ঢাকায় নারীদের বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনে হিমশিম খাচ্ছে শালিসি বোর্ড

প্রকাশঃ মার্চ ২৩, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

পশ্চিমা বিশ্বের জীবন ব্যবস্থা অনুকরণ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নানাবিদ পরিবর্তন আসছে আমাদের সমাজ ব্যবস্থাতে। আগে একটা সময় ছিল যখন আমাদের সমাজে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য শুধু মাত্র পুরুষ সমাজকে দায়ী করা হত। কিন্তু এখন সময়ের পরিবর্তন এসেছে। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও এখন বিবাহবিচ্ছের জন্য আবেদন করছে এবং তালাক দিচ্ছে।

চলতি  বছরগুলোতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের করা একটি জরিপে দেখা যায়, দুই এলাকাতেই  বিবাহবিচ্ছেদের জন্য পুরুষের চেয়ে বেশি আবেদন করছেন নারীরা।

জরিপে দেখা যায়,  শতকরা ১০০ ভাগের মধ্যে ৭০ দশমিক ৮৫ ভাগ বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করছে নারীরা , অন্যদিকে পুরুষের এ হার ২৯ দশমিক ১৫ ভাগ। বিচ্ছেদের জন্য নিম্নবিত্ত ও উচ্চবিত্ত উভয় শ্রেণির নারীরাই আবেদন করলেও, এই ক্ষেত্রে শিক্ষিত কর্মজীবী নারীরা এগিয়ে আছে।  বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য শালিসি পরিষদে কাছে নারীরা কারণ হিসেবে দেখাচ্ছে বনিবনা না হওয়া এবং স্বামী কর্তৃক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা। কিন্তু এগুলো যথাযথ কারণ বলে মনে করে না এর সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট মহল।

একটা সময় বোঝা বলে করা হত মেয়েদের। সে কারণে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা মেয়েকে নিরুৎসাহিত করত। কিন্তু বর্তমানে মেয়েরা অর্থনৈতিকভাবে  স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। তাই বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা মেয়েকে নিরুৎসাহিত করছে না। মেয়েরা এখন আর পরিবারের কাছে  বোঝা  হয়ে থাকছে না। তাই এখন বিবাহ বিচ্ছেদের পরিমান তিনগুণ  হাড়ে বেড়ে চলেছে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, শুধু রাজধানীতে বর্তমানে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে ৪৯ হাজার বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন এবং ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় তালাকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫২ হাজার।  আর প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০টির মতো বিচ্ছেদের আবেদন জমা হচ্ছে শালিসি পরিষদে কাছে। রাজধানীর গত পাঁচ বছরের বিবাহবিচ্ছেদ-সংক্রান্ত শালিসি পরিষদের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রায় ৩৪ হাজার তালাকের নোটিসের মধ্যে স্ত্রীর পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে ২৩ হাজার আর স্বামীর পক্ষ থেকে ১১ হাজার। বিচ্ছেদের ঘটনা বিগত বছরগুলোয় বৃদ্ধি পাওয়ায় শালিসি বোর্ডের কর্মকর্তাদেরও এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে।

দুই সিটি করপোরেশনের ১০টি আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পাঁচ বছরে রাজধানীতে তালাকের মোট আবেদনের ৬৬ দশমিক ১৬ শতাংশ নারী এবং ৩৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ পুরুষ পক্ষ থেকে করা হয়েছে। এ সময় বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ২৫ হাজার ৯৬৯টি। এ হিসাবে প্রতি বছর ৮ হাজার ৮২৮টি, মাসে ৭৩৬টি এবং দিনে ২৫টি সংসার ভাঙছে।

এই সময়ে উত্তরে ১৮ হাজার ২২০টি তালাকের নোটিস জমা পড়েছে, যার মধ্যে পুরুষের পক্ষ থেকে ৬ হাজার ৯২৯টি এবং নারীর পক্ষ থেকে ১১ হাজার ৬৯২টি নোটিস জমা পড়ে।এর মধ্যে নোটিস কার্যকর হয়েছে ১৪ হাজার ৫৮টি। উত্তরের পাঁচটি অঞ্চলের গত পাঁচ বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া যায়।অন্যদিকে ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিচ্ছেদের নোটিস পড়েছে ১৪ হাজার ১৭৫টি। এর মধ্যে পুরুষের পক্ষ থেকে জমা পড়েছে ৪ সহস্রাধিক আর নারীর পক্ষ থেকে ৯ হাজার ৬৮৩টি। নোটিস কার্যকর হয়েছে ১১ হাজার ৯১১টি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-১-এর কর্মকর্তা বলেন, সমাজের সব শ্রেণির নারী বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আবেদন করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত নারীদের কেউ কেউ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েও বিচ্ছেদ চাইছেন।

উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৩-এর নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘শালিসি পরিষদ হিসেবে আমাদের আসলে কিছু করার থাকে না। মাত্র ২ শতাংশ দম্পতি আমাদের কাছে শালিস বৈঠকে আসেন।’ তিনি বলেন, নারীদের তালাক দেওয়ার হার পুরুষের চেয়ে অবশ্যই বেশি। পেশাগত উন্নয়ন, আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা আগের চেয়ে বেশি সচেতন। নারীরা লোকলজ্জার ভয়ে এখন আর আপস করছেন না। বরং অশান্তি এড়াতে বিচ্ছেদের আবেদন করছেন।

সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলেছেন , অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ বলেই বিচ্ছেদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়া এ বিষয়ে পর্যাপ্ত কাউন্সেলিংও হয় না বলে অভিযোগ আছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা সাথে কথা বলে জানাযায়, একটি পরিবার ভেঙে গেলে শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সম্পর্কে ফাটল ধরে না। তাদের সন্তানদের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। রাজধানী ঢাকার নিকাহ রেজিস্ট্রাররা জানান, ঢাকায় প্রতি বছরই বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শালিসের মাধ্যমে সংসার টিকছে এমন হার খুবই কম। নিয়ম অনুযায়ী কাজী অফিসে তালাকের আবেদন জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর সিটি করপোরেশন দুই পক্ষকে বিচ্ছেদ ঠেকানোর জন্য বা সমঝোতার জন্য তিন মাস সময় দেয়। তালাকের আবেদন করা হলে শালিসের মাধ্যমে সংসার টিকছে এমন হার কম। সিটি করপোরেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে, বিচ্ছেদের আবেদন পাওয়ার পর দুই পক্ষকে প্রতি মাসে শুনানির জন্য ডাকা হলেও ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই এ শুনানিতে কোনো পক্ষ সিটি করপোরেশন অফিসে যায় না।

যে কারণে বিচ্ছেদে যাচ্ছে নারী : ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের ছাত্রী ছিলেন সুতপা। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে তার দুই ব্যাচ সিনিয়র শিক্ষার্থী রিফাতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সুতপাকে গোপনে বিয়ে করেন রিফাত। কিন্তু কয়েক মাস না যেতেই সুতপাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করলেন। স্বামী রিফাতকে তার বাসায় তুলে নিতে বললে তিনি সুতপার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। রিফাত অবশেষে সুতপাকে জানান যে, তিনি বিবাহিত। তার একটি সন্তানও আছে। সুতপা এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘রিফাত শুধুমাত্র টাকার প্রয়োজনে আমার সঙ্গে সময় কাটিয়েছে। এটা বুঝতে পারার পরপরই আমি তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ’ টানা চার বছর প্রেম করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর ছাত্র তমালকে বিয়ে করেন মৌ। দুই পরিবারের সম্মতিতে দুজনের বিয়েও হয়। কিন্তু মৌকে তমাল ও তার পরিবার নিজেদের বাড়িতে তুলে নিয়ে যায়নি। বড় আয়োজন করে বিয়ের পর মৌকে শ্বশুরবাড়িতে নেওয়া হবে বলে জানান মৌর শ্বশুরবাড়ির লোকজন। কিন্তু এর পাঁচ মাস পর হঠাৎ করে মৌর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন তমাল। একপর্যায়ে মৌ যখন তার শ্বশুরবাড়িতে যান সেখানে জানতে পারে তমাল তার আগের মেয়েবন্ধুর সঙ্গে আবার যোগাযোগ শুরু করেছেন। বিষয়টি নিষ্পত্তিতে শাশুড়ির সাহায্য চাইলেও তিনি উল্টো মৌর চরিত্র নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন। তার মা-বাবাকে নিয়েও খারাপ কথা বলতে শুরু করেন। অভিভাবকদের সম্মানের কথা ভেবে মৌ তালাকের সিদ্ধান্ত নেন। দুটি ঘটনাতেই সুতপা ও মৌ চাকরিজীবী ও উচ্চশিক্ষিত হওয়ায় নিজের এবং পরিবারের আত্মসম্মান রক্ষার খাতিরে বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন। সুতপা ও মৌদের মতো আরও অনেকেই এখন দিনের পর দিন স্বামীর অত্যাচার, প্রতারণা মুখ বুজে সহ্য না করে প্রতিবাদ করছেন।

অবশ্য বেশ কিছু ক্ষেত্রে স্ত্রীর পরকীয়া, উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে পুরুষরাও বিচ্ছেদ ঘটাচ্ছেন। তবে এ সংখ্যা নারীর তুলনায় কম।   পরিসংখ্যান বলছে, নারীদের তালাক দেওয়ার হার আগের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। কিন্তু এর পেছনে শুধু নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও শিক্ষার হার বৃদ্ধিই কাজ করেনি। দিনের পর দিন স্বামীর অত্যাচার মুখ বুজে সইলেন যারা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস দেখাননি যারা, সেই তারাই এখন জোর গলায় নিজের মনের কথা বলছেন। আর্থিক স্বনির্ভরতার অভাবে এক সময় মা-বাবার বোঝা হওয়ার ভয় করতেন অনেক নারী। এ ছাড়া সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবেও অনেকে স্বামীর কাছ থেকে তালাক নেওয়ার কথা ভাবতে পারেননি। এমনকি অন্য নারীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িত স্বামীর সঙ্গে একই ছাদের নিচে থেকেছেন এদেশের বহু নারী। তাদের মনে ভয় ছিল লোকলজ্জার। অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। আত্মসম্মানের খাতিরে অনেক নারীই এখন তালাক চাইছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-১ এর নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সানাউল হক  বলেন, সালিশি পরিষদে কাজ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি যে, অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হওয়ার কারণে নারীরা এখন নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারছেন। যা আগে পারতেন না। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি থেকে নর-নারীর মধ্যে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কও বিচ্ছেদের অন্যতম একটি কারণ।

সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদের বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে যৌতুক দাবি, স্বামীর হাতে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার এবং মাদকাসক্ত, পরকীয়া, দুজনের জীবনযাপনে অমিল, সন্দেহপ্রবণতা, স্বামীর কাছ থেকে অর্থনৈতিক সহায়তা না পাওয়া, সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে অবৈধ সম্পর্কে জড়ানো ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশনের নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, শিক্ষার কারণে নারী এখন আগের চেয়ে বেশি সচেতন। নিজের আবেগের চেয়ে নারীর কাছে এখন তার সন্তান ও তার ভবিষ্যৎ বড়।

Advertisement

কমেন্টস