‘ডাকসু নির্বাচন ইজ অ্যা মাস্ট’ অভিনন্দন রাষ্ট্রপতিকে

প্রকাশঃ মার্চ ৪, ২০১৭

ফারুক আহমাদ আরিফ-

স্বাধীন বাংলাদেশে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই ২৬ বছর ৯ মাস। ১৯৯০ সালের ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচনের পর থেকে ২০১৭ সালের ৪ মার্চ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৬ বছর ৯ মাস বা প্রায় ২৭ বছর যাবত ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই।

ছাত্র সংসদ নির্বাচন না থাকায় নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি বন্ধ। তবে এখন জাতিকে দিক নির্দেশনা দেওয়ার মত কোন নেতা বা অভিভাবক তৈরি হচ্ছে না। এর অনুপস্থিতিতে যারা নেতৃত্বে আসছে তারা ছাত্রদের নয় বরং উপর মহলের দয়াপুষ্ট হয়ে ক্ষমতাবান হচ্ছে- দায়িত্ববান নয়। এতে করে প্রকৃতপক্ষে ছাত্রনেতা তৈরি হচ্ছে না। ছাত্রদের অধিকার আদায় হচ্ছে না। আমরা ২০১৪ সাল থেকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছি।

২০১৬ সালের ১ আগস্ট ও ১৫ ডিসেম্বর স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের দুটি আলোচনা সভায় ছাত্র সংসদ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক দাবি উত্থাপন করলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবৃন্দ সাধুবাদ জানান। বিষয়টি কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তা নিয়ে তারা ব্যাপক আলোচনা করেন আমার সাথে। বিশেষ করে বিজনেস ডিপার্টমেন্টের উপদেষ্টা প্রফেসর ড. আশরাফু্ল ইসলাম চৌধুরী ও ডিপার্টমন্টের হেড মেজর জেনারেল (অব.) কামরুজ্জামান স্যার বেশ কয়েকবার আমার সাথে আলোচনায় বসেন।

বিশেষ করে বিডিমর্নিং অনলাইন নিউজ পোর্টালে ২০১৬ সালের ১ আগস্ট বিডিমর্নিং এ ‌’ছাত্র রাজনীতি নয় ছাত্র সংসদ প্রয়োজন‘, ১ ডিসেম্বর ‘‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ চাই, দিতেই হবে’‘১৪ ডিসেম্বর ‘‘স্বাধীনতার ৪৫ বছরে ছাত্র সংসদ নেই ২৬ বছর’‘ ১৬ ডিসেম্বর ‘৪৫ তম বিজয় দিবসের অঙ্গীকার হোক ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার‘ ৩১ ডিসেম্বর ‘২০১৭ সাল হোক শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে দৃপ্তিময়‘ ও ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি বিডিমর্নিং এ ‘মাননীয় মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যকে অভিনন্দন‘ এই বিষয়ে একাধিক সেমিনার, বক্তৃতায় ও কলামে দাবি জানিয়েছি।

৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ তম সমাবর্তনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। আর রাষ্ট্রপতির দাবির অর্থ হচ্ছে নির্দেশ প্রদান। এটি আমাদের দীর্ঘদিনের সভা, সেমিনার, কলাম ও ঘরোয়াভাবে দাবি জানানোর একটি ফসল। এখন প্রধানমন্ত্রীর দায়-দায়িত্ব হচ্ছে ছাত্র সংসদ দেওয়ার ঘোষণা করা।

রাষ্ট্রপতি মহোদয় বলেছেন, “ডাকসু নির্বাচন ইজ অ্যা মাস্ট। ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচন প্রয়োজন। ডাকসু নির্বাচন হতেই হবে, তা না হলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে নেতৃত্বশূন্য হয়ে যাবে।” (৪ মার্চ-বিডিনিউজ২৪.কম) এই বক্তব্যের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো আমাদের দাবিটি যৌক্তিক এবং সময়পযোগী। এই সাহসী উচ্চারণটির জন্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) যাত্রা শুরু। ঢাবির জন্মের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ এই তিনটি দেশের জন্ম হয়। আর দুঃখের বিষয় হচ্ছে এখানেই প্রায় ২৭ বছর যাবত ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই। ঢাবিতে ১৯২৪-২৫ সালে ছাত্র সংসদের দাবি উঠলে সেই বছরই প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও জেনারেল সেক্রেটারি (জিএস) যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত মনোনিত হন। ১৯৫৩ সালে ভোটের মাধ্যমে (Dhaka University Central Students Union (Dacsu)) ঢাকসুর প্রথম ভিপি নির্বাচিত হন এসএ বারী এবং জিএস হন জুলমত আলী খান। সেই যে ইংরেজ আমলে শুরু কিন্তু ১৯৯০ সালের ৬ জুনের নির্বাচনের পর থেমে গেল গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে। তারপর সারাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই। এটি একটি জাতির জন্যে ব্যর্থতা।

কেননা নেতৃত্ব হচ্ছে ঝর্নাধারার মতো। ঝর্না বয়ে চললে সে কোন নদী বা সাগরের সাথে মিলেমিশে স্রোত সৃষ্টি করে আর থমকে দাঁড়ালে সেখানেই সূর্যতাপে বিলীন হয়ে যায়। ছাত্রদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনে অবদান রাখতে হলে তাকে ক্লাসরুমেই প্রস্তুত করে তুলতে হবে। অন্যথায় তাঁর নেতৃত্ব ধ্বংস নিশ্চিত। সে তখন ছাত্র অধিকারের চেয়ে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। জাতির কল্যাণের পরিবর্তে ভিন্ন দিকে মোড় নিবে।

চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর র‌্যালির উদ্বোধনীতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আমি আবারো শিক্ষামন্ত্রীকে বলব, ক্যাম্পাসে যদি গণতন্ত্রচর্চার একটা সুন্দর চমৎকার পরিবেশ গড়ে তুলতে চান, তাহলে ঢাকসুসহ সকল ছাত্র সংসদের নির্বাচন দেয়ার ব্যবস্থা করুন। ২৫ বছর ধরে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে আছে সকল ছাত্র সংসদ’ (দৈনিক ইনকিলাব- ৫ জানুয়ারি-২০১৭)।

আজ (শনিবার) আবার রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নির্দেশ এলো। এখন প্রয়োজন সেটি বাস্তবায়ন করা।

রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতন্ত্রের ভিতকে মজবুত করতে হলে দেশে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। আর সেই নেতৃত্ব তৈরি হবে ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমেই। কিছু ক্ষেত্রে অছাত্ররাই ছাত্র রাজনীতির নেতৃত্ব দেয়, নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে ছাত্র রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের এমনকি সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা, সমর্থন ও সম্মান ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। এটি দেশ ও জাতির জন্য শুভ নয়।… দেশের মানুষকে পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত করতে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই ছিল কাজ। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের কোনো স্থান ছিল না। এর কারণে সাধারণ মানুষ ছাত্রদের সম্মানের চোখে দেখত’ ৪ মার্চ-প্রথম আলো।

এসব আক্ষেপের মধ্যে যে বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে তা হচ্ছে সততা ও যোগ্যতার অভাব। এই অভাবটি নিঃসন্দেহে পূরণ করতে হবে। অার বসে বা অলসতার সময় সুযোগ কোনটিই নেই।

নির্বাচন পদ্ধতিটি নিয়ে আমরা একাধিক লেখায় আলোকপাত করেছিলাম। পদ্ধতিটি হচ্ছে ‘প্রতিটি ব্যাচ থেকে সেই ব্যাচের শিক্ষার্থীরা একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন। সবগুলো ব্যাচের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নিজ বিভাগের জন্যে একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন। সবশেষে প্রত্যেকটি বিভাগের নির্বাচিতদের ভোটে একজন সভাপতি ও একজন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন। সেখানে বিভিন্ন বিভাগের নির্বাচিত সদস্যরা এক একটি বিভাগে এক বছরের দায়িত্বের জন্যে নির্বাচিত হবেন। প্রতিটি ব্যাচ থেকে নির্বাচিতরা ব্যাচের দায়িত্ব পালন করবেন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু হল ভিত্তিক কাজ হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রে প্রতিটি হল থেকে একজন করে নির্বাচিত হবেন। সেই নির্বাচিত ব্যক্তিদেরই ভোটের মাধ্যমে ভিপি নির্বাচিত হবেন। একই পদে শুধুমাত্র একবারই দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। নির্বাচনে শিক্ষকরা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালন করবেন’ (বিডিমর্নিং ১ আগস্ট ২০১৬)।

শুধু ডাকসু নয়, দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলে ১৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি-সেনাবাহিনী মিলে মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ আছে ৯৪টি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনার্স ও মাস্টার্স কলেজ আছে ২২০০টি। সবমিলে ২৪৩২টি প্রতিষ্ঠান আছে এইচএসসি পর পড়াশোনা করানো হয়। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিতে হবে। আমরা চাই অতিসত্ত্বর প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ চালুর নির্দেশ প্রদান এবং তা বাস্তবায়ন করা হবে। সুপ্রভাতের অপেক্ষায় রইলাম।

শিক্ষার্থী; স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও মুখপাত্র; নো ভ্যাট অন এডুকেশন

৮/ডি, ধানমন্ডি-১৪, ঢাকা, ৪ মার্চ-২০১৭, সন্ধ্যা ৬টা ৩৩ মিনিট।

ইমেইল: [email protected]

Advertisement

কমেন্টস