থামুন ! আত্মহত্যা শেষ কথা নয়…

প্রকাশঃ জুলাই ২৩, ২০১৭

Advertisement

শাহ্‌রিয়ার নিশান।।

প্রতিদিনের মত বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গিয়েছিলাম বনশ্রীতে। আমরা যখন সবাই নানা গল্পগুজবে মেতে উঠেছি হঠাৎ তখন আমার চোখ পড়ে মাঠের কোণায়। কাছে এক ছোট ভাই (সবুজ ছদ্মনাম) মন খারাপ করে বসে আছে। তার চেহারায় কেমন জানি অস্থিরতা লক্ষ্য করলাম। তাই বন্ধুদের রেখে তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে তোর? প্রথমে কিছু না বলতে চাইলেও পরে বলল, ভাই আমি আজ আত্মহত্যা করব! তার এমন উত্তর শুনে আমি প্রচণ্ড ‘ধাক্কা খেলাম’। তারপরেও নিজের সব আবেগ লুকিয়ে রেখে তাকে বললাম অনেক ভাল সিদ্ধান্ত নিছস তুই। এই জীবন আসলেই এক যন্ত্রণা। এ জীবনে বেঁচে থাকার কোন মানেই হয় না… অথবা বেঁচে থেকে কি লাভ?

আমার এমন কথা শুনে ছোট ভাই তো আরও অবাক। এই বিস্ময় না কাটতেই তাকে  প্রশ্ন করলাম কিভাবে আত্মহত্যা করবি? কোন সিদ্ধান্ত নিছস? ও তখন আমাকে উত্তর দিলো ব্লেড দিয়ে ‘হাত কেটে’ আত্মহত্যা করব। আমি জানতে চাইলাম ব্লেড কিনার টাকা আছে? ও বলল না। আমি তখন টাকা দিয়ে বললাম ব্লেড কিনে নিয়ে আয়। আর সিদ্ধান্ত যখন নিছস তখন আজ রাতেই শুভ কাজটার সমাধান করে দে!

একটু পর সজিব ব্লেড কিনে মন খারাপ করে আমার সামনে আসে দাঁড়ালো। আমি তখন জিজ্ঞাস করলাম কেন তুই আত্মহত্যা করবি? ও বলল ভাই বাবা আমাকে দেখতে পারে না। মা মারা গেছে অনেক আগেই। এখন থাকি ছোট খালার বাসায়। খালু সারাদিন বকে। কলেজের বেতন দিতে পারছি না গত ৬ মাস ধরে। পরীক্ষাও চলে আসছে। আজ খালার কাছে চাইতেই খালু বাবা-মা তুলে অনেক আজে বাজে কথা শুনাইছে। বলেছে, ‘তোর বেঁচে থাকাটা অর্থহীন। তুই একটা অভিশাপ, তুই মরে গেলেই শান্তি। তোর উচিত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেয়, তাহলে আমাদের জন্য অন্তত একটা বোঝা দূর হবে’।

এখন তুমিই বল ভাইয়া আমার বেঁচে থেকে কি লাভ? এ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় আত্মহত্যা করা।

আমি তখন বন্ধুদের বিদায় দিয়ে ওকে বললাম চল তুই আমার সাথে। ওকে নিয়ে চলে  গেলাম একটা বিরিয়ানির দোকানে। ওকে দেখেই বুঝতে পেরেছি ও সারাদিন কিছুই খায়নি। ওকে বললাম দেখ মরে যাওয়ার আগে একটু ভাল মন্দ খাওয়া উচিত। যদিও আমার পকেটে তেমন টাকা নাই তারপরেও কাচ্ছি আর বোরহানি দিয়ে তোর জীবনের শেষ খাবারটা খেতে পারবি।

খাবার শেষ করে ওকে বললাম কই যাবি?ও বলল জানি না। আমি তখন বললাম এখন চল আমার সাথে, আমার বাসায়। তোর যখন মনে হবে এখনি আত্মহত্যার উপযুক্ত সময় তখনি বাসা থেকে বের হয়ে যাইস।

তারপর ব্লেড দিয়ে হাত কেটে সব যন্ত্রনাকে বিদায় দিয়ে হাসি মুখে পরপারের যাত্রা। বিষয়টা অনেক ইন্টারেস্টিং! কি বলছ?

ওকে নিয়ে রাত প্রায় সাড়ে ১১টায় হাজির হলাম আমার বাসায়। হাতের কাছে পেলাম হিমু সামগ্র বইটি। ‘এবং হিমু’ উপন্যাসটি সজিবকে পড়তে দিয়ে বললাম, শুধু শুধু সময় নষ্ট না করে এই উপন্যাসটি পড়ে শেষ কর। ও বলল ভাই আমি আত্মহত্যা করব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি বললাম তাকে কি? মরার আগে বই পড়লে কোন সমস্যা হয় না। ও তখন আমার চাপে পড়ে বই পড়তে শুরু করলো।

এদিকে আমি নিজেকে গুছিয়ে নিলাম। রাত প্রায় ৩ টার দিকে বই পড়া শেষ করে ও অনেকটাই শান্ত হয়ে গেল। আর এই সুযোগে আমি আমি তার কাউন্সেলিং শুরু করি। তার নেতিবাচক চিন্তাপদ্ধতি পরিবর্তন, প্রতিরোধ, পুনর্বাসন, জীবনের মানোন্নয়ন ও বিভিন্ন সমস্যা সমাধান নিয়ে শুরু করি আলোচনা। সেই সঙ্গে প্রিয়জনকে হারানোর বেদনায় আচ্ছন্ন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক ভয়, হতাশাগ্রস্ততা, আর একাকীত্ব নিয়ে আলোচনা করতে করতে কিছুটা সময় যাবার পর আমি আস্তে আস্তে তাকে বাস্তব দুনিয়ায় নিয়ে আসতে সক্ষম হই। তাকে বুঝাই, এ দুনিয়ায় প্রাণ আছে, ভালোবাসা আছে, বেঁচে থাকার একশ একটা কারণ আছে! অবশেষে আমার পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করি। আর সেই যাত্রায় আত্মহত্যা নামক খুনি শব্দটার হাত থেকে আজীবনের জন্য সবুজ বেঁচে যায়।

সবুজ হয়তো বেঁচে গিয়েছে কিন্তু সমাজে প্রতিনিয়ত এমন হাজার সবুজ নিজেকে মুক্তি দিচ্ছে আত্মহত্যার মাধ্যমে। একজন মানুষ কখন ঠিক কী কী কারণে আত্মহত্যা করতে চাইতে পারে? আত্মহত্যা কি? উত্তরটা দেওয়ার আগে বলতে হয় আমরা এক কঠিন সময় পার করছি। অস্থিতিশীল এই সময়ে মাঝে মাঝে জীবনটাকে বড়ই অর্থহীন মনে হয়। মনে হয় বেঁচে থেকে আর কি লাভ? এই উত্তর খুঁজে না পেয়ে হারিয়ে ফেলি আমাদের মানসিক মানসিক ভারসাম্য। আর তখনি আমরা সিদান্ত নিই স্বেচ্ছামৃত্যু বা আত্মহত্যার পথ।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যা একটি প্রতিরোধযোগ্য ভয়াবহ এবং সামাজিক ব্যাধি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বে প্রতি তিন সেকেন্ডে একজন আত্মহত্যার প্রচেষ্টা (Attempt to suicide)এবং প্রতি মিনিটে একজন আত্মহত্যা করে। সে সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট বলছে- প্রতিবছর যেসব কারণে সারাবিশ্বে মানুষের মৃত্যু ঘটে, তার মধ্যে দশম প্রধান কারণ আত্মহত্যা। কিশোর-কিশোরী এবং যাদের বয়স পঁয়ত্রিশের নিচে, তাদের মৃত্যুর প্রধান কারণটিও আত্মহত্যা।

সেই সাথে বলা হয়েছে- মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে ৮৭% থেকে ৯৮% আত্মহত্যা সংঘটিত হয়। এছাড়াও, আত্মহত্যাজনিত ঝুঁকির মধ্যে অন্যান্য কারণও আছে। যেমন – প্রেমে ব্যর্থতা, নেশায় আসক্তি, জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে না পাওয়া, মানসিক আঘাত অথবা মানসিক রোগ আত্মহত্যার অন্যতম প্রধান উপাদান। সেই সাথে বেকারত্ব, দারিদ্র্যতা গৃহহীনতার মতো বিষয়গুলো আত্মহত্যার প্রতি উৎসাহিত করে থাকে।

এছাড়া শৈশবের কোন নেতিবাচক স্মৃতি, মানসিক শারীরিক কিংবা যৌন নির্যাতন, মাত্রাতিরিক্ত মানসিক অবসাদ অথবা কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত হওয়া প্রভৃতি কারণও মানুষের আত্মহত্যার কারণ হিসেবে বিবেচিত।

আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত একজন সুস্থ মানুষ কখনোই নিতে পারে না। মানসিকভাবে চরম ভারসাম্যহীন হলেই তবে মানুষ আত্মহত্যার মত কঠিন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতি তিনজনের মানুষের মধ্যে একজন মানুষের মাথায় জীবনের কোনও না কোনও সময়ে আত্মহত্যার চিন্তা আসতে আসে। আর এখন তো আত্মহত্যাকারীদের বেশীরাভাগই ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আরেকটি হিসেব মতে, সারা বিশ্বে বর্তমানে প্রতি বছর গড়ে ১০ লাখ লোক আত্মহত্যা করছে। আর যারা আত্মহত্যা করবার চেষ্টা করে কোনো-না-কোনো কারণে ব্যর্থ হয়, তাদের সংখ্যা আত্মহত্যাকারীদের বিশ গুণ। আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি পূর্ব-ইউরোপের দেশগুলোতে হলেও পৃথিবীর যত মানুষ আত্মহত্যার মাধ্যমে মৃত্যুবরণ করে, তার মধ্যে ২.০৬ শতাংশ বাংলাদেশি। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রতি লাখে ১২৮.০৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতিবছর এই সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ২৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। এ তালিকা থেকে মুক্তি পায়নি ইউনিভার্সিটির প্রবীণ শিক্ষক, চিকিৎসক, পুলিশ, সাংবাদিক, অভিনয়শিল্পী, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বাংলা-ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়া ছোট শিশুরাও।

একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, প্রতিবছর দেশে গড়ে ১০ হাজার ৪শ’ ৮৪ জন আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। আর প্রতিমাসে আত্মহননের সংখ্যা ৪শ’ ৭৪।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বে মহিলাদের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় পুরুষ আত্মহত্যা করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের ঝিনাইদহ জেলাতে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে আত্মহত্যাকারীদের শতকরা ৬০ ভাগ মহিলা এবং ৪০ ভাগ পুরুষ। শুধু তাই নয় বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে এই ঝিনাইদহ জেলায়।

দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের গবেষণায় থেকে দেখা যায়, যারা আত্মহত্যার চেষ্টা করে বা করেছেন তাদের অধিকাংশই মানসিকরোগে আক্রান্ত ছিল। তাদের অধিকাংশই পরিবারের সদস্য, বন্ধু-বান্ধবের কাছে আত্মহত্যার ইচ্ছা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে প্রকাশ করে ছিল। পরিসংখ্যানে আরো পাওয়া যায় যারা আত্মহত্যা করেছে তাদের ৮০ ভাগই আত্মহত্যার পূর্বাভাস দিয়েছে কিন্তু যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে কেউ প্রতিরোধের ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারেনি।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা। সাধারণত দু’ভাবে আত্মহত্যা সংঘটিত হয়ে থাকে। এক. পরিকল্পনার মাধ্যমে আত্মহত্যা করা। দুই. তাৎক্ষণিক উত্তেজনা বা তাড়নায় ইমপালসিভ আত্মহত্যা। পরিকল্পনাকারীদের মনে প্রথমে আত্মহত্যার ইচ্ছা জাগে, ইচ্ছার পর পরিকল্পনা করে আত্মহত্যার জন্য এ্যাটেম্পট গ্রহণ করে। এই ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিষণ্ণতা রোগের শেষ পরিণতি হচ্ছে পরিকল্পনার মাধ্যমে আত্মহত্যা।

মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড এর মতে, যখন ভালোবাসার মানুষের প্রতি সৃষ্ট তীব্র রাগ ও আক্রমণাত্মক মনোভাব নিজের প্রতি ধাবিত হয়, তখনই মানুষ আত্মহত্যা করে। অন্যকে হত্যা করার সুপ্ত কামনা মনে যখন অবদমিত হয়, তখনই সেটা আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করে। মানুষের মধ্যে একটি শক্তি তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়, আরেকটি তাকে ধ্বংস করে ফেলতে চায়। এই ধ্বংসের শক্তির জন্যই মানুষ আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যাকারীর মধ্যে হত্যার কামনা, নিহত হওয়ার কামনা ও মৃত্যুর কামনা লক্ষ করা যায়।

অপরদিকে আত্মহত্যার চেষ্টাকারীদের মধ্যে তার মৃত্যুর পর কী কী পরিস্থিতি হবে, কার কী কী প্রতিক্রিয়া হবে, তার মৃত্যুর ফলে কে কে গুরুতর কষ্ট বা ‘শাস্তি’ পাবে, এসব বিষয়ে নানা রকম কল্পনা দেখা যায়। অনেকে আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজেকে শাস্তি দিতে চায়। অনেকে তার ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে এ জনমে মিলিত না হতে পেরে পর জনমে মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে আত্মহত্যা করে।

কারণ যা-ই থাকুক, আত্মহত্যা কখনই গ্রহণযোগ্য নয়। দার্শনিকরা বরাবর আত্মহত্যাকে অগ্রহণযোগ্যই গণ্য করেছেন। মানব জীবনে যেমন ভালো সময় থাকে, ঠিক তেমনি খারাপ সময়ও থাকে। ভালো খারাপের সংমিশ্রণেই জীবনের সৃষ্টি। তাই আপনার জীবনে খারাপ সময় চলছে মানে এই নয় যে আপনার জীবনে আর কখনো ভালো সময় আসবে না। কিন্তু তাই নিজের জীবন শেষ করে ফেলাটা বড় বোকামি ছাড়া কিছু নয়।

একটু ভিন্ন করে ভাবুন। কিংবা বারবার চেষ্টা করার পরও কোন একটি কাজে আপনি অকৃতকার্জ হয়েছেন বা সফলতা আপনাকে ধরা দিচ্ছে না। তাই বলে ব্যাপারটা এমন না যে আপনি আর পারবেনই না। নিজেকে বলুন আপনি পারবেন। আপনার চিন্তা ভাবনায় একটু পরিবর্তন আনুন। নিজেকে কিছু আলাদা সময় দিন। বুঝতে চেষ্টা করুন, আপনার নিজের কোন ভুলের কারনে আপনি ব্যার্থ হচ্ছেন কিনা।

প্রেমে ব্যার্থ হয়েছেন তো কি হয়েছে? আপনি কাউকে ভালোবাসতেই পারেন। যে কোন কারনেই সেই ভালোবাসার সম্পর্ক ভেঙ্গে যেতে পারে। আপনি প্রতারণা, অবহেলার স্বীকার হলেন মানেই যে আপনার জীবন দিয়ে দিতে হবে তা নয়। বরং আপনি আরো একবার নিজের জীবনটাকে সুন্দর ভাবে গোছানোর সুযোগ পেয়েছেন।নিজেকে একটু সময় দিন। পরিবার বা প্রিয় মানুষগুলোর সাথে সময় কাটান। দরকার হলে কয়েকদিনের জন্য একঘেয়ে জীবন থেকে ছুটি নিয়ে কোথাও ঘুরে আসুন। নিজের জীবনকে হনন নয়, নতুন করে সাজাতে শিখুন।

‘আমাকে দিয়ে আর হবে না, আমি কিছুতেই পারবো না, এভাবে কিছুতেই সম্ভব না’… এই ধরণের প্রশ্ন  গুলো যখনি মনে হবে নিজেকে শক্ত রাখুন, মনকে অন্যদিকে ব্যাস্ত রাখুন। মনে রাখবেন, আত্মহত্যা কখনোই একজন মানুষের জীবনে কোন সমস্যার সমাধান দিতে পারে না।

ইসলাম ধর্ম কোন অবস্থাতেই আত্মহত্যাকে সমর্থন করে না। ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মেও আত্মহত্যা মহাপাপ। পবিত্র আল-কুরআনের সুরা নিসার একটি আয়াত হলো: “তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর দয়ালু। আর যে বাড়াবাড়ি ও জুলুমের কাজ করবে, তাকে আমি আগুণে পোড়াবো। একাজ আল্লাহর পক্ষে সহজ।” এ আয়াতটি আত্মহত্যার বিরুদ্ধে নাজেল হয়েছে।

নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তো আত্মহত্যাকে সরাসরিই নিষিদ্ধই ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, “কোনো মানুষকে অভিশাপ দেয়া তাকে হত্যা করার শামিল। কোনো মুমিনকে মিথ্যামিথ্যি কাফের বলা তাকে হত্যা করার শামিল। আর যে-ব্যক্তি কোনো জিনিষ দ্বারা নিজেকে হত্যা করবে (অর্থাৎ আত্মহত্যা করবে), কিয়ামতের দিনও তাকে সেই জিনিস দ্বারা শাস্তি দেয়া হবে।” (বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ)।

আত্মহত্যা কোনো অবস্থাতেই কাম্য হতে পারে না। আত্মহত্যার মাধ্যমে একটি জীবনই শুধু নষ্ট হয় না। প্রতিটি আত্মহত্যার বিরূপ প্রভাব পড়ে পরিবারের ওপর, সমাজ এমনকি রাষ্ট্রের ওপর। একটি আত্মহত্যার ঘটনা একটি পরিবারের সারা জীবনের সুখ কেড়ে নিয়ে গভীর কষ্টের মাঝে তাঁদের নিমজ্জিত করে।

আমাদের দেশে এখনো মানসিক অসুস্থতাকে পাগলের উপসর্গ হিসেবে দেখা হয়। একজন মানুষ যে কোন কারনেই মানসিকভাবে অসুস্থ হতে পারে। কিন্তু এজন্য তারা চিকিৎসা নিতে চাইলেও বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় সমাজ। তাদের পাগল বলে মানুষ হাসাহাসি করে। একজন মানুষ যখন মানসিকভাবে অসুস্থ হয় তখন সে বা তার আশপাশের মানুষ এটাকে গুরুত্ব দেয় না এবং দিলেও প্রকাশ না করে চেপে যায়। অথচ সে সময় চিকিৎসার পাশাপাশি বন্ধুবৎসল মানুষের বড় প্রয়োজন হয় যারা তাকে মানসিকভাবে সাপোর্ট দেবে, ভালোবাসবে।

আপনার আশপাশে মানসিক রোগ সিজোফ্রেনিয়া বা বিষণ্নতায় ভোগা মানুষগুলোর দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিন। বাবা,মা, ভাই, বোন কিংবা বন্ধুরা তার পাশে থাকুন। তাকে বুঝতে চেষ্টা করুন, বোঝাতে চেষ্টা করুন। প্রয়োজন হলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। অবসাদগ্রস্ত মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মানুষটির সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন সঙ্গ। আমাদের দাঁড়াতে হবে আত্মহত্যা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির পাশে। আত্মহত্যার ঝুঁকি শনাক্ত করতে হবে স্বজনদের। ঝুঁকি শনাক্ত করে আত্মহত্যার পূর্বেই ভূমিকা রাখতে হবে আমাদের।

মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু তাই বলে, ‘মরে যাওয়া মানে মুক্তি নয়। তুমি বাঁচো তোমার স্বপ্নে, তোমার কর্মে, তোমার চেতনায়’। আর কোন আত্মহত্যা নয়, আত্মউপলব্দি করুন পৃথিবীর সকল সুন্দরের। আর মৃত্যুকে দুরে সরিয়ে সব অসুন্দরকে দূর করেদিন। কোন মানুষের জীবনই মূল্যহীন বা অর্থহীন হতে পারে না। একটু নিজেকে সময় দেন,কে জানে, হয়তো ঘুরতে ঘুরতেই খুঁজে পাবেন জীবনের অর্থ!তখন আর আত্মহত্যা করার সুযোগ থাকবে না।

বিশ্বাস করি, জীবন নিয়ে যখন একজন মানুষ প্রচণ্ড পরিমাণে হতাশ হয়ে পড়েন তখন কোন প্রকার নীতিবাক্যই তাকে তার সিদ্ধান্ত থেকে ফেরাতে পারে না। তাই, আপনার নিজেকে বুঝানোর দায়িত্ব মূলত আপনার নিজেরই। হয় তো এমন কিছু মানুষ আছে যারা আপনাকে নিয়ে ভাবছে-ভালোবাসছে। তাদেরকে কষ্ট না দিয়ে অন্তত তাদের জন্য হলেও বাঁচতে শিখুন। দুঃখ নয়, বরং সুগভীর প্রেম আনন্দ নিয়ে বাঁচুন।

Advertisement

Advertisement

কমেন্টস