Advertisement

শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি, চেয়েছিলেন কে?

প্রকাশঃ জানুয়ারি ৩, ২০১৭

Advertisement

ফারুক আহমাদ আরিফ-
বাংলাদেশ আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একে অপরের মানচিত্র। বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকতে হলে প্রথম যে চিত্রটি আঁকতে হবে তা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা আঁকা অসম্ভব।

অথচ ১ জানুয়ারি রাজধানীতে ছাত্রদলের ৩৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধান অতিথির ভাষণে জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি, তিনি চেয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে (বিডিমর্নিং; ১ জানুয়ারি-২০১৭, সময় ও ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন)।’

এমন আজগুবি কথা শুনে আমাদের মনে প্রশ্নজাগে শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি, চেয়েছিলেন কে? খালেদা জিয়া পরবর্তীতে বলেন, ‘শহীদ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তখন রাজনৈতিক নেতারা পালিয়ে গিয়েছিলো তাই জিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। অথচ জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার কোন কারণ ছিল না (পূর্বোক্ত)।’

এখন প্রশ্ন হলো জিয়াউর রহমান কি এমন ব্যক্তি ছিলেন যে, তাঁর কথায় বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়বে? তাকে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে ক’জন মানুষ চিনতো। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ ছাড়া তাঁর আর কি অবদান ছিল যে তার নামে সবাই যুদ্ধে পঙ্গপালের মতো ঝাপিয়ে পড়বে?

যারাই বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীটি পড়েছেন তারা নিশ্চয়ই জানেন যে ইংরেজ শোষণ থেকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা, পাকিস্তানের নির্যাতন থেকে একটি স্বাধীন দেশের জন্মের জন্যে তাদের কি পরিশ্রম ছিল।

শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলীতে ১৬০টি ও পূর্ব পাকিস্তান এ্যাসেম্বলীতে ২৮৮টি আসনে জয় লাভ করেন। হিসেব অনুযায়ী তার কাছেই প্রধানমন্ত্রিত্ব হস্তান্তর করা কথা। কিন্তু পাকিস্তান সরকার তা করতে অস্বীকার করে। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জনসভায় ঐতিহাসিক ভাষণ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’ উচ্চারণ করেন তিনি।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ সংগঠিত হবার সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী গ্রেফতারের পূর্বে ২৫ মার্চ দিবাগত রাত ১২টা ৩০ মিনিটে অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি ইপিআরের একটি ছোট ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। (This may be my last massage, from to-day Bangladesh is Independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you fight be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expedited form the soil of Bangladesh and final victory is achieved.) এটির বাংলা অনুবাদ ছিল ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ, তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সৈন্যবাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।’ সেটি চট্টগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এম এ হান্নান সাহেব কয়েকবার পাঠ করেন ২৬ মার্চে। পরদিন ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমানকে এনে সেটি আবার পাঠ করানো হয়। যদিও প্রথমে জিয়াউ রহমান নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দিয়ে সেটি ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে তিনি নিজের ভুল শোধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাঠের মাধ্যমে মানুষ বোঝতে পারে যে, সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আছে এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। পাঠ করা আর একটি জাতিকে স্বাধীনতার জন্যে তৈরি করা, স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র লেখা এক জিনিস নয়! জিয়াকে নিয়ে আসা হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। তিনি স্বেচ্ছায় ঘোষণা দিতে আসেননি। বিষয়টি খালেদা জিয়া কেন বোঝলেন তা আমাদের মাথায় আসে না।

মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ পদ্মা-মেঘনা-যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’ ইত্যাদি। কোথাও কি ‘জয় বাংলা, জয় জিয়াউর রহমান’ বলে স্লোগান ছিল প্রশ্ন রইল খালেদা জিয়ার প্রতি।

২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অংশ নিতে খালেদা জিয়া বিএনপি’র নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, আপনারা রাতে সবাই হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে আসুন। কিন্তু বিএনপি’র ক’জন নেতা এসেছিলেন? অথচ তখন তো তিনি বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। ৩ বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন। তাঁর কথায় তো বিএনপির একটি কাক-পক্ষীও আসেনি। যদিও দুপুরে খন্দকার মোশাররফসহ স্থায়ী কমিটির বেশ কয়েকজন নেতা গিয়ে তাদের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করে এসেছিলেন। তাদের কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিলেন। সেই সমাবেশটির কারণ প্রশ্নবিদ্ধ হলেও তারা সেখানে গিয়েছিলেন।

তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কথায় একটি নেতা-কর্মী আসেনি। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে তাঁর বাসার সামনে বালুর ট্রাক দাঁড় করিয়ে রাখা হলে সেখানে তাকে রক্ষার জন্যে কোনো নেতাকর্মীর টিকিটি দেখা যায়নি। কাজের মেয়েকে নিয়ে বাসা থেকে নয়াপল্টনের উদ্দেশ্যে বের হতে বৃথা চেষ্টা করেন।  সেই নেতা যখন বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন তখন আর কি বলার থাকে?

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার জৈষ্ঠ সন্তান ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্বরে লন্ডনে বলেছেন, ‘তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বলছি, শেখ মুজিব রাজাকার, খুনি এবং পাকবন্ধু ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিব পরিবারের কোনো অবদান নেই (প্রথম আলো-১৭ ডিসেম্বর-২০১৪)।’ বলে বক্তব্য দিয়েছিলেন। এমন মাতলামি বক্তব্য আমরা আর শুনতে চাই না। বঙ্গবন্ধু একদিনে হয়ে যাননি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা শুধুই ৯ মাসে হয়নি। এর পিছনে ছিল দীর্ঘদিনের প্রতিবাদ, আন্দোলন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৬৬দিনের চূড়ান্ত যুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়। এখানে দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষের সহযোগিতা, সহমর্মিতা, অবদান রয়েছে।

খালেদা জিয়াও সম্মানিত ব্যক্তি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তাঁর অবদান রয়েছে। একজন সম্মানিত ব্যক্তির কাজ হচ্ছে আরেকজন ব্যক্তিকে সম্মান করা। আমরা চাই খালেদা জিয়া তাঁর এমন অগ্রহণযোগ্য বক্তব্য প্রত্যাহার করবেন।

৩ জানুয়ারি-২০১৭, দুপুর ২টা ৪৬ মিনিট, ৮/ডি ধানমন্ডি-১৪, ঢাকা-১২০৫
ইমেইল: faarif10@gmail.com

Advertisement

 

Advertisement

কমেন্টস