’সিনেমার ভিলেনও যেন হার মেনেছে কাদেরের কাছে’

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে খুনিদের নানা নির্দেশনা দিয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) কাদের খান। কিন্তু হত্যায় জড়িত নন- এমন অকাট্য প্রমাণ রয়েছে তার কাছে। তা হল- তিনি তখন বাংলাদেশেই ছিলেন না, ছিলেন ভারতে!

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আদালত ও পুলিশের কাছে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ তথ্য জানিয়েছেন কাদের খান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিনেমার ভিলেনও যেন হার মেনেছে তার কাছে।

কীভাবে? এ অকাট্য প্রমাণ তৈরি করতে লিটন হত্যার প্রায় আড়াই মাস আগে গত বছরের ১৯ অক্টোবর বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বৈধভাবে (ভিসা-পাসপোর্টে) ভারতে যান কাদের খান। ফিরেন লিটন হত্যার ছয় দিন পর ৬ জানুয়ারি। কাদের খানের পাসপোর্ট বলছে সে কথাই।

কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, মাঝে দুই-তিন দফা তিনি অবৈধভাবে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ যাওয়া-আসা করেন। ৩১ ডিসেম্বর লিটনকে হত্যার পর খুনিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে চোরাইপথেই যান ভারতে। এরপর ফিরেন বৈধভাবে।

কাদের খানের কুশপুত্তলিকা দাহ, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ : কাদের খানসহ এমপি লিটনের খুনিদের ফাঁসির দাবিতে শনিবার সন্ধ্যায় বামনডাঙ্গার হাসানপুরে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা কাদের খানের কুশপুত্তলিকা দাহ করে। পরে বামনডাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সমস উদ্দিন বাবুর সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন- জাহেদুল ইসলাম জাবেদ, নিলুরাম রায়, আবুল কালাম আজাদ, নাদিম হোসেন, মুশফিকুল ইসলাম পিয়াল, খালেদ গাফলাদার প্রমুখ।

এদিকে ক্লুলেস এ হত্যাকাণ্ডের খুনিদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে পারায় পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়েছে জেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দল। গাইবান্ধা জেলা পুলিশ সুপারের অফিসে রোববার দুপুরে মিষ্টি পাঠিয়ে ধন্যবাদ জানান তাদের প্রতিনিধিরা।

এমপি লিটন হত্যার ঘটনায় কাদের খানকে মঙ্গলবার বগুড়া থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বুধবার তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ডের তৃতীয় দিন শনিবার তিনি ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন।

এর আগে এ ঘটনায় কিলিং মিশনে অংশ নেয়া তিন যুবক মেহেদী, শাহীন ও রানা এবং কাদের খানের গাড়িচালক হান্নান আদালতে জবানবন্দি দেয়। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গার নিজ বাড়িতে দুর্বৃত্তরা এমপি লিটনকে গুলি করে হত্যা করে।

কেন খুন : দেড় বছর ধরে একাকী হয়ে পড়েছিলেন কাদের খান। স্ত্রী নাছিমা বেগম তার সঙ্গে বগুড়ার বাসায় থাকলেও সম্পর্কে টানাপড়েন চলছিল। একমাত্র ছেলে থাকত ঢাকায়। ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের কাছে পরাজিত হওয়ার কারণে এলাকায় তার যাতায়াত কমে আসে। সমর্থক-নেতাকর্মীরাও তার কাছে তেমন আসতেন না। নিজ বাসায় একাকী জীবনে তিনি হতাশায় ভুগছিলেন। তখন লিটনের ওপর তার প্রচণ্ড রাগ হতো।

তিনি মনে করতেন, লিটনের কারণেই তার মধ্যে এ হতাশা তৈরি হয়েছে। ক্ষমতার লোভ তাকে পেয়ে বসেছিল। হতাশা থেকে তার মধ্যে ‘হোমিসাইডাল’ (অন্যকে হত্যা) ও ‘সুইসাইডাল’ (আত্মহত্যা) প্রবণতা কাজ করত।

কাদের খান মনে করেছিলেন, লিটনকে সরিয়ে দিয়ে আবার ক্ষমতায় গেলে এ হতাশা থেকে পরিত্রাণ পাবেন। তাই আত্মহত্যা না করে ঘটনার ছয় মাস আগে লিটনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। নিজের ইচ্ছায় এবং পরিকল্পনায় হত্যার মিশন বাস্তবায়ন করেন।

তবে হত্যার মিশনে ব্যবহৃত দুটি অবৈধ অস্ত্র তার কাছে কীভাবে এলো এবং তিন খুনিকে নিজ বাসায় প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়ে স্বীকারোক্তিতে কিছু বলেননি তিনি। তদন্ত সূত্র বলছে, কাদের খান হয়তো সচেতনভাবে এ দুটি বিষয় এড়িয়ে গেছেন।

গাইবান্ধা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম বলেন, কাদের খান এমপি লিটন হত্যায় নিজেকে জড়িয়ে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

এর আগে হত্যার মিশনে অংশ নেয়া তিন কিলারসহ চারজন জবানবন্দি দিয়েছেন। সবার জবানবন্দিতেই একই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে। এখন তদন্ত শেষ করে শিগগিরই আদালতে চার্জশিট দেয়া হবে।

হত্যার কারণ হিসেবে কাদের খান জানিয়েছেন, ২০১২ সালে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা চন্দন কুমার সরকারকে দিয়ে লিটন দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছিল।

পরে দুদক তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা করে। তখন তিনি এমপি ছিলেন। পরে চন্দনের মাধ্যমে লিটনের সঙ্গে যোগাযোগ করে এ সমস্যার সমাধান করা হয়। লিটন এমপি হওয়ার পর চন্দন চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

এ সময় লিটনের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। পরে চন্দনের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। এদিকে ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে লিটনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন কাদের খান। লিটন প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়।

এতে তিনি লিটনের ওপর চরমভাবে ক্ষুব্ধ হন। ক্ষোভ, হতাশা এবং ক্ষমতার লোভে তিনি লিটনকে খুন করার পরিকল্পনা করেন। লিটনের সঙ্গে চন্দনের শত্রুতা থাকায় খুনের পরিকল্পনায় তাকেও তিনি সম্পৃক্ত করেন।

কাদের খান স্বীকারোক্তিতে আরও বলেন, ঘটনার সময় চন্দন লিটনের বাড়ির আশপাশে ছিলেন। তিন কিলার রাশেদুল ইসলাম মেহেদী, শাহীন মিয়া ও আনোয়ারুল ইসলাম রানা বামনডাঙ্গায় লিটনের বাড়ির আশপাশে এক দোকানে পানি বা কোল্ড ড্রিংকস কিনে কাদের খানের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছিল।

চন্দন মোবাইল ফোনে লিটনের বিষয়ে কাদের খানকে তথ্য দেয়ার পর তিনি তা কিলারদের জানিয়ে দেন। তারপর তিন কিলার লিটনকে নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করে। এর এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে ছাপারহাটিতে চলে আসে তারা।

তিন কিলারকে সহযোগীর মাধ্যমে দলে টানেন কাদের : তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কাদের খান স্বীকারোক্তিতে বলেছেন, ছয় মাস আগে তার এক সহযোগী মেহেদী, রানা ও শাহীনকে নিয়ে আসে। এর আগেও এ তিন যুবক কাদের খানের কাছে চাকরির জন্য এসেছিল।

তাই টার্গেট করেন তাদের। হত্যার পরিকল্পনা করার পর সহযোগীর মাধ্যমে তিনি এ তিন যুবককে ডাকেন। তদন্তের স্বার্থে ওই সহযোগীর বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি সূত্রটি। প্রলোভন দেখিয়ে তাদের দলে নেন কাদের।

নতুন জামা পড়ে কিলিং মিশনে কিলাররা : কাদের খান স্বীকারোক্তিতে বলেছেন, লিটনকে হত্যার মিশনে যাওয়ার আগে তিন কিলার মেহেদী, শাহীন ও রানাকে নতুন জামা কেনার জন্য টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে তারা বগুড়া থেকে নতুন জিন্স প্যান্ট এবং শার্ট কেনেন।

তারপর নিজের গাড়িতে করে সুন্দরগঞ্জের ছাপারহাটিতে নিজ বাড়িতে তিন কিলারকে নিয়ে আসেন কাদের খান। দুপুরের পর তারা একটি মোটরসাইকেলে করে ছাপারহাটি থেকে এমপি লিটনের বাড়ি বামনডাঙ্গায় যায়। কাদেরের গাড়িচালক হান্নানের মোবাইল ফোন থেকে কিলারদের সঙ্গে সর্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছিলেন কাদের খান।

এ সময় কিলাররা বামনডাঙ্গায় এক দোকানের সামনে মোটরসাইকেল রেখে অবস্থান করছিল। এমপি লিটনের বাড়ির আশপাশে অবস্থান করছিল সাংবাদিক পরিচয়ধারী স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা চন্দন।

সন্ধ্যার দিকে চন্দন মোবাইল ফোনে কাদের খানকে জানান, লিটনের বাড়ি ফাঁকা। তখন কাদের খান তিন কিলারকে এ তথ্য দিয়ে বলেন, এখনই মিশন সফল করতে হবে। তারা লিটনকে গুলি করে এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে ছাপারহাটিতে কাদেরের বাসায় ফিরে আসে। ওই রাতেই কাদের খান নিজের গাড়িতে করে কিলারদের বগুড়া নিয়ে আসেন। পরে তাদের ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।

সাত লাখ টাকা কিলারদের দেন : কাদের খান স্বীকারোক্তিতে বলেছেন, ঘটনার কয়েক দিন পর নিজের দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে সাত লাখ টাকা তুলে তিন কিলার মেহেদী, রানা ও শাহীনকে দেন কাদের খান। ঘটনার আগে কাদের খানের গাড়িতে করে বগুড়া এবং গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতো খুনিরা। লিটন হত্যার কয়েক দিন পর তারা আবার বগুড়ায় ফিরে আসে এবং কাদের খানের সঙ্গে আবারও ঘোরাফেরা শুরু করে।

জেলখানায় কাদের খানের অস্থিরতা : শনিবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার পর গাইবান্ধা জেলা কারাগারে পাঠানো হয় কাদের খানকে। কারা সূত্র জানায়, কারাগারে তাকে সাধারণ কয়েদিদের সেলে রাখা হয়েছে।

তবে তার সঙ্গে অন্য কোনো কয়েদি নেই। শনিবার সারারাত তিনি ঘুমাননি। কখনও হাঁটাহাঁটি আবার কখনও বসেছিলেন তিনি। রবিবার সকালে তাকে নাস্তা দেয়া হয়েছে রুটি আর গুড়। দুপুরে ভাত-মাছ আর ডাল দেয়া হয়েছে। রাতে দেয়া হয় সবজি ও মাংস।

নিজেকে মানসিক অসুস্থ দাবি : রিমান্ডে থাকা অবস্থায় কাদের খানকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা বলেন, তিনি নিজেকে মানসিক রোগী বলেছেন। হতাশা থেকে তার মধ্যে ‘হোমিসাইডাল’ ও ‘সুইসাইডাল’ প্রবণতা কাজ করত। তিনি মনে করেন, এমপি লিটনের কারণে তিনি এমপি হতে পারেননি। পারিবারিক টানাপোড়েনের কারণে তিনি দেড় বছর ধরে একাকী হয়ে যান।

তার মধ্যে চরম হতাশা কাজ করে। এ সময় একবার তার মনে হতো, নিজেকে শেষ করে দিলেই সবকিছুর সমাধান হয়ে যাবে। আবার তিনি মনে করতেন, লিটনকে সরিয়ে আবার এমপি হলে তিনি হয়তো হতাশা থেকে মুক্তি পাবেন। তিনি দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেন। কাদের খান নিজে একজন চিকিৎসক। তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ এটা তিনি মনে করতেন।

 

Advertisement

কমেন্টস