‘মাশরাফিকে সরিয়ে অধিনায়ক সাকিব, হাথুরের পরিকল্পনা পাপনের বাস্তবায়ন’

প্রকাশঃ এপ্রিল ৫, ২০১৭

অর্ণব ইসলাম।।

অবসরে যাচ্ছেন টাইগার দলপতি মাশরাফি বিন মর্তুজা! এমন গুঞ্জন যেন নতুন নয়, অনেকদিন ধরেই এমন কানাঘুষা চলছিল ক্রিকেট অঙ্গনে। অবশেষে সেটাই সত্যি হল! হঠাৎ আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েই দিলেন ম্যাশ। কিন্তু কেন? কাউকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ এমন সিন্ধান্ত নিলেন তিনি? অবসর তো এক সময় নিতেই হবে তাই বলে এইভাবে?

এই সামগ্রিক বিষয়টিকে কি নিতান্তই একটি কাকতালীয় ব্যাপার হিসেবে মানা যায়? যদি নাই যায় তাহলে, কি এমন থাকতে পারে নড়াইল এক্সপ্রেসের আকস্মিক এমন সিদ্ধান্তের নেপথ্যে?

তাহলে একটু পিছন থেকে ঘুরে আসা যাক, দলীয় কানাঘুষার পাশাপাশি মাশরাফি নিজেও আগে থেকেই চাইছিলেন সব ধরণের ক্রিকেট থেকে একবারে অবসর নিতে। একরকম ঠিকও করে ফেলেছিলেন সবকিছু।

পরিকল্পনা ছিল ২০১৯ বিশ্বকাপের পর একবারে সব ক্রিকেটকে বিদায় বলে দেবেন। শুধু কি তাই, নিউজিল্যান্ড সফরেই বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন একদিন বললেন,  নিউজিল্যান্ড সফর শেষে মাশরাফি টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে সেই সময়ে অবসরের কিছুই জানতেন না মাশরাফি। তা হলে অবসরের প্রসঙ্গ আসলো কোথা থেকে?

পরের কাহিনী রটলো শ্রীলংকায়। সেখানে নাকি কোচ চন্দিকা হাথুরুসিংহে বোর্ড সভাপতি পাপনকে সরাসরি বললেন, তিনি এক তারুন্যনির্ভর নতুন বাংলাদেশকে চান টি-টোয়েন্টিতে। তার এমন কথায় আকার-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিচ্ছে দলে মাশরাফির প্রয়োজন শেষ। সেটা আর কেউ বুঝতে না পারলেও মাশরাফি ঠিকই  বুঝেছিলেন। তাইতো কাউকে কিছু না জানিয়ে নীরবে সরে গেলেন।

অপরদিকে দেখা গেলো ক্রিকেট বোর্ড আর টাইগার কোচের অন্যরুপ। মাশরাফি দল থেকে সরে যাওয়ার পর পরেই সাকিবের হাতে টি-টোয়েন্টির অধিনায়কত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে।

কলম্বোয় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বোর্ড বিসিবি সভাপতি জানালেন, টি-টোয়েন্টি থেকে মাশরাফি অবসর নেওয়ায় নতুন অধিনায়ক খুঁজে নেবে বিসিবি। ফর্ম অনুযায়ী সে পদটা যে সাকিব আল হাসানেরই হতে যাচ্ছে,  সেটির ইঙ্গিত দিয়েই বলেছেন, ‘দেখুন অধিনায়ক হিসেবে আমাদের ভাবনা সব সময় মুশফিক, সাকিব, মাশরাফি,  তামিম ও মাহমুদউল্লাহকে ঘিরেই। এখন মুশফিক,  মাশরাফি বাদে থাকে তামিম, মাহমুদউল্লাহ ও সাকিব। সাকিব যেহেতু সহ-অধিনায়ক, তাই আমরা মনে করি টি-টোয়েন্টির অধিনায়ক সাকিবই হওয়া উচিত। ওর যে ফর্ম, মানসিকতা সব দিক দিয়েই সাকিবকে অনেক বেশি পরিণত মনে হচ্ছে। ওর সঙ্গে মাহমুদউল্লাহর আসাটা খুব কঠিন হবে।’

এদিকে মাশরাফির হঠাৎ অবসর কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রেমীরা। চারদিকে যখন, ‘ফিরে এসো ম্যাশ’ ধ্বনি তখনি মাশরাফি বলেছেন, তরুণদের দলে জায়গা করে দিতেই তার এই সিদ্ধান্ত, টেনেছেনও পেসার রুবেল হোসেনের উদাহরণ। বললেন, তার জন্যই নাকি ভাল ফর্মে থাকা সত্ত্বেও টি-টোয়েন্টি দলে জায়গা হচ্ছে না রুবেলের।

মাশরাফির এমন বক্তব্য শুনে সবাই হয়তো ভাবতে পারেন। ম্যাশ অনেক অভিমানী কোচের কথাতেই টি-টোয়েন্টিকে বিদায় জানালেন। সত্যিই কি এটাই আসল কারণ?

জানা গেছে, কোচ চন্দিকা হাথুরুসিংহ অনেক দিন আগে থেকেই বিসিবি কর্তাদের জানিয়েছেন, মাশরাফি, তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহিমকে তিনি টি-টোয়েন্টি দলে জরুরি মনে করেন না। এমনকি তিন ফরমেটে তিন অধিনায়কও চান তিনি। কোচের সেই ইচ্ছে পূরণ করতেই বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান পাপন সোমবার রাতেই মাশরাফিকে জানিয়ে দেন, দলে তিন সংস্করণে তিন অধিনায়ক চায় বিসিবি। আর পাপনের এমন বক্তব্যের পরেই মূলত মঙ্গলবার ম্যাচের আগে জানিয়ে দেন টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নিচ্ছেন দেশের এই জীবন্ত কিংবদন্তী ক্রিকেটার।

এদিকে মাশরাফি বিন মুর্তজার অবসরের ঘোষণায় বিষাদে আচ্ছন্ন লাখো ক্রিকেটামোদীদের সঙ্গে বিষণ্ন তাঁর সতীর্থরাও। মুশফিক তাঁর ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘সব অসাধারণ জিনিসের সমাপ্তি আছে। এটি হয়তো তারই একটি। ম্যাশকে ছাড়া বাংলাদেশ দল,  এটা আমাদের জন্য ভাবা কঠিন। আপনি সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন। আপনার মতো নেতার অধীনে খেলতে পেরে নিশ্চিত আমার মতো সবাই গর্বিত…আমরা সবাই ভীষণ হতাশ, আপনি টি-টোয়েন্টির জার্সিটা অনেক অনুভব করবেন। ধন্যবাদ ম্যাশ।’

অন্যদিকে তামিম বলেছে, ‘মানুষটা যখন আমাদের অধিনায়ক মাশরাফি ভাই, তাঁকে নিয়ে যত বলবেন, ততই যেন বলার বাকি থাকে। তাঁর হয়তো বিশ্ব রেকর্ড নেই কিংবা অন্যান্য দেশের কিংবদন্তি বোলারদের মতো ৪০০-৫০০ উইকেট নেই। তবে সন্দেহ নেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে তিনি বড় দাগই রেখে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেটে এখন যে বদল, সেটি তাঁর অসাধারণ অধিনায়কত্বে সওয়ার হয়েই। আমার কাছে এটা বিশ্ব রেকর্ড কিংবা ৪০০ উইকেট নেওয়ার মতোই দুর্দান্ত কিছু। ড্রেসিংরুম কীভাবে একটা পরিবার হয়, একই সময়ে কীভাবে ভালো ফল পাওয়া যায়, সেটিই তিনিই আমাদের দেখিয়েছেন।’

মাশরাফিকে নিয়ে আবেগ জড়িতভাবে মাহমুদউল্লাহ জানিয়েছ, ‘আপনাকে সত্যি মিস করব, বিশেষ করে আমি। আপনি আমার ভাই, বন্ধু, যাঁর কাছে সব বলা যায়। আপনি একজন যোদ্ধা, বড় নেতা, অধিনায়ক এবং সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন। খুবই খারাপ লাগছে। কিন্তু এটাই বাস্তবতা।’

অন্যদিকে ম্যাশের প্রিয় তাসকিন ফেসবুকে একটা ছবি পোস্ট করেছেন। সেখানে তাঁর আবেগঘন প্রতিক্রিয়া, ‘জানি না আর কত দিন এই হাতটা খেলার মাঠে আমার কাঁধে পাব। জাতীয় দলে অভিষেক হওয়ার আগ থেকেই আপনি আমার আদর্শ। গত তিন বছর ধরে একজন অভিভাবকের চেয়েও অনেক বেশি। সব সমস্যার সমাধানকারী হিসেবে বারবার আপনাকেই জ্বালাব…।’

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে মাশরাফির বিদায়ের সিদ্ধান্তের পেছনে যা-ই থাকুক, এ নিয়ে কোনো বিতর্ক হোক তা চান না বাংলাদেশ ক্রিকেটের বরপুত্র। তবে এই কথার সুবাদে পরিষ্কার বুঝা যায়, মাশরাফির অবসরের পেছনে কোন ‘কিন্তু’ রয়েছে। সেই কিন্তুটা খোঁজার দায়িত্বটা না হয় আপনাদের জন্যই থাকল।

Advertisement

কমেন্টস