‘চারুকলার শিক্ষার্থীরা ভাস্কর্য ভাঙচুর করেছে এটা অদ্ভুত’

প্রকাশঃ এপ্রিল ১৯, ২০১৭

গোলাম রাসূল, রাবি প্রতিনিধি- 

উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক প্রফেসর হাসান আজিজুল হক বলেন, ‘চারুকলার শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তার জন্য ভাস্কর্য ভাঙচুর করেছে, এটা আমার কাছে অদ্ভুত বা আশ্চার্য মনে হয়েছে। কারণ পাঠ্য পুস্তকের মতোই চারুকলার শিক্ষার্থীদের কাছে ভাস্কর্য একই গুরুত্ব বহন করে। আর এটা কখনো প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না।’

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা ও অন্যান্য দাবীতে ভাস্কর্য উল্টে দেওয়ার বিষয়ে তাঁর মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি একথা বলেন।

হাসান আজিজুল হক বলেন, ‘এর সাথে যদি ভিন্ন কোন উদ্দেশ্য যুক্ত থাকে, যেমন দেশের বিভিন্ন স্থানে মূর্তি সরানোর যে উগ্র মৌলবাদী তৎপরতা শুরু হয়েছে তারই ধারাবাহিকতা হয়ে থাকলে আমি ভাস্কর্যের নিরাপত্তা জোরদার এবং এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’

জানা যায়, গত সোমবার দিবাগত রাতে ভাস্কর্য বিভাগের কিছু শিক্ষার্থী এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে স্বীকার করেছেন তারা। মঙ্গলবার সকালে ভাস্কর্য ভাঙ্গচুরের ঘটনা জানাজনি হলে ক্যাম্পাস জুড়ে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়।

এ ঘটনায় ক্যাম্পাসের নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় বইছে। অনেকে বলেন, ভাস্কর্য ভেঙ্গে প্রতিবাদ! এটা কোন প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগরে প্রফেসর ইমিরেটাস ড. এবিএম হোসেন বলেন, নিজেদের তৈরীকৃত মূর্তি উল্টিয়ি দাবি আদায়ের মাধ্যম হতে পারে না।

বাংলাদেশ ওয়র্কাস পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী সদর আসনের এমপি ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, নিজেরাই ভাস্কর্য তৈরী করে নিজেরাই ভেঙে ফেলা এটা আশ্চর্যজনক। এর মাধ্যমে ভাস্কর্য বিরোধী মৌলবাদী হাতকেই শক্তিশালী করা হয়েছে। আমি শিক্ষার্থীদের কাছে পুনরায় ভাস্কর্য মেরামতের আহ্বান জানাচ্ছি।

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের পরিচালক প্রফেসর সুলতান আহমদ বলেন, দেশব্যাপী যে মৌলবাদী গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ঠিক সেই মূহুর্তে শিক্ষার্থীদের এত বাড়াবাড়ি করা ঠিক হয়নি। তাদের দাবিগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে প্রথমে জানানো উচিত ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রফেসর মলয় কুমার ভৌমিক বলেন, ‘যেভাবে সারাদেশে জঙ্গী তৎপরতা বাড়ছে তার সাথে এর সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে ধারণা করেছিলাম। কিন্তু শিক্ষার্থীরা নিজেদের তৈরি করা শিল্পকর্ম এভাবে নষ্ট করে কখনো প্রতিবাদের মাধ্যম হতে পারে না।

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এএইচএম খাইরুজ্জামান লিটন বলেন, এটা নিন্দনীয় ঘটনা। এটা রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে হুমকি স্বরুপ। এই ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু বলেন, ভাস্কর্য বিভাগের গুটিকয়েক শিক্ষার্থী শিল্পকর্মের প্রতি যে অবমাননা করেছে তার পেছনে কোন জঙ্গী গোষ্ঠীর হাত আছে কি না তা যাচাই করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে শুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।

বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আব্দুল মজিদ অন্তর বলেন, এটা কোন প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না। ভাস্কর্য তাদের ব্যাক্তিগত বিষয় নয়। এর সাথে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. মোস্তফা শরীফ আনোয়ার বলেন, ‘আমরা সকালে এই ঘটনা দেখার পরে জরুরী মিটিংয়ে বসেছিলাম। আমরা সেখান থেকে নিশ্চিত হয়েছি বিভাগের ৭-৮জন শিক্ষার্থী এই কাজের সাথে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিংয়ে মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। আর এ ঘটনায় আমরা সামগ্রিকভাবে নিন্দা জানাচ্ছি।

এদিকে সরেজমিনে চারুকলা অনুষদে যেয়ে দেখা যায়, প্রায় তিনশতাধিক ভাস্কর্য মাটিতে উল্টো অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক ভাস্কর্য আবার উল্টে দেওয়াতে ভেঙ্গে গেছে। অবশ্যই বিকেলে যেয়ে দেখা যায় শিক্ষার্থীরা এটা সবগুলো ভাস্কার্য ঠিক করে দিয়েছে।

 

Advertisement

কমেন্টস