শিক্ষকতা কি শুধু একটি চাকুরী, না মহান পেশা?

প্রকাশঃ মার্চ ১২, ২০১৭

আরিফ চৌধুরী শুভ।।

১০ মার্চ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ দুর্নীতি দমন কমিশনের মানববন্ধনে বলেছেন, ‘সত্যিকার অর্থে আমাদের মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষক বেশি দরকার। শিক্ষামন্ত্রীর কথায় সহমত পোষণ করছি। শিক্ষামন্ত্রীর কথার দ্বিমত এখন পর্যন্ত কোন শিক্ষক করেনি। তার মানে শিক্ষকরাও শিক্ষামন্ত্রীর কথাকে সমর্থন করেছেন।

২০১৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ৭ শিক্ষক জড়িত থাকার ঘটনা শিক্ষক সমাজের জন্যে চরম লজ্জার বিষয়। হয়তো শিক্ষকরাও মনে মনে বলছেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার হালচালে দাঁড়িয়ে শিক্ষামন্ত্রীর এভাবে বলা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী কথাটি অনেক দেরিতে বলেছেন।

এই প্রথম শিক্ষকদের মূল্যবোধের তারতম্য খুঁজে পেলাম শিক্ষামন্ত্রীর কথায়। তাঁর কথায় রাগ ছিলো, ক্ষোভ ছিল, কিন্তু যেটা স্পষ্ট ছিল সেটা হলো সত্য। সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আমার প্রশ্নো, কিভাবে মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষক তৈরি হবে? শিক্ষতায় যোগদানের পরে একজন শিক্ষক মূল্যবোধ অর্জন করবেন, নাকি মূল্যবোধসম্পন্ন ছাত্র তৈরি করা শিক্ষকদের কাজ?

মেধাবী ও মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষার্থীরাই শিক্ষকতায় সুযোগ পাক, এটাই হওয়া উচিত প্রথম শর্ত। কিন্তু মূল্যবোধ ও মেধার মান যাচাইয়ের সঠিক ফর্মুলাটা কি? কে দিবেন মূল্যবোধ ও মেধাবীর সার্টিফিকেট? শিক্ষামন্ত্রী লাখ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে জিপিএ ৫ এর সার্টিফিকেট দেওয়ার নিদ্দের্শ দেন শিক্ষকদের। কিন্তু মূল্যবোধ ও মেধাবীর সার্টিফিকেট কি তিনি দিতে বলেন কখনো?

তাই শিক্ষকরাও মনে করেন মেধাবী মানে জিপিএ ৫, ৫, এবং সিজিপিএ ৩.৫। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক হবার প্রথম শর্ত যদি এটা হয়, তাহলে জগতের সেরা মূল্যবোধসম্পন্ন ও মেধাবী বর্তমানের শিক্ষকরা। শিক্ষামন্ত্রী পাল্লা দিয়ে যাদের মূল্যবোধ মাপতে চেয়েছেন দুদিন আগে। এছাড়া যতই গবেষক আর রিসার্চার হোন না কেন, এই শিক্ষকদের চোখে একজন ছাত্র শিক্ষকতায় কোন ভাবেই যোগ্য নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যারা শিক্ষক, পত্রিকার বিজ্ঞপ্তি অনুসারে প্রত্যেকের মেধার শর্ত সর্বনিম্ম জিপিএ ৫, ৫ এবং সিজিপিএ ৩.৫। স্কুল ও কলেজগুলোতে কিছুটা ব্যতিক্রম এই নিয়মের। তবে সিলেবাস ভিত্তিক পড়াশুনার বাইরে পৃথিবীটা কেমন, এদের অনেকেরই অজানা। যেই সিটের বোঝা কিছুদিন আগে তিনি বইছেন অনিইচ্ছাকৃত, শিক্ষার্থীদের সেটি বহন করতে বাধ্য করছেন এখন। শিক্ষা যে এক জীবনবিযুক্ত জ্ঞানবিজ্ঞান প্রক্রিয়া, যার একমাত্র লক্ষ্য ও মোক্ষম হলো সনদ, ডিগ্রি ও জীবনকে আনন্দময়, মূল্যবোধসম্পন্ন এবং তাৎপর্যময় করে তোলা, তা শিক্ষকের সিলেবাসের বাইরেই থেকে যায়। পাঠ্য বইয়ের বাইরে যেতে চান না বেশির ভাগ শিক্ষকরা।

যেই শিক্ষা মহৎ আদর্শ লালন করে, সমাজে মূল্যবোধ তৈরি করে, সেই আদর্শের ধারক পণ্ডিত বা শিক্ষক। আজ সেই পন্ডিতরাই শিক্ষকতার মতো মহান পেশাকে অর্থনৈতিক মনবৃত্তির লোভে চাকুরিতে পরিণত করেছেন। এর অন্যতম কারণ হলো শিক্ষক হওয়ার শর্ত পূরণ করেছেন সিজিপিএ দিয়ে! দায়িত্ববোধ বা মূল্যবোধ দিয়ে নয়। পরিবর্তন করা উচিত এই ধারার।

আধুনিক শিক্ষার দুইশ বছরে সমাজ, শিক্ষা, পাঠদান, সনদ, ডিগ্রির যতটা পরিবর্তন হয়েছে, তার চেয়ে বেশি পরিবর্তন হয়েছে আমাদের শিক্ষকদের মনন ও মানসিকতার। তাঁরা যতটা না একাডেমিক, তার চেয়ে বেশি একান্তিক, অর্থনৈতিক। ‘ভালো জিপিএ ছাড়া প্রতিযোগিতার বাজারে ভালো চাকুরী নাই। তিঁনিও শিক্ষকতার চাকুরিটা পেয়েছেন ভালো সিজিপিএর জন্যে’। এমন কথা শিক্ষকদের মুখে শুনতে শুনতে শিক্ষার্থীরা জিপিএ নির্ভর হওয়া ছাড়া উপায় কি? সেই শিক্ষকদের কাছেই আমার প্রশ্ন, শিক্ষকতা কি শুধু একটি চাকুরি, না মহান পেশা?

শিক্ষকরা যখন প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে সরাসরি জড়িয়ে যান, তখন শিক্ষকদের দায়িত্ববোধ, মূল্যবোধ এবং নীতি নৈতিকতার জায়গাটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাদের হাতে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের দায়িত্ববোধ, মূল্যবোধ এবং নীতি নৈতিকতা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়। জাতি মুক্তি পেতে চায় এমন পরিস্থিতি থেকে। কিন্তু এই পরিস্থিতির সমাধান শিক্ষামন্ত্রী রাতারাতি করতে পারবেন না। যেহেতু সিস্টেম আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। শিক্ষামন্ত্রী সত্য বললে আমরা যেমন সাপোর্ট দিচ্ছি, তেমনি শিক্ষামন্ত্রীর ব্যর্থতাও আমাদের বলতে হবে। ২০০১ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত নকল মুক্ত যেই শিক্ষা ব্যবস্থা আমরা পেয়েছি সেটি কি শিক্ষামন্ত্রী ধরে রাখতে পারছেন?

তিনি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, তিনি যেই অবস্থায় শিক্ষা ব্যবস্থাকে দাঁড় করিয়েছেন, সেটি মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষক তৈরির জন্যে যতেষ্ঠ? শিক্ষকদের মুখে শুনেছি ১৯৭২ সালে যারা পাশ করেছেন, তাদের পাশকে মূল্যায়ন করতো ‘বাত্তুরিয়া পাশ’ নামে। আর এখনকার শিক্ষার্থীদের এ সমাজ মূল্যায়ন করে ‘আই এম জিপিএ ফাইভ’ নামে। লজ্জা কি শুধু ছাত্রের?। এই লজ্জার দায় শিক্ষকেরও। শিক্ষাব্যবস্থার ভুলনীতির দায় মন্ত্রী ও সরকারকেই নিতে হবে।

শুধু জিপিএ দেখে যাদের শিক্ষকতায় সুযোগ দেওয়া হয় তাদের বেশির ভাগই অভিজ্ঞতার বিনিময়ে বড়জোর দক্ষ চাকুরিজীবী হয়ে উঠেন কিন্তু কখনোই হয়ে উঠেন না আদর্শবান ও মূল্যবোধসম্পন্ন একজন শিক্ষক। যোগ্যতার বাইরেও যারা অসৎ পথে দখল করেন শিক্ষক পদ আজ তাদের জন্যেই শিক্ষকতা মহান পেশা নয়, বরং চাকুরী হিসাবে বাজারে অনেক জনপ্রিয়। সদ্যগ্র্যাজুয়েটরা রঙিন স্বপ্নে এই চাকুরির পেছনে ছুটছেন লাগাম ছেড়ে। এদের কে দায়িত্ববোধ সম্পন্ন ও কে মূল্যবোধ সম্পন্ন সেটা যাচাইয়ের প্রয়োজন পড়ে না। প্রয়োজন শুধু জিপিএটা দেখা। এদের কাছে একজন শিক্ষার্থীর অসহায়ত্ব, আবেগ, ভালোবাসা, ত্যাগ, মূল্যায়নের কতটুকু দাম থাকে? শুধু বেতন বৃদ্ধি, পদমর্যাদা, ও ডিগ্রির জন্যে আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করতে পারলেই হন লাভবান।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ক্লাস, রেজাল্ট, থিসিস থেকে শুরু করে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত ভুলের খেসারত দিতে হয় অনেক শিক্ষার্থীকে। বিভাগীয় প্রধানের শুভাকাক্সিক্ষ হলেই ক্লাস নিতে অক্ষম ৮০ উর্ধ্বে বয়স্ক শিক্ষকদেরও ক্লাসে পাঠান। একজন শিক্ষক একই সাথে ক্লাস নেন একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এটা মূল্যবোধ শিখানোর জন্যে নয়, শুধু ব্যক্তিগত উপার্জনের লক্ষ্যেই করেন। এদের কাছেই শিক্ষার্থীরা সামান্য একটা রিকোমেন্ডেশন পেতে মাসের পর মাস ঘুরে যখন ব্যর্থ হয়, তখন নিজের কাছে নিজেকে অসহায়ত্ব ভাবা ছাড়া উপায় কি। অথচ একজন শিক্ষার্থীকে চাকুরী থেকে বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রির জন্যে তার সিভিতে রিকোমেন্ডেশন করা একজন শিক্ষকের গুরুদায়িত্ব। কিন্তু তারা মনে করেন রিকোমেন্ডেশন করলেই বোধহয় ছেলেটির বা মেয়েটির চাকুরি হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. আতিউর রহমানের শিক্ষক তাঁর ছাত্রের জন্যে গঞ্জে গঞ্জে মানুষের কাছে গামছা পেতে ভিক্ষা করেছেন। ড. কামাল হোসেনের শিক্ষক ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন তাঁর ছাত্রের জন্যে গৃহ ত্যাগ করেছেন। ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এপিজে আবুল কালাম আজাদের শিক্ষক রেলস্টেশনে পত্রিকা বিক্রি করে ছাত্রের লেখাপড়ার খরচ দিয়েছেন। কবি জসীম উদ্দিনের শিক্ষক কবিকে পড়াশুনা চালু রাখার জন্যে মাসিক পত্রিকায় চাকুরির ব্যবস্থা করেছেন। ড. জাফর ইকবালের সহায়তায় এদেশের বহু অপদার্থ শিক্ষার্থী আজ বিদেশের মাটিতে সুনাম কুড়াচ্ছেন। কতটা আন্তরিক ছিলেন তাঁরা। এঁদের চরণধুলা বাংলায় আজও উড়ছে বলে এখানো মাথা নত হয়ে যায় শিক্ষক দেখলে। চোখের সামনে এক উজ্জল ভবিষ্যত ভেসে উঠে। ইচ্ছে করে আমিও হই তাঁদের মতো মহান শিক্ষক।

অতীতে ছাত্রদের জন্যে শিক্ষকদের এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। কিন্তু আজ শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থীদের সেই স্থান কোথায়, কতটুকু? বরং প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ে সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছেন অনেক শিক্ষক। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ শিক্ষার্থী। ক্ষতিগ্রস্থ শিক্ষা ব্যবস্থা।

শিক্ষাখাতে বেসরকারি সেক্টর থেকে প্রতি বছর আয় প্রায় ২৭৯১ কোটি টাকা। ২০১৪ এর পূর্বে এ আয় ছিল প্রায় ৪০০ কোটির বেশি। এই অর্থের বিরাট অংশের যোগানদাতা আমাদের প্রান্তিক কৃষক, দিনমুজুর, ব্যবসায়ী, কিংবা মধ্যম পরিবারের শিক্ষার্থীদের পকেট। শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর বিশাল অংকের অর্থের ভার বইছেন সত্য কিন্তু মেধাশূণ্য বন্ধ্যা গ্র্যাজুয়েট তৈরি হয়ে বের হচ্ছে তারা। ক্লাসে না পড়িয়ে এরাই পরীক্ষার সময় নিজেদের কৃতিত্ব দেখাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস করেন। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এদের মতো শিক্ষকরা লুকিয়ে আছেন। এখনই সময় এদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করা। সেই সাথে শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালার পরিবর্তন আনা দরকার মনে করি।

২০১৫ সালে ইউজিসি যে নির্দেশনা, ক্লাস ডেমোনেস্ট্রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের যে সুপারিশ তার বাস্তবায়ন করা উচিত। এছাড়া দক্ষতা, মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে বিশেষজ্ঞ প্যানেল ও পুল গঠন করার পাশাপাশি মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করা উচিত। ডিপার্টমেন্টের সব শিক্ষক শুধু ক্লাস নিবেন তা নয়, কো-কারিকুলাম কোয়ালিটিপূর্ণ শিক্ষকেরও প্রয়োজন আছে প্রতিটি ডিপার্টমেন্টে।

একজন শিক্ষার্থী যেমন সবদিকে ভালো হতে পারেন না, তেমনি ভালো সিজিপিএ অর্জনকারী শিক্ষকও ক্লাসে ভালো শিক্ষক হবেন এর গ্যারান্টি স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী কেন প্রধানমন্ত্রীও দিতে পারবেন না।

ইউজিসির সর্বশেষ ৩৮ তম প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা ও মেধাবীরা নিয়োগ পাওয়ার কথা থাকলেও অযোগ্যরা নিয়োগপ্রাপ্ত হোন। শিক্ষকদের যে মৌলিক কাজ ক্লাসে লেকচার প্রদান, সেটির সামর্থ থাকলেও মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং প্রকৃত পর্যায়ে ভালো রেজাল্ট করলেও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে একেবারেই ব্যর্থ হচ্ছেন অনেকেই।

দেশের অর্থনীতি যেমন আটক আছে শিল্পপতিদের হাতে, তেমনি শিক্ষকতার মতো মহান পেশা সিজিপিএ ওয়ালাদের হাতে বন্ধি। এটা প্রকৃত শিক্ষার পরিপন্থি ও মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের শিক্ষক হওয়া স্বপ্নের মৃত্যু ঘটায়। অথচ কিছুটা কম সিজিপিএ, কিন্তু অসাধারণ ক্ষমতা বলার, উপস্থাপনার, কিংবা বিষয় ভিত্তিক দক্ষতার, তাদের জন্যে এই দরজা একেবারেই রুদ্ধ হওয়াটা বড়ই কষ্টের ও বেমানান। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী তাদের ও সুযোগ দেওয়া হোক এই পেশায়।

লেখক:  সাংবাদিক ও লেখক।

Advertisement

কমেন্টস