুমনের ব্যাপারে ডাক্তারদের সাথে যোগাযোগ, পরামর্শসহ নানা চাপের মধ্যে পড়ে যায় তিনি। আলমগীর কাকা, বড় মামা, ছোট মামা, নাছিমা খালাসহ ফুফুরাও হয়ে পড়ে চিন্তিত। আলমগীর কাকা তো সুমনের রোগ দেখে অবাকই হয়ে গেলেন! টেস্টে কোন রোগ ধরা পড়ে নাই তাহলে ডাক্তাররা তাকে কিসের ইনজেকশন দিচ্ছে!

সুমনের শারীরিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে কিন্তু ডাক্তাররা সঠিক চিকিৎসা তো দূরের কথা কোন রোগই নির্ণয় করতে পারছে না। সেজন্যে ২৩ আগস্ট সুমনকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার কাছে যদিওবা কবিরাজি চিকিৎসার কোন মূল্য নেই তবুও বেশ কয়েকজন কবিরাজ দেখালাম। তারাও কিছু বুঝতে পারছে না।

২৪ তারিখ হঠাৎ অলৌকিকভাবে সুমন অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠলো। তার বন্ধু- জাহিদুল, সোহাগ, সেলিম, কাউসার, রাসেল, মুছা, মুকুল চাচাসহ অনেকেই দেখতে আসলে তাদের সাথে স্বাভাবিকভাবে গল্প করল, পুকুর পাড়ে বসে গান গাইল, কবিতা আবৃত্তি করল। সিয়াম এবং নাদিম ছোট্ট বাচ্চা, তাদের সাথেও ছবি তুলল। পুকুর পাড়ে শুয়ে-শুয়ে সে নিজেও নিজের ছবি তুলল।

ফিরে এলো ২৭শে আগস্ট, এলে না তো তুমি!

ঐ দিন রাতে আবার শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে লাগল। জ্বরে সারা শরীর প্রচণ্ড কাঁপছে। কোন ওষুধেই কমছে না। মুখে আবোল-তাবোল বলতে শুরু করল। ঘরের সিলিং এর দিকে তাকিয়ে ফেরদৌসি আপুকে বলতে লাগল, ‘আফারে ঐ যে দেখ কয়েকটা ছোট্ট বাচ্চা আমারে মারার লাইগা আইতাছে। আমারে ছুরি দিয়া মারবার চাইতাছে।’

সবাই তখন তার কথা শুনে বিস্মিত! সবাই তাকে সান্তনা দিতে লাগল, ‘কই ওইনো তো কোন বাচ্চাই নাই। আমরা এইন আছি, তোমার কিছুই অইব না।’ কিছুক্ষণ পর সে ঘুমিয়ে পড়ল। আম্মু, ফেরদৌসি আপু, জোসনা খালার চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে না ঘুমাতে ঘুমাতে। তারা সর্বক্ষণ সুমনের পাশেই থাকে।

২৫ তারিখ সকালে আবার আবোল-তাবোল বকতে লাগল। পুরো গ্রামবাসী তাকে দেখার জন্য ছুটে এল। তখন সে বলল, ‘মনতার মা নানী কই, আমি মনতার মা নানীরে দেহাম।’ ৯০ এর অধিক বয়স মনতার মা নানীর। সে নিজেই চলতে পারে না, তবুও খবর পেয়ে সে অনেক কষ্ট সহ্য করে এলো সুমনকে দেখতে। এসে বলল, ‘সুমন আমারে চিনছ’, সুমন বলল, ‘হ, আমহে মনতার মা নানী।’ সুমন তখন মনতার মা নানীকে দেখে অনেক খুশি হল। প্রতিবেশী অনেকেই বলতো লাগল, ‘সুমন কওতো আমি কেডা’, সুমন ঠিকঠাকাভাবেই তাদের নাম বলল। কিছুক্ষণ পরে সে ঘুমিয়ে পড়ল।

ঐ দিন বিকাল বেলা। সারা শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে, শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। কবিরাজ কিংবা ডাক্তার কেউই তার এ জ্বর কমাতে পারছে না। অস্বাভাবিক হারে বাড়তে লাগল রক্তচাপ। শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি দেখে স্থানীয় এক ডাক্তারের পরামর্শে রাত ৮ টার দিকে আবার নিয়ে যাওয়া হয় ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। তবে আম্মু হাসপাতালে না নেওয়ার জন্য বারংবার নিষেধ করেছিল। কিন্তু আম্মুর এ আকুতি কেউ মানেনি। অবশেষে রাত ৯ টার দিকে আলমগীর কাকা, মোশারফ ভাই, আরিফ ভাই সুমনকে আবার ভর্তি হাসপাতালে করল।

ডাক্তররা সুমনের এ অবস্থা দেখে সাধারণ ট্রিটমেন্ট দিলে সে ঘুমিয়ে পড়ে। রাত প্রায় ২ টার দিকে সুমনের ঘুম ভেঙে যায়। সুমনের অবস্থা তখন মারাত্মক ভয়ানক, পেট ফুলতে শুরু করেছে। আরিফ ভাই, জোসনা খালা, আম্মা তখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে! ডাক্তাররা এসে দেখে অবস্থা এতই মারাত্মক যা দেখে ডাক্তাররাই মনে হয় সঠিক ট্রিটমেন্ট ভুলে গিয়েছিল। ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নিল সুমনকে ঘুমের ইনজেকশন পুশ করবে।

যখন ডাক্তাররা সুমনকে ইনজেকশন পুশ করতে চায় তখন আবার ঘটল এক অলৌকিক ঘটনা। যে সুমন বিকাল থেকে কথা বলতে পারে না, সেই সুমন স্পষ্টভাবে ডাক্তারদের আকুতি করে বলতে লাগল, ‘কাকু-কাকু আমারে ইনজেকশন দিবেন না।’ কিন্তু ডাক্তার কি আর রোগীর আকুতি শুনে। তারো তো মনে করে তাদের যে সিদ্ধান্ত সেটাই সঠিক। হউক সেটা রোগীর হিত বা বিপরীত।

অবশেষে ডাক্তাররা সুমনের শরীরে ইনজেকশন পুশ করল। মুহূর্তের মধ্যেই সুমন ভাই ঢলে পড়তে লাগল মৃত্যুর কোলে। সবাই যেখানে তাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল সেখানে সুমন ব্যস্ত হয়ে পড়ে মুসলমানদের প্রথম রোকন বা স্তম্ভ কালিমা নিয়ে। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে নিজেই উচ্চস্বরে তেলাওয়াত করতে লাগল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’। কালিমা তেলাওয়াত শেষে সে চলে গেল চিরনিদ্রায়।

সুমনের বিদায়ে হাসপাতালে আম্মু, খালা, আরিফ ভাই কান্নায় ভারী হয়ে পড়েছিল, তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আলমগীর কাকার মনের ভেতর সুমনের কন্ঠে প্রতিধ্বনি শুনতে পেল। আলমগীর কাকা শুনতে লাগল সুমন তাকে বলছে, ‘কাকা আমি তো ইনজেকশন দিতে না করেছিলাম, তবুও আপনারা আমাকে ইনজেকশন দিয়ে মেরেই ফেললেন। কি দোষ করেছিলাম আমি।’

মায়ের চোখের সামনে মৃত সন্তানের লাশ। মায়ের মন তখন পাহাড় সমান কষ্টে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। ঐ কষ্টের সামনে যদি পাথর আনা হত তাহলে মুহূর্তেই পাথার গলে গিয়ে জলে পরিণত হতো। বুকের ভেতর জমানো কষ্ট শুধু বেড়েই চলেছে। কষ্টের তাপ এতোই তীব্র ছিল যে এই কষ্টের সাথে তুলনা করার মত পৃথিবীতে কোনকিছুই নেই। ক্রমশ সমস্ত হাত পা দুর্বল হয়ে পড়তে লাগল।

এদিকে, জোসনা খালা, আলমগীর কাকা এবং আরিফ ভাইয়ের একই দশা। অল্প কিছুক্ষণ পরেই আম্মুর বাকশক্তি ফিরে এল। লাশের সামনে বসে সুমনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আম্মু পরিণত হল প্রায় উন্মাদে। সন্তান হারানোর যে কত কষ্টের; যেই মা হারিয়েছেন সেই মা একমাত্র বুঝবে।

যখন জোসনা খালা ও আলমগীর কাকা একটু স্বাভাবিক হলেন; তখন জোসনা খালা মামুন কাকাকে ফোন দিল। আমি তখন বারান্দার রুমে শুয়ে শুয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলাম যেন সুমন ভাই ভালো হয়ে যায়। যখন ফোনে কাকা বলল, ‘কি বল’! তখন আমার আর বুঝার বাকি রইল না; সবচেয়ে প্রিয় ভাইটি আর পৃথিবীতে নেই। আমার শরীর তখন পাথরের মত থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। কি করবো বুঝতে পারছি না।
কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। চুম্বক শক্তি যেন আমাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে, শত চেষ্টা করেও আমি জায়গা থেকে নড়তে পারছিলাম না। দু’চোখে শুধু দেখতে লাগলাম চারিদিকে অন্ধকার। পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার যেন আমাকে ঘিরে রেখেছে।

সুমনের মৃত্যুর খবর শুনে নুরুল্লাহ ভাই, ফেরদৌসি ও নাসরিন আপু আমার চেয়ে অনেক বেশি, এমনকি অগণিত বেশি কষ্ট পেয়েছিল, যা শুধু অনুধাবন করা সম্ভব কিন্তু গণনা নয়। নুরুল্লাহ ভাই নিজেও ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ল। তবুও দুই বোনের সামনে নিজেকে সংযত করে তাদেরকে সান্তনা দিতে লাগল। কিন্তু ভাই হারানোর ব্যথা কি সান্তনাতে কাজ হয়? দুই বোন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে উন্মাদের ন্যায় আচরণ শুরু করল। কান্না আর বুক ভরা কষ্টে কি করবে বুঝতে পারছে না তারা, শুধু ছটফট করছে। আত্মচিৎকার ও কান্নায় দুর্বল হয়ে প্রতিবেশীদের কোলে ঢলে পড়ে।

নুরুল্লাহ ভাই নিজের মনকে সংযত করে সুমনের লাশ কিভাবে আনা যায় সে ব্যাপারে কাকার সাথে কথা বলছে। আমার পাশে শুয়েছিল আব্বু। তখন আব্বুর ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে নুরুল্লাহ ভাইয়ের সাথে কাকার কথার শব্দে এবং আমার এ অবস্থা দেখে আব্বুরও বুঝতে বাকি রইল না কি ঘটেছে। আব্বু বুঝতে পারল তার সবচেয়ে উঁচু, সাহসী, পরোপকারী সন্তানটি আর পৃথিবীতে নেই। আমাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘আমার সুমন কোথায়, সুমন কোথায়, আমার সুমন কোথায়, কিয়ে হয়েছে সুমনের?’- পৃথিবীর বুকে বাবার জন্য সর্বোচ্চ কষ্ট হচ্ছে সন্তানের মৃত্যুর সংবাদ। সন্তানের মৃত্যুর সংবাদে কষ্টের আঘাতে জর্জরিত হয়ে চিৎকার করতে করতে পুরো শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ল।

আমি নিজেকে সংযত করে একটু স্বাভাবিক হলাম। নুরুল্লাহ ভাই, মামুন কাকা, ছোট মামা, বড় মাতা তারা সিদ্ধান্ত নিল সুমনকে আনতে তারা ৪ জনই যাবে। তখন আমি গিয়ে বললাম আমিও যাবো। তারা আমাকে বলল তুমি বাড়িতে থাকো। আব্বা, ফেরদৌসি, নাসরিন আপুকে সামলাও। আমাকে ফেলেই তারা চলে গেল। ভাইয়ের মৃত্যুর কথা চিন্তা করতেই ঘা শিউরে ওঠতে লাগলো। ভাইয়ের মুখটি দেখার জন্য আর দেরি সহ্য করতে পারছিলাম না। খালাতো ভাই সোহাগ তখন আমার পাশে। সোহাগকে নিয়েই তখন মোড়ে আসলাম তখন কোন গাড়ি বা সিএনজি কিছুই পাচ্ছিলাম না। এদিকে আবার অপেক্ষা সহ্য করতেও পারছিলাম না। সেলিম, কাওছার ও খলিল মামার সহযোগিতায় জুয়াড় আসর থেকে সিএনজি চালক নাজমুলকে ডেকে এনে যাওয়া শুরু করলাম।

আমাদের বাড়ি থেকে হাসপাতালের দূরত্ব মাত্র ২৫ কি.মি.। সিএনজি তখন সর্বোচ্চ গতিতে চলছিল। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছিল সিএনজি সামনের দিকে এগোনোর বদলে পেছন দিকে যাচ্ছে। কোন অদৃশ্য শক্তি যেন সিএনজিকে এগোতেই দিচ্ছে না।

হাসপাতালে পৌঁছাতে যখন মাত্র ৫ মিনিটের রাস্তা বাকি তখন বিপরীত দিকে থেকে আসা একটি এ্যাম্বুলেন্সের শব্দ শুনতে পেলাম। সোহাগ তখন জানালো সুমনকে নিয়ে চলে আসা হয়েছে। তৎক্ষণাৎ সিএনজি ঘুরিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিলাম। এবারও যেন রাস্তা ফুরোয় না।

ফিরে এলো ২৭শে আগস্ট, এলে না তো তুমি!

বাড়িতে এসে দেখি ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার ভাইটি ঘুমিয়ে আছে। কাছে আসতে চাইলে হারুন কাকাসহ প্রতিবেশীরা আসতে দিচ্ছে না। তখন বললাম, ‘আমি ঠিক আছি।’ কাছে গিয়ে ভাই কে ডাকতে শুরু করলাম। কিন্তু ভাইতো আর কথা বলে না। আমার ডাকে সাড়া দেয় না। সে নিদ্রায় শায়িত আছে চিরদিনের জন্য। দুইবোন সুমনকে দেখে কষ্ট সহ্য করতে না পেড়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। নুরুল্লাহ ভাই নিজের বুকের কষ্টকে ধামাচাপা দিয়ে আমাদেরকে সামলাতে লাগল। কিন্তু তার বুকেও জ্বলছিল কষ্টের আগুন। আব্বু- আম্মু তখন পাগলের মতো পড়ে রয়েছে।

কখন যে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম খেয়াল নেই। তবে যখন জ্ঞান ফিরল তখন শুনতে পেলাম মসজিদে ফজরের আজান হচ্ছে। দৌঁড়ে উঠানে আসলাম ভাইয়ের মুখখানা দেখতে। নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করলাম, প্রিয় ভাইয়ের মুখটির দিকে তাকাতেই দু’চোখ দিয়ে অঝড়ে অশ্রু ঝড়তে লাগল। আর নিজেকে সংযত করতে পারছিলাম না। দুইবোন ও নুরুল্লাহ ভাই তখন সুমনের দিকে চেয়ে শুধুই কাঁদছে। আমাদেরকে সেখান থেকে ঘরে নিয়ে এল কয়েকজন। কিন্তু এ সময় কি আর ঘরে মন বসে; ঘরের ভেতর ধৈর্য্য ধরতে না পেরে ছটফট করতে লাগলাম সুমনকে দেখার জন্য। অনেক আকুতি-মিনতি করার পরে যেতে দিল।

এভাবে চলতে থাকে প্রায় সকাল পর্যন্ত। ততক্ষণে নিজেকে সংযত করে নিলাম। কিন্তু দুইবোন তখনো বারবার ছুটে আসছে সুমনের দিকে। ৪ বছরের ছোট্ট ভাই সিয়াম সুমনের কাছে এসে কেঁদে কেঁদে বলতে লাগল, ‘সুমন ভাই, সুমন ভাই, ওড ওড।’ কিন্তু সিয়াম তো বুঝেনি তার সুমন ভাই চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছে। সে ঘুম থেকে আর কোনদিন উঠবে না।

বেলা প্রায় ১১ টার দিকে আরিফ ভাই, ফখরুল কাকা এবং আরো কয়েকজনের সহায়তায় কাফন সম্পন্ন হলো। কাফনের পর সুমনের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সুমন ভাই যেন হাসছে। এ যেন সুখের হাসি। বাড়ির ভেতর আম্মু ‘আমার স্বন্নের দলা সুমন’ বলে অবিরত কেঁদেই যাচ্ছে। দুইবোন তখন নিজেদের একটু শক্ত করে আম্মুর পাশে বসে আম্মুকে সান্তনা দিচ্ছে। কিন্তু মায়ের মন কি আর সান্তনা মানে।

এদিকে, আব্বু চাতকের ন্যায় আমার, নুরুল্লাহ ভাই ও সুমন ভাইয়ের দিকে তাকিয়েই থাকে। নিজের বুকের ভেতর পাহাড় সমান কষ্ট শুধু ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে কি করবে বুঝতে পারছিল না। দিনটি শুক্রবার হওয়ায় জুমার নামাজের জন্য আগেই তিনভাই, আব্বু এবং অন্যান্যদের সহযোগিতায় মাদ্রাসা মাঠে নিয়ে আসতে লাগলাম। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ভারী পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ। কাঁধে করে সন্তানের লাশ বইয়ে নিয়ে যাওয়া যে কত কষ্টের তা একমাত্র সন্তান হারানো পিতাই বুঝে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আব্বু আর হাঁটতে পারছে না। ক্রমশ থেমে যাচ্ছে তার পা। কষ্ট আর না সইতে পেরে কাঁদতে কাঁদতে ভেঙে পড়ল।

জানাজার জন্য একে একে লোক জড়ো হতে থাকে। জানাজায় এতো লোক হয়েছিল; আমাদের শতোর্ধ্ব বয়সী দাদার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল ঐ মাঠের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লোকের জানাজা। জানাজার সময় যখন মুসল্লিরা সুমনের মুখখানা দেখছিল সেখানে আমরা দুই ভাই শুধু সুমনের মুখের দিকে তাকিয়েই রইলাম। এতো দেখার পরেও যেন তৃপ্তি পাচ্ছিলাম না। শুধু আকাঙ্খা বেড়েই চলেছে, আরেকটু দেখি।

জানাজার শেষে যখন আব্বু, নুরুল্লাহ ভাই ও আরিফ ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালাম তখন দেখি কষ্টের ছাপ তাদের মুখে এমনভাবে লেগে রয়েছে যে ভােই হারানোর ব্যথা যেন বিষ মেশানো তীরের ন্যায় আঘাত করছে। জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন করে কিছুদূর আসার পরে উল্টে কবরের দিকে তাকালাম। তখন সুমন ভাইকে আরেকটি বার দেখার জন্য মন এতো ছটফট করছিল যে, কবর থেকে তুলে শেষবারের মতো আরেকটু দেখি। পরে যখন নিজেকে সংযত করে এগোনোর চেষ্টা করলাম তখন দেখি সামনে শুধুই অন্ধকার। আশেপাশে কে বসে আছে তাদের কারো নাম মনে পড়ছিল না। সবাইকে তখন অপরিচিত মনে হচ্ছিল। শুধুমাত্র মুকুল চাচাকে চিনতে পেরেছিলাম। নিজের অজান্তেই লুটিয়ে পড়লাম তার কোলে। তারপর আর কিছুই মনে পড়ছে না।

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা। আব্বু-আম্মুর কাছে আসলাম, তারা আমার দিকে শুধু তাকিয়ে কাঁদছে। তারা এখনো সন্তানের মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছিল না। দুই বোন কাঁদতে কাঁদতে এখন নিজেরাই রোগী। নুরুল্লাহ ভাই নিজের বুকের কষ্টকে ধামাচাপা দিয়ে দুই বোনকে সামলাচ্ছেন। মামুন কাকা, আলমগীর কাকা, হারুন কাকা, বড় মামা, ছোট মামা, নাছিমা খালা, বড় মামানী, ফুফুরাসহ অন্যান্যরা তখন আমাদেরকে বুঝাচ্ছেন যে, আল্লাহ তার বান্দাকে তার কাছে তুলে নিয়ে গেছেন।

আস্তে আস্তে যখন গভীর রাত ঘনিয়ে আসল তখন হঠাৎ নাসরিন আপুর ঘুম ভেঙে গেল। সে সুমনের থেকে মাত্র ২ বছরের ছোট। ক্লাস থ্রি থেকে একসাথে লেখাপড়া, একসাপথে খেলাধূলা এসব স্মৃতি তার চোখের সামনে ভাসতে লাগল। সে কোনভাবেই সুমনেরে মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছিল না। সুমনের সাথে তার প্রত্যেকটি মুহূর্ত তার মনে আঘাত হানতে লাগল। তার অবস্থা এতটাই স্মৃতিকাতার হয়ে পড়েছিল যে ঘরের ভেতরে থাকা সুমনের স্মৃতিগুলো দেখে বলতে লাগল, ‘ঐ যে সুমন আমাকে ডাকছে, আমি সুমনের কাছে যাবো।’

ফিরে এলো ২৭শে আগস্ট, এলে না তো তুমি!

ঘরের ভেতরে যেহেতু সুমনের স্মৃতিগুলো তাকে আঘাত হানছে তাই গভীর রাতেই তাকে নিয়ে সপরিবারে নানীর বাড়িতে চলে যাই। সেই রাত্রে সে একটু স্বাভাবিক হলেও সকাল থেকেই সুমনের স্মৃতিগুলো তাকে আরো প্রবলভাবে আঘাত হানতে শুরু করে। সুমনের মৃত্যুর কয়েকদিন পরে শিরিন ফুফু স্বপ্ন দেখে, সুমন তাকে বলছে, ‘দেখেন ফুফু আমার বাড়িটা কত সুন্দর। বাড়ির চারপাশে ফুলের বাগান। এখানেই থাকি আমি।’

তারপর আস্তে আস্তে নাসরিন আপু নিজেকে সংযত করে নেয়। স্মৃতিগুলো তার মনে বারবার আসলেও সে সুমনের মৃত্যুকে ধীরে ধীরে হালকা করে নেয়।

এদিকে নাসরিন আপুর অবস্থার উন্নতি হলেও চরম অবনতি হয় আব্বুর শারীরিক অবস্থার। সন্তান হারানোর যন্ত্রণায় হাঁটতে গেলও লাঠি ভর করে আস্তে আস্তে হাঁটতে হতো। যেখানে এরআগে কোনদিন হাঁটতে লাঠির প্রয়োজন পড়েনি। আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ঠিক থাকলেও ভেঙে যায় পুরো পরিবারটির মেরুদণ্ড। পরিণত হয় প্রাণহীন, নিস্তেজ, ছন্দ ছাড়া সংসারে।

কিছুদিন পরেই আসে কোরবানির ঈদ। কিন্তু ঈদের আনন্দ হয়ে উঠে বিষাদ। ঈদ মানে আনন্দ, কিন্তু ঈদের আনন্দ আমাদের কাছে পরিণত হয় নিরানন্দে। আমাদের ভাই, আব্বু-আম্মুর কাছে সন্তান হারানোর শোক ঐ দিনকে পরিণত করে কষ্টের সাগরে।

তবে সময়তো আর থেমে থাকে না, সে চলতেই থাকে; এটিই তার ধর্ম। সময় চলতে চলতে কেটে গেল একটি বছর। আবার ফিরে আসছে সেই কোরবানির ঈদ। হয়তো এবারের ঈদে লক্ষ টাকার কোরবানি জবাই করব। কিন্তু আব্বু-আম্মুর মনে কি তৃপ্তি মিটবে? সাজানো-গোছানো সুন্দর একটি বাগানের সর্বোৎকৃষ্ট ফুলের অভাবটি চিরকাল তাদের মনের ভেতর ক্ষত হয়েই থাকবে। এই ক্ষত আব্বু-আম্মুসহ আমাদের মন থেকে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ভালো হবে না।

শুধু আমাদের নয়; জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্মরণ করবে জাহিদুল, সেলিম, কাউছার, সোহাগ, মুকুল চাচা, ইসরাফিল ভাই, আঃ রাজ্জাক, রাসেলসহ তার সকল বন্ধুরা। যাদের জন্য সুমন ভাই সবসময় নিজেকে উজার করে দিতো। তার বন্ধুরাও ছিল উদার মনের মানুষ। সুমন ভাইয়ের সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে তারা সবসময় পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কখনো সাহায্য, কখনো উৎসাহ, কখনো বা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। ধন্যবাদ জানাই সেলিম, সোহাগ, কাউছার, জাহিদুল, রাসেল, মুকুল চাচা, ইসরাফিল ভাইকে তাদের এ উদারতার জন্য।

তবে মনের আক্ষেপ রয়েই যায় ডাক্তারদের দিকে। যে ডাক্তারদেরকে বলা হয় সৃষ্টিকর্তার পর জীবনদাতা। কিন্তু সে ডাক্তাররাই কখনো কখনো মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের অসাবধানতা, সাধারণ রোগীদের অমূল্যায়ন, সরকারি হাসপাতালে নিজেকে কম নিয়োজিত রেখে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, চেম্বার বা অন্যান্য উপায়ে টাকা কামানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়া, রোগীর রোগকে ভালোভাবে মূল্যায়ন না করা, নিজের খেয়াল খুশি মতো ট্রিটমেন্ট দেওয়া এসব বর্তমানে ডাক্তারদের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যার কারণে প্রতিদিন সারাদেশে মারা যাচ্ছে অগণিত মানুষ।

যদি ডাক্তররা টাকা উপার্জনের দিকে ব্যস্ত না হয়ে সাধারণ রোগীদের সমস্যাকে সচেতনাসহিত মূল্যায়ন করতো তাহলে হয়তো সুমন ভাইয়ের মতো আর কাউকে তাদের ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হতো না। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ ডাক্তাররা যে পথে হাঁটছে এভাবেই যদি চলতে থাকে তাহলে সাধারণ মানুষ তাদের ওপর থেকে অচিরেই আস্থা হারাবে। তখন ডাক্তার নামটি সাধারণ মানুষের মনে হয়ে ওঠবে একটি আতঙ্কের আরেক নাম।

কমেন্টস