‘ধর্মানুসারে সরকারি ছুটি দিতে হবে’ কলামে সাড়া দেয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ

প্রকাশঃ জুন ১৫, ২০১৭

ফারুক আহমাদ আরিফ-
বন্ধু তন্দ্রা কানজিলাল ইফতার মাহফিলে আসলেন বৃষ্টিতে ভিজে। পাশে দাঁড়াতেই চেয়ার টেনে বসার আমন্ত্রণ জানালাম। মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে বসলেন। বললাম বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে আসলেন? তিনি বললেন-না, একজন দিয়ে গেছে। নানা বিষয়ে কথা হলো। একটু পর তিনি অারেকটি হাসি দিয়ে বললেন-আরিফ ভাই সরকার ‘সব ধর্মের প্রধান উৎসবের ছুটি বাড়বে’ নামে একটি নিউজ পড়লাম।
আমি আগ্রহ নিয়ে বললাম কোথায় দেখিত ভাই? তিনি আশরাফুল হক রাজীব সাহেব লিখিত কালের কণ্ঠের নিউজটি দেখালেন তার মোবাইল স্কিন থেকে। পড়লাম হন্য হয়ে। সংবাদটি পড়তে গিয়ে খুব-ই সম্মান, শ্রদ্ধা আর আবেগে বার বার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। তারপরও মনোযোগ দিলাম পড়ায়। বার বার শিহরিত হচ্ছিলাম সংবাদটি পড়ে। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে তন্দ্রাকে বললাম ‘আমার খুব ভালো লাগছে। সরকার আমাদের দাবিতে সাড়া দিয়েছে। আমরা এমন ছুটি চাচ্ছিলাম ২০১৫ সাল থেকে। আমার কাছে খুব ভালো লাগছে।’

২৩ মে-২০১৭ থেকে নানা অপমান, অবজ্ঞা নির্যাতন আর নিষ্পেষণের কারণে মনটা একেবারে ভেঙে পড়েছে। কোন কাজেই শৈল্পিকতা আনতে পারছিলাম না। এমন মুহূর্তে ঐতিহাসিক একটি সংবাদ পড়ে মনটা অনেক ভালো লাগলো। কষ্টের পরেই যে আনন্দ আসে আমার জীবনে ‘সব ধর্মের প্রধান উৎসবে সরকারি ছুটি বাড়বে’ সংবাদটি তেমনি আনন্দ নিয়ে আসলো। শুধু মুসলিম নয় সব ধর্মের মানুষও যে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে দীর্ঘ সময়ধরে আনন্দে ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারবে এর চেয়ে সুখী খবর আর কি হতে পারে? নিজের সুখ জ্বলাঞ্জলি দিয়ে অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর কাজ সব সময়ই করে যাই। কিন্তু কখনো কখনো অযথা উর্ধ্বতন ব্যক্তিদের অপমান আমাকে নিষ্ক্রীয় করে দেয়। তেমনি মুহূর্তে এই সংবাদটি মনে প্রশান্তি নিয়ে আসলো। নাবিলকে উপস্থাপনার তালিকা প্রস্তুত করতে দিয়ে তন্দ্রাকে বললাম চলুন স্যারকে জানিয়ে আসি আনন্দের সংবাদটি।

স্যার মানে স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (এসইউবি) র জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ (জেসিএমএস) বিভাগের সমন্বয়ক অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর সজীব সরকার। তিনি আমাদের বাবা-মা, শিক্ষক, অভিভাবক এমনকি কখনো কখনো বন্ধু।
তন্দ্রা ও মাহিকে নিয়ে ডিপার্টমেন্টে গেলাম স্যারকে বিষয়টি জানানোর জন্যে। গিয়ে স্যারকে সালাম দিলাম। পূর্ব থেকেই সেখানে বাশার, অনির্বাণ, লিয়ন, রবি, সঞ্জয়সহ অনেকেই আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন।

স্যার বসতে বললেন। বাশাররা একটু নড়ে চড়ে বসে বসার জন্যে চেয়ার দিলেন। বসলাম। কিছুক্ষণ বিভিন্ন বিষয়ে কথা হলো। তন্দ্রা আর মাহি বসলো সোফায়।
স্যারকে বললাম স্যার একটা আনন্দের সংবাদ জানাতে আপনার কাছে আসলাম। স্যার বললেন কি? বললাম স্যার আমরা ২০১৫ সাল থেকে সকল ধর্মানুসারে সরকারি ছুটি দিতে দাবি জানিয়ে আসছিলাম। অর্থাৎ মুসলমানদের ঈদের ছুটির মতো হিন্দুদের দূর্গাপূজা, বৌদ্ধপূর্ণিমা, খ্রিস্টানদের বড়দিন ইত্যাদি। গত বছর (ধর্মানুসারে সরকারি ছুটি দিতে হবে ২০১৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর) এই নিয়ে বিডিমর্নিংয়ে কলাম লেখেছিলাম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় গতকাল (১৩ জুন) এই বিষয়ে জনপ্রসাশন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছে সব ধর্মের প্রধান উৎসবে মুসলমানদের ঈদের মত ছুটি দেওয়ার জন্যে ব্যবস্থা নিতে। স্যার বললেন ‘এটি করতে পারলে ভালো হয়। তবে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলো এসব করবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে।’
বললাম কেন করবে না? তারা কি সরকারের দেশের আইন মানবে না?
স্যার বললেন ‘অনেক প্রতিষ্ঠান ত মানছে না। মাতৃত্বকালীন ৪ মাসের ছুটি দেয় না। ছুটি চাওয়ার কারণে কাউকে কাউকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এমন নজিরও রয়েছে।’ বললাম স্যার এটাতো অন্যায় এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সকলের প্রতিবাদ করা প্রয়োজন এবং করতে হবে। সবাই মিলে দাবি জানালে অবশ্যই মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ সকলের সুযোগ-সুবিধা আদায় করা সম্ভব।

সকল ধর্মের মানুষের জন্যে তাদের ধর্মীয় বড় বড় উৎসবে ছুটির বিষয়টি মাথায় আসে ২০১৫ সালে ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’ আন্দোলনে ১৪ সেপ্টেম্বর বিজয়ী হওয়ার পর গোয়েন্দাদের নানা ধরনের অপতৎপরতার কারণে আমি বাড়িতে গিয়ে বাবা-মার সাথে কোরবানির ঈদ উদযাপন করতে পারিনি। আমার কাকার বাসা লক্ষীপুরের রামগঞ্জে গিয়ে মোবাইল ফোন বন্ধ করে (ভিন্ন সিম চালানো) অবস্থান করতে হয়েছিল। কাকা-কাকির আদর, স্নেহ, মমতা, ছোট ভাই-বোনের সম্মান-শ্রদ্ধা সত্ত্বেও আমার মনে মা-বাবা. ভাই-বোন, নানা-নানী, দাদা-দাদী, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের কথা বার বার মনের পর্দায় ভেসে বেড়াচ্ছিল। মায়ের অভাব আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছিল। বিষয়টি নিয়ে আমাকে খুব ভাবিয়ে তুলেছিল যে, আমার হিন্দু বা খ্রিস্টান বন্ধুরাও তো এমন সমস্যায় পড়ে। দূর্গাপূজায় তারা বেশি ছুটি পায় না। তাদের মা-বাবা কষ্ট পায় নিজের সন্তানদের কাছে না পেয়ে। ঈদের ছুটি কাটিয়ে ক্যাম্পাসে আসার পর বিষয়টি নিয়ে হিন্দু ও খ্রিস্টান বন্ধুদের এই নিয়ে সরকারের কাছে দাবি জানানো, মানববন্ধন করাসহ নানা বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করি। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালের ১৯ থেকে ২৩শে অক্টোবর পর্যন্ত হিন্দুধর্মালম্বীদের দূর্গাপূজাতে ছুটির জন্যে  এসইউবির হিন্দু শিক্ষার্থীদের ৩ দিনের ছুটি আদায়ে কল্পনা, রোম্পা পাউলসহ বেশ কয়েকজনকে নিয়ে রেজিস্ট্রার প্রফেসর একরাম উদ-দৌলা স্যারের কাছে যাই। কিন্তু তিনি কোন ধরনের সিদ্ধান্ত দিতে পারলেন না। অবশেষে ডিপার্টমেন্ট অব বিজনেস স্টাডিজ অ্যান্ড সোসাল সাইন্স এর ডিন প্রফেসর ড. আশরাফুল ইসলাম স্যার, এসইউবির উপদেষ্টা প্রফেসর এস এম ফায়েজ স্যারকে সাথে নিয়ে তিনি বোর্ড অব ট্রাস্টিজকে রাজী করালেন যে, হিন্দু শিক্ষার্থীরা দূর্গাপূজার ছুটিতে বাড়ি যাবে। তাদের ক্লাস এটেন্ডেন্স দেওয়া হবে তবে পরবর্তীতে তাদের জন্যে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করা হবে।
এইভাবেই সকল ধর্মের মানুষের জন্যে সরকারি ছুটির বিষয়টি হাটি হাটি পা পা করে এগিয়ে যায়। ১৩ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দিয়েছেন যে, ‘শুধু ঈদ নয়, সব ধর্মের প্রধান উৎসবের ছুটি বাড়বে। মুসলমানদের ঈদের ছুটির আদলে হিন্দু ধর্মের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজা, খ্রিস্টানদের বড়দিন এবং বৌদ্ধদের উৎসব বুদ্ধপূর্ণিমার ছুটিও বাড়বে।’

বিষয়টি ১৯ জুন মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে আলোচনা হবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা আমরা পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। দুই ঈদে মোট ছয় দিন ছুটি বাড়ালে নৈমিত্তিক ছুটি অবশিষ্ট থাকে ১৪ দিন। দুর্গাপূজা, বড়দিন ও বুদ্ধপূর্ণিমায় আরো এক দিন করে বাড়ালে মোট তিন দিন ছুটি বাড়াতে হয়। ফলে নৈমিত্তিক ছুটি থাকে আর ১১ দিন।

আজ রাতে আশরাফ স্যারকে ফোনে সরকারের ছুটির বিষয়টি জানালাম। স্যার খুব খুশি হলেন। তিনি বললেন, ‘আরিফ তোমাদের সেই দাবি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলায় আমাকে অনেক ধরনের বৈরিতার মধ্যে পড়তে হয়েছিল। বিভিন্নভাবে কষ্ট দেয়া হয়েছিল কিন্তু আমি তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে সব নীরবে সহ্য করে নিয়েছি। কোন কাজে লেগে থাকলে যে বিজয় আসে এটি তার প্রমাণ। সরকার এমন একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। সকল ধর্মের মানুষের প্রধান প্রধান ধর্মীয় উৎসবগুলো পরিববার-পরিজনের সাথে উপভোগ করুক। সবার জন্যে শুভ কামনা রইল।’

২৫ সেপ্টেম্বরে আমার ‘ধর্মানুসারে সরকারি ছুটি দিতে হবে’ লেখায় কয়েকটি দাবি উত্থাপন করেছিলাম তা হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমাদের দাবি হচ্ছে ‌’১. হিন্দুদের পূজা উৎসব, বৌদ্ধদের বৌদ্ধপূর্ণিমা, খ্রিস্টানদের বড়দিনসহ ধর্মীয় বড় বড় বিভিন্ন উৎসবগুলোতে মুসলমানদের ইদের ছুটির মতো ৩দিন সরকারি ছুটি দিতে হবে। (এই সময়টাতে শুধু নিজ নিজ ধর্মানুসারে হবে অর্থাৎ পূজা উৎসবের তিনদিনের ছুটিতে মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানরা ছুটি পাবে না।) ২. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একই নিয়ম চালু থাকবে। ৩. বিভিন্ন বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ যাবতীয় প্রতিষ্ঠানে এই নিয়ম জারি থাকবে।’ তবে শারদীয় দুর্গোৎসবে মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী ও মহাদশমী পূজা হয়ে থাকে বিধায় তাদের জন্যে ৫দিন সরকারি ছুটি রাখতে হবে।

তা ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের ধর্মীয়ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন- মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে ইদ, খ্রিস্টানপ্রধান দেশগুলোতে বড়দিন, বৌদ্ধপ্রধান দেশগুলোতে বৌদ্ধ পুর্ণিমা, হিন্দুপ্রধান দেশে পূজা উৎসবসহ নিজস্ব ধর্মানুসারে রাষ্ট্রীয় ছুটি থাকে। এতে করে অন্য ধর্মের মানুষরা ছুটি থেকে বঞ্চিত হয়। এই বিষয়টি লক্ষ্য করে উপরে উল্লেখিত পরামর্শ অনুযায়ী ৩দিনের ছুটির ব্যবস্থা করার অনুরোধ রইল।

প্রতিটি মা’ই আশা করে তার সন্তানকে সাথে নিয়ে ধর্মীয় উৎসব পালন করবেন। আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্জিত বাংলাদেশের সরকারের কাছে দাবি ও মিনতি জানাচ্ছি সকলের ধর্মীয়মূল্যবোধকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে ‘ধর্মানুসারে সরকারি ছুটি দিতে হবে।’ তবে দুই ইদে সরকারি ছুটি সকলের জন্যেই বহাল থাকবে। চলতি বছরের ৭ থেকে ১১ অক্টোবর শারদীয় দুর্গোৎসব থেকেই যথাসম্ভব এটি কার্যকর করা যেতে পারে।
২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ থেকে ১৩ জুন ২০১৭ পর্যন্ত কলাম লেখার ৮ মাস ১৯ দিন পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের সেই দাবির প্রতি সাড়া দেয়ায় আমাদের অন্তরস্থল থেকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ সরকার এমন একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আবারও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

উল্লেখ্য সৌদি আরবে ঈদুল ফিতরের ছুটি থাকে সাত দিন। ঈদুল আজহার ছুটি থাকে ১০ দিন। চীনে বসন্ত উৎসবে সরকারি ছুটি থাকে টানা সাত দিন। অক্টোবর মাসেও ছুটি আছে এক সপ্তাহের। মালয়েশিয়া, ব্রাজিলসহ অন্যান্য দেশেও দুই ছুটির মাঝের কর্মদিবসগুলোকে ছুটি ঘোষণা করা হয়।

লেখক: শিক্ষার্থীঃ জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ; স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও  মুখপাত্র: নো ভ্যাট অন এডুকেশন

ইমেইল: [email protected] ২৫ সেপ্টেম্বর-২০১৬, ১০৬ ধানমন্ডি, ঢাকা)

৫/৮ লালমাটিয়া, ঢাকা-১২০৭,
১৪ জুন-২০১৭, রাত ১১ টা ৫৫

Advertisement

কমেন্টস