”মুফতি হান্নানের দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠের পেছনের গল্প”

প্রকাশঃ মার্চ ২০, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

কীভাবে মুফতি আব্দুল হান্নান হয়ে উঠলেন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি-বি) অন্যতম শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান। কীভাবে তিনি হয়ে উঠলেন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতা? নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতা হিসেবে তার নাম বেশ আলোচিত। কিন্তু কে এই মুফতি হান্নান? 

১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ১৭টি হামলার মূল হোতা হান্নান । এসব হামলায় নিহত হয়েছেন ১০১ জন ,আহত হয়েছেন ৬০৯ জন। এর মধ্যে একটি হামলা ও দুটি হামলা চেষ্টার ঘটনার মূল টার্গেট ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর রাজধানীর বাড্ডা তেকে মুফতি হান্নানকে গ্রেফতার করা হয়।

২০০১ সালে ঢাকার পল্টনে সিপিবির সমাবেশে, রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানসহ ৬টি বোমা হামলার ঘটনা ঘটায় জঙ্গিরা। এরপর শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড  হামলা চালায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে। এতে আওয়ামী লীগের  ২২ জন নেতাকর্মী নিহত হন। আহত হন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দুই শতাধিক ব্যক্তি।

তবে এ ঘটনার আগে ওই ( ২০০৪ সাল)  বছরের ২১ মে সিলেটে হজরত শাহজালাল (র.) -এর মাজারে বাংলাদেশে তত্কালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর এবং ৭ আগস্ট সিলেটের তত্কালীন মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের ওপর গ্রেনেড

হামলা চালায় হুজি-বির জঙ্গিরা। হান্নানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় সর্বশেষ গ্রেনেড হামলা হয় ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জে এক সমাবেশে। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ ৫ জন নিহত হন।

মুফতি হান্নানের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার হিরনে। পড়াশোনা  গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা ও বরিশালের শর্ষিণা আলিয়া  মাদ্রাসায়। এরপর ভর্তি হন ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে ভারতের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক শিক্ষায় স্নাতকোত্তর পাস করেন।

পরের বছর ১৯৮৮ সালে তিনি পাকিস্তানে যান এবং ভর্তি হন করাচির জামিয়া ইউসুফ বিন নূরিয়া মাদ্রাসায় ফিকাহশাস্ত্রে। সেখান থেকে সীমান্তবর্তী শহর খোস্তে মুজাহিদ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন। ওই যুদ্ধে আহত হয়ে তিনি পেশোয়ারে কুয়েত আল-হেলাল হাসপাতালে চিকিসাত্সাধীন ছিলেন দশ মাস।

আফগানিস্তান থেকে মুফতি হান্নান দেশে ফেরেন ১৯৯৩ সালের মাঝামাঝি সময়। দেশে ফেরার পরপরই পাকিস্তানভিত্তিক হরকাতুল মুজাহিদিনের হয়ে তত্পরতা শুরু করেন। অবশ্য এর আগেই আফগান ফেরত এ দেশীয় মুজাহিদরা হুজি-বি গঠন করেন। মুফতি হান্নান ১৯৯৪ সালে হুজি-বিতে যোগ দেন। দায়িত্বপান কোটালীপাড়া উপজেলার থানা প্রচার সম্পাদকের। আর সাংগঠনিক দক্ষতায় খুব অল্প সময়ের মধ্যে হুজির অন্যতম শীর্ষ  নেতৃত্বে চলে আসেন মুফতি হান্নান।

১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে এ দেশে গোপন জঙ্গি সংগঠন হুজি-বির নাশকতা শুরু হয়। হুজি-বির  কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সিদ্ধান্তে মুফতি হান্নান ও মুফতি আবদুর রউফের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় এ হামলা হয় বলে হান্নানের  দেয়া ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।

ওই হামলায় ১০ জন নিহত ও দেড়শ জন আহত হন। যদিও তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ ঘটনায় বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ফলে জঙ্গিদের বিষয়টি তখন আড়ালেই থেকে যায়। এরপর একই বছরের ৮ অক্টোবর খুলনা শহরের আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা হয়। তাতে ৮ জন নিহত হন।

২০০০ সালের জুলাইয়ে কোটালীপাড়ায় তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভাস্থলের কাছাকাছি ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রেখে প্রথম আলোচনায় আসেন মুফতি হান্নান ও তার দল। এরপর থেকে তিনি আত্মগোপনে থেকে তত্পরতা চালান।

জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেন সাংবাদিক টিপু সুলতান। তিনি জানান, পড়াশোনা সূত্রে পাকিস্তানে গিয়েই জঙ্গি মতাদর্শে উদ্ধুদ্ধ হন মুফতি হান্নান।

টিপু সুলতান বলেন, ‘মুফতি হান্নান গোপালগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। পরে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য স্থানীয় মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং পড়াশোন করেন। এরপর ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানের করাচিতে নিউ টাউন মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে পড়াকালীন তিনি জঙ্গিবাদের জড়িত হন।

তার জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ১৯৮৮ সালে তিনি পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে রণাঙ্গনে যুদ্ধে অংশ নেন এবং আহত হন। পরে ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে ফিরে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশে যোগ দেন। শুরুতে কোটলীপাড়া থানার প্রচার সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু দ্রুতই তার সাংগঠনিক দক্ষতা, তার দুধর্ষতার সুবাদে কেন্দ্রীয় নেতা হয়ে ওঠেন।’

সিআইডি অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক আব্দুল কাহার আকন্দ জানান, মুফতি হান্নানের বিশেষত্ব হল তিনি সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও নিজে বিভিন্ন জঙ্গি হামলার প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকেছেন।

আব্দুল কাহার আকন্দ বলেন, ‘তার বিশেষত্ব তিনি আফগান স্টাইলে বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার তৎপরতা চালচ্ছিলেন। প্রথমে দেশী বোমা ব্যবহার করলেও পরে পাকিস্তান থেকে গ্রেনেড সংগ্রহ করেন। এছাড়া বোমা বানানো এবং আক্রমণ বিষয়েও তার সামরিক প্রশিক্ষণ আছে এবং এ নিয়ে প্রশিক্ষণও দিতেন তিনি।’

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের শুরুটা হরকাতুল জিহাদের মধ্যদিয়ে হলেও দেশের বড় বড় জঙ্গি হামলা মুফতি আব্দুল হান্নানের নেতৃত্বে ও পরিকল্পনায় সংঘটিত হয় উল্লেখ করে সাংবাদিক টিপু সুলতান বলেন, ‘হরকাতুল জিহাদই প্রথম বাংলাদেশে জঙ্গি হামলা শুরু করে। শুরুটা হয়েছিল ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচির অনুষ্ঠানে বোমা হামলার মাধ্যমে।

সেই ঘটনার পরিকল্পনায় ও নেতৃত্বে মুফতি হান্নান নিজে ছিলেন। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যতগুলো জঙ্গি হামলা হয়েছে, এককভাবে তার নেতৃত্বেই সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত মুফতি হান্নানের নেতৃত্বে ও পরিকল্পনায় সাত বছরে ১৩টি জঙ্গি হামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১০১ জন মানুষ নিহত হয়েছেন আর আহত হয়েছেন ৬শ’ জনেরও বেশি মানুষ।’ বিবিসি বাংলা অবলম্বনে

কমেন্টস